Author Archive

আমার এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে “আগামীকাল” অনলাইন ম্যাগাজিনে। সাধারণতঃ, গল্পটা শেয়ার করি তবে এটি সদ্য প্রকাশিত বলে এখানে লিঙ্ক দিলাম। যাঁরা পড়বেন, মতামত জানাতে পারেন এখানে বা ম্যাগাজিনের “মন্তব্য” অংশে…  🙂

https://aagamikal.com/%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7/

Advertisements

অপেক্ষা করতে বিরক্ত লাগলেও উপায় নেই। বসে তাকে থাকতেই হবে। হিসেবমতো, ফোনটা আসার আগে এই ঘর ছেড়ে তার বেরনোর কথা নয়। তাই, চুপচাপ বসে আকাশপাতাল ভাবা ছাড়া আর কী করা যায়, সেটা চিন্তা করতে করতেই মুঠোফোন মৃদু নড়েচড়ে উঠল। ভাইব্রেশনে রাখা। দ্বিতীয়বার নড়ার সঙ্গে সঙ্গেই “অ্যাক্সেপ্ট” বোতাম টিপলো সে এবং ওপার থেকে ভেসে এল কন্ঠস্বর,

— ঘুমিয়ে পড়েছে?
— হ্যাঁ, বেশ কিছুক্ষণ আগে…
— আপনি এবার বেরিয়ে যেতে পারেন। অনেক ধন্যবাদ।

কট্‌ করে কেটে গেল লাইন। তারপরেও একটুক্ষণ থম্‌ মেরে বসে রইল সে। “ধন্যবাদ” শব্দটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কেউ কখনো আগে তাকে ধন্যবাদ দেয়নি এই কাজের জন্য।

অবশেষে, নিজের মনেই একটু হেসে, ব্যাগটা তুলে দরজা দিয়ে উঁকি মেরে ফাঁকা করিডরে বেরিয়ে এল সে। কেউ নেই কোত্থাও। থাকার কথাও নয় এই রাত একটার সময়। যেমন বলা হয়েছে, তেমনি, ঘরের দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে, লিফ্‌ট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে  নেমে পেছনের রাস্তায় বেরোতে আরো খানিকক্ষণ।
রাস্তা জুড়ে মসৃণ, পাতলা কুয়াশার পর্দার মধ্যেও একটু দূরে দাঁড়ানো গাড়িটা চিনতে কষ্ট হলনা। ড্রাইভার বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছিল কারণ বেশ কয়েকবার জানালার কাঁচে টোকা মারার পর দরজা খুলল। ভেতরে বসে ব্যাগের মধ্যে হাত দিয়ে নোটের মোটা বাণ্ডিলটা একবার স্পর্শ করল সে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরনোর সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ীটা কুয়াশা ভেদ করে এগিয়ে চলল।
—————————————————————————————————————————————–

প্রায় দশবার নক্‌ করার পরেও স্যুট নম্বর ৭০৮ থেকে  কোন সাড়া না পেয়ে, হাউসকিপিং-এর নতুন রিক্রুট অনিল রাস্তোগীর কপালে এই শীতেও বিন্‌বিন্‌ করে পুঁতির মত ঘাম ফুটে উঠল। ভেতরে যাঁর থাকার কথা, তিনি হেঁজিপেঁজি লোক নন, এ দেশের বিখ্যাত বিজনেস টাইকুনদের মধ্যে অন্যতম।  কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আরো দু-মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেই সে ম্যানেজারের ঘরের দিকে ছুটল।
—————————————————————————————————————————————–

কুণাল পার্কে অষ্টমবার পাক দেওয়া সবে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়েই ফোনটা বাজল। অভ্যেসমাফিক, ফোনটা তুলেই “ইন্সপেকটার রয় স্পিকিং” বলার সঙ্গে সঙ্গেই ওপার থেকে যা খবর পাওয়া গেল, তা পুরো দিনটা মাটি করার পক্ষে যথেষ্ট। কয়েক মিনিট পর, ফোনটা বন্ধ করে কুণাল ফের জগিং-এ মনোনিবেশ করল। যা হয় হোক, দশ পাক না মেরে কোথাও যাওয়ার প্রশ্ন নেই!

ঠিক আধঘন্টা বাদে, কুণাল যখন হোটেল “ভিউ পয়েন্ট”-এর রিসেপশনের ঢুকল, তখনও পরনে জগিং-এর পোষাক। সবে সকাল সাড়ে আটটা, লবিতে লোকজন বিশেষ নেই এবং বোঝাই যাচ্ছে যে হোটেল কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যাপারটা মিডিয়ায় এখনো অবধি ফাঁস হতে দেয়নি। তবে শেষরক্ষা হবেনা, বলাই বাহুল্য, ভাবল কুণাল।

— ইয়েস স্যার, হাউ মে আই হেল্প ইউ? রিসেপশনের ছোকরা নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে মেশিনের মত আউড়ে গেল।
কুণাল বেশি কথার মানুষ না। বস্তুতঃ, ডিপার্ট্মেন্টের সকলেই জানে ওর মেজাজ আর গোঁয়ার্তুমির কথা। যা মনে করবে, সেটাই করবে। তিনকূলে কেউ নেই, ঘুষ খায়না, মেয়েছেলের দোষ নেই, সৎ, পরিশ্রমী এবং ঝক্‌ঝকে বুদ্ধির অধিকারী এই বাঙালী ছেলেটিকে তাই মেজাজ সত্ত্বেও ওপরওয়ালারা যথেষ্ট স্নেহ করেন এবং একটু সমঝেও চলেন।

এখনও কুণাল একটাও কথা খরচ না করে শুধু আই-কার্ডটা বের করার সঙ্গে সঙ্গেই ছোকরার নির্লিপ্তি, সম্ভ্রমে বদলে গেল। কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন পোর্টারকে ডেকে ম্যানেজার মিঃ কাশ্যপের কেবিনে পৌঁছে দিত বলল ওকে।

