Archive for অগাষ্ট, 2020

স্লেট-রঙা আকাশটা নিচে ঝুঁকে পড়ে একসময়। দুপুরটা বৃষ্টি হয়ে যায়। সামনেটা ধোঁয়াটে, আবছা। নিমের ছোট ছোট সাদা ফুল বনজ সুঘ্রাণ ছড়িয়ে শরীর বিছিয়ে মাটিতে। বন-তুলসীর ঘন ঝোপের মধ্যে ডানা গুটিয়েছে একটা শালিক, হলদেটে একটা ফড়িং সেদিকে যেতে গিয়েও থমকে যায়। স্বচ্ছ পাখায় কয়েক বিন্দু জল। পদ্মপাতা’র দৃষ্টিবিভ্রম। ক্ষণস্থায়ী, ভঙ্গুর।

পুরোনো বাড়িতে, ছোটবেলার জানালায় ছিল মোটা মোটা লোহার শিক। কেউ কেউ বলতো, জেলখানা যেন। এইরকম কোন কোন বৃষ্টি-ধোয়া দুপুরে, জানালার ঠিক পাশের পুকুর থেকে দ্রুত ছুটে আসতো রাশি রাশি জলকণা। লোহা আর জলের গন্ধ মিশে একটা মিশ্র ধাতব গন্ধের সৃষ্টি হত। জেলখানা নয়, সে জানালা আমার খোলা আকাশ, কল্পনার ক্যালাইডোস্কোপ। রাতেরবেলা কালো জলের শিরশিরে ডাক, মৎসকন্যা না উঠুক, হিল্ হিল্ করে সাপ সরে সরে যেত, ঘাস ছেড়ে ঘন কালো জলে। পুকুরপাড়ে নিস্তব্ধতা, অন্ধকার ঘরে খোলা জানালা– সেইসব ঘুমহীন কল্পজাল বোনার রাতে, চুপি চুপি কথা হতো নিজের সঙ্গে। ওই জানালার ধারে বসেই ঠাকুমা একদিন বলেছিল, “ও মণি, তুমি কি আমারে খারাপ বাসো?” ভাল তো সবাই বাসে, খারাপ বোধহয় একমাত্র বরিশালের মানুষরাই বাসতে পারে! সেই তারা-হয়ে-যাওয়া বুড়িকে বলতাম– না না, আমি কারুক্কে খারাপ বাসি না, অত সময় কই এক জীবনে।

কিন্তু ভাল-ই বা বাসি কি? কী জানি, বুঝি না। কিন্তু ওই যে ছোট্ট ছোট্ট দু’টো ফ্যাকাশে গোলাপি বনফুল ফুটেছে ভয়ে ভয়ে টবের কোণায়, আঁজলা করে জল দিই ওদের। সবুজ গঙ্গাফড়িং আসতো একটা সকালে, সেটা আর আসেনা বলে অযথা বিচলিত হই। শুকনো ফুল কুড়িয়ে নিয়ে মাটির ভাঁড়ে রাখি। তবে কি ফুরিয়ে না গেলে, মিলিয়ে না গেলে, ভালবাসা বোঝা যায় না? দুপুরটা যেমন বৃষ্টি হয়ে যায়, উথলে ওঠে, ভালবাসাও জীবন পাক। আমি থাকি বা না থাকি, আমি যে ছিলাম, সেই রেশটুকু যেন থাকে।



তিনটে বিশালদেহী নারকেলগাছ আকাশের অনেকটা কিনে নিয়েছে। সূর্যটা প্রতিদিন ওদের পাতার আড়ালেই রাতের আশ্রয় নেয়। টুপচুপ অন্ধকার অজস্র পালকের মত ধীরে ধীরে নেমে আসে। ভারহীন, শব্দহীন, তবুও ভীষণরকম বাঙ্ময়। অন্ধকারের একটা মাধুর্য আছে; আলোর নির্লজ্জ রঙমাখা শহুরে অন্ধকার নয়, ফণীমনসার কাঁটায়, বটের ঝুরিতে, বুনো কচুর পাতা-ভরা যে অন্ধকার, সে শিরশিরানি জাগিয়ে তোলা সুন্দর। উপরে মেঘের ছাউনি, ইতিউতি উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করা দু’একটা অবাধ্য তারা– সেই সৌন্দর্যে আটকা পড়ে যায়।

মেয়েটা রাত্তির ভালবাসে। অন্ধকার ভালবাসে। অন্ধকারের নিজস্ব অস্তিত্ব তার চেনা। হালকাপলকা পশমিনা শালের মত সেই অস্তিত্ব, সব কষ্ট, সব ক্ষত আলতো করে ঢেকে দেয়। ভারি নিশ্চিন্ত লাগে। একজোড়া কালো ডানা গজায়…. হুউউশ করে সময় পেরিয়ে যায়।
গাঢ়তর হয় রাত, জোনাকি জ্বলে আজকাল মাঝে মাঝে। উড়ন্ত সবুজ পান্নার মত মনে হয় লুসিফেরন আর লুসিফেরজের এই কাণ্ডকারখানা। ওরা নাকি সঙ্গী খোঁজে আলো জ্বালিয়ে। হবেও বা। মেয়েটার মনে হয়, এই রাতটা-ই জীবন্ত। বিশ্বচরাচরে কাউকে প্রয়োজন, মনেই হয় না। বেলফুলের গন্ধের সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করে হাওয়ায় ভর করে।
রাত হতে ইচ্ছে করে।
গাছ হতে ইচ্ছে করে।
কিছু হয় না।

অনেকক্ষণ পর, নারকেলগাছগুলো আর কালো থাকে না। সবুজ হয়ে ওঠে আবার।আরেকটা দিন,মানুষ সেজে ঘোরার যন্ত্রণাময় আরেকটা দিন শুরু হয়।