Archive for the ‘গদ্য হাবিজাবি’ Category

চিংড়ি

Posted: সেপ্টেম্বর 15, 2017 in গদ্য হাবিজাবি
ট্যাগসমূহ:, , ,

প্রতিদিন এই সময় দোকানের পেছনে ছোট্ট খুপরি ঘরটায় বসে মোমবাতির আলোয়  পড়া মুখস্থ  করে চিংড়ি। এমন নয় যে ওদের এই আধা গ্রাম-আধা শহর চন্দ্রপুরে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। খুব আছে; ইলেক্ট্রিসিটি আছে, রবিবারের হাট আছে, সবজির আড়ত আছে, সাহাবাবুর পেল্লায় লাল ট্র্যাক্টর আছে, একপাশ দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাওয়া একটা অখ্যাত নদী পর্যন্ত আছে। নেই শুধু চিংড়িদের টাকা। চিংড়ি জানে, ওরা খুব গরীব। বাবা অনেক বলেকয়ে পাশের চন্দ্রকাকুর  চালের দোকান থেকে লাইন টেনে একটা টিম্‌টিমে বাল্ব জ্বালায় দোকানের ভিতরে। তাতে যেন অন্ধকারগুলো সন্ধ্যার পর আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। তার মধ্যেই বাবা উনুন ধরিয়ে চা বানিয়ে খদ্দেরদের দেয়। আর খদ্দের কেই-বা। এই তো এখানের লোকজন সব। কজন-ই বা এই মফস্বলে দোকানে চা খাওয়ার বিলাসিতা করে। তার ওপর বাবা ভাল চা বানায়, বাবাকে খুব ভালবাসলেও একথা চিংড়ি বলতে পারবেনা। তাই তাদের দোকান প্রায় চলেনা বলতে গেলে। বাবা মাঝে মাঝেই মাথা নেড়ে নেড়ে বিড়বিড় করে আর বলে, “আর বাঁচতে হবেনা, আর পারবনা”।

সেইরকম সময়ে খুব মন খারাপ হয় চিংড়ির । তার তো দিব্যি লাগে বেঁচে থাকতে। সকালবেলা উঠে পুকুরধারে যখন দাঁত মাজতে যায়, তখন দেখে একটা জলফড়িং অকারণে ঘাস বেয়ে উঠছে আর নামছে, নামছে আর উঠছে, কোনদিকে তাকাচ্ছে না। অবাক হয়ে চেয়েই থাকে সে। কী সুন্দর পরীর মতন পাখা ফড়িংটার, রোদ পড়ে ঝিলমিল করছে। পরীদের পাখা মনে হয় আট্টু বড় হয়। নয়ত আকাশে ওড়ে কী করে! এইসব ভাবতে ভাবতেই একটা ঢোঁড়া সাপ পায়ের পাশ দিয়ে হিলিবিলি কেটে জলে নেমে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে পুকুরপাড়ের বন-কলমির ঝোপ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নামে ইঁট রঙের বেজিটা, বেকুবের মতন চেয়ে থাকে জলের দিকে। ঠিক এই সময়েই বাবার গলা ভেসে আসে।
– “হল তোমার? নাকি সারাদিন জলের দিকে চেয়েই কাটিয়ে দেবে? ইশ্‌কুল যেতে হবেনা আর।”

এইভাবেই প্রায় রোজ শুরু হয় চিংড়ির সকাল। ভাল লাগে তো তার। খুব ভাল লাগে বেঁচে থাকতে।

এমনকি, এই যে এখন সন্ধ্যেবেলা কাঁপা কাঁপা মোমের আলোয় বসে সে ইতিহাস পড়ছে, এও তার ভাল লাগে। থোকা থোকা অন্ধকার জমে থাকে ঘরটার চার কোণায়। মাঝেমাঝেই দু-একটা জোনাকি রাস্তা ভুল করে ঢুকে পড়ে আর সব্‌জে আলো দপ্‌দপ্‌ করে ওঠে। চিংড়ি তখন স্পষ্ট যেন দেখতে পায় সেই আদিম মানুষেরা গুহায় ছবি আঁকছে। ওই তো বর্শা নিয়ে হরিণের পেছনে ছুটে গেল একজন, গাছের ফাঁক দিয়ে দুটো হিংস্র হলুদ চোখ শিকারীকে দেখছে— গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে ওঠে!

সত্যি বলতে কী, পড়াশোনায় চিংড়ি মোটেই খারাপ না। স্কুলে স্যররা তাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। পরীক্ষায় প্রথম তিনজনের মধ্যে চিংড়ি থাকেই প্রতিবার। তবে, ইতিহাস ওর প্রিয় বিষয়। বাবা অবশ্য বলে, সে সারাক্ষণ হাবিজাবি ভাবে আর আজগুবি সব কল্পনা করে বলেই ইতিহাস ভাল লাগে তার। দ্যুত্‌! এরকম হয় নাকি আবার। অবশ্য বাবাও নাকি খুব ভাল ছাত্র ছিল; সুবীরকাকুর কাছে শুনেছে সে। দারুণ ভাল ছিল ইংরেজি আর অঙ্কে। তারপর সেই যে রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে ঠাকুমা, দাদু, আর তার ছোট্ট এক পিসি ছিল, সবাই মরে গেল, তারপরেই বাবার আর পড়াশোনা করা হলনা। কলকাতায় কাজ করত কোথায় যেন। তারপর মা’র সঙ্গে বাবার বিয়ে হয়েছিল। মা-কে অবশ্য মনে নেই চিংড়ির। সে যখন খুব ছোট তখন মা’র কী একটা খুব কঠিন অসুখ হওয়ায় মা’ও মরে গিয়ে আকাশের তারা হয়ে গেছে। ্তারপর থেকে বাবাও কেমন হয়ে গেছে। যখন হাঁটুর উপর ধুতি তুলে রং-ওঠা একটা ফতুয়া পরে মাথা নীচু করে চা বানায়, তখন মনেই হয়না এই মানুষটা মুখে মুখে সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্কগুলো করে দিতে পারে। খুব মায়া হয় তখন চিংড়ির বাবাকে দেখে। বড় হয়ে সে নিজে চা বানাবে বাবার জন্য আর বাবাকে একটা বড় হাতলওয়ালা চেয়ারে বসিয়ে রাখবে। ওই জয়ন্তদের বাড়িতে যেমন আছে, সেরকম নরম গদী দেওয়া চেয়ার।