মিঃ জয়রাম কাশ্যপ, দেরাদুনের অন্যতম বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল, “ভিউ পয়েন্টে” -এর ম্যানেজার, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন কুণালের জন্য। এই ছবির মত ছোট্ট, সুন্দর পাহাড়ী শহরে দু-বছর হতে চলল কুণালের। সকলেই প্রায় ওর খ্যাতি বা কুখ্যাতির কথা জানে। মিঃ কাশ্যপের মুখ দেখে যথেষ্টই টেন্সড মনে হল। ওনারা যা সন্দেহ করছেন, তাই ঘটে থাকলে পুলিশের কাছ থেকে ক্লিন-চিট পাওয়াটা হোটেলের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে জরুরী। মিঃ কাশ্যপের দুশ্চিন্তার কারণ আছে বৈকি।
____________________________________________________________________________________________

ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে স্যুট নম্বর ৭০৮-এ ঢুকে বিস্তৃত বসার ঘর পেরিয়ে, পাশে বেড্রুমে ঢুকতেই একঝলক কন্‌কনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় কেঁপে উঠল কুণাল। বিছানায় যিনি শুয়ে আছেন, তাঁকে সারা ভারতবর্ষে অনেকেই চেনে। বিখ্যাত ব্যবসায়ী মিঃ অশোক সিংঘানিয়া। ঠিক মাথার পাশের জানালাটা হাট করে খোলা। শোয়ার ভঙ্গী দেখে এক ঝলকে কিছু বোঝা না গেলেও পুলিশের বুঝতে অসুবিধে হয়না, যে, দেহে আর প্রাণ নেই। নীচু হয়ে ঝুঁকে একটা আঙ্গুল স্পর্শ করল কুণাল— বরফ! জানালার হাওয়া তার কাজ করেছে।

— আপনারা কেউ এর আগে এই ঘরে ঢুকেছেন? কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাশ্যপকে জিজ্ঞেস করে কুণাল।

— না…ন্‌না…কেউ না।

— হুঁ, জানালাটা তাহলে খোলাই ছিল, তাই তো?

— তাই হবে, স্যর। হয়তো প্রচণ্ড হাওয়ায় কোনভাবে খুলে গিয়ে থাকবে। কাল তো ভয়ানক কুয়াশা ছিল, হাওয়ার দাপট বেড়েছিল রাত্রের দিকে। পাগলেও এই ডিসেম্বরের রাতে দেরাদুনে জানালা খুলে শোবেনা!

— হুঁ; আর কথা বাড়ায়না কুণাল।

ফরেন্সিক টিম এবং ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে করতেই ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট আনন্দ রাঠৌর এসে পৌঁছায়। একবার  ঘরে ঢুকে দেখেই মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসে।

— সিম্‌স টু বি অ্যান ওপেন অ্যান্ড শাট্‌ কেস, স্যর। এভরিথিং লুক্‌স পার্ফেক্ট। নো ফোর্সড এন্ট্রি অর এনিথিং…   হি মাইট হ্যাভ গট্ন আ হার্ট অ্যাটাক…….

–ইয়েস, ইয়েস। সোৎসাহে আলোচনায় যোগ দেয় কাশ্যপ, বলতে থাকে,

–আপনারা আমাদের সিসিটিভি ফুটেজ-ও দেখুন। কাল রাত ১১.৪৫-এর পর এই  সেভেন্‌থ ফ্লোর থেকে আর লিফ্‌ট ওঠেনি বা নামেনি। নতুন কোন ভিজিটর বা গেস্টও আসেনি সাড়ে দশটার পর…  উই আর ক্লিন…

বোঝাই যাচ্ছে, ভাবল কুণাল, কাশ্যপ মনেপ্রাণে চাইছে যেন কোনভাবেই হোটেলের কোন বদনাম না হয়। সেক্ষেত্রে, বেচারার চাকরি-ও চলে যেতে পারে।

কুণাল তাও চিন্তা করছিল। ওর মন সবসময়েই অন্ধকারে আলো খুঁজে বেড়ায়। আর একটা কথা ও বিশ্বাস করে, টু মাচ নর্ম্যালসি মিন্‌স সাম্থিং ইজ অ্যাবনর্ম্যাল।

কিছুক্ষণ পর ডক্টর লোহিয়া বেরিয়ে এসেও প্রায় একই কথা শোনালেন।

— মৃত্যু ঘটেছে ভোর পাঁচটা থেকে সাড়ে ছ-টার মধ্যে কোন এক সময়ে। রিজ্‌ন; ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। Primary flaccidity-র স্টেজেই আছে এখনো বডি। Rigor mortis সেট-ইন করেনি। তবে তোমাকে আরো সঠিকভাবে সময়টা বলতে পারবো এবং অন্যান্য ডিটেইলস, ইন কেস যদি পোস্টমর্টেম হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্টস্‌ অনেক আছে, নেওয়া হয়েছে কিছু, যদি কাজে লাগে।

মাথা নেড়ে আর তেমন কিছুই করার নেই ভেবে শেষবারের মতন একবার ৭০৮-এ ঢুকেই থমকে যায় কুণাল। টেবিলের একেবারে তলায় ওটা কী? নীচু হয়ে টেনে বের করতেই দেখে একটা বুকমার্ক। সাধারণ বাজারী বুকমার্ক নয়, বাহারী, পাতলা কাঠের তৈরি… বেশ অন্যরকম, সুন্দর দেখতে।

ঘরে বই কোথায়? এদিক ওদিক খুঁজেও বই চোখে পড়লোনা তো। নিউজপেপার আছে,  কয়েকটা বিজনেস ম্যাগাজিন…কিন্তু বই নেই!

আপনা থেকেই ভুরু কুঁচকে যায় কুণালের।
____________________________________________________________________________________________

— পাগল হলে নাকি, রয়? এসিপি গুপ্তা মেজাজ হারিয়ে খেঁকিয়ে ওঠেন। কীসের জন্য পোস্টমর্টেম? একটা জানালা হাওয়ায় খুলে গেছিল আর তুমি কী একটা বুকমার্ক কুড়িয়ে পেয়েছো বলে? মিসেস সিংঘানিয়া কোনরকম সন্দেহ প্রকাশ করেননি। নো ফাউল প্লে। উনি বরং আমাদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন। আর, এসব হাই প্রোফাইল কেস-এ ওপরমহলের চাপ কীরকম তা তোমার অজানা না। ভালয় ভালয় মিটে যাচ্ছে, কোথায় শান্তি পাবে তা না… সবেতেই তোমার এই ইন্‌ট্যুশন আর সন্দেহবাতিক। দু-দিন ছুটি নাও। দিস ইজ অ্যান অর্ডার…

