Author Archive

amazon-825

তা প্রথমেই হলে ঢুকতে গিয়ে আঁতকে উঠলাম। পাতা-ফাতা, গাছের শিকড়-বাকড় দিয়ে কী একটা ভয়াবহ জিনিস তৈরি করা হয়েছে “নবীনা” সিনেমাহল’র সামনে! আমি ভেবেছিলাম কোন ভি আই পি বুঝি মারা গেছেন, তার শ্রাদ্ধের জন্য ভাড়া করেছে বুঝি হলটাকে। প্রায় হায় হায় করে উঠতে যাচ্ছিলাম আমার তিনশো টাকা জলে গেল ভেবে, তখন একজন পাশ থেকে বলল যে ওটাই অ্যামাজনের জঙ্গল 😥

ভয়ে ভয়ে চাদ্দিক দেখতে দেখতে ভেতরে ঢুকে দেখি “মেম্বৌ” -এর অ্যাড দেখাচ্ছে। একটি মেয়ে চোখেমুখে কষ্টের ছাপ অনেক কষ্ট করেও না আনতে পেরে, ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে “আমি শুঢু টোমার জন্ন অনেখ আশা নিয়ে ভিডেশ ঠেকে এখানে এসেচি”। পরমুহূর্তেই অবশ্য আমাদের সবার পিয়ো দেব কে দেখে ভুল ভাঙল ❤ মেয়েটা হল গিয়ে আপনার শ্বেতলানা গুলাকোভা ওরফে আনা। সে এসেছে শঙ্করকে অ্যামাজনের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে এল ডোরাডো খুঁজতে, যা কিনা আবার তার বাপ ফ্রাঙ্কো আগেরবার গিয়ে খুঁজে পায়নি এবং মরতে মরতে ফিরে এসেছে। বেঁচে থাকার আনন্দ সেলিব্রেট করতে করতে ফ্রাঙ্কো বেচারা অ্যালকোহলিক হয়ে গেছে তাই আনা এল ডোরাডো খুঁজে পেতে  প্রাইভেট ডিটেক্‌টিভ’র মতন প্রাইভেট এক্সপ্লোরার ভাড়া করতে ইণ্ডিয়ায় এসেছে।

শঙ্করকে বেশি সাধাসাধি করতে হল না। যেতে রাজি হয়ে গেল। কাশির দমকে লাবণী সরকার ছেলেকে নিরূপা রয় স্টাইলে বিদায় জানালেন 😦

এরপরেই সব ঘটনা অতি দ্রুত ঘটতে লাগল। শঙ্করকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আনা বলল, “এই যে তোমার গাড়” (না, চন্দ্রবিন্দু নেই)। দেখা গেল শঙ্কর অ্যামাজন সম্পর্কে স-অ-ব জানে। তাই তিনজনে একটা পিকনিকে যাওয়ার মেজাজে এল ডোরাডো খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল O:)

তারপর এক জায়গায় একটা দুলন্ত, ঝুলন্ত ব্রিজ দেখিয়ে ফ্রাঙ্কো বলল যে ব্রিজটা বহুত পুরনো, পার হতে গেলেই ভেঙে যাবে। বলেই তিনজনে একসঙ্গে তিনটে ঘোড়া নিয়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ব্রিজটা যথারীতি একজায়গায় ছেত্‌রে পড়ল। সে ক্কী চীৎকার, চেঁচামেচি! আউপাতালি ব্যাপার যাকে বলে। শেষে ঘোড়াটোড়া সুদ্ধ তিনজনে ওপারে পৌঁছে জিঙ্গো জিঙ্গো ট্যাঙ্গো ট্যাঙ্গো করতে লাগল।
এরমধ্যে ফ্রাঙ্কো’র বন্ধুর রাবার ফার্ম-এ গিয়ে একজন কালো ক্রীতদাসীকে শঙ্কর অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচালো, জাগুয়ার নিয়ে আলোচনা হতে না হতেই হঠাৎ রাত্তিরবেলা একটা জাগুয়ার এসে ফার্মে’র একটা মেয়েকে কয়েক সেকেন্ডে মেরে ফেলল, তার পেছনে ছুটে গেল মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড আর আমাদের অকুতোভয় শঙ্কর। জাগুয়ারটা বয়ফ্রেন্ডটাকে তিন সেকেন্ডে মেরে ফেলল, শঙ্কর জাগুয়ারকে এক সেকেন্ডে মেরে ফেলতেই দেখে আরেকটা জাগুয়ার ছুটে আসছে 😥 ব্যস্‌! শঙ্কর বাঘাযতীন হয়ে গেল, মানে খালি হাতে জাগুয়ারের সঙ্গে খানিক কুস্তি করে তাপ্পর রিভ্লবার বের করে ঠাঁই করে এক গুলিতে মেরে দিল। অবশ্য না মারলেও জাগুয়ারটা লজ্জায় মরে যেত :/  ও হ্যাঁ, এই যে জাগুয়ারদ্বয় নিহত হল, কারোরই একফোঁটা রক্ত দেখা গেলনা। কী চাপ!