সেসব কথা থাক। আপাততঃ কাল ভূগোল পরীক্ষা, সেই নিয়ে হিমশিম অবস্থা। ইতিহাস মুড়ে রেখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভূগোল বই খুলতে হয়। পৃথিবীটা কমলালেবুর মতন না ন্যাসপাতির মত, তা জেনে কোন কচুপোড়া হবে শুনি! ন্যাসপাতি হলেই বরং ভাল হত। ঘোষবাবুদের  বাগানে তিনটে গাছ আছে, চুরি করে খায় তারা বন্ধুরা। একটু বিটনুন দিলে যা লাগে না…উফ! জিভের জলটা সুড়ুৎ করে গিলে নিল চিংড়ি। ঘোষবাবুদের মালী অবশ্য একবার টের পেয়ে লাঠি তুলে তাড়া করেছিল কিন্তু তবু ন্যাসপাতি তো খেয়েছে। কমলালেবু একবার-ই খেয়েছিল। গেল শীতে একদিন স্কুল থেকে সবাইকে একটা করে দিয়েছিল। বেশ টক। খাওয়ার চিন্তা জোর করে মাথা থেকে তাড়াতে একটা মশাকে হাতের তালুর ওপর বসে মনের সুখে রক্ত খেতে দেখেও মারলনা চিংড়ি … আহা, খাক…ওর-ও হয়ত তার মতই খালি পেট আর তাছাড়া মশার কামড়ের চুলকানিতে খাওয়ার ভাবনা বিদায় নেবে একটুখানি হলেও।

টুংটাং করে কী একটা বাজাচ্ছিল কে যেন। আর সারা ঘরময় একটা কেমন গন্ধ, ছাই ছাই, পোড়া পোড়া। অনেকগুলো জোনাকি ঢুকে পড়েছে কখন যেন,সবুজ আভা ঘরময়। মোমবাতিটা জ্বলছেনা নাকি! অবাক লাগে চিংড়ির। নাকি ও স্বপ্ন দেখছে। তাই তো! মুখ থেকে লালা বেরিয়ে ভূগোলের ভূ প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। মোমটা কখন নিভে গেছে কে জানে। সামনে দোকানঘরে বাবা নেই বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে বাবা কেটলিতে চা তৈরি করে রেখে বাড়ি যায় রান্না করতে। সেই সময় কেউ এলে চিংড়িই চা ঢেলে দেয়। কিন্তু আজ তো কেউ নেই। তবে আওয়াজ একটা হচ্ছে… টুংটাং না …বিস্কুটের বয়াম খোলার আওয়াজ। একটুখানি সিঁটিয়ে যায় চিংড়ি ভয়ে। কে রে বাবা!

পরক্ষণেই মনে হল, এ  নিঘ্‌ঘাত বিল্টুর কাজ। বিল্টুর সঙ্গে বাজি ধরেছিল কালকেই যে ভূত বলে কিছু নেই। নিশ্চয়ই ব্যাটা ভয় দেখাতে এসেছে মওকা পেয়ে। এটা মাথায় আসতেই লাফ দিয়ে দোকানঘরে ঢুকেই ব্যোমকে যায় চিংড়ি। কেউ কোত্থাও নেই। বাল্বের জোর যেন আরো কমে এসেছে। আশ্বিন মাসের শেষ, গাঁ-গঞ্জে এই সময় ভালই কুয়াশা পড়তে শুরু করে, তবে আজকে যেন সামনেটা একটু বেশিই ধোঁয়াটে। পাতলা একটা ছেয়েরঙা আস্তরণ দোকানটাকে যেন আলাদা করে দিয়েছে বাইরের দুনিয়ার থেকে। হালকা শীতও করছে। নিজের অজান্তেই শিউরে ওঠে চিংড়ি।

ঠিক তখনই খেয়াল হয় একটা পাঁচ টাকার বিস্কুটের প্যাকের আধখোলা হয়ে পড়ে আছে উনুনের পাশে। মাথাটা গরম হয়ে যায় টং করে। হাজার খিদে পেলেও চিংড়ি নিজে কখনও দোকানের জিনিস ছোঁয়না। বাবা বলেছে, এগুলো বদভ্যাস। আর এখন কে না কে এসে প্যাকেট খুলে এরকম ছড়িয়ে রেখেছে!
আর বাবার পাঁচটা টাকা তো নষ্ট হল। এটা ভাবা মাত্রই সব ভয় চলে গেল চিংড়ির।

রীতিমতন হুংকার দিতে চেষ্টা করে সে।

– কে রে বিস্কুট চুরি করে খাচ্ছিস?