— কিন্তু, স্যর, একবার শেষ চেষ্টা করে কুণাল। উনি আগের রাত্রেও একেবারে নর্ম্যাল ছিলেন। ডিনার  দিতে-যাওয়া স্টাফ কনফার্ম করেছে। হাইপারটেনশনের পেশেন্ট বলে নিয়মিত চেক আপ করাতেন… ওষুধের শিশিও পাওয়া গেছে বেডসাইড টেব্‌লে…

— তাতে কী? হাইপারটেনশন অনেক সময়েই সাইলেন্ট কিলার… আর কথা বাড়িওনা…প্লিজ!
____________________________________________________________________________________________

অসম্ভব মাথা গরম হয়ে রয়েছে কুণালের। মাঝে মাঝে ভাবে শালা চাকরিটাই ছেড়ে দেবে! বিগ পিপ্‌ল অ্যান্ড দেয়ার ইল্ক! মিসেস সিংঘানিয়ার সঙ্গে একবার কথা বলার ইচ্ছে ছিল, সেটাও সম্ভব হলনা। অবশ্য, এমনও হতে পারে ও নিজেই অকারণ সন্দেহ করছে এক্ষেত্রে। মেকিং মাউন্টেন আউট অভ মোল্‌হিল্‌স। যাক, কী আর করা, এই প্রথম ওর ইন্‌ট্যুশন ফেল করলো। কেস অফিশিয়ালি ক্লোজড।

এক কাপ কফি খাবে বলে সামনের কফিশপ্-এ ঢুকে বসতেই খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এল পেছন থেকে। দুটো অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে, মেয়েটা খুব হাসছে, ছেলেটা রেগে আছে, বোঝা যাচ্ছে।

— আমায় আধঘন্টা দাঁড় করিয়ে রেখে হাসছিস?

— আরে, তুই একটা দম-দেওয়া পুতুলের মতন প্রতি মিনিটে একবার করে ঘড়ি দেখছিলি আর একবার মোবাইল। মেয়েটার হাসি থামেই না আর।

— তুই কী করে জানলি???

-আমি তো ছিলাম ওখানে তোর অনেক আগে থেকেই। বুকশপের পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আমি না এলে তুই কী করিস…

হঠাৎ যেন কুণালের মাথায় ধাক্কা লাগে। কী বলল মেয়েটা! আগে থেকেই ছিল ওখানে! এরকম যদি হয়, ওই সেভেন্‌থ ফ্লোরেও কেউ আগে থেকেই ছিল, রুম বুক করে। তাহলে তো লিফ্‌ট ব্যবহার করার প্রশ্নই উঠছেনা। এক্ষুণি একবার গেস্ট-লিস্ট চেক করা দরকার। আগে কেন করেনি সেই ভেবেই নিজেকে গালি দিতে ইচ্ছে হল কুণালের।
_________________________________________________________________________________________

দশ মিনিট পর হোটেল “ভিউ পয়েন্ট”-এ একটু সন্তর্পণেই যেন ঢুকলো কুণাল। কারণ অফিসিয়ালি সে এই কেস নিয়ে তদন্ত চালাতে পারেনা। হাঁফ ছাড়লো দেখে যে রিসেপশনে অন্য একটি মেয়ে বসে। কুণাল ওর আই ডি কার্ডটা দেখিয়ে বলে, “আমার কিছু ইনফর্নেশন দরকার মিঃ সিংঘানিয়ার ব্যাপারে। দশ মিনিটের মধ্যে।”

দশ মিনিটের জায়গায় প্রায় আধঘন্টা পর যে তথ্যগুলো পাওয়া গেল, তাতে কুণালের ভ্রূ, কপাল দু-ই কুঁচকে গেল।

সিংঘানিয়া শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটের সময় চেক-ইন করেন এবং রবিবার সকাল সাড়ে আটটার কিছু পরে তাঁর মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। সিংঘানিয়া’র পরে সেইদিন, অর্থাৎ শুক্রবার সন্ধ্যে থেকে রবিবার রাত অবধি আরো পঁচিশ জন গেস্ট “ভিউ পয়েন্ট”-এর আতিথ্য গ্রহণ করেছেন; তার মধ্যে আটজন হোটেলের পুরনো কাস্টমার, সতেরো জন নতুন। চারটে বিদেশী কাপ্‌ল, ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর জন্য আসা, জনা আষ্টেকের একটা দল, একজোড়া বুড়োবুড়ি, বাচ্চা সহ একটি পরিবার– এরা প্রত্যেকেই এখনও হোটেলেই আছে প্রাথমিক পুলিশি নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর-ও। ঝাড়াই-বাছাই করতে করতে সে তিনটে নামে এসে ঠেকার পর, সেই তিনজনের ক্রেডেনশিয়াল্‌স জানতে চায়। জানা যায়, প্রথম জন, একজন সোলো ফোটোগ্রাফার, গতকাল অর্থাৎ মঙ্গলবার হোটেল থেকে বেরিয়েছেন শ্যুটের জন্য, ঘর ছাড়েননি। আজ তাঁর ফেরার কথা। দ্বিতীয়জন,  এক সিন্ধ্রি, গতকাল বিকেলে বেরিয়ে গেছেন এবং তৃতীয় ব্যক্তি, এক বয়স্ক মহিলা, একাই এসেছিলেন এবং রবিবার খুব ভোরে তিনি হোটেল ছাড়েন।

রবিবার! খুব ভোর! কী এমন প্রয়োজন ছিল যে ভদ্রমহিলা পাঁচটার সময় এই শীতের ভোরে বেরিয়ে গেলেন। ইন্‌ট্যুশন ট্রিগার করে আবার।

মহিলার ফটো আইডি’র জেরক্স কপি দেখে কুণালের মাথা গরম হয়ে যায়। কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছেনা, ঝাপসা ছবি, শুধু একমাথা সাদা বব্‌ড চুল।

– কী করে অ্যাক্সেপ্ট করেন আপনারা এমন আই ডি? মেজাজ হারিয়ে ফেলে কুণাল।

মেয়েটি মিনমিন করে বলে, যে নিজেই ছিল সেই সময় এবং ভদ্রমহিলার সত্যি একমাথা অমন চুল, সে মিলিয়ে নিয়েছিল।