এরপর নদীতে নৌকো করে যেতে যেতে এক জায়গায় ফ্রাঙ্কো বলল যে এখানেই তার আগেরবার জাহাজডুবি হয়েছিল। বলতেই তিনজনে অক্সিজেন মাস্ক-ফাস্ক নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিল ম্যাপ খুঁজতে।
জাহাজে ম্যাপ খুঁজতে খুঁজতেই একটা বেঁটে-মোটা ইলেক্ট্রিক ঈল এসে শঙ্করকে শক্‌ দিল। বেচারা কেলিয়ে পড়ল। ফ্রাঙ্কো তাকে ওপরে নিয়ে এসে মুখে মুখ দিয়ে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে। তাও মাল নট নড়নচড়ন নট কিচ্ছু। তখন ফ্রাঙ্কো বলল, “ও গড্‌ প্লিজ প্লিজ”। বলতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিষ্টি নামল। শঙ্কর বেঁচে গেল। O:)

এক জায়গায় নেমে ওরা তিনজনে একটা পোড়োবাড়ি খুঁজে পেল (হ্যাঁ, ওই অ্যামাজনের জঙ্গলেই। কি মিষ্টি না? ) তা সে বাড়িতে খালি ট্যারান্টুলা’র জাল। কিন্তু ফ্রাঙ্কো বলল এখন আর এখানে ট্যারান্টুলারা থাকেনা। কে জানে, হয়ত ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল 😦  তো, সেই বাড়িটায় বসে বসে শঙ্কর আর ফ্রাঙ্কো খোশগপ্পো করছে আর একলা মেয়েটাকে পাঠিয়েছে নদী থেকে জল আনতে (কেমন বাপ তুই? অ্যাঁ!) গপ্পো করতে করতে হঠাৎ দ্যাখে কী, এক ঝাঁক ট্যারান্টুলা! দুজনে চুপিসাড়ে বেরিয়ে এসেছে যেই না, টপ্‌টপ্‌ করে ফ্রাঙ্কো’র হাতে চ্যাটচ্যাটে কীসব পড়ল :-O বলে নাকি ওটা ফেরোমন 😦 ফেরোমন সম্বন্ধে আমার যাবতীয় ভুল ধারণা ঘুচিয়ে দিয়েছে এই সিনেমা। তা হবেও বা ফেরোমন। আমার অবশ্য দেখে আরো খারাপ কিছুই মনে হচ্ছিল। সে যাক।

ফেরোমন দেখেই ফ্রাঙ্কো আবার ভেতরে ঢুকল। ইদিকে আনা নদীর ধার থেকে চিল্লাচ্ছে। শঙ্কর ছুটল আনাকে বাঁচাতে। এটা ঠিক কাজ অবশ্য। সোমত্থ ছেলে, আনাকে বাঁচাবে না তো কি ওর বাপ কে বাঁচাবে নাকি! তো নদীর ধারে গিয়ে দ্যাখে ইয়াব্বড় অ্যানাকোন্ডা। দেখেই দুম ফটাশ! কিন্তু পাজি সাপটা কেমন করে জানি নদীর ধার থেকে মুহূর্তের মধ্যে ওই ঘরের মধ্যে ঢুকে ফ্রাঙ্কো’র মাথাটা চিবিয়ে, তারপর কিছুই নেই দেখে, থু করে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল 😥 😥

এরপর হচ্ছে সেই ঐতিহাসিক বুনিপ নিধন স্টাইলে অ্যানাকোন্ডা মারার রাজসূয় যজ্ঞ। সেই এক স্টাইল, “তুই আমার বাপকে মেরেছিস, আমার মা’কে বিধবা বানিয়েছিস, আমার বোনে’র ইজ্জত…(ওহো না…এটা না) তোঁকে আঁমি ছাঁড়বোঁনাঁ”। বললে বিশ্বাস করবেন না মাইরি, জাস্ট গাছে দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে বেচারা সাপটাকে মেরে ফেলল। ❤

এবার শঙ্কর আর আনা দুজনে মিলে ছুটল এল ডোরাডো খুঁজতে। না খেয়েদেয়ে, খালি হাতে (একটা দড়ি বা গাঁইতি পর্যন্ত নেই!!!) পাহাড়-ফাহাড় ডিঙ্গিয়ে, ইয়ানোমামি সর্দার’র কাছ থেকে ম্যাপ বাগিয়ে নিয়ে, কোড ডেসিফার করে, সেই কোড আবার ইংরিজিতে অনুবাদ করে, শঙ্কর অবশেষে আমজাদ খান’এর মত একটা হাসি দিল। হিহিহ্যা, হিহিহ্যাহ্যা, হিহিহ্যাহ্যাহ্যা।

এখানেই শেষ নয়।

আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলাম, এল ডোরাডো কেন খুঁজছে ওরা। সেটার উত্তর পেলাম যখন শঙ্কর বলল, “উই ওয়ান্ট টু ফাইন্দ দা টুথ” … কীসের দাঁত, তা জানিনা অবশ্য, ইয়েতির হতে পারে; আফটার অল, সব পথ এসে, মিলে যায় শেষে।

এখনও শেষ হয়নি।

এরপর তেমন আর বিশেষ কোন চেষ্টা না করেই সোনার শহর এল ডোরাডো খুঁজে পাওয়া গেল। দুজনে যখন  নেচে নেচে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন এক পাল ব্ল্যাক প্যান্থার এসে ওদের মেরে ফেলতে চাইল। ওরা ব্ল্যাক প্যান্থারের থেকেও জোরে দৌড়ে পালিয়ে যেত, কিন্তু আনা’র পা মচ্‌কে গেল 😦 তখন কোথা হইতে কী হইয়া গেল, একদল দারুণ মেকআপ করা সুন্দরী, যারা নাকি “ভার্জিন্স অভ দ্য সান”, তারা এসে তীর ছুঁড়ে ওদের বাঁচালো।

হলসুদ্ধু সকলেই বাঁচল।

প্রচুর কচিকাঁচা গেছিল। হাতে টেডি-ফেডি নিয়ে। একজন জিজ্ঞেস করছিল, “বাবা, বুনিপ কখন আসবে?” 😥  শিশুর মন তো। সহজে সন্তুষ্ট হয় না, কিন্তু আমি ব্যাপারটা ভেবেই শিউরে উঠলাম 😦