কিন্তু চিংড়ির বয়স যেহেতু মাত্র দশ সেহেতু হুংকারটা তেমন জুতসই হয়না। কেউ উত্তরও দেয়না।

এমন সময় হঠাৎ দোকানের বাল্বটা নিভে যায়। এ অবশ্য রোজকার ব্যাপার, সাড়ে সাতটা বাজলেই চন্দ্রকাকু  নিজের  চালের দোকান বন্ধ করে আর লাইট চলে যায় চিংড়িদের দোকানে।

চিংড়ি ভয় পায়না তাই কিন্তু অন্য কে একটা যেন হাঁউমাউ করে ওঠে আলো নেভার সঙ্গে সঙ্গেই।

– “কে রে , কে রে”… বলতে বলতেই চিংড়ি টের পায় একটা ঠাণ্ডা মতন হালকা কিছু তাকে প্রায় জড়িয়ে ধরেছে। সে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই কে যেন সরু কান্না কান্না গলায় বলতে থাকে,
“ওরে বাবাগো, অন্ধকারে আমার ভীষণ ভয়! লাইট জ্বালাও শিগ্‌গির”

হাঁ হয়ে যায় চিংড়ি। কে এটা!

– কে তুই? এত ঠাণ্ডা কেন তোর গা? এখনও তো শীত পড়েইনি…
– আমি রবি। আর আমার গা তো এরকম ঠাণ্ডা-ই হবে। আমাদের সবার এরকম। আসলে রক্ত নেই  তো, তাই।
– রক্ত নেই মানে?  ও, তোর বুঝি ডেঙ্গু হয়েছিল? এই তো কিছুদিন আগে সোনালিদিদির ডেঙ্গু হয়েছিল, তখনও হাসপাতালে ডাক্তার বলেছিল রক্ত নেই।
– দুৎ , ডেঙ্গু না…আমার জন্ডিস হয়েছিল।
– জন্ডিস হলেও রক্ত থাকেনা? বলিস কী! আচ্ছা, তুই-ই তাহলে বিস্কুট খাচ্ছিলি। শরীর খারাপ যখন, খেয়ে নে বিস্কুটগুলো, আমি না হয় বাবাকে বলব আমি খেয়ে ফেলেছি।

কিন্তু বিস্কুত খাওয়ার বদলে হঠাৎ ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কান্না জুড়ে দেয় রবি। নাক থেকে সর্দি টানার মতন আওয়াজ হতে থাকে।

-কাঁদছিস কেন? এ কী রে বাবা! বললাম তো কাউকে বলবোনা … খেয়ে নে তুই বিস্কুট।
– আমি তো খেতে পারিনা-আ-আ-আ… কিছহু খেহেতে পারিনাআ-আ-আ…

বলে কী ছেলেটা। খাইয়ে দিতে হবে নাকি। সে তো কত ছোটবেলা থেকে নিজে নিজে খায়।

-খেতে পারিসনা মানে! ইয়ার্কি হচ্ছে!

এতক্ষণ অন্ধকারে থেকে চোখ সয়ে গেছিল। প্যাকেট থেকে একটা বিস্কুট বের করে আন্দাজে রবির মুখে ঢোকাতে যেতেই চিংড়ি বুঝতে পারে তার হাত কালো ছায়াটা ভেদ করে শূন্যে দুলছে।

সেই সময় রবি আরো জোরে কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে,

“ও দাদাগো, ও চিংড়িদা, তোমার পায়ে পড়ি, আলো জ্বালাও, আমার খুব ভয় করছে”

ছোট হলেও চিংড়ি একা একা থাকে কি-না আর ওকে বাবা বলেছে যে ভূত বলে কিছু হয়না, তাই চিংড়ি অজ্ঞান হতে হতেও হলনা। গুটি গুটি পায়ে পেছনের খুপরিতে ঢুকে হাতড়ে মোমবাতি জ্বালতেই দেখে একটা চিম্‌সে মত কালো ছায়া দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে।

মোম দেখেই ছায়াটা যেন ফ্যাক করে একটা হাসির আওয়াজ করল মনে হল।

-তুমি আমায় দেখে ভয় পাওনি তো, চিংড়িদা?
-ক্কে…ক্কেন? ভয়ের কী আছে… তুই তো রবি
– সবাই ভয় পেয়ে যায় তো। কেউ আমার দুঃখ বোঝেনা। ভূত হয়ে গেছি বলে কি আমার ডাংগুলি খেলতে ইচ্ছে করেনা বল? টিভিতে কার্টুন দেখতেও তো ইচ্ছে করে। আর সেদিন তোমাদের পাড়ার বিল্টুদের বাড়িতে কষা মাংস হচ্ছিল, তা আমি একটু চারপাশ ঘুরে গন্ধ শুঁকছিলাম, খেতে তো আর পারবোনা। তা ওদের বাড়ীর কুকুরটা কী চিল্লান চিল্লাতে শুরু করল…শেষে পালিয়ে বাঁচি…
– খেতে পারবিনা কেন?
– তুমি কি বুদ্ধু নাকি! খাবো কী করে… আমার তো শরীরটাই নেই…খেতে খুব ইচ্ছে করে কিন্তু খেতে পারিনা। আবার প্রায় কান্না শুরু করে রবি।
– আচ্ছা, থাক থাক…খেতে পারিসনা কিন্তু গন্ধ পাস…আহা রে…

চিংড়ি ভূত না হয়েও হাড়ে হাড়ে জানে এরকম হ’লে কী কষ্টটাই  না হয়।

এমন সময় বাইরে হঠাৎ বাবা’র গলা পাওয়া যায়।
-চিংড়ি, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি বাবা? চল, চল, আটটা বেজে গেল… দোকান বন্ধ করি…

মুহূর্তের মধ্যে রবি উধাও হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফিরে চিংড়ি যখন গরম ভাত, ডাল আর আলুসেদ্ধ খাচ্ছে, তখন টের পায় বারান্দার একটা কোণের অন্ধকার যেন একটু ঘন হল… বাতাসে কার যেন ফিস্‌ফিসানি ভেসে আসে…
“কাঁচালঙ্কাটা ভাল করে আরেকটু ডলে দাও তো… আহা-হা…দারুণ গন্ধ।”

