ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল!

Posted: জুন 10, 2018 in গদ্য হাবিজাবি
ট্যাগসমূহ:, , , ,

লীলাবতী’র বিবাহ স্থির হইয়াছে। আত্মীয়স্বজনকে জানানো হইয়াছে, তাঁহারা একে একে আসিয়া সহর্ষ রোমাঞ্চে সারা বাড়ি উচ্চকিত করিয়া তুলিতেছেন। লীলা’র জ্যেষ্ঠতাত গম্ভীর মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পাত্র’র ব্যাপারে অগ্রে কিছু খোঁজখবর করিতে পারেন নাই। শুনিয়াছেন লীলা নিজেই পাত্র পছন্দ করিয়াছে। প্রেমের বিবাহ! তাঁহার ওষ্ঠাধর বঙ্কিম হইল। বিরাগপূর্ণ স্বরে লীলা’র পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,

— তা, ছেলে কী করে?

— (সহর্ষে) ফেসবুক করে। তিনটে দশ লাখি গ্রুপের অ্যাডমিন, দুটো পাঁচ লাখি’র মডারেটর। বেচারা’র নাওয়াখাওয়ার সময় পর্যন্ত নেই, অ্যাত্তো চাপ! সামনের মাসেই জাকারবার্গে’র সঙ্গে মিটিং করতে হন্ডুরাস যাচ্ছে, ওখানকার ক্রাইম রেট কেন বেশি সেই নিয়ে “হন্ডুরাসে হাহা কর” গ্রুপ-এ বিরাট ঝামেলা হয়েছে কিনা, জামাইকে তাই ডেকে পাঠিয়েছে; ও-ই অ্যাডমিন তো…

— আহা, আহা, ভাবা যায়! বেঁচে থাকুক, বাবাজীবন। হীরে’র টুকরো জামাই হয়েছে আমাদের লীলা’র…ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল!

——————————
উপরোক্ত কথোপকথন আপাততঃ কাল্পনিক হলে-ও, এমন দিন যে অদূর ভবিষ্যতে আসবেনা, এমন কথা জোর গলায় বলা যায়না। ফেসবুক এখন আমাদের শিরায়-উপশিরায় বাহিত হয়। আপনার আধার কার্ড নাও থাকতে পারে, কিন্তু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকতেই হবে। এক অজানা জগতের অপার সম্ভাবনাসমৃদ্ধ ইশারা দেয় ফেসবুক। কত্ত কিছু যে জানতে পারবেন, কত জানা জিনিস যে ভুলে যাবেন ফেসবুক করতে করতে, তা আপনি নিজেই টের পাবেন না।

আমি যা কোনোদিন-ও শিখতে পারবো বলে স্বপ্নে-ও ভাবিনি, ফেসবুক আমাকে তা শিখিয়েছে। ঘাসের ওপর প্রথম পড়া শিশির সামান্য নুন দিয়ে খেলে কোষ্ঠ সাফ হবে, টোম্যাটো বেশি খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়, ইউনেস্কো আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে অন্য সব দেশের-ও জাতীয় সঙ্গীত করা’র পরামর্শ দিয়েছে, কীভাবে বসলে মাথায় কোনদিন-ও টাক পড়বেনা, কেন ঠিক দুপুরবেলা রোজ হেঁড়ে গলা’য় গান গাইলে  বাত-এ ধরেনা, ফুলকপি’র  কেক, তরমুজ’র চকোলেট ম্যুজ  বা নিমপাতার টক-মিষ্টি ফিরনি– এ সব-ই আমাকে ফেসবুক শিখিয়েছে। যে বই আমি কখনো পড়িনি, যে সিনেমা আমার কখনো দেখতে ইচ্ছে হয়নি, ফেসবুক আমাকে সেইসব বই/সিনেমা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করেছে, সমাজে আমি মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছি।

তবে, শুধু এটুকু-ই নয়। আরো কয়েক-টা জিনিস বলা দরকার।
এখন আমাদের অনেক বন্ধু। নিত্যনতুন বন্ধুরা তো আছেই, তাছাড়া সেই ছোটবেলা’র ফেলে আসা দিনের বন্ধুদের-ও খুঁজে পেয়েছি এইখানেই। ভারচুয়াল জগত এটা, আমরা সবাই জানি, তবু-ও কারো কারো সঙ্গে তৈরি হয় নতুন সম্পর্ক, দু-দিন অনলাইন না দেখলেই ভাবি “আরে, দেখছিনা তো অমুক-কে, ভাল আছে তো”! ভারচুয়াল হোক বা রিয়্যাল, কৃত্রিমতা চারপাশে বেড়ে-ই চলেছে। ফেসবুকে’র জগতে এইটুকু ভালবাসা, বন্ধুত্ব বা স্নেহের গল্প নাহয় হল। অ্যাবসল্যুট ব্লিস বলে কিছু হয়না। ফেসবুকে-ও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, মনোমালিন্য বা বন্ধুবিচ্ছেদ। তবু-ও দিনশেষে যখন ছবি ফুটে ওঠে একের পর এক স্ক্রিণ-এ, প্রবহমান ভারচুয়ালিটি অজান্তেই কখন আপাত এক নিশ্চিন্তির সন্ধান দেয়। অস্ফুটে কেউ বা বলে-ও ফেলেন, “ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল!”

***”মাধুকরী” অনলাইন ম্যাগাজিন, জুন সংখ্যায় প্রকাশিত***

Advertisements
মন্তব্য
  1. uttamchakrabortyblog বলেছেন:

    একেবারে ঠিক লিখেছেন।

  2. Jyotirmoy Sarkar বলেছেন:

    দারুন ব্যাঙ্গাতক লেখা তার সঙ্গে বাস্তবিকতাও খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছো ।

    • Maniparna Sengupta Majumder বলেছেন:

      অনেক ধন্যবাদ… 🙂 ফেসবুক সত্যি-ই এখন যাকে বলে পার্ট অ্যান্ড পার্সেল অভ লাইফ। আধার কার্ড না থাকলেও চলবে কিন্তু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট যেন থাকে… এরকম অবস্থা… 😛

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.