Archive for জুলাই, 2017

“মিসোজিনি” বা নারীবিদ্বেষ জিনিসটা এতটাই পুরনো, এতটাই গভীরে প্রোথিত তার শিকড়, যে, কখন কীভাবে আমরা না চেয়েও এটাকে উৎসাহ দিয়ে ফেলি, তা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারিনা। কিছু কিছু মানুষ আছেন, ঘোরতরভাবে বিশ্বাস করেন মহিলারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, শুধু দুনিয়ার শোভাবর্ধন, পুরুষের অঙ্কশায়িনী এবং সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্যই তাদের সৃষ্টি। এঁদের নিয়ে তেমন সমস্যা হয়না। এনারা নিয়মিতভাবে মহিলাদের হেয় করে হোয়াট্‌স অ্যাপে ‘জোক’ শেয়ার করেন, ট্রামে-বাসে কোন মহিলা অসুবিধেয় পড়েছে দেখলে প্রভূত মানসিক আনন্দ লাভ করেন, কর্মক্ষেত্রে মহিলা সহকর্মীদের সাজপোশাক, চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে প্রায় অর্গ্যাজমিক তৃপ্তি পান এবং বাড়িতে ফেরার আগে বৌ-এর দেওয়া লিস্টি মিলিয়ে বাজারহাট সেরে ত্রস্তপদে ঘরে ঢোকেন।

কিছু পুরুষ আছেন, যাঁরা সত্যি সত্যিই নারীকে পাশেপাশে দেখতে চান; সহকারী এবং বন্ধুরূপে। আর, বেশ কিছু আছেন, তাঁরা “আহা, ছাড় দিকি, মেয়ে তো” সুলভ দার্শনিকতা নিয়ে স্মিত হাসি হাসেন সবেতেই। সত্যি বলতে কী, সমস্যা সেরকম কোনকিছু নিয়েই নেই। তবুও চুলকানি হয় মাঝে মাঝে আমার মতন কিছু পাগলাইয়ে লোকের যখন, যেদিকে চোখ ফেরাই, সর্বত্রই দেখি কী অমায়িকভাবে,কখনও ঝলমলে বিজ্ঞাপনের মোড়কে, কখনও বা সুপারডুপার হিট সিনেমার ততোধিক হিট সংলাপের আড়ালে মোলায়েমভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে সমাজে তথা পৃথিবীতে, পুরুষতন্ত্রই শেষ কথা বলে আসছে।

“দিলওয়ালে দুল্‌হনিয়া লে জায়েঙ্গে” ছবির সেই দৃশ্যটার কথা মনে আছে? যেখানে রাজরূপী শাহ্‌রুখের বাবা অনুপম খের বলছেন, “বেটা, দুল্‌হন তো উসিকি হোতা হ্যায় যো উসে উঠাকে ডোলি মেঁ বৈঠাতা হ্যায়”। (যে ‘দুল্‌হন” সেজেছে তার মর্জি, ইচ্ছে-অনিচ্ছের ১০৮!) বা “থ্রী ইডিয়টস” ছবিতে চতুরের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা? ধর্ষণ ব্যাপারটাকে যে এতখানি ট্রিভিয়ালাইজ করা যায় মাইরি ভাবতে পারিনি! অথচ মজার ব্যাপার হল, এই দুটো (এ দুটো ছবি সকলেই দেখেছেন প্রায়, তাই উল্লেখ করলাম)  এবং এই ধরণের আরো কয়েক কোটি জিনিস কিন্তু আমরা দেখেছি, হেসেছি এবং উপভোগ করেছি (ভবিষ্যতেও করবো) এবং ঠিক যেমনভাবে ভিকি না জেনে অমেত্ত ভেবে মার্জারিন খেতো, ঠিক সেইভাবেই নারীবিদ্বেষকে নিজের অজান্তেই প্রোমোট করে ফেলেছি।

ধর্ম ব্যাপারটাও অনেকটা এরকমই। কোথায়, কীভাবে যে আপনার মনে নিজের ধর্মের প্রতি একটা আনুগত্য রয়ে গেছে, আপনি নিজেই বুঝবেন না। Religion শব্দের ইটিমোলজি, রোমান ব্যাকরণবিশারদ সার্ভিয়াসের মতে, এসেছে ল্যাটিন religare থেকে, যার নিকটতম অর্থ হল, ”to bind”। এই বন্ধনে আমি, আপনি কেউ সাধ করে আবদ্ধ হইনি, জন্মসূত্রেই হতে হয়েছে। কথা হল, চাইলেই উপবীত বা শাখা-সিঁদুরের মতন একে বর্জন করা যায়না। মানে, অবশ্যই করা যায়, কিন্তু নিজের কাছে কখনও না কখনও ঠিক ধরা পড়ে যেতে হয়। কারণ,  ধর্মহীন হতে  গেলে নিজের এবং পরিবারে দীর্ঘকাল ধরে  চলে-আসা আচারবিচার, উৎসব এবং বিভিন্ন সম্পর্ক গুলোকেও একেবারে মনের গভীর থেকে উপড়ে ফেলতে হয়, সেটা কেউ পারে বলে মনে হয়না। আমি নিজেও অনেক চেষ্টা করেছি, কা কস্য পরিবেদনা।

সুতরাং, ভড়ং দেখিয়ে আর বলতে পারিনা যে আমি সেক্যুলার। আমি আমার ধর্মকে (যদিও, হিন্দুত্ব ঠিক ধর্ম নয়, একটা জীবনযাত্রা) শ্রদ্ধা করি এবং সেই সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষদেরও সমান সম্মান করি। কেউ বিপদে পড়েছে দেখলে, আমি তাকে আগে সাহায্য করবো তার ধর্ম জিজ্ঞেস না করেই। আমার শিক্ষা এবং মূল্যবোধ তাই বলে। ধর্ম নিয়ে ভ্যাজর ভ্যাজর তাই অসহ্য লাগে। কোন বিশেষ খাদ্যাভ্যাস নিয়েও আমার কোন মাথাব্যথা নেই। ভাল করে রান্না করে ডেকে খাওয়ালে সবই খাই (ফলিডল ছাড়া)।

ও, হ্যাঁ, আরেকটা কথা। ধরুন আপনাকে কেউ বিনা কারণে অপমান করলো বা ঠাস্‌ করে একটা চড় কষালো, আপনি কি ছেড়ে দেবেন? দিতেও পারেন, সেটা আপনার অভিরুচি। আমি দিইনা। আমি যেকোন মন্তব্য, যেকোন মতবাদ, যেকোন মানুষকে খোলা মনেই গ্রহণ করি এবং তাকে যোগ্য সম্মান এবং সমাদর দেওয়ার চেষ্টা করি। সেই ব্যবহার তার থেকেও আশা করাটা অন্যায় নয় নিশ্চয়ই। মানে, মোদ্দা কথা, গান্ধীজির এক গালে চড় খেয়ে আরেক গাল এগিয়ে দেওয়াতে বিশ্বাস করিনা। সব ধর্মই সমান; আমার ধর্ম নিয়ে যদি কারো ফালতু মাথাব্যথা না থাকে, আমারও তারটা নিয়ে বিন্দুমাত্র নেই। অন্যথা হলে… আছে। 🙂

এই লেখা পড়ে বেশ কিছু লোক মনে মনে উদ্‌মা খিস্তি এবং প্রকাশ্যে ছিছিক্কার দিয়ে আমাকে আনফ্রেন্ড  বা আনফলো করবেন, এই আশা রাখি। 😑

Advertisements