চিংড়ির আবারও কেমন মনে হয়, বেঁচে থাকাটা ভীষণ সুন্দর একটা ব্যাপার।

Advertisements

সকালবেলা হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে কয়েকদিন আগে উজালাক্ষী এসে হাজির। উজালাক্ষী আমার বড়বেলার বন্ধু। হেব্বি পড়াশোনা-করা সিরিয়াস আঁতেল টাইপের পাবলিক। কীসব গবেষণা করে, গুচ্ছের পেপার লিখে, দেশ এবং দশকে উদ্ধার করার ফলে নামের আগে একখানা ডক্টর-ও বসে তার। এ হেন গুণবতী মামণি কীভাবে আমার মতন আকাটের বন্ধু হয়, এ নিয়ে যারা দু-লাইন পড়েই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, তাদের অবগতির জন্য জানাই, উজালাক্ষীকে একবার একটা বিপদের হাত থেকে আমি বাঁচিয়েছিলাম- সেই কারণেই, কিছুটা কৃতজ্ঞতা এবং কিছুটা আমার  অন্যান্য অপদার্থতার প্রতি  করুণাবশতঃ, বেচারী আমায় ফেলতে পারেনা। বিদেশ থেকে পারফ্যুমটা, লজেন্সটা, চকোলেটটা এনে দেয়। এমনকি, মাঝে মাঝে কোন কোন ব্যাপারে আমার পরামর্শও চায়। যদিও ওর সাহায্য চাওয়ার বিষয়গুলো ঠিক সাধারণ বলা যায়না। যেমন, একবার আইএসডি করে জিজ্ঞেস করেছিল, ওর বয়ফ্রেন্ড তার জাঙিয়া ওর বাড়িতে ফেলে গেছে, তো সেটা কি ও ট্র্যাশ ক্যান-এ ছুঁড়ে ফেলবে না কাচবে। তখন রাত্তির আড়াইটে বাজে প্রায়। তা, আমি ঘুমচোখে আর কিছু না জিজ্ঞেস করে বলেছিলাম কেচে ফেলতে। তখন বলল, কেচে বয়ফ্রেডকে কুরিয়র করে পাঠিয়ে দেবে না আলমারিতে রাখবে।! এইভাবে স্টেপ বাই স্টেপ ব্যাপারটা মিটতে প্রায় রাত ভোর হয়ে গেছিল।

সে হেন উজালাক্ষীকে রবিবার ভোর আটটা’র (হ্যাঁ, আটটা আমার কাছে ভোর-ই) সময় একটা জম্পেশ কায়দার বুটিকের ছাইরঙা হাই-লো কুর্তা আর সাদা পাজামা পরে হাঁপাতে হাঁপাতে আসতে দেখেই আমি প্রমাদ গুণলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই জানা গেল যে, বেশ একটা উঁচুদরের সাহিত্যসভায় ওর যাওয়ার কথা এগারোটার সময়। দুজনের জন্য ইনভিটিশন পাঠিয়েছেন উদ্যোক্তারা। কোন এক রহস্যময় কারণে ওর মনে হচ্ছে সঙ্গে কাউকে না নিয়ে একা গেলে ওর সম্মানহানি ঘটবে; তাই এই আক্রমণ…মানে ইয়ে… আগমন।

আমি প্রায় কেঁদে ফেলে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এই সাতসকালে আমার প্রাত্যহিক কোন কাজ তো হয়ই-নি এবং তার চেয়েও বড় কথা এসব সভায় আমাকে নিয়ে যাওয়া আর একটা দাঁড়কাক কে নিয়ে যাওয়া এক-ই ব্যাপার।

-তার চেয়ে এক কাজ কর বরং, তোকেও যেতে হবেনা। পাঁঠার মাংস রাঁধবো। আর বিয়ার আনাবো…আজ আমার এখানেই থেকে যা।

এসব লোভ দেখিয়েও কোন কাজ হলনা। এমনকি শেষে আমি বিয়ার থেকে স্কচ অবধি উঠেছিলাম, তাতেও না।

অদ্যই আমার জীবনের শেষ রজনী- এই ভেবে তৈরী হয়ে নিলাম ইষ্টনাম জপতে জপতে। এইরকম সব মেগাবিপদের সময় আমি আরো অনেকের মতই ভয়ানক ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়ে পড়ি L

পৌঁছে দেখি সে এক এলাহি ব্যাপার! গম গম করে লাউডস্পীকারে নাম-টাম বলা হচ্ছে আর লোকজন গিয়ে হেসে হেসে পুষ্পস্তবক নিচ্ছে আর একটা বড় বাক্স। উজালাক্ষীও পেল। আমি যথারীতি বাক্সর একদিকের  কানা উঁচু করে দেখতে চেষ্টা করছিলাম যে ভেতরে মিষ্টি আছে কি-না, বা থাকলে কী কী মিষ্টি। ক্যামন দুর্বাসার মতন কট্‌মট করে তাকালো আমার দিকে। মরুকগে যাক, সামনে পুজো, আমি এখন ডায়েট করছি।