#অ্যামাজন_অভিযান
#Amazon_Obhijaan
#film
#review

Advertisements

আপেল, আপেল

Posted: ডিসেম্বর 11, 2017 in ছন্দের কারিকুরি

হঠাৎ মনে হল আপেল জিনিসটা বেশ গোলমেলে। সেই কোন যুগে ইভ্‌ নাম্নী এক অতি-কৌতূহলী মহিলা  তার অভাবনীয়-সরল সঙ্গীকে এই আপেল-ফাপেল খাইয়েই যাবতীয় ঝামেলা শুরু করেছিল। তারপর নিউটন একদিন আপেলগাছের তলায় শুয়ে শুয়ে আকাশপাতাল ভাবছিল কী করে সব জিনিস নিম্নগামী হয়। আমার কেমন জানি মনে হয় ব্যাটা বাঙালি ছিল :/ নয়ত যাবতীয় জিনিসকে এভাবে টেনে নীচে নামানোর কথা ভাবতে পারতোনা (পান ইন্টেন্ডেড) আবার দেখুন, কেমন সেয়ানা মাল, বেল গাছ বা নারকেল গাছের নীচে বসেনি, জানে, কীভাবে সেফ খেলতে হয়।

সে যাইহোক, হচ্ছিল আপেলের কথা। তা, আপেল বলতে গেলে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইন ফ্যাক্ট, “মানুষ” হওয়ার প্রথম পাঠ শুরু হয় আপেল দিয়ে; এ ফর অ্যাপল…

এ ছাড়া,  একটা আধখাওয়া আপেল-ই আজ ধনী-দরিদ্র’র মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে তুলেছে। সুতরাং, আর্থ-সামাজিক দিক থেকেও এর একটা বিশাল অবদান রয়েছে। সবাই রোজ একটা করে আপেল খেলে ডাক্তাররা না খেতে পেয়ে মারা যাবেন, এরকম ইঙ্গিত-ও পাওয়া যায় পুরনো প্রবাদে। আপেল ছাড়া আর কোন ফল মানুষের অগ্রগতির ইতিহাসে এরকম সুস্পষ্ট ছাপ ফেলতে পারেনি।

কালীপুজোয় ভাসান যাচ্ছে সেই রবিবার থেকে। একটা কাজে গতকাল সন্ধ্যেবেলায় বেরোতে হয়েছিল, তা দেখি দু-পা অন্তত অন্তর ঠাকুর আর ভাসান। তা, পুজো যখন হয়েছে, ভাসান-ও হবে, সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু মাইরি, এ  পুরো একটা  আউট অভ দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাপার মনে হচ্ছিল!

একটা ভ্যান বা চারশো সাত; তার পেছনে  মিনিমাম পঞ্চাশজন বিভিন্ন বয়সের মানুষ, তার সামনে গোটা পাঁচ-ছয় ঢাকী, ভ্যাঁপ্পোর ভোঁ ভ্যাঁপ্পোর ভোঁ করতে থাকা আরেকটা দল, যারা মার্চ করার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা, সঙ্গে তাসা পার্টি– যারা আবার অ-নে-ক সামনে থাকায় ঠিক কোন পাড়ার পুজোর সঙ্গে এসেছে বা কী বাজাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছেনা। এবার, প্রত্যেকটা দলে দশ-বারো জন আছে যারা নাচছে! তান্ডব + মোহিনীআট্যম + নাগিন ড্যান্স = ভাসান নাচ। তার মধ্যে আবার সারা মুখ সিঁদুরে মাখামাখি, সীতা-সাবিত্রী কে বলে সাইড হয়ে যা– এমন অবস্থা।  মাঝে মাঝে কোথা থেকে একজন চিমড়েমার্কা লোক এসে নাচুড়েদের (এরকম শব্দ হয়না কিন্তু এদের দেখে এটাই মনে এল) মুখে সন্দেশ গুঁজে দিচ্ছে। সাইড দিয়ে যাওয়ার সময় বাংলা এবং  বিদেশি, দুইয়ের গন্ধই পাওয়া যাচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট, আলাদা করা যাচ্ছেনা, মিলেমিশে একটা বেশ সাররিয়াল গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে।

দু-তিনজন পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক “অ্যাই, দিদিদের যেতে দে”, ” ন্না ন্না, দ্দাদা, এখন বাইক নিয়ে যাওয়া যাবেনা, ওই ডানদিকের গলি দিয়ে যান” ইত্যাদি বলছেন। নিষেধাজ্ঞার মা-মাসি করে দুমাদ্দুম বোম ফাটছে এবং কিছু উব্যার- ন্যাকা মামণি সেই শব্দে অস্কার পাওয়ার মতন করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিনয় করছে। একজন পুলিশকাকুকে দেখতে পেলাম, বেশ খারাপ লাগলো অসহায় মুখটা দেখে। যাইহোক, আমায় গম্ভীর মুখে ছবি তুলতে দেখে আমার সামনে এসে কয়েকজন নৃত্য প্রদর্শন করলো, আমিও তাদের ছবি তুলছি এমন ভাব দেখালাম তারপর, “দেখি ওপাশ থেকে ছবি তুলবো” বলতেই তারা তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে আমায় রাস্তা পেরোতে দিল। নইলে আরো দশ মিনিট ওখানেই হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। সবই মায়ের লীলা! রাস্তা পেরিয়ে পাশের গলিতে গিয়ে দই- ফুচকা খেলাম, আসলে, ওটাই কাজ ছিল, ওর জন্যেই বেরিয়েছিলাম …হেঁ হেঁ…খাওয়াই সব রে পাগলা!

