ভালবাসার অদৃশ্য সংজ্ঞা

Posted: এপ্রিল 14, 2019 in গদ্য হাবিজাবি
ট্যাগসমূহ:, , , ,

খুব চেনা ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন হয়; স্বামী রিটায়ার করেছেন এক যুগ হয়ে গেছে, স্ত্রী বয়সে খুব বেশি ছোট নন স্বামী’র থেকে। অনেক, অনেক বছর আগে হলেও তাঁদের ছিল ভালবাসার বিয়ে।  দুজনকে-ই এখন “ওয়াকিং স্টিক”-এর ভরসায় হাঁটাচলা করতে হয়। কিন্তু, সেটা তাঁরা করেন না বেশিরভাগ সময়ে। একে-অপরকে আঁকড়ে ধরে পা টিপে টিপে রাস্তার এক পাশ দিয়ে সাবধানে হাঁটেন। স্ত্রী মাঝে মাঝে চকিতে দেখে নেন পেছন ফিরে, আচমকা কোনো কাণ্ডজ্ঞানহীন রিকশা বা অটো বেমক্কা উঠে এল নাকি গায়ের ওপর! স্বামী সেটা-ও আবার পারেন না, গলায় মোটা বেল্ট, স্পন্ডিলিসিস।

ছেলে-মেয়ে দুজনেই যথাক্রমে অন্য দেশে এবং প্রদেশে থাকে। ওনারা একাই আছেন এবং, দিব্যি আছেন।
হাজার অসুস্থতা, শারীরিক অসুবিধে এবং বহুবিধ অন্য নিত্যকার ঝামেলা সামলিয়ে-ও আমি ওনাদের হাসতে দেখি। সকলেই দ্যাখে। আমার মতন অবাক-ও হয় হয়তো। আমরা যেখানে এই বয়সেই “আর পারছিনা” লব্জ আওড়াতে থাকি পান থেকে চুন খসলেই, সেখানে ওঁরা এখন-ও হাসেন। ফরসা মুখে বলিরেখা উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, চোখের কোণে অগুন্তি হাঁসের পায়ের ছাপ সোচ্চারে জানান দেয়, এ হাসি অনেক পুরনো।

বেশ কিছুদিন আগে, পাড়া’র ওষুধের দোকানে গেছি মা’র ওষুধ কিনতে। সেদিন কোন কারণে কর্মচারী খুব কম। ব্যস্ততা’র শেষ নেই। মাসের প্রথমে যেকোন ওষুধের দোকানে আজকাল গেলে দেখা যায়, বয়স্ক এবং নট-সো-বয়স্ক মানুষরা মাসকাবারী বাজার করা’র মত ওষুধ কিনছেন 😦 আমার সামনেই একজনের বিল হল প্রায় সাত হাজার টাকা’র কাছাকাছি। সারা মাসের ওষুধ। তো যাইহোক, আমি ওষুধ নিয়ে বেরোতে যাবো, এমন সময়ে দোকানদার কাকু একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন “ওমুক বাড়িতে এই ক’টা ওষুধ দিয়ে দিবি একটু যাওয়ার সময়? তোদের পাড়াতেই, চিনিস মনে হয়। আজ একটাও লোক নেই যে পৌঁছে দেবে। এদিকে বয়স্ক মানুষের জিনিস, না দিলেই নয়”। না করা’র কারণ নেই। এই দোকানদার কাকু আমায় ছোটবেলা থেকে চেনেন। আর বাড়িটা বুঝলাম, যে বৃদ্ধ দম্পতি-কে মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখি, চোখাচোখি হয়, সামান্য হাসি কখনো, তাঁদের।

সেই প্রথম তাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি কথা হল। দুজনেই ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন ভেতরে ঢুকে চা খাওয়ার জন্য। অন্যদিন আসবো প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ফিরে এলাম।

তারপর গেছি বার দুয়েক।

কয়েকদিন আগে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক প্রায় শয্যাশায়ী। কোনোভাবে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগিয়েছেন। কথাই বেরোচ্ছেনা গলা দিয়ে। তাও, আমি যেতেই ইশারা করে বোঝালেন স্ত্রী-কে, চা করো। আমি যত বলি খাবোনা, তিনি তত-ই ইশারা করে এক-ই কথা বলেন। মাসিমা স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে বললেন, “তুমি ভেবোনা আর। তোমায় খেতেই হবে, নইলে ইনি এই দশ মিনিট আগে চা খেয়েই আবার খাবেন কী করে!”
ধরা পড়ে মুখ গোঁজ করে স্ত্রী-কে কাঁচকলা দেখালেন। এবার আমি আগে হাসলাম।

টুকটাক কথা হচ্ছিল। হাসতে হাসতেই হঠাৎ মাসিমা বললেন। “জানো তো, আমি সবসময় ঠাকুরকে বলি এই মানুষটা যেন আগে রওনা দেয়। আমি আগে গেলে  খুব কষ্ট হবে ওর।”

কাঠ হয়ে গেলাম শুনে। কতখানি ভালবাসলে এরকম বলা যায়! আমরা তো সবসময়েই বলি, তোমাকে ছাড়া বাঁচব না– এই বাক্যটি-ই নাকি শ্রেষ্ঠ প্রেমের উক্তি। অথচ, তার মধ্যে মিশে থাকে এক অপরিসীম স্বার্থপরতা। সেখানেও আমরা চিন্তা করি নিজের সুখটুকু, ভালবাসার মানুষটি না থাকলে দিনযাপন ভয়ানক হয়ে ওঠে, বিশেষতঃ বার্ধক্যে। আমরা ভাবি, সেই সীমাহীন শূন্যতা আমায় অন্ততঃ যেন ভোগ করতে না হয়, অন্ধকারের স্মৃতি হাতড়ে, অশক্ত টলমল পায়ে, আমি যেন অন্ততঃ জীবনের কাছে মুক্তি ভিক্ষা না করি। সঙ্গী বা সঙ্গিনী’র যা হয় হোক, আমায় যেন নিংড়ে-নেওয়া মানসিক যন্ত্রণা না পেতে হয়। হয়ত বা অতিরঞ্জত ভাবনা, কিন্তু এরকম-ই মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে।

এরকম-ও ভালবাসা হয়। এরকম-ও ভালবাসা যায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.