ইতিমধ্যে, বেশ মনোজ্ঞ আলোচনা শুরু হয়েছে; ভারতীয় সাহিত্যে লেবানীজ খাদ্যের গুরুত্ব, আর্স্টহোয়াইল সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন ধরণের লেখায় বা কার কার লেখায় গ্রামবাংলার শ্রেণীবৈষম্যের হুবহু চিত্রাবলী অঙ্কিত হয়েছে, দেরিদা’র ডিকন্সট্রাকশনের ওপর রবীন্দ্রনাথ এবং মাধ্যাকর্ষনের প্রভাব, গুলাগ-এর প্রথম উৎপত্তি এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ-এর ম্যাসাকার- দুই-ই ১৯১৯ সালে হয়েছিল, নিউমেরোলজির বিচারে এই দুইয়ের মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে কি-না—
এসবের মধ্যে বিভিন্ন বক্তা এবং শ্রোতাবৃন্দ বক্তব্য রাখছিলেন, পেন-ফেন দিয়ে মনোযোগ সহকারে নোট নিচ্ছিল উজালাক্ষী আর আমি ক্ষিদেয়  আধমরা হয়ে ভাবছিলাম সেই পেনটা যদি পাওয়া যেত  “that would be a syringe”! (না, ব্যোমকেশের দুর্গরহস্য নহে)

আমি মাঝে মাঝে মুখে সবজান্তা স্মিত হাসি এবং চোখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব এনে মাথা নেড়ে যাচ্ছিলাম। মাইরি বলছি, শোনার চেষ্টাও করছিলাম কিন্তু  কিচ্ছুটি মগজে সেঁধোচ্ছিল না। তার ওপর থেকে থেকেই একটা প্রাণকাড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম, বেশ একটা ভাজা চিকেন, ভাজা চিকেন গন্ধ। বেশ কয়েকবার জিভে জল চলে এসেছে, একবার তো টিস্যুতে মুছতে হল; লিপস্টিক ঠিক করার ভান করে মুছে নিলাম।

শেষে আর থাকতে না পেরে উজালাক্ষীকে জিগালাম, “হ্যাঁ রে এদের লাঞ্চ ব্রেক-টেক নেই?”
– চুপ, চুপ…দেখছিস না কী ভীষণ দরদ নিয়ে অমুকদা সার্ত্রে’র স্মৃতিচারণ করছেন…এই সময় তোর খিদে পাচ্ছে?
-পেলে কী করবো? ওনার সার্ত্র, আমার ন্যসিয়া, খিদেয়… আমি করুণ স্বরে জানাই।
-উফ! ওই তো পেছনদিকে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে…চলে যা… এই  গেস্ট কার্ডটা রাখ সঙ্গে… আমি এখন যাবোনা…একটু পরেই ডিবেট শুরু হবে।

এটা এতক্ষণ বলতে কী হয়েছিল। মনে মনে ভয়ানক একটা খিস্তি দিয়ে আমি গুটি গুটি কার্ড নিয়ে এগোই। খাওয়ার ব্যবস্থা বেশ ভালই। চিকেন কাটলেট, বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, জলভরা সন্দেশ, এগুলো দেখে একটু আগে দেওয়া খিস্তিটা ফিরিয়ে নেবো কিনা ভাবছি, এমন সময় একটা ছোকরা এসে এক গাল হেসে ‘হাই’ বলল। ছোকরাকে আমি চিনিনা, বলাই বাহুল্য। তাছাড়া তখন যমরাজ এসে ডাকলেও আমি ঘুঁষি চালিয়ে দেবো এরকম দশা, তার মধ্যে এ কী আপদ!

ভদ্রতাবশে “হাই” বলতেই হয়। বললাম। চশমা পরলে আমাকেও বেশ আঁতেল লাগে, দু-একজন বলেছে, তাই আমি চশমা পরে গেছিলাম। ভুল করেছিলাম অবশ্যই কারণ ছোকরা এরপর ভীষণ স্মার্টভাবে নিজের নাম বলে হাত বাড়িয়ে দিল।
আ মোলো যা! দেখছিস এক হাতে প্লেট, আরেকহাতে চামচ। এখনও একটা কাটলেট পর্যন্ত তুলিনি প্লেটে! এর মধ্যে হ্যান্ডশেক!

কোনরকমে ব্যাপারটা ম্যানেজ করে মুখে মিষ্টি হাসি এবং মনে মনে ছোকরার চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে একটা কাটলেট তুলে দু-কামড় খেয়েছি কী খাইনি, ছোকরা প্লেট হাতে পাশে হাজির।
“আপনি আঁখিদির সঙ্গে এসেছেন , না? অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছি আপনাকে” (কেন ব্বে? আমি কি চিড়িয়াখানা থেকে এসেছি?)
খেতে খেতে এর উত্তরে হেঁ হেঁ ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা। কিন্তু সমস্যা হল, আগুনে ক্ষিদের মুখে আমার আরো দুটো কাটলেট নিতে ইচ্ছে করছে। মালটা এরা বানিয়েছেও ভাল। বিরিয়ানিও খাবো। ইদিকে ছোকরা বকেই যাচ্ছে। বকেই যাচ্ছে… 😦

হঠাৎ খেয়াল হল হতচ্ছাড়া কী একটা কথা বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের জন্য।
“অ্যাঁ?” আমি শুধোই।
-বলছিলাম যে, আপনি ডিবেটে কি দেরিদা’র গ্রুপে?
আমি নঞর্থক ভাবে মুন্ডু হেলাই। মুখে কাটলেট এবং শসার কুচি।
– তবে কি নেরুদা?