চিংড়ি

Posted: সেপ্টেম্বর 15, 2017 in গদ্য হাবিজাবি
ট্যাগসমূহ:, , ,

প্রতিদিন এই সময় দোকানের পেছনে ছোট্ট খুপরি ঘরটায় বসে মোমবাতির আলোয়  পড়া মুখস্থ  করে চিংড়ি। এমন নয় যে ওদের এই আধা গ্রাম-আধা শহর চন্দ্রপুরে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। খুব আছে; ইলেক্ট্রিসিটি আছে, রবিবারের হাট আছে, সবজির আড়ত আছে, সাহাবাবুর পেল্লায় লাল ট্র্যাক্টর আছে, একপাশ দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাওয়া একটা অখ্যাত নদী পর্যন্ত আছে। নেই শুধু চিংড়িদের টাকা। চিংড়ি জানে, ওরা খুব গরীব। বাবা অনেক বলেকয়ে পাশের চন্দ্রকাকুর  চালের দোকান থেকে লাইন টেনে একটা টিম্‌টিমে বাল্ব জ্বালায় দোকানের ভিতরে। তাতে যেন অন্ধকারগুলো সন্ধ্যার পর আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। তার মধ্যেই বাবা উনুন ধরিয়ে চা বানিয়ে খদ্দেরদের দেয়। আর খদ্দের কেই-বা। এই তো এখানের লোকজন সব। কজন-ই বা এই মফস্বলে দোকানে চা খাওয়ার বিলাসিতা করে। তার ওপর বাবা ভাল চা বানায়, বাবাকে খুব ভালবাসলেও একথা চিংড়ি বলতে পারবেনা। তাই তাদের দোকান প্রায় চলেনা বলতে গেলে। বাবা মাঝে মাঝেই মাথা নেড়ে নেড়ে বিড়বিড় করে আর বলে, “আর বাঁচতে হবেনা, আর পারবনা”।

সেইরকম সময়ে খুব মন খারাপ হয় চিংড়ির । তার তো দিব্যি লাগে বেঁচে থাকতে। সকালবেলা উঠে পুকুরধারে যখন দাঁত মাজতে যায়, তখন দেখে একটা জলফড়িং অকারণে ঘাস বেয়ে উঠছে আর নামছে, নামছে আর উঠছে, কোনদিকে তাকাচ্ছে না। অবাক হয়ে চেয়েই থাকে সে। কী সুন্দর পরীর মতন পাখা ফড়িংটার, রোদ পড়ে ঝিলমিল করছে। পরীদের পাখা মনে হয় আট্টু বড় হয়। নয়ত আকাশে ওড়ে কী করে! এইসব ভাবতে ভাবতেই একটা ঢোঁড়া সাপ পায়ের পাশ দিয়ে হিলিবিলি কেটে জলে নেমে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে পুকুরপাড়ের বন-কলমির ঝোপ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নামে ইঁট রঙের বেজিটা, বেকুবের মতন চেয়ে থাকে জলের দিকে। ঠিক এই সময়েই বাবার গলা ভেসে আসে।
– “হল তোমার? নাকি সারাদিন জলের দিকে চেয়েই কাটিয়ে দেবে? ইশ্‌কুল যেতে হবেনা আর।”

এইভাবেই প্রায় রোজ শুরু হয় চিংড়ির সকাল। ভাল লাগে তো তার। খুব ভাল লাগে বেঁচে থাকতে।

এমনকি, এই যে এখন সন্ধ্যেবেলা কাঁপা কাঁপা মোমের আলোয় বসে সে ইতিহাস পড়ছে, এও তার ভাল লাগে। থোকা থোকা অন্ধকার জমে থাকে ঘরটার চার কোণায়। মাঝেমাঝেই দু-একটা জোনাকি রাস্তা ভুল করে ঢুকে পড়ে আর সব্‌জে আলো দপ্‌দপ্‌ করে ওঠে। চিংড়ি তখন স্পষ্ট যেন দেখতে পায় সেই আদিম মানুষেরা গুহায় ছবি আঁকছে। ওই তো বর্শা নিয়ে হরিণের পেছনে ছুটে গেল একজন, গাছের ফাঁক দিয়ে দুটো হিংস্র হলুদ চোখ শিকারীকে দেখছে— গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে ওঠে!

সত্যি বলতে কী, পড়াশোনায় চিংড়ি মোটেই খারাপ না। স্কুলে স্যররা তাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। পরীক্ষায় প্রথম তিনজনের মধ্যে চিংড়ি থাকেই প্রতিবার। তবে, ইতিহাস ওর প্রিয় বিষয়। বাবা অবশ্য বলে, সে সারাক্ষণ হাবিজাবি ভাবে আর আজগুবি সব কল্পনা করে বলেই ইতিহাস ভাল লাগে তার। দ্যুত্‌! এরকম হয় নাকি আবার। অবশ্য বাবাও নাকি খুব ভাল ছাত্র ছিল; সুবীরকাকুর কাছে শুনেছে সে। দারুণ ভাল ছিল ইংরেজি আর অঙ্কে। তারপর সেই যে রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে ঠাকুমা, দাদু, আর তার ছোট্ট এক পিসি ছিল, সবাই মরে গেল, তারপরেই বাবার আর পড়াশোনা করা হলনা। কলকাতায় কাজ করত কোথায় যেন। তারপর মা’র সঙ্গে বাবার বিয়ে হয়েছিল। মা-কে অবশ্য মনে নেই চিংড়ির। সে যখন খুব ছোট তখন মা’র কী একটা খুব কঠিন অসুখ হওয়ায় মা’ও মরে গিয়ে আকাশের তারা হয়ে গেছে। ্তারপর থেকে বাবাও কেমন হয়ে গেছে। যখন হাঁটুর উপর ধুতি তুলে রং-ওঠা একটা ফতুয়া পরে মাথা নীচু করে চা বানায়, তখন মনেই হয়না এই মানুষটা মুখে মুখে সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্কগুলো করে দিতে পারে। খুব মায়া হয় তখন চিংড়ির বাবাকে দেখে। বড় হয়ে সে নিজে চা বানাবে বাবার জন্য আর বাবাকে একটা বড় হাতলওয়ালা চেয়ারে বসিয়ে রাখবে। ওই জয়ন্তদের বাড়িতে যেমন আছে, সেরকম নরম গদী দেওয়া চেয়ার।

