পয়লা বৈশাখ

Posted: এপ্রিল 3, 2019 in গদ্য হাবিজাবি
ট্যাগসমূহ:, , ,

“ছাড়! ছাড়!” আর্তনাদে সচকিত হয়ে উঠলেন প্রদ্যোতবাবু।  কী ভয়ঙ্কর তীক্ষ্ণ সেই নারী কণ্ঠস্বর, বুঝি বা জীবনের অন্তিম ক্ষণ উপস্থিত। দিনকাল একেবারেই ভাল নয়, নারী নিযার্তনের খবর অহরহ মেলে সর্বত্র। যদি-ও সময়টা ভরদুপুর এবং স্থান খাস গড়িয়াহাট, তাও প্রদ্যোতবাবু যারপরনাই বিচলিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু মুহূর্তমধ্যে তাঁর সমস্ত আশঙ্কা ধূলিসাৎ করে, হাই-হিলের গুঁতোয় তাঁকে কেৎরে দিয়ে, তীব্রবেগে কণ্ঠস্বরে’র অধিকারিণী ছুটে গেলেন একটি বিশেষ দোকানের দিকে, যার সাইনবোর্ড সগৌরবে ঘোষণা করছে ৮০% ছাড়! তাঁকে এক-ই গতিতে অনুসরণ করলেন আরো কয়েকজন। প্রদ্যোতবাবু’র বিস্ময়াহত এবং হাই-হিলাহত চেহারা এক ঝলক দেখে গিন্নি মন্তব্য করলেন, “এইজন্যেই বলেছিলাম ঘরে বসে থাকো। সেল থেকে কিনবে তো নিজের খান-দুই সাদা পাঞ্জাবি আর সম্বচ্ছরের স্যান্ডো গেঞ্জি, সে আমি-ই কিনতে পারতাম। কিন্তু তা-না! বাবু’র আসা চাই… আসলে ক্রেডিট কার্ড আমার হাতে দেবে না…হুঃ, আমি যেন বুঝিনা! এখন খাও জুতো’র গুঁতো।”

মিনমিন করে কিছু বলতে গিয়ে-ও চেপে গেলেন প্রদ্যোতবাবু। ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারটা ধরা পড়ে গেছে, গতিক সুবিধার না। জোরে জোরে দু-তিনবার নিঃশ্বাস নিয়ে মন শান্ত করা’র বৃথা চেষ্টা করে দু-পাশে তাকাতেই মনে হল কবি এই চৈত্র সেল দেখে-ই বোধহয় লিখেছিলেন “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান”।
নানা বয়সের, নানা রঙের, নানা সাইজের মানুষ কিল্‌বিল করছে চাদ্দিকে। তার মধ্যে মহিলা’র সংখ্যায় শতকরা নব্বই শতাংশ। প্রত্যেকের চোখে-মুখেই বেশ একটা লড়্‌কে লেঙ্গে হিন্দুস্থান জাতীয় হাবভাব। চোখে শিকারী’র মনোযোগ এবং ধূর্ততা। এক দশাসই মহিলা একটা টপ্‌ তুলে সেটা গায়ে হবে না বলেই বোধহয় রেখে দিয়েছেন কী দেননি, দুটো দুরকম হাত দু-দিক থেকে এসে সেটা ধরে ফেলল।

প্রথমাঃ আমি তো এটা আগে নিলাম।
দ্বিতীয়াঃ আপনার আগে আমি টাচ করেছি, দিদি…
প্রঃ বললেই হল! আমি যখন এটা ধরেছি, আপনার আঙুল তখন-ও অ্যাট লিস্ট চার সেন্টিমিটার দূরে…
দ্বিঃ একদম বাজে কথা বলছেন…

এরকম বাক্যালাপ কোথায়, কীভাবে শেষ হত কে জানে, কিন্তু দোকানদার ছেলেটা হঠাৎ কতগুলো লেগিংস পতাকা’র মত উড়িয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “জল জল জল, সমুদ্র, পুকুর, মিনারেল। জলের দর, জলের দর, জলের দর।” দুই মহিলাই চরম পিপাসার্তের মত  তৎক্ষণাৎ সেই “জল”-এর দিকে হাত বাড়ালেন।

পেছন থেকে ভেসে এল একটা রিন্‌রিনে স্বর।

— ছিঃ, তুমি ওখানে গিয়ে লুঙ্গি তুলছো!