চুলটা পরচুলা হতে পারে, সেকথা বলে লাভ নেই। কুণাল সেদিকে না গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে কিছু। ডিসগাস্টিং! মহিলা’র মুখে স্কার্ফ, লিফ্‌টে এক জায়গায় তিনি কাশছেন মনে হচ্ছে। মুখ কোথাও দৃশ্যমান নয়। এমনকি, মহিলার ট্রান্সপোর্টের ব্যাপারেও কিছুমাত্র হদিশ পাওয়া গেল না। জানা গেল, সেই ভোরবেলা তিনি হেঁটেই হোটেলের সীমানা পার হয়েছিলেন।
—————————————————————————————————————————————–

চারদিন কেটে গেছে। কুণাল সত্যি ছুটি নিয়েছে, দু-দিন না, এক সপ্তাহ। এই প্রথম কোন অপরাধী ওকে হারিয়ে দিল। ও এখন দৃঢ়বিশ্বাসী যে, ব্যাপারটা খুব চাতুর্যের সঙ্গে করা একটি মার্ডার। কে-ই বা বিশ্বাস করবে।হয়ত পোস্টমর্টেম করলে কিছু ক্লু মিলত… হতাশা, বিশ্রী রকম একটা হতাশা যেন গ্রাস করতে থাকে ওকে।

হঠাৎ মনে হয়, একবার মিসেস সিংঘানিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে হয়। যদিও, এসিপি গুপ্তা জানতে পারলে প্রবলেম আছে, তবুও ভদ্রমহিলাকে একবার জিজ্ঞেস করতে ক্ষতি কী! বড়জোর রিফিউজ করবেন এবং গুপ্তাকে জানাবেন। সাতপাঁচ ভেবে কিছুক্ষণ বাদে ফোনটা করেই ফেলে সে। সেক্রেটারীকে পেরিয়ে মিসেস নিশিতা সিংঘানিয়ার কাছে ফোনটা গেলে তিনি কুণালের অনুরোধ শুনে একটু যেন বেশীক্ষণ-ই সময় নেন রেস্পন্ড করতে।

— ম্যাম, আর ইউ অন দ্য লাইন?

— ইয়েপ, ওকে… আ যাইয়ে আপ, কাল শাম পাঁচ বজে, অ্যাট মায় রেসিডেন্স ইন কসৌলি।

—————————————————————————————————————————————–

কসৌলি এর আগে বার কয়েক যেতে হয়েছে কাজে। জায়গাটা এতই সুন্দর যে কুণালের মতন আনরোম্যান্টিক ছেলেও যেন অভিভূত হয়ে যায়। ভিক্টরিয়ান আমলের বাড়িঘর, ওক, উইলো আর ফার গাছের চাঁদোয়া মাথার ওপর, পরিষ্কার রাস্তাঘাট– ব্রিটিশ আমলের নস্টালজিয়া থেকে এখনও যেন বেরোতে পারেনি কসৌলি।

ঠিক চারটে পঞ্চান্ন মিনিটে “সিংঘানিয়া ম্যানসন”-এর সামনে দাঁড়িয়ে কুণালের মনে হল, অর্থ এবং রুচির নিঁখুত মিশেলে যেন তৈরি হয়েছে প্রাসাদোপম বাড়িটা।

উর্দিপরা দারোয়ান যে হলটায় বসিয়ে দিয়ে গেল, বহুমূল্য মরোক্কান চামড়ায় মোড়া তার সোফাসেট, মাথার ওপর সোয়ারোভস্কি ক্রিস্ট্যালের ঝাড়লন্ঠন। একটু পরেই আরেকজন মহিলা এসে জানালেন, ম্যাডাম তাঁর স্টাডিরুমে আছেন, সেখানেই যেতে হবে।

নিশিতা সিংঘানিয়া সুন্দরী, শুনেছিল কুণাল। কিন্তু সৌন্দর্য যে এরকম অপার্থিব হতে পারে, ওর ধারণা ছিল না! ভদ্রমহিলা বসে আছেন একটা হাই-ব্যাকড চেয়ারে, পরনে সাদা সিল্কের গাউন। মুখের চামড়া থেকে যেন আলো বেরোচ্ছে আক্ষরিক অর্থেই। আর এত কম বয়েস! কুণাল ঠিকমত হোম্ওয়ার্ক করেনি। নিশিতার বয়েস খুব বেশি হলে বত্রিশ হবে, মিঃ সিংঘানিয়া ছিলেন চুয়ান্ন।

নিশিতাই নীরবতা ভাঙলেন।

— কফি নিন, তারপর বলুন কী জানতে বা বলতে চান।

প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠেছে ততক্ষণে কুণাল।

—————————————————————————————————————————————–

নিশিতার গভীর চোখে স্পষ্টতই সংশয় দেখা দেয়।

— তার মানে, আপনি বলছেন কেউ একজন ছিল যে খুব সফলভাবে সবার চোখে ধূলো দিয়েছে?

— ম্যাডাম, আমি কিছুই বলছিনা। কারণ কোন প্রমাণ নেই। কেসও অফিসিয়ালি ক্লোজড। ওই মহিলাকেও ট্রেস করা যায়নি। ঠিকানা ভুয়ো। ওখানে ওই নামে কেউ কস্মিনকালেও ছিলনা। আইডি নকল। তাহলে বুঝতে পারছেন তো?

— আমি শুধু জানতে চাইছি, এমন কি কেউ আছে, যাকে আপনি সন্দেহ করেন? যে এই কাজ করতে পারে বলে মনে হয়?

— না। নিশিতা  দৃঢ়স্বরে বলেন। বিজনেস রাইভ্যালরি থাকেই আমাদের জগতে কিন্তু কেউ এমন কাজ করবে বলে মনে হয়না।

— আচ্ছা, আপনার স্বামী সেদিন বিজনেস মিটিং এর জন্যি দেরাদুন গেছিলেন?

–হ্যাঁ, এ তো সকলেই জানে।

— আর ইউ শিওর?