সেসব কথা থাক। আপাততঃ কাল ভূগোল পরীক্ষা, সেই নিয়ে হিমশিম অবস্থা। ইতিহাস মুড়ে রেখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভূগোল বই খুলতে হয়। পৃথিবীটা কমলালেবুর মতন না ন্যাসপাতির মত, তা জেনে কোন কচুপোড়া হবে শুনি! ন্যাসপাতি হলেই বরং ভাল হত। ঘোষবাবুদের  বাগানে তিনটে গাছ আছে, চুরি করে খায় তারা বন্ধুরা। একটু বিটনুন দিলে যা লাগে না…উফ! জিভের জলটা সুড়ুৎ করে গিলে নিল চিংড়ি। ঘোষবাবুদের মালী অবশ্য একবার টের পেয়ে লাঠি তুলে তাড়া করেছিল কিন্তু তবু ন্যাসপাতি তো খেয়েছে। কমলালেবু একবার-ই খেয়েছিল। গেল শীতে একদিন স্কুল থেকে সবাইকে একটা করে দিয়েছিল। বেশ টক। খাওয়ার চিন্তা জোর করে মাথা থেকে তাড়াতে একটা মশাকে হাতের তালুর ওপর বসে মনের সুখে রক্ত খেতে দেখেও মারলনা চিংড়ি … আহা, খাক…ওর-ও হয়ত তার মতই খালি পেট আর তাছাড়া মশার কামড়ের চুলকানিতে খাওয়ার ভাবনা বিদায় নেবে একটুখানি হলেও।

টুংটাং করে কী একটা বাজাচ্ছিল কে যেন। আর সারা ঘরময় একটা কেমন গন্ধ, ছাই ছাই, পোড়া পোড়া। অনেকগুলো জোনাকি ঢুকে পড়েছে কখন যেন,সবুজ আভা ঘরময়। মোমবাতিটা জ্বলছেনা নাকি! অবাক লাগে চিংড়ির। নাকি ও স্বপ্ন দেখছে। তাই তো! মুখ থেকে লালা বেরিয়ে ভূগোলের ভূ প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। মোমটা কখন নিভে গেছে কে জানে। সামনে দোকানঘরে বাবা নেই বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে বাবা কেটলিতে চা তৈরি করে রেখে বাড়ি যায় রান্না করতে। সেই সময় কেউ এলে চিংড়িই চা ঢেলে দেয়। কিন্তু আজ তো কেউ নেই। তবে আওয়াজ একটা হচ্ছে… টুংটাং না …বিস্কুটের বয়াম খোলার আওয়াজ। একটুখানি সিঁটিয়ে যায় চিংড়ি ভয়ে। কে রে বাবা!

পরক্ষণেই মনে হল, এ  নিঘ্‌ঘাত বিল্টুর কাজ। বিল্টুর সঙ্গে বাজি ধরেছিল কালকেই যে ভূত বলে কিছু নেই। নিশ্চয়ই ব্যাটা ভয় দেখাতে এসেছে মওকা পেয়ে। এটা মাথায় আসতেই লাফ দিয়ে দোকানঘরে ঢুকেই ব্যোমকে যায় চিংড়ি। কেউ কোত্থাও নেই। বাল্বের জোর যেন আরো কমে এসেছে। আশ্বিন মাসের শেষ, গাঁ-গঞ্জে এই সময় ভালই কুয়াশা পড়তে শুরু করে, তবে আজকে যেন সামনেটা একটু বেশিই ধোঁয়াটে। পাতলা একটা ছেয়েরঙা আস্তরণ দোকানটাকে যেন আলাদা করে দিয়েছে বাইরের দুনিয়ার থেকে। হালকা শীতও করছে। নিজের অজান্তেই শিউরে ওঠে চিংড়ি।

ঠিক তখনই খেয়াল হয় একটা পাঁচ টাকার বিস্কুটের প্যাকের আধখোলা হয়ে পড়ে আছে উনুনের পাশে। মাথাটা গরম হয়ে যায় টং করে। হাজার খিদে পেলেও চিংড়ি নিজে কখনও দোকানের জিনিস ছোঁয়না। বাবা বলেছে, এগুলো বদভ্যাস। আর এখন কে না কে এসে প্যাকেট খুলে এরকম ছড়িয়ে রেখেছে!
আর বাবার পাঁচটা টাকা তো নষ্ট হল। এটা ভাবা মাত্রই সব ভয় চলে গেল চিংড়ির।

রীতিমতন হুংকার দিতে চেষ্টা করে সে।

– কে রে বিস্কুট চুরি করে খাচ্ছিস?

কিন্তু চিংড়ির বয়স যেহেতু মাত্র দশ সেহেতু হুংকারটা তেমন জুতসই হয়না। কেউ উত্তরও দেয়না।

এমন সময় হঠাৎ দোকানের বাল্বটা নিভে যায়। এ অবশ্য রোজকার ব্যাপার, সাড়ে সাতটা বাজলেই চন্দ্রকাকু  নিজের  চালের দোকান বন্ধ করে আর লাইট চলে যায় চিংড়িদের দোকানে।

চিংড়ি ভয় পায়না তাই কিন্তু অন্য কে একটা যেন হাঁউমাউ করে ওঠে আলো নেভার সঙ্গে সঙ্গেই।

– “কে রে , কে রে”… বলতে বলতেই চিংড়ি টের পায় একটা ঠাণ্ডা মতন হালকা কিছু তাকে প্রায় জড়িয়ে ধরেছে। সে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই কে যেন সরু কান্না কান্না গলায় বলতে থাকে,
“ওরে বাবাগো, অন্ধকারে আমার ভীষণ ভয়! লাইট জ্বালাও শিগ্‌গির”

হাঁ হয়ে যায় চিংড়ি। কে এটা!