কী দেখতে হবে না হবে ভেবে আতঙ্কিত হয়ে-ও অসীম কৌতূহলে প্রদ্যোতবাবু ঘাড় ঘোরালেন।

একটা অল্পবয়সী মেয়ে’র সামনে সম্ভবতঃ তার বয়ফ্রেন্ড দাঁড়ানো। অসহায় চোখমুখ।
ছেলেটা’র গলা শোনা যাচ্ছে, “আরে মা একটা নিতে বলেছিল বাবা’র জন্য। তোমার সঙ্গে যখন এলাম-ই এদিকে তাই দেখছিলাম যদি কিনে নেওয়া যায়।”

মেয়েটা গজগজ করে কিছু একটা বলল। প্রদ্যোতবাবু আর শোনা’র চেষ্টা করলেন না।

এদিকে গিন্নি এগিয়ে গেছেন অনেকটা। দূর থেকে অদ্ভুত মুখভঙ্গী করে ডাকছেন।

পা চালিয়ে এগিয়ে যেতেই মুখঝামটা।

— এসেছো যখন ব্যাগগুলো তো একটু ধরবে। বয়স হচ্ছে, একা একা এত বোঝা বওয়া যায় নাকি!

বোঝা বানানো’র কী দরকার ছিল, এটা মনে এলে-ও মুখে আনলেন না আর।

— আচ্ছা, দ্যাখো তো এই “মেঘে’র মা” শাড়িটা ভাল নাকি এই “কুসুম দোলা”-টা?

গিন্নি’র কথা শুনে যাকে বলে হুব্বা হয়ে গেলেন তিনি। কে মেঘ, তার মা’র শাড়ি কেন-ই বা বিক্রি হচ্ছে কিছুই বুঝলেন না। তবু কিছু একটা বলতেই হয়, বলে বসলেন, “ওই কুসুম শাড়ি-ই নাও। কার না কার মায়ের শাড়ি, সেকেন্ড হ্যান্ড শাড়ি কিনোনা, যত-ই ডিস্কাউন্ট দিক”।

বলেই, গিন্নি’র গন্‌গনে মুখে’র দিকে তাকিয়েই বুঝলেন কিছু একটা গণ্ডগোল করেছেন। সেটা কী বা কোথায়, তা বুঝতে না পেরে মনোযোগ দিয়ে উল্টোদিকের একটা রোলে’র দোকানের দিকে চেয়ে থাকাই নিরাপদ বলে মনে হল।

হঠাৎ  কানে এল ছোট শালী সুমেধা’র সুমধুর কণ্ঠস্বর,

— আরে, দিদি, তুই এখানে? ও বাবা, প্রদ্যোতদা-ও আছেন দেখছি। বাজার করতে বেরিয়েছিস নাকি এই গরমে?

সুমেধা-কে দেখে তিনি যারপরনাই আহ্লাদিত হলেন। মেয়ে-টা দিদি’র মত নয়। একেবারে আলাদা। এই সু্যোগ কাজে লাগাতে হবে।

— আর বোলোনা, তোমার দিদি শপিং শপিং করে পা… এই অবধি বলে, গিন্নি’র মুখের দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গিলে, …না, মানে, এই তোমার বাবা-মায়ের জন্য, তারপর বাড়ি’র জন্য কিছু তো কিনতেই হয়। আমি ব্যাগ বইবো বলে এসেছি… হেঁ হেঁ করে কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলেন তিনি।

মুচকি হেসে সুমেধা দিদি’র হাত ধরে টান লাগায়।

— চল্‌ তো! অনেক কিনেছিস। কী যে এত কিনিস বুঝিনা। এসব তো সারা বছর পাওয়া যায়। আমাদের এক বন্ধু’র গানের অনুষ্ঠান আছে  কাছেই, পয়লা বৈশাখ সামনে, সেই উপলক্ষ্যে, ওখানে গিয়ে শান্তি-তে গান শুনবি। তুই তো গান ভালবাসিস।

দিদি’র হাতের ভারী ব্যাগ-টা  নিজের হাতে নিয়ে, এক নজর ভেতরে দেখেই আবার অবাক স্বর শোনা যায় সুমেধা’র।

— এ কী রে, এত গাদাগুচ্ছের ফ্রক কিনেছিস কেন? বাবান কি ফ্রক পরে নাকি?  আবার ক্লিপ, হেয়ার-ব্যান্ড…এসব কী রে…

— চুপ, চুপ…

গিন্নি’র নীচু গলা কানে আসে প্রদ্যোতবাবু’র।

—  না রে, একটা বাচ্চা মেয়েদের সংস্থা আছে; অনাথ, গরীব মেয়েরা থাকে। বচ্ছরকার দিন… ওদের কিছু দেবোনা? আমাদের বাড়ির কাছেই রে… সেইজন্য…

বলতে বলতে গিন্নি এগিয়ে গিয়েছিলেন। পেছন ফিরে প্রদ্যোতবাবু’র দিকে তাকিয়ে এগোতে ইশারা করলেন। শেষ বিকেলের আলোয় ঘর্মাক্ত মধ্যবয়সিনী’র মুখ অন্য আভায় উজ্জ্বল।

সহসা সেই অমোঘ লাইন ক’টি মনে পড়ে যায় তাঁর…

“প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস-
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।।
এ সংসারের নিত্য খেলায় প্রতিদিনের প্রাণের মেলায়
বাটে ঘাটে হাজার লোকের হাস্য-পরিহাস–
মাঝখানে তার তোমার চোখে আমার সর্বনাশ।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.