শালা আমায় এখনও পর্যন্ত একটা গোটা কাটলেট খেতে দেয়নি। মনে মনে বলি, “বসন্তি, এহি হ্যায় ওহ্‌ ম্যাজিক মোমেন্ট, হিলা দে ইউপি, হিলা দে এমপি”

অতঃপর, আমি পাশের টেবিলের ওপর প্লেটটা রেখে ছোকরার চোখে চোখ রেখে বলি,
“দেখুন, দেরিদা বা তাড়াতাড়িদা কাউকেই আমি চিনিনা। ন্যাড়াদা বা নেড়ুদা বলে আমাদের পাড়ায় একজন আছেন। মদ খেয়ে রোজ রাতে বাওলামি করেন বলে ওনার বৌ ওনাকে রামক্যালান ক্যালায়। তার কথা বলছেন? সেও এখানে এসেছে নাকি? আঁখি যে আমাকে বলল এখানে সব ভাল ভাল লোকেরা আসবে…”
শেষের লাইনটা সলিলকি স্টাইলে।

বললে পেত্যয় যাবেন না, ছোকরা পুরো চল্লিশ সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আমিও পেশেন্স দেখালাম। এতখানি যখন দেরি হয়েছে খেতে আরো এক মিনিটও সই। বেয়াল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় সে “আচ্ছা, আমিও খেয়ে আসি” বলে দ্রুতপদে উধাও হল।
ধীরেসুস্থে খাওয়ার ব্যাপারটা সেরে আবার হলে’র দিকে এগোতেই দেখি সেই ছোকরা উজালাক্ষীর পাশে বসে কীসব বলছে এবং মাঝে মাঝে ভীতভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ব্যাপার সুবিধের নয় বুঝে মানে মানে কেটে পড়াই মনস্থ করলাম। ঝটপট বেরিয়ে ওলায় বসেই উজালাক্ষীকে মেসেজ করলাম, “পেট কামড়াচ্ছে, বাড়ি যাচ্ছি”।

প্রায় দশদিন হয়ে গেছে। এখনও কোন রিপ্লাই দেয়নি। সামনের মাসে ও আবার কোথায় যেন বিদেশে যাচ্ছে। চকোলেট আনবে কি-না আমার জন্য, সেই ভাবনাই আপাততঃ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে… 😥

একটি প্রখ্যাত প্রসাধনী কোম্পানি সুরবালাকে তাহাদের কিছু  মূল্যবান সামগ্রী পাঠাইয়াছেন; উদ্দেশ্য, সুরবালা যেন সে সকল ব্যবহার করিয়া নিজের মতামত জানান। সুরবালার নিজেকে প্রথমে কেমন গিনিপিগ বোধ হইতেছিল। একবার ভাবিলেন, সবসুদ্ধ ব্যাগটি সোনা হেন মুখ করিয়া কাহাকেও পাচার করিবেন এবং যা-হয় একটা কিছু মতামত লিখিবেন। কিন্তু তাহার পর তিনি “বাহুবলী” দেখিলেন, হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করিলেন এবং ঠিক করিলেন যা হয় হইবে, একবার মাখিয়া দেখাই যাক!

সুরবালার পতিদেবতাটি সুবিধের নহেন। ফাঁক পাইলেই তিনি তির্যক মন্তব্য করিয়া সুরবালার ঝাঁ… অর্থাৎ গা-পিত্তি জ্বালাইয়া থাকেন। অতএব, সুরবালা ঠিক করিলেন, যে “মুখলেপন” বা ফেসপ্যাকটি আছে, উহা সকলে ঘুমাইয়া পড়িলে রাত্রে মাখিয়া দেখিবেন।  :/

সেইমত, গতকল্য রাত্রে মৃদু “ঘুরররর- ঘোঁত” শুরু হইতেই সুরবালা সতর্কভাবে খাট হইতে নামিয়া কৌটা খুলিয়া গোময় সদৃশ অর্ধতরল পদার্থটি মুখে মাখিতে শুরু করিলেন। দেখিতে খারাপ হইলেও উহার সুবাস বেশ মনোরম, সুরবালার কষ্ট হইতেছিল না। এর পর দেখিলেন কৌটার গায়ে লেখা আছে, মুখে লেপন লাগাইয়া বসিয়া থাকিতে হইবে যতক্ষণ না উহা শুকাইয়া যায়। দীর্ঘঃশ্বাস ফেলিয়া সুরবালা খাটে বসিয়া, টেবল-বাতি জ্বালাইয়া, বহুবার পড়া “হ্যারী পটার” পুনরায় পড়িতে আরম্ভ করিলেন।

এক্ষণে হ্যারী “সাপের ভাষা সাপের শিষ” সবেমাত্র আধো আধো বলিতে ও বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছে, এমন মাহেন্দ্রক্ষণে, পতিদেব সামান্য নড়িয়াচড়িয়া উঠিলেন। মাগ্‌ল বলিয়াই হয়ত, সুরবালা ইতিমধ্যে তাহার মুখে যে লেপন রহিয়াছে, উহার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছিলেন। বেশ কয়েকবার মুখ চুলকাইয়া ফেলিবার ফলে যে বেশ সাদায়-কালোয় চিত্রবিচিত পট তাহার মুখে রচিত হইয়াছিল, সে বিষয়েও অবগত ছিলেন না।

সুতরাং,পতিদেব জল খাইবেন বলিয়া চোখ খুলিয়া পাশের টেবলে হাত বাড়াইলেন, সুরবালা বিরক্ত হইয়া নিজমুখের সম্মুখ হইতে বইটি সরাইয়া কড়া চোখে তাকাইলেন এবং……

“বাপ্‌রে, ডাইনি কোথাকার” বলিয়া পতিদেব লম্ফ দিয়া উঠিতে গিয়া জলের বোতল সহ ভূপতিত হইলেন 😦

