মেয়েদের সামাজিক অবস্থান ঠিক কোথায় এখন? হঠাৎ মনে-হওয়া কিছু কথা…

Posted: মার্চ 4, 2018 in গদ্য হাবিজাবি
ট্যাগসমূহ:, ,

বেশ কিছু বছর আগে এক ঘরোয়া আসরে, এক পরিচিতা পৃথুলা মহিলাকে আরেকজন মহিলা বলে বসেন, “একটু ওজন কমানো’র চেষ্টা কোরো, নয়ত বয়স বাড়লে নানারকম সমস্যা দেখা দেবে।” তাতে তাঁর উত্তর ছিল, “আমার বর এরকম-ই পছন্দ করে”।

কী ভীষণ অদ্ভুত! স্বামী’র পছন্দ-অপছন্দ’র ওপরেই নির্ভর করবে একটি মেয়ের ওজন। সে কেমন পোষাক পরবে, কী খাবে, কোথায় যাবে, কীভাবে হাঁটবে– সবকিছু-ই ঠিক করবে তার পরিবার, যা কিনা বৃহত্তর সমাজের অংশ। যুগ যুগ ধরে মেয়েরা এইসব বাধানিষেধ মানতে মানতে, কখন যেন ভুলেই গেছে এই বেড়াজালে’র বাইরে তার নিজস্ব অস্তিত্বের কথা। সমাজ তাকে যা পাখি-পড়া করে শিখিয়েছে, তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়ে জিন-এর চরিত্র-ই বোধহয় বদলে দিয়েছে। আমরা তাই এখন, এই সময়ে দাঁড়িয়ে-ও দেখি ফর্সা হওয়া’র ক্রিম দেদার বিক্রি হয়, তা মেখে ত্বকে’র গুরুতর ক্ষতি হতে পারে জেনে-ও শুধুমাত্র নিজেকে সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য করে তোলা’র জন্য শ্যামবর্ণা সুন্দরী  তা প্রাণপণে গালে ঘষতে থাকে। কেন? কারণ তার সেই জোরটা-ই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, নিজেকে নিজের মতো করে তুলে ধরা’র। সেই এক-ই কারণে, যে দেশে এখনও বহুসংখ্যক মেয়ে ঋতুস্রাব-এর দিনগুলোতে নোংরা ন্যাকড়া ব্যবহার করতে বাধ্য হন এবং অস্বাভাবিক হারে  ইউ. টি. আই -তে (Urinary Tract Infection) ভোগেন, সেই দেশে’র একটি রাজ্য ঘোষণা করে স্তনবৃদ্ধিকারী কোন অপারেশন হলে, দরিদ্র মেয়েরা বিনামূল্যে তা করাতে পারবেন সরকারী খরচে। অবাক হবেন না, স্তন এবং যোনি ছাড়া আর আছেটাই বা কী আমাদের। সেগুলো-ও আবার ঠিক ঠিক মাপ-এ হওয়া দরকার, মানে, যে মাপগুলো সমাজ ঠিক করে দিয়েছে। তাই, যোনিপথ যাতে “টাইট” থাকে (বুঝলেন না বুঝি? অর্থাৎ, পুরুষ যাতে সর্বোচ্চ আনন্দ উপভোগ করতে পারে মিলনের সময়, সেই মাপ আর কী)  সেইজন্য নর্ম্যাল ডেলিভারি’র সময় অনেক ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া হয় একটা সেলাই বেশি দিয়ে দিতে। তাতে, নারী’র যন্ত্রণা’র শেষ থাকে না এবং মিলনসুখ বা “অর্গ্যাজম” অনুভব-ও করতে পারেনা আর, কিন্তু এটুকু কষ্ট করা-ই যায় পুরুষের সন্তুষ্টির জন্য, তাই না? খানিকটা এক-ই যুক্তি(!) দেখানো হয় FGM বা Female genital mutilation-এর ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে, মেয়েরা যাতে জীবনে আর কোনদিন-ও যৌনসুখ পেতে  না পারে, সেই বিষয়টা কনফার্ম করা হয়। It’s a tool to control female sexual desire. মেয়েদের ওসব-এর দরকার নেই তো। পুরুষের যৌনক্ষুধা মিটলেই হল। বাকি সব এলেবেলে বি-এ পাশ 🙂