— কী বলতে চাইছেন? একটু যেন রুক্ষ শোনায় নিশিতার কন্ঠস্বর।

মাথা নাড়ে কুণাল। কিছু না। হতাশাটা ফিরে আসতে থাকে ফের।

— আপনাকে এভাবে বিরক্ত করার জন্য আমি লজ্জিত, ম্যাডাম। আর একটাই প্রশ্ন, ব্যাগ থেকে বুকমার্কটা বের করে কুণাল বলে, কখনো দেখেছেন এমন কিছু? এটা পাওয়া গেছিল আপনার স্বামীর রুমে।

এক ঝলক তাকিয়েই মাথা নাড়েন নিশিতা। না, দেখেননি।

উঠে দাঁড়ায় কুণাল।

— অনেক ধন্যবাদ, ম্যাডাম, আপনার সময়ের জন্য।

— ইউ আর ওয়েলকাম।

ঘর থেকে বেরনোর আগে চারটে দেওয়াল ভর্তি বইয়ের আলমারির দিকে দৃষ্টি যায় কুণালের। মহিলা রীতিমতন শিক্ষিতা।

বেরিয়ে এসে হলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, কী যেন একটা চোখে পড়তে পড়তেও পড়ল না…কী যেন একটা ভুল হয়ে গেল।

শেষ সিঁড়িতে নেমেই কুণাল লাফ দিয়ে  আবার ওঠে প্রথমটায়। দারোয়ান অবাক হয়ে চেয়ে আছে। পাত্তা না দিয়ে দ্রুতগতিতে হেঁটে নিশিতার স্টাডিতে ঢুকতেই যেন একটা ফ্রিজশট্‌ হয়ে যায়।

প্রায় দশ-বারোটা বুকমার্ক নিশিতার হাতে। সেগুলো তিনি সম্ভবতঃ, অন্য কোথাও রাখতে যাচ্ছিলেন। বুকমার্কগুলোর একটা রয়েছে কুণালের ব্যাগে। এইগুলোই ওর চোখে পড়েছিল বই দেখতে দেখতে। একটা ছোট টেবিলের ওপর গোছা করে রাখা ছিল। দেখেছিল কিন্তু মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ “নজর” করেনি!

নিশিতা এক পা-ও নড়েননি। খুব আলতো হেসে বলে উঠলেন,

— প্রমাণ কী, অফিসার? একটা বুকমার্ক দিয়ে আর যাই হোক, নিশিতা সিংঘানিয়াকে ফ্রেম করতে পারবেন না।

কুণালের মত পোড়-খাওয়া মানুষ-ও যেন থমকে যায় একটু। তারপর সেও মৃদু হাসে,

— জানি। আপনার অনেক টাকা, অনেক কানেকশন্স। শাস্তি আপনার হয়ত হবেনা। সে পথ বন্ধ। কিন্তু কেন করলেন এ কাজ?

হঠাৎ যেন জ্বলে উঠলেন নিশিতা।

— কেন করলাম? কেন করলাম?

— আনন্দ সিংঘানিয়া ছিল আমার বাবার সামান্য এক এমপ্লয়ী। বয়স তখন অল্প, ওর প্রেমে পড়ে গেলাম। হাজার বারণ সত্ত্বেও ওকেই বিয়ে করবো পণ করলাম। প্রায় কুড়ি বছরের বড় এই লোকটাকে বিয়ে করার পরে জানতে পারলাম ওর স্বরূপ। বাবা হার্ট পেশেন্ট, তাঁকে জানানো যাবেনা। শুরু হল আমার সুখী থাকার অভিনয়। একটা দুশ্চরিত্র, মদ্যপ লোক ছিল এই সিংঘানিয়া। স্যাডিস্ট। প্রতিবার বিছানায় আমায় মেরে রক্ত বের না করলে ওর সুখ হতনা। এর মধ্যে বাবা মারা যাওয়ার আগে বিজনেসের পাওয়ার অভ অ্যাটর্ণি পেয়ে যায় ও আর আরো বেড়ে যায় অত্যাচার। আমাকে মা পর্যন্ত হতে দেয়নি ও। খুব কাছের দু- একজন ছাড়া কেউ জানেনা কী নরকযন্ত্রণা আমি ভোগ করছি বারো বছর ধরে!

বলতে বলতে হাঁপাতে থাকেন নিশিতা।

— আপনি জিজ্ঞেস করছিলেন না কী জন্য সেদিন গেছিল ও দেরাদুনে? বিজনেস মিটিঙয়ের অছিলায় হি ইউজড টু স্লিপ উইদ হুকারস।

— আমি আর পারছিলাম না। দুবার আমি সুইসাইড করার চেষ্টা করেছি, পারিনি। তাই একটা শেষ চান্স নিয়েছিলাম এবার। ফেক আইডি বানানো কোন কঠিন কাজ না, আপনারা পুলিশরা ভাল-ই জানেন। বাবার পুরনো এক এমপ্লয়ী আমায় হেল্প করেন এই ব্যাপারে। ্শুক্রবার আনন্দ দেরাদুন রওনা হওয়ার আগে আমি ওর প্রেশারের ওষুধের বোতলে নিরীহ ভিটামিন ট্যাবলেট ভরে দিয়েছিলাম আসল ওষুধ সরিয়ে। ও ভয়ানক হাইপারটেনশনের পেশেন্ট। ওষুধ না খাওয়া মানে … সাঙ্ঘাতিক এফেক্ট হতে পারে।

এরপর, ও রওনা হওয়ার খানিক বাদে আমিও বের হই। নিজে ড্রাইভ করে গেছিলাম। গাড়িতেই ভোল বদলে ফেলি। দেরাদুনে একটি অল্পবয়সী সেক্স- ওয়ার্কার-এর সঙ্গে কথা বলে তাকে বুঝিয়ে দিই যে কী করতে হবে। অসামান্য সুন্দরী এই মেয়েটির কথা আনন্দ’র মতন লম্পট ফেলতে পারবেনা, জানতাম। মেয়েটি ওর মদের সঙ্গে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ মেশায়। শুধু তাই নয়, বাজার চলতি একটি  অ্যাফ্রোডিসিয়াক ট্যাবলেট-ও খাইয়ে দেয় ওকে। ফল হয় মারাত্মক! একে দু-তিন দিন আসল ওষুধ ওর শরীরে যায়নি, তার ওপর এগুলো। আনন্দ ঘুমিয়ে পড়লে মেয়েটি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আমি ঢুকি। অবশ্যই মেয়েটিকে আনন্দর ঘরে ঢুকতে কেউ দেখেনি কেননা, সে আমার গেস্ট হিসেবেই এসেছিল। আনন্দ’র ফ্লোরেই ববড্‌ হেয়ার মহিলা স্যুইট বুক করেছিলেন, জানেন নিশ্চয়ই।