তবে, তিনি চোট পান নাই এবং সুরবালা যথেষ্ট আমোদ পাইয়াছেন। ভাল ভাল কথা লিখিবেন প্রসাধনী সম্পর্কে, ঠিক করিয়া ফেলিয়াছেন।

gsrabani51_pic

ঠিক কীভাবে যে গাড়িটা স্কিড করেছিল ঠিকঠাক মনে করতে পারেনা কিছুতেই রচনা। পেছন পেছন আসা ট্রাকটার ওপর বোঝাই করা মাল ত্রিপল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা, ওপরে বসে আছে কয়েকজন ছোকরা গোছের খালাসী। মাঝেমধ্যেই তারা  সরস যৌনগন্ধী টিপ্পনী ছুঁড়ে দিচ্ছিল রচনাদের উদ্দেশ্যে। সেগুলো সব শোনা বা বোঝা না গেলেও অঙ্গভঙ্গি বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না দুজনের কারোরই।  মেজাজ হারাচ্ছিল অভি, রচনা কড়া চোখের ইশারায় বারণ করছিল রিঅ্যাক্ট করতে। দিনকাল ভাল নয়, কোত্থেকে কী হয় বলা যায়না…সন্ধ্যার ঝোঁকে এইসব রাস্তা, হাইওয়ে কানেক্টর বলা যায়,  খুব একটা ব্যস্ত নয়। হুশহাশ গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ কারো সাহায্যের জন্য দাঁড়াবে এমন ভাবার কোন কারণ নেই।

আসানসোল থেকে বেরোতেই দেরী হয়ে গিয়েছিল ওদের। রাতের আগেই কলকাতা ঢুকবে বলে অভি চালাচ্ছিলও বেশ ভাল স্পীডে, আর, আশ্চর্যজনকভাবে ট্রাকটা যেন ওদের ওভারটেক করতেই চাইছিল না।  এই রাস্তায় এভাবে ট্রাকের মাথায় বসে থাকা যথেষ্ট বিপজ্জনক- এই বোধও কী নেই ওদের! অভি দু-একবার সামান্য স্লো করে ইশারা করলেও পাত্তা দেয়নি ড্রাইভার। হাল ছেড়ে দিয়ে অভি যথাসম্ভব স্পীড তুলেছিল। হঠাৎ একটা বাঁকের পরেই আলো-ঝলমলে একটা ধাবা দেখে আচমকা ব্রেক কষেছিল, প্রায় পরক্ষণেই বিকট স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ আওয়াজ তুলে ওদের নীলরঙা ওয়াগনারের রঙ চটিয়ে সেটাকে প্রায় উলটে দিয়ে সামনের বিরাট গাছটাতে ধাক্কা মেরেছিল ট্রাকটা। রচনা ওই স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ অবধি মনে করতে পারে সব…তারপর অন্ধকার।

নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফেরার দুদিন পরে অভি বলেছিল ঘটনাটা। গাছে ধাক্কার অভিঘাতে উপরে বসা তিনজনই ছিট্‌কে পড়েছিল রাস্তায় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছন পেছন আসা আরেকটা লরী পিষে ফেলে ওদের।

“তুমি কি ইচ্ছে করেই ওভাবে ব্রেক কষেছিলে, অভি?”
আকুল স্বরে করা রচনার প্রশ্নটা শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল অভি।

“পাগল হয়ে গেছ নাকি? মানুষ খুন করেছি বলতে চাও? পুলিশ ইনভেস্টিগেশন হয়নি?… একশো আটরকম কথার জবাব দিতে হয়েছে…যারা ওখানে ছিল প্রত্যেকেই বলেছে দোষ ট্রাকটার…আর এখন কিনা তোমার কাছে এইসব আজগুবি কথা শুনতে হচ্ছে!!”

“কিন্তু…কিন্তু…তিনজন মারা গেছে… আর যে পেছনে ছিল? তার কী হল? বাঁচেনি না?”

হাঁ করে দু-সেকেন্ড রচনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অভি ধীরে ধীরে বলে,
“আর কেউ ছিলনা ওপরে, তিনজন; ড্রাইভার আর তার পাশে আরেকজন ছিল, তারা সাঙ্ঘাতিক ইঞ্জিওর্ড”

“কী বলছো কী! আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম যখন ট্রাকটা আমাদের গাড়ির গা ঘেঁষে ছেঁচড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পেছনে আরেকজন ছিল… কালো রঙের জামা-প্যান্ট, সাথে একটা কুকুর, সেটাও কালো রঙ…লাল জিভ বের করে পা চাটছিল… লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে হাত নাড়ল…”

“স্টপ ইট, প্লীজ। তোমার এইসব গালগল্প শোনার মানসিকতা নেই আমার… ট্রমা আমারও আছে, রচনা, কিন্তু তাই বলে তোমার মতন মাথা খারাপ হয়ে যায়নি আমার…আই জাস্ট কান্ট টেক এনি মোর অভ দিস্‌ বুলশীট”

সেই শুরু।

*******

মাস সাতেক পর, রচনার ছোটকাকার পঁচাত্তর বছরের জন্মদিন খুব বড় করে পালন করা হবে বলে ওরা সব ভাইবোনেরা মিলে ডিসিশন নিল। এই কাকা অবিবাহিত, ভাইপো-ভাইঝিদের বড়ই প্রিয় এবং আদরের। ্সকাল থেকেই বাপের বাড়িতে রচনা। হই-হুল্লোড়, আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়ার দাপটে সাত মাস আগে ঘটে যাওয়া ভয়ানক স্মৃতিটা মন থেকে ব্লটিং পেপার দিয়ে কেউ শুষে নিয়েছে যেন। অভিও দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে খুড়শ্বশুরের সঙ্গে বিয়ার নিয়ে বসে হাল্কা রসিকতা করে চলেছে…অন্যান্য জামাই, শালারাও সঙ্গে যোগ দিয়েছে। মাঝে মাঝেই ছোটকাকার উদাত্ত হা-হা হাসির আওয়াজ ভেসে  আসছে দোতলার  হল থেকে। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে রচনা ছুটল সদর দরজা খুলতে।

বড়পিসি বাতের ব্যথায় কেঁপেঝেঁপেও এসে হাজির হয়েছে। কত্তদিন বাদে দেখা…জড়িয়ে ধরে রচনা পিসিকে।