তা যা বলছিলাম, আমাদের মেয়েদের এরকম-ই ভাবতে শেখানো হয়ে এসেছে এবং আগামী একশো বছরে-ও এর কতটুকু পরিবর্তন হবে, সেই বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। আধুনিক সমাজে, কোন মেয়ে সাধারণভাবে যৌনতা’র প্রতি তার আসক্তি ব্যক্ত করলে, তাকে আমরা দাগিয়ে দিই- “নিম্‌ফোম্যানিয়াক” বলে। সেই এক-ই আসক্তি পুরুষ দেখালে হেব্বি “মাচো” ব্যাপার আর কী O:)  আমরা এখন-ও জানি এবং মানি “পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা”; মেয়ে-ফেয়ে হলে, স্রেফ গলা টিপে বা দুধে’র গামলায় চুবিয়ে মেরে ফেলা হয় অনেক জায়গায়। ছেলে হবে না মেয়ে- সেই ব্যাপারটাও, বিজ্ঞানের ক্যাঁতায় আগুন দিয়ে, মেয়েদের ওপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। এখন-ও ধরে নেওয়া হয়, মা হওয়া-ই মেয়েদের জীবনের পরম মোক্ষ এবং সেটি না হতে পারলে, তোমার নারীজন্ম বৃথা। শুধু তাই নয়, মা হওয়ার পর, সন্তানের জন্য জীবনের যাবতীয় সুখ-আহ্লাদ-চাকরি-পড়াশোনা বিসর্জন দেওয়া-ই “ভাল মা” হওয়া’র অন্যতম শর্ত। মাতৃত্ব-কে এক সুমহান (পড়ুন ওভারহাইপড)  রূপে উপস্থাপিত করতে পুরোপুরি সক্ষম এই সমাজ। “বাজে মা” আর “বেশ্যা” –এই দু-টি এখন-ও মেয়েদের প্রতি সর্বোচ্চ গালি হিসেবে সর্বত্র স্বীকৃত। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ সেই নারীকেই উত্তম বলা হয়েছে, যে নারী তার স্বামীকে সন্তুষ্ট করে, পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় এবং স্বামীর কথার উপর কথা বলে না। সুতরাং, হুঁ হুঁ বাওয়া, অত্ত সোজা না। শুক্লযজুর্বেদের অন্তর্গত শতপথ ব্রাহ্মণে নারীকে তুলনা করা হয়েছে এভাবে, “সে ব্যক্তিই ভাগ্যবানযার পশুসংখ্যা স্ত্রীর সংখ্যার চেয়ে বেশি”। কীরকম “Dogs and Indians are not allowed” মনে পড়ছে, কী বলেন!

দুঃখের কথা এই যে, আমরা মেয়েরাও বেশীর ভাগ সময়ে এই সমাজের খাঁচা’য় ঢুকে পড়ি। খাঁচা’য় দানাপানি পাওয়া যায়, আদর-যত্ন-ও কপালে থাকলে জোটে বৈকি। আসলে, বুঝতেই পারি না যে এটা খাঁচা। খাঁচা’র মধ্যে যেসব মেয়েরা একটু “আলাদা”, মানে যারা তেমন ফর্সা নয়, সুন্দরী নয়, যাদের স্তন ছোট বা অতিরিক্ত বড়, যারা মা হতে পারেনি, যার বিয়ে হয়নি বা হলেও টেঁকেনি, যে অফিসে রাতভর পরিশ্রম করে সকালে ফেরে, যে সিগারেট খায় বা মদ খায়, যে ছেলে বা মেয়ে দেখে বন্ধুত্ব করেনা- মানে সোজা কথায় বলতে গেলে সবরকম মেয়েদের দিকে, আমরা, এই মেয়েরাই আঙুল তুলি। কোনো কোনো সময় পুরুষের-ও আগে আমাদের আঙুল ওঠে একে-অপরের দিকে।

আমরা এক হতে পারিনি। হয়ত পারবো কোনোদিন-ও, যেদিন সমস্ত বস্তাপচা ধ্যানধারণাগুলো মন থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হবো। দিল্লি অনেক দূর, জানি, তবু আশায় আশায় বসে থাকি… বসেই থাকি… আমরা সবাই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.