– কে তুই? এত ঠাণ্ডা কেন তোর গা? এখনও তো শীত পড়েইনি…
– আমি রবি। আর আমার গা তো এরকম ঠাণ্ডা-ই হবে। আমাদের সবার এরকম। আসলে রক্ত নেই  তো, তাই।
– রক্ত নেই মানে?  ও, তোর বুঝি ডেঙ্গু হয়েছিল? এই তো কিছুদিন আগে সোনালিদিদির ডেঙ্গু হয়েছিল, তখনও হাসপাতালে ডাক্তার বলেছিল রক্ত নেই।
– দুৎ , ডেঙ্গু না…আমার জন্ডিস হয়েছিল।
– জন্ডিস হলেও রক্ত থাকেনা? বলিস কী! আচ্ছা, তুই-ই তাহলে বিস্কুট খাচ্ছিলি। শরীর খারাপ যখন, খেয়ে নে বিস্কুটগুলো, আমি না হয় বাবাকে বলব আমি খেয়ে ফেলেছি।

কিন্তু বিস্কুত খাওয়ার বদলে হঠাৎ ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কান্না জুড়ে দেয় রবি। নাক থেকে সর্দি টানার মতন আওয়াজ হতে থাকে।

-কাঁদছিস কেন? এ কী রে বাবা! বললাম তো কাউকে বলবোনা … খেয়ে নে তুই বিস্কুট।
– আমি তো খেতে পারিনা-আ-আ-আ… কিছহু খেহেতে পারিনাআ-আ-আ…

বলে কী ছেলেটা। খাইয়ে দিতে হবে নাকি। সে তো কত ছোটবেলা থেকে নিজে নিজে খায়।

-খেতে পারিসনা মানে! ইয়ার্কি হচ্ছে!

এতক্ষণ অন্ধকারে থেকে চোখ সয়ে গেছিল। প্যাকেট থেকে একটা বিস্কুট বের করে আন্দাজে রবির মুখে ঢোকাতে যেতেই চিংড়ি বুঝতে পারে তার হাত কালো ছায়াটা ভেদ করে শূন্যে দুলছে।

সেই সময় রবি আরো জোরে কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে,

“ও দাদাগো, ও চিংড়িদা, তোমার পায়ে পড়ি, আলো জ্বালাও, আমার খুব ভয় করছে”

ছোট হলেও চিংড়ি একা একা থাকে কি-না আর ওকে বাবা বলেছে যে ভূত বলে কিছু হয়না, তাই চিংড়ি অজ্ঞান হতে হতেও হলনা। গুটি গুটি পায়ে পেছনের খুপরিতে ঢুকে হাতড়ে মোমবাতি জ্বালতেই দেখে একটা চিম্‌সে মত কালো ছায়া দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে।

মোম দেখেই ছায়াটা যেন ফ্যাক করে একটা হাসির আওয়াজ করল মনে হল।

-তুমি আমায় দেখে ভয় পাওনি তো, চিংড়িদা?
-ক্কে…ক্কেন? ভয়ের কী আছে… তুই তো রবি
– সবাই ভয় পেয়ে যায় তো। কেউ আমার দুঃখ বোঝেনা। ভূত হয়ে গেছি বলে কি আমার ডাংগুলি খেলতে ইচ্ছে করেনা বল? টিভিতে কার্টুন দেখতেও তো ইচ্ছে করে। আর সেদিন তোমাদের পাড়ার বিল্টুদের বাড়িতে কষা মাংস হচ্ছিল, তা আমি একটু চারপাশ ঘুরে গন্ধ শুঁকছিলাম, খেতে তো আর পারবোনা। তা ওদের বাড়ীর কুকুরটা কী চিল্লান চিল্লাতে শুরু করল…শেষে পালিয়ে বাঁচি…
– খেতে পারবিনা কেন?
– তুমি কি বুদ্ধু নাকি! খাবো কী করে… আমার তো শরীরটাই নেই…খেতে খুব ইচ্ছে করে কিন্তু খেতে পারিনা। আবার প্রায় কান্না শুরু করে রবি।
– আচ্ছা, থাক থাক…খেতে পারিসনা কিন্তু গন্ধ পাস…আহা রে…

চিংড়ি ভূত না হয়েও হাড়ে হাড়ে জানে এরকম হ’লে কী কষ্টটাই  না হয়।

এমন সময় বাইরে হঠাৎ বাবা’র গলা পাওয়া যায়।
-চিংড়ি, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি বাবা? চল, চল, আটটা বেজে গেল… দোকান বন্ধ করি…

মুহূর্তের মধ্যে রবি উধাও হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফিরে চিংড়ি যখন গরম ভাত, ডাল আর আলুসেদ্ধ খাচ্ছে, তখন টের পায় বারান্দার একটা কোণের অন্ধকার যেন একটু ঘন হল… বাতাসে কার যেন ফিস্‌ফিসানি ভেসে আসে…
“কাঁচালঙ্কাটা ভাল করে আরেকটু ডলে দাও তো… আহা-হা…দারুণ গন্ধ।”