মাথা নাড়ে কুণাল।

— এরপর খুব সোজা। বিছানার পাশের জানালাটা খুলে দিয়ে আমি পাশের ঘরে বসে একটা বই পড়ছিলাম সারারাত। আনন্দ’র আবার অ্যাস্থমা-ও ছিল। ওর যখন ভোররাতের দিকে অ্যাটাকটা হয়, ঠিক সে সময় আমি ওর বিছানার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার সারা জীবনের গ্লানি, কষ্ট, দুঃখ মুছে যাচ্ছিল আমার চোখের সামনেই। বেরিয়ে আসার আগে বোতলের ওষুধ বদলে দিয়েছিলাম আসলগুলো দিয়ে। আর, যা শীত, হাতে গ্লাভ্‌স না পরলে কী চলে, বলুন।

— এই বুকমার্কগুলো আমি নিজে হাতে বানাই আমার বইয়ের জন্য। বই ছাড়া আর কোন বন্ধু নেই আমার। ভুল হয়ে গিয়েছিল, খেয়াল করিনি কখন বুকমার্কটা বই থেকে মাটিতে পড়ে গেছিল।

গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললেন নিশিতা।

শুকনো হাসি হাসল কুণাল।

— কোন কোন সময় আইন যা শাস্তি দিতে পারে, তার থেকেও বেশি শাস্তি মানুষ নিজের কাছেই পায়, মিসেস সিংঘানিয়া, তার নিজের অস্তিত্বের মধ্যেই।

— দ্য কেস ইজ ক্লোজড, ফ্রম মাই সাইড টু…এঞ্জয় ইওর ফ্রিডম।

দরজাটা ভেজিয়ে বেরিয়ে আসার সময় একটা অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজ কী ভেসে এল, কে জানে।
তবে ওর ইন্‌ট্যুশন তো ভুল করেনা!

#KolkataPolice কলকাতা পুলিশ-এর ফেসবুক পেইজ-এর “পাঠক কলম” বিভাগে নির্বাচিত এবং প্রকাশিত। 

আয়না’র সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে মুখ ভ্যাংচালে বেশ আমোদ পাওয়া যায়। এছাড়া, মুখভর্তি জল নিয়ে টিপ করে পাশের বাড়ি’র দেওয়ালে বা টিকটিকি’র গায়ে, এসব-ও আমি করে থাকি। একটা প্রশ্ন মাঝে মাঝেই মনে হয়, আমার মাথায় ছিট্‌ আছে কিনা :/ লোকে মুখের উপর বলেনা, ভয় পায় হয়ত, যদি কামড়ে দিই, কিন্তু আমার কেমন সন্দেহ হয়, মনে মনে ভাবে। একমাত্র, পুত্র চরম বিশ্বাসঘাতকে’র মত মাঝেই মাঝেই বলে “পাগল না কী!” এই ক’দিন আগে যে ভয়ানক ঝড় হল, সেদিন আমি হাতে ছাতা এবং পকেটে পয়সা থাকা সত্ত্বে-ও ভিজে ভিজে, খানিক ডালপালা কুড়িয়ে বাড়ি ফিরলাম, সেদিন পতিদেব-ও আমি উপুড়চুপুড় ভিজে ঘরে ঢোকামাত্র-ই “পাগ…” অবধি বলে, তারপর আমার জ্বলন্ত চক্ষুযুগল দেখে, সামলে নিয়েছিলেন। এই ইয়েদের কে বোঝাবে যে বিষ্টি গায়ে মাখতে কী ভাল যে লাগে! বাড়িতে এসে একটু গরম জল দিয়ে চান করে নিলে-ই আর সর্দিকাশির ভয় নেই O:)

আরেকটা ব্যাপার আছে; আমি, শুকনো ডালপালা, পাতা, কুটি কুটি ছেত্‌রে যাওয়া ফুল— এসবের শুধু ছবি তুলি তাই না, ঘরে এনে জমিয়ে-ও রাখি। এর ফলে, রাস্তা’র র‍্যান্ডম লোকজন-ও আমার দিকে মাঝে মাঝে খুব সন্দেহের চোখে তাকায় 😦  একবার একটা জংলা মতন জায়গায় দাঁড়িয়ে ভর-দুপুরবেলায় শুকনো পাতা’র ছবি তুলছিলাম, একটা আপদ রামছাগল (সত্যিকারের চারপেয়ে, দুপেয়ে না) কোত্থেকে এসে প্রায় গুঁতিয়ে দিচ্ছিল 😡 ব্যাটা ওই শুকনো পাতা চিবাবে! সাধে কী বলে, ছাগলে কী না খায়।

এই ব্লগে আমি ছবি-টবি বিশেষ দিই না, এবার কয়েকটা ছবি এখানে রইল…

1-shanti 317

বটফল

1-shanti 360

পাতা যখন ফুল!

1-pedong 007

শুকনো পাতা’র উজ্জ্বল রঙ

1-014

বাঁশে’র গায়ে গজিয়ে ওঠা ছত্রাক

1-033

কিছুমিছু

 

প্রথম প্রেম বা প্রথম চুম্বনের মতন প্রথম রান্না-ও মানুষ ভুলতে পারেনা। বা বলা ভাল, ভুলতে চাইলেও এই নির্মম সমাজ তাকে ভুলতে দেয়না। আমি যখন ক্লাস এইট-এ পড়ি, তখন আমি প্রথম চা বানিয়েছিলাম। ব্যাপারটা দেখতে অনেকটা খুব নোংরা গামছা-ধোয়া-জলের মতন হয়েছিল; মা এক চুমুক খেয়েই মুখ ভেট্‌কে নামিয়ে রেখেছিল (নিষ্ঠুর মহিলা), বাবা ধন্যি ধন্যি করেছিল বটে কিন্তু আরেক কাপ অফার করতেই “শিবু’র মা খুব অসুস্থ, যাই এক্ষুণি  একবার দেখে আসি” বলে কেটে পড়েছিল। সে যাই হোক, তবু তো খেয়েছিল! কিন্তু তা বলে এখনও, এই যে আমি এরকম দামড়া মহিলা হয়ে গেছি, এ-খ-ন-ও আমার সেই চা বানানোর গপ্পো শুনিয়ে হাসতে হবে 😮 তাও আবার আমার-ই ছেলের সামনে। অত্যাচার!! অথচ তারপর যে কত হাজার বার কত্ত ভাল চা বানিয়ে খাইয়েছি,  এমনকী পার্ফেক্ট  আর্ল গ্রে বানিয়েছি, তার কোন উল্লেখ নেই কখনো। দুনিয়াটাই এরকম ইয়ে টাইপ 😦

এই চা বানানোর কয়েকদিন পর-ই আমার হঠাৎ ডিম-কষা করবার সাধ জাগে। কীভাবে কী হইয়াছিল তাহা জানে শ্যামলাল কিন্তু নেট রেজাল্ট দাঁড়িয়েছিল, এক বাটি মশলামাখা ব্রাউন রঙের জলে কয়েকটি শুভ্রকান্তি ডিম সুন্দর রাজহাঁসের মতন সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। এছাড়া, ফুঁ দিয়ে গ্যাস আভেন নিভিয়ে ফেলার রেকর্ড-ও আছে আমার… হুঁ হুঁ বাওয়া। তবে এসব সামান্য ব্যাপার এবং আমরা সকলেই অবগত আছি, বড়ে বড়ে দেশো মেঁ, অ্যাইসি ছোটি ছোটি বাঁতে হোতি রহতি হ্যায় ইত্যাদি প্রভৃতি।

আসল ব্যাপার হল আমার জীবনের প্রথম অ্যালকোহল পান করা। তখন আমি ক্লাস ইলেভ্‌ন। বন্ধুরা মিলে ঠিক হল, যে একদিন এই মদ খাওয়া ব্যাপারটা একবার ট্রাই না করলে সমাজে মুখ দেখানো যাচ্ছেনা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেই বা আমরা কী জবাবদিহি করবো :/  আমাদের এক বন্ধুর বাবা কর্মসূত্রে নিয়মিত বিদেশে যেতেন এবং বিভিন্ন ধরণের পানীয় নিয়ে আসতেন। He was, we can say, an afcionado in this matter. একদিন সেই বন্ধু, ধরা যাক তার নাম দীপিকা, এসে বলল, অমুকদিন বাবা-মা কেউ বাড়ি থাকবেনা, দুপুরবেলায় তোরা সবাই চলে আয়। সবাই বলতে আমরা পাঁচটি কৌতূহলী কিশোরী। “তথাস্তু” বলে আমরা গুটি গুটি বিকেল চারটে নাগাদ নির্দিষ্ট দিনে দীপিকাদের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম।

প্রথমেই ঝামেলা লাগল কী রঙের এবং কোন ডিজাইনের বোতল নামানো হবে, তা নিয়ে। আমাদের কারোর-ই বিন্দুমাত্র ধারণা ছিলনা সেই সময় বিভিন্ন ধরণের ওয়াইন, স্কচ বা হুইস্কি নিয়ে। দীপিকা’র নিজের জ্ঞান-ও দেখা গেল খুব-ই সীমিত। ফলে, একজনের পছন্দ পেটমোটা, খাঁজকাটা গোল কালো বোতল তো অন্যজন ভোট দিচ্ছে হালকা নীল স্লিক একটায়। বিস্তর ঝামেলা’র পর একখানা সবুজ বোতল নামানো হল 😀 নাম-টাম আজ আর মনে নেই।  অবশ্য সেইসময়-ও নাম দেখা হয়নি, “নামে কী-ই বা এসে যায়” থিওরি অবলম্বন করেছিলাম আমরা।

তা বোতল নামানো হয়েছে। দীপিকা “দাঁড়া, আমি গ্লাস আর ডালমুট নিয়ে আসছি” বলে ভেতরে গেছে, আমরা বসার ঘরে সোফায় বসে আলোচনা করছি ঠিক কীভাবে মদ খায়। এখন সমস্যা হল, আমি বরাবর নিজেকে হেব্বি ইয়ে, যাকে বলে এসস্মার্ট মনে করি (সব ছাগলেরাই তাই মনে করে, নতুন কিছু নয়); তো এইসব আলোচনা’র মধ্যেই আমি খুব কনফিডেন্টলি বলে উঠলাম, “কীভাবে আর খায়, দেখিসনি সিনেমায়? বোতল ধরে এইভাবে…” বলে বোতলটা তুলে থামস্‌ আপ খাওয়ার মতন ঢক্‌ঢকিয়ে গলায় ঢেলে দিলাম!! প্রথম ঢোঁকেই মনে হল উগ্‌রে দিই সবটা। কিন্তু প্রেস্টিজ কা ভি সওয়াল থা 😦 যো করে প্রেস্টিজ সে প্যয়ার, উয়ো কিসি ভি খতরনাক কাম সে ক্যায়সে করে ইন্‌কার। সুতরাং আমি প্রায় চার-পাঁচ ঢোঁক গিলে তবেই বোতল নামালাম।

ইতিমধ্যে দীপিকা গ্লাস-ট্রে ইত্যাদি নিয়ে ফিরে এসেছে এবং বিস্ফারিত চোখে আমাকে দেখছে। আমি জল-টল খেয়ে কিছুই হয়নি এরকম ভাব নিয়ে মিনিট কুড়ি কী আধঘন্টা বসার পরেই কেমন মনে হতে লাগল,  এ জীবন মায়া প্রপঞ্চময় বড়, কা তব কান্তা কাস্তে পুত্রঃ সংসারোহয়– এরকম একটা লেভেলে চলে যাচ্ছি ক্রমশঃ। বাকিরা আমার ওই পৈশাচিক খাওয়া দেখে সামান্য কন্সার্ন্ড হয়ে পড়লেও তখনও বোঝেনি কী হতে চলেছে। সত্যি বলতে কী, আমার মনে আছে যে আমি একবার বলেছিলাম’ “অ্যাই, ভূমিকম্প হচ্ছে না কি রে?” তারপর আমার আর কিছু মনে নেই 😥