চিংড়ির আবারও কেমন মনে হয়, বেঁচে থাকাটা ভীষণ সুন্দর একটা ব্যাপার।

সকালবেলা হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে কয়েকদিন আগে উজালাক্ষী এসে হাজির। উজালাক্ষী আমার বড়বেলার বন্ধু। হেব্বি পড়াশোনা-করা সিরিয়াস আঁতেল টাইপের পাবলিক। কীসব গবেষণা করে, গুচ্ছের পেপার লিখে, দেশ এবং দশকে উদ্ধার করার ফলে নামের আগে একখানা ডক্টর-ও বসে তার। এ হেন গুণবতী মামণি কীভাবে আমার মতন আকাটের বন্ধু হয়, এ নিয়ে যারা দু-লাইন পড়েই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, তাদের অবগতির জন্য জানাই, উজালাক্ষীকে একবার একটা বিপদের হাত থেকে আমি বাঁচিয়েছিলাম- সেই কারণেই, কিছুটা কৃতজ্ঞতা এবং কিছুটা আমার  অন্যান্য অপদার্থতার প্রতি  করুণাবশতঃ, বেচারী আমায় ফেলতে পারেনা। বিদেশ থেকে পারফ্যুমটা, লজেন্সটা, চকোলেটটা এনে দেয়। এমনকি, মাঝে মাঝে কোন কোন ব্যাপারে আমার পরামর্শও চায়। যদিও ওর সাহায্য চাওয়ার বিষয়গুলো ঠিক সাধারণ বলা যায়না। যেমন, একবার আইএসডি করে জিজ্ঞেস করেছিল, ওর বয়ফ্রেন্ড তার জাঙিয়া ওর বাড়িতে ফেলে গেছে, তো সেটা কি ও ট্র্যাশ ক্যান-এ ছুঁড়ে ফেলবে না কাচবে। তখন রাত্তির আড়াইটে বাজে প্রায়। তা, আমি ঘুমচোখে আর কিছু না জিজ্ঞেস করে বলেছিলাম কেচে ফেলতে। তখন বলল, কেচে বয়ফ্রেডকে কুরিয়র করে পাঠিয়ে দেবে না আলমারিতে রাখবে।! এইভাবে স্টেপ বাই স্টেপ ব্যাপারটা মিটতে প্রায় রাত ভোর হয়ে গেছিল।

সে হেন উজালাক্ষীকে রবিবার ভোর আটটা’র (হ্যাঁ, আটটা আমার কাছে ভোর-ই) সময় একটা জম্পেশ কায়দার বুটিকের ছাইরঙা হাই-লো কুর্তা আর সাদা পাজামা পরে হাঁপাতে হাঁপাতে আসতে দেখেই আমি প্রমাদ গুণলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই জানা গেল যে, বেশ একটা উঁচুদরের সাহিত্যসভায় ওর যাওয়ার কথা এগারোটার সময়। দুজনের জন্য ইনভিটিশন পাঠিয়েছেন উদ্যোক্তারা। কোন এক রহস্যময় কারণে ওর মনে হচ্ছে সঙ্গে কাউকে না নিয়ে একা গেলে ওর সম্মানহানি ঘটবে; তাই এই আক্রমণ…মানে ইয়ে… আগমন।

আমি প্রায় কেঁদে ফেলে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এই সাতসকালে আমার প্রাত্যহিক কোন কাজ তো হয়ই-নি এবং তার চেয়েও বড় কথা এসব সভায় আমাকে নিয়ে যাওয়া আর একটা দাঁড়কাক কে নিয়ে যাওয়া এক-ই ব্যাপার।

-তার চেয়ে এক কাজ কর বরং, তোকেও যেতে হবেনা। পাঁঠার মাংস রাঁধবো। আর বিয়ার আনাবো…আজ আমার এখানেই থেকে যা।

এসব লোভ দেখিয়েও কোন কাজ হলনা। এমনকি শেষে আমি বিয়ার থেকে স্কচ অবধি উঠেছিলাম, তাতেও না।

অদ্যই আমার জীবনের শেষ রজনী- এই ভেবে তৈরী হয়ে নিলাম ইষ্টনাম জপতে জপতে। এইরকম সব মেগাবিপদের সময় আমি আরো অনেকের মতই ভয়ানক ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়ে পড়ি L

পৌঁছে দেখি সে এক এলাহি ব্যাপার! গম গম করে লাউডস্পীকারে নাম-টাম বলা হচ্ছে আর লোকজন গিয়ে হেসে হেসে পুষ্পস্তবক নিচ্ছে আর একটা বড় বাক্স। উজালাক্ষীও পেল। আমি যথারীতি বাক্সর একদিকের  কানা উঁচু করে দেখতে চেষ্টা করছিলাম যে ভেতরে মিষ্টি আছে কি-না, বা থাকলে কী কী মিষ্টি। ক্যামন দুর্বাসার মতন কট্‌মট করে তাকালো আমার দিকে। মরুকগে যাক, সামনে পুজো, আমি এখন ডায়েট করছি।

ইতিমধ্যে, বেশ মনোজ্ঞ আলোচনা শুরু হয়েছে; ভারতীয় সাহিত্যে লেবানীজ খাদ্যের গুরুত্ব, আর্স্টহোয়াইল সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন ধরণের লেখায় বা কার কার লেখায় গ্রামবাংলার শ্রেণীবৈষম্যের হুবহু চিত্রাবলী অঙ্কিত হয়েছে, দেরিদা’র ডিকন্সট্রাকশনের ওপর রবীন্দ্রনাথ এবং মাধ্যাকর্ষনের প্রভাব, গুলাগ-এর প্রথম উৎপত্তি এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ-এর ম্যাসাকার- দুই-ই ১৯১৯ সালে হয়েছিল, নিউমেরোলজির বিচারে এই দুইয়ের মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে কি-না—
এসবের মধ্যে বিভিন্ন বক্তা এবং শ্রোতাবৃন্দ বক্তব্য রাখছিলেন, পেন-ফেন দিয়ে মনোযোগ সহকারে নোট নিচ্ছিল উজালাক্ষী আর আমি ক্ষিদেয়  আধমরা হয়ে ভাবছিলাম সেই পেনটা যদি পাওয়া যেত  “that would be a syringe”! (না, ব্যোমকেশের দুর্গরহস্য নহে)

আমি মাঝে মাঝে মুখে সবজান্তা স্মিত হাসি এবং চোখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব এনে মাথা নেড়ে যাচ্ছিলাম। মাইরি বলছি, শোনার চেষ্টাও করছিলাম কিন্তু  কিচ্ছুটি মগজে সেঁধোচ্ছিল না। তার ওপর থেকে থেকেই একটা প্রাণকাড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম, বেশ একটা ভাজা চিকেন, ভাজা চিকেন গন্ধ। বেশ কয়েকবার জিভে জল চলে এসেছে, একবার তো টিস্যুতে মুছতে হল; লিপস্টিক ঠিক করার ভান করে মুছে নিলাম।