এরপরের গপ্পো অনেক বড়। টু কাট আ লং স্টোরি শর্ট, কাকু-কাকীমা ফিরে এসেছিলেন এবং আমাদের কাউকেই একটুও বকাবকি করেননি। আমার বাড়িতে-ও ওনারাই পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে, বিভিন্ন পানীয় ঠিক কীভাবে টেস্ট করতে হয়, কীভাবেই বা স্কটল্যান্ডের এক অঞ্চলের পানীয় অন্য অঞ্চলের থেকে আলাদা– এসব-ও তাঁর কাছেই শোনা। গল্পের মত বলে যেতেন। (পরে কখনও এই নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে) দুঃখের বিষয়, ভূয়োদর্শী মানুষটি এখন পার্কিনসন্স রোগ-এ আক্রান্ত 😦 ।

যাইহোক, সব ভাল যার শেষ ভাল। বিয়ের প্রায় দু-তিন বছর পর থেকে আমি আস্তে আস্তে রান্না করা শিখেছি। শিখতে গিয়ে বুঝেছি, সামান্য একটু ইচ্ছা, জানার আগ্রহ, ধৈর্য আর ভালবাসা থাকলেই রান্না জিনিসটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমি এখন ইয়ে মানে… হেঁ হেঁ… মানে আমার রান্না খেয়ে লোকজন দিব্যি পোsongসা করে আর কী… সত্যি, মাক্কালীর দিব্যি।

লীলাবতী’র বিবাহ স্থির হইয়াছে। আত্মীয়স্বজনকে জানানো হইয়াছে, তাঁহারা একে একে আসিয়া সহর্ষ রোমাঞ্চে সারা বাড়ি উচ্চকিত করিয়া তুলিতেছেন। লীলা’র জ্যেষ্ঠতাত গম্ভীর মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পাত্র’র ব্যাপারে অগ্রে কিছু খোঁজখবর করিতে পারেন নাই। শুনিয়াছেন লীলা নিজেই পাত্র পছন্দ করিয়াছে। প্রেমের বিবাহ! তাঁহার ওষ্ঠাধর বঙ্কিম হইল। বিরাগপূর্ণ স্বরে লীলা’র পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,

— তা, ছেলে কী করে?

— (সহর্ষে) ফেসবুক করে। তিনটে দশ লাখি গ্রুপের অ্যাডমিন, দুটো পাঁচ লাখি’র মডারেটর। বেচারা’র নাওয়াখাওয়ার সময় পর্যন্ত নেই, অ্যাত্তো চাপ! সামনের মাসেই জাকারবার্গে’র সঙ্গে মিটিং করতে হন্ডুরাস যাচ্ছে, ওখানকার ক্রাইম রেট কেন বেশি সেই নিয়ে “হন্ডুরাসে হাহা কর” গ্রুপ-এ বিরাট ঝামেলা হয়েছে কিনা, জামাইকে তাই ডেকে পাঠিয়েছে; ও-ই অ্যাডমিন তো…

— আহা, আহা, ভাবা যায়! বেঁচে থাকুক, বাবাজীবন। হীরে’র টুকরো জামাই হয়েছে আমাদের লীলা’র…ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল!

——————————
উপরোক্ত কথোপকথন আপাততঃ কাল্পনিক হলে-ও, এমন দিন যে অদূর ভবিষ্যতে আসবেনা, এমন কথা জোর গলায় বলা যায়না। ফেসবুক এখন আমাদের শিরায়-উপশিরায় বাহিত হয়। আপনার আধার কার্ড নাও থাকতে পারে, কিন্তু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকতেই হবে। এক অজানা জগতের অপার সম্ভাবনাসমৃদ্ধ ইশারা দেয় ফেসবুক। কত্ত কিছু যে জানতে পারবেন, কত জানা জিনিস যে ভুলে যাবেন ফেসবুক করতে করতে, তা আপনি নিজেই টের পাবেন না।

আমি যা কোনোদিন-ও শিখতে পারবো বলে স্বপ্নে-ও ভাবিনি, ফেসবুক আমাকে তা শিখিয়েছে। ঘাসের ওপর প্রথম পড়া শিশির সামান্য নুন দিয়ে খেলে কোষ্ঠ সাফ হবে, টোম্যাটো বেশি খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়, ইউনেস্কো আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে অন্য সব দেশের-ও জাতীয় সঙ্গীত করা’র পরামর্শ দিয়েছে, কীভাবে বসলে মাথায় কোনদিন-ও টাক পড়বেনা, কেন ঠিক দুপুরবেলা রোজ হেঁড়ে গলা’য় গান গাইলে  বাত-এ ধরেনা, ফুলকপি’র  কেক, তরমুজ’র চকোলেট ম্যুজ  বা নিমপাতার টক-মিষ্টি ফিরনি– এ সব-ই আমাকে ফেসবুক শিখিয়েছে। যে বই আমি কখনো পড়িনি, যে সিনেমা আমার কখনো দেখতে ইচ্ছে হয়নি, ফেসবুক আমাকে সেইসব বই/সিনেমা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করেছে, সমাজে আমি মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছি।

তবে, শুধু এটুকু-ই নয়। আরো কয়েক-টা জিনিস বলা দরকার।
এখন আমাদের অনেক বন্ধু। নিত্যনতুন বন্ধুরা তো আছেই, তাছাড়া সেই ছোটবেলা’র ফেলে আসা দিনের বন্ধুদের-ও খুঁজে পেয়েছি এইখানেই। ভারচুয়াল জগত এটা, আমরা সবাই জানি, তবু-ও কারো কারো সঙ্গে তৈরি হয় নতুন সম্পর্ক, দু-দিন অনলাইন না দেখলেই ভাবি “আরে, দেখছিনা তো অমুক-কে, ভাল আছে তো”! ভারচুয়াল হোক বা রিয়্যাল, কৃত্রিমতা চারপাশে বেড়ে-ই চলেছে। ফেসবুকে’র জগতে এইটুকু ভালবাসা, বন্ধুত্ব বা স্নেহের গল্প নাহয় হল। অ্যাবসল্যুট ব্লিস বলে কিছু হয়না। ফেসবুকে-ও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, মনোমালিন্য বা বন্ধুবিচ্ছেদ। তবু-ও দিনশেষে যখন ছবি ফুটে ওঠে একের পর এক স্ক্রিণ-এ, প্রবহমান ভারচুয়ালিটি অজান্তেই কখন আপাত এক নিশ্চিন্তির সন্ধান দেয়। অস্ফুটে কেউ বা বলে-ও ফেলেন, “ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল!”

***”মাধুকরী” অনলাইন ম্যাগাজিন, জুন সংখ্যায় প্রকাশিত***