শেষে আর থাকতে না পেরে উজালাক্ষীকে জিগালাম, “হ্যাঁ রে এদের লাঞ্চ ব্রেক-টেক নেই?”
– চুপ, চুপ…দেখছিস না কী ভীষণ দরদ নিয়ে অমুকদা সার্ত্রে’র স্মৃতিচারণ করছেন…এই সময় তোর খিদে পাচ্ছে?
-পেলে কী করবো? ওনার সার্ত্র, আমার ন্যসিয়া, খিদেয়… আমি করুণ স্বরে জানাই।
-উফ! ওই তো পেছনদিকে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে…চলে যা… এই  গেস্ট কার্ডটা রাখ সঙ্গে… আমি এখন যাবোনা…একটু পরেই ডিবেট শুরু হবে।

এটা এতক্ষণ বলতে কী হয়েছিল। মনে মনে ভয়ানক একটা খিস্তি দিয়ে আমি গুটি গুটি কার্ড নিয়ে এগোই। খাওয়ার ব্যবস্থা বেশ ভালই। চিকেন কাটলেট, বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, জলভরা সন্দেশ, এগুলো দেখে একটু আগে দেওয়া খিস্তিটা ফিরিয়ে নেবো কিনা ভাবছি, এমন সময় একটা ছোকরা এসে এক গাল হেসে ‘হাই’ বলল। ছোকরাকে আমি চিনিনা, বলাই বাহুল্য। তাছাড়া তখন যমরাজ এসে ডাকলেও আমি ঘুঁষি চালিয়ে দেবো এরকম দশা, তার মধ্যে এ কী আপদ!

ভদ্রতাবশে “হাই” বলতেই হয়। বললাম। চশমা পরলে আমাকেও বেশ আঁতেল লাগে, দু-একজন বলেছে, তাই আমি চশমা পরে গেছিলাম। ভুল করেছিলাম অবশ্যই কারণ ছোকরা এরপর ভীষণ স্মার্টভাবে নিজের নাম বলে হাত বাড়িয়ে দিল।
আ মোলো যা! দেখছিস এক হাতে প্লেট, আরেকহাতে চামচ। এখনও একটা কাটলেট পর্যন্ত তুলিনি প্লেটে! এর মধ্যে হ্যান্ডশেক!

কোনরকমে ব্যাপারটা ম্যানেজ করে মুখে মিষ্টি হাসি এবং মনে মনে ছোকরার চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে একটা কাটলেট তুলে দু-কামড় খেয়েছি কী খাইনি, ছোকরা প্লেট হাতে পাশে হাজির।
“আপনি আঁখিদির সঙ্গে এসেছেন , না? অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছি আপনাকে” (কেন ব্বে? আমি কি চিড়িয়াখানা থেকে এসেছি?)
খেতে খেতে এর উত্তরে হেঁ হেঁ ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা। কিন্তু সমস্যা হল, আগুনে ক্ষিদের মুখে আমার আরো দুটো কাটলেট নিতে ইচ্ছে করছে। মালটা এরা বানিয়েছেও ভাল। বিরিয়ানিও খাবো। ইদিকে ছোকরা বকেই যাচ্ছে। বকেই যাচ্ছে… 😦

হঠাৎ খেয়াল হল হতচ্ছাড়া কী একটা কথা বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের জন্য।
“অ্যাঁ?” আমি শুধোই।
-বলছিলাম যে, আপনি ডিবেটে কি দেরিদা’র গ্রুপে?
আমি নঞর্থক ভাবে মুন্ডু হেলাই। মুখে কাটলেট এবং শসার কুচি।
– তবে কি নেরুদা?

শালা আমায় এখনও পর্যন্ত একটা গোটা কাটলেট খেতে দেয়নি। মনে মনে বলি, “বসন্তি, এহি হ্যায় ওহ্‌ ম্যাজিক মোমেন্ট, হিলা দে ইউপি, হিলা দে এমপি”

অতঃপর, আমি পাশের টেবিলের ওপর প্লেটটা রেখে ছোকরার চোখে চোখ রেখে বলি,
“দেখুন, দেরিদা বা তাড়াতাড়িদা কাউকেই আমি চিনিনা। ন্যাড়াদা বা নেড়ুদা বলে আমাদের পাড়ায় একজন আছেন। মদ খেয়ে রোজ রাতে বাওলামি করেন বলে ওনার বৌ ওনাকে রামক্যালান ক্যালায়। তার কথা বলছেন? সেও এখানে এসেছে নাকি? আঁখি যে আমাকে বলল এখানে সব ভাল ভাল লোকেরা আসবে…”
শেষের লাইনটা সলিলকি স্টাইলে।

বললে পেত্যয় যাবেন না, ছোকরা পুরো চল্লিশ সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আমিও পেশেন্স দেখালাম। এতখানি যখন দেরি হয়েছে খেতে আরো এক মিনিটও সই। বেয়াল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় সে “আচ্ছা, আমিও খেয়ে আসি” বলে দ্রুতপদে উধাও হল।
ধীরেসুস্থে খাওয়ার ব্যাপারটা সেরে আবার হলে’র দিকে এগোতেই দেখি সেই ছোকরা উজালাক্ষীর পাশে বসে কীসব বলছে এবং মাঝে মাঝে ভীতভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ব্যাপার সুবিধের নয় বুঝে মানে মানে কেটে পড়াই মনস্থ করলাম। ঝটপট বেরিয়ে ওলায় বসেই উজালাক্ষীকে মেসেজ করলাম, “পেট কামড়াচ্ছে, বাড়ি যাচ্ছি”।

প্রায় দশদিন হয়ে গেছে। এখনও কোন রিপ্লাই দেয়নি। সামনের মাসে ও আবার কোথায় যেন বিদেশে যাচ্ছে। চকোলেট আনবে কি-না আমার জন্য, সেই ভাবনাই আপাততঃ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে… 😥