ঠিক সেই সময়েই চোখে পড়ে সদর দরজার উল্টোদিকের পাঁচিলে বসা লোকটাকে।

কালো রঙের জামা-প্যান্ট, সাথে একটা কালো কুকুর… লাল জিভ বের করল না কুকুরটা?…পা-টা কি চাটছে? লোকটা হাসছে…হাতটা নাড়বে বলে ওঠাচ্ছে … পিসির গায়ের ওপরেই এলিয়ে পড়ে রচনা।

..আবার অন্ধকার… আবার নার্সিংহোম।

তবে এবার আর একা ফেরা নয়, সঙ্গে ছিল ছোটকাকার বডি। পিসির আর্তনাদ শুনে হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা স্লিপ করে যায় কাকার…ইন্ট্যারন্যাল হেমারেজ… কয়েক ঘন্টায় সব শেষ।

*******

অনেক চেষ্টা করেও অভিকে ঘটনাটা বলে উঠতে পারেনি রচনা। জানে যে, বিশ্বাস করবেনা, শুধু শুধু ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি…আজকাল একদম পারেনা এসব চাপ নিতে সে…

তিন দিন আগে, পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস দেশাইয়ের ছেলের বাচ্চা হয়েছে শুনে দেখা করতে গেছিল। মিষ্টি, ফুট্‌ফুটে একটা পুতুল যেন মেয়েটা। খোলা জানালা দিয়ে সটান চোখ গেল সামনের ব্যালকনিতে।

আবার… মৃদু হাসল বোধহয়…কুকুরটা লোলুপ লোল জিহ্বা বের করে তাকিয়ে আছে।

ঝট্‌ করে চোখটা সরিয়ে নেয়… কিন্তু জানত কী হবে।

বাচ্চাটা দু-দিন পরে মারা গেল। টাইফয়েড হয়েছিল নাকি… বোঝা যায়নি।

********

অভি প্রথমে কোন কথাই বললনা কিছুক্ষণ। মাথা নীচু করে কিছু ভাবছিল। যখন মুখ তুলল, তখন দু-চোখে মায়া মাখানো।
“আমায় ভুল বুঝোনা প্লিজ, কিন্তু তুমি বুঝতে পারছনা কী সাঙ্ঘাতিক একটা মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে তুমি যাচ্ছ। আমি জানি রচনা, এই ধরণের অ্যাকসিডেন্টের পর অনেক সময়েই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে… আর তুমি তো কিছু বুঝতেই দাওনি কখনো…শুধু কয়েকবার ব্ল্যাক-আউট…যাইহোক, আমি কালই ডক্টর সোমের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করছি, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে…কিছু ভেবোনা,সোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে।” হালকা করে একটা চুমু খায় অভি রচনার ভেজা গালে।

“আমি পাগল নই, অভি! মানসিক রোগ হয়নি আমার। আমি যা তোমাকে বললাম সব বর্ণে বর্ণে সত্যি। কীকরে বোঝাবো তোমাকে…লোকটা আসে, প্রতিবার, আমি জানি কিছু একটা ভয়ানক অমঙ্গল নিয়ে আসে ও…”

দুজনেই দুজনকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে চলে… শব্দ-প্রতিশব্দরা দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরতে থাকে, ঘুরতেই থাকে। তারপর একসময় প্রবল বিস্ফোরণে আছড়ে পড়ে। মাথার ভেতর প্রতিটি শব্দ বিস্ফোরণে ছিটকে আসা লোহার টুকরো…গেঁথে যেতে থাকে রচনার মগজে… শিরায়-উপশিরায়।

“পাগল, তুমি পাগল…মানসিক রোগী তুমি”

*********

গতকাল রাত্রে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে কখন যেন। টের পায়নি রচনা। এত ঘুম ঘুমোয় ও আজকাল যে কিছু টের পায়না। স্বপ্নও দেখেনা। কোথাও বেরোতে ভয় পায়। অভির সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ বললেই চলে। ডাক্তার দেখায়নি ও। কেন দ্যাখাবে? সব সত্যি, ও জানে…

তবুও আজ সকালটা অন্যরকম লাগছিল। অসময়ের বৃষ্টির ঝাপ্‌টায় বারান্দার গাছগুলো ভিজে চুপ্পুস। ইস্‌, জেগে থাকলে ও-ও দেখতে পেত, জলের ঝরোখার ওপারে ভিজতে থাকা  গাছগুলোর আনন্দ।  বহুদিন পরে হঠাৎ যেন বড় বেশী করে বাইরে বেরোতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ। বলবে কি অভিকে তাড়াতাড়ি আসতে?

ঘোরটা কেটে যায় অভির গলার আওয়াজে। আজকাল আর বাড়িতে ব্রেকফাস্ট করেনা অভি, বাইরেই খেয়ে নেয়। শুধু বেরোনর আগে নিয়ম করে একটা কথা রোজ জিজ্ঞেস করে…আজও সেটাই বলছে।

“যাবে একবার ডক্টর সোমের কাছে? প্লীজ?”

দমকা হাওয়ায় টবের গোলাপ গাছটা দুলে ওঠে, দু-ফোঁটা জল ঢেলে দিয়ে যায় আদর করে হাতের ওপর। অভিকে চূড়ান্ত হতবাক করে মাথা নাড়ে রচনা, যাবে।

হতভম্ব হয়ে কোন কথা না বলে রচনাকে  শুধু জড়িয়ে ধরে অভি; “রেডি হয়ে থেকো, ঠিক ছ’টা।”

আজ অনেকদিন পরে অভির যাওয়ার সময় সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ঠিক হয়ে যাবে সব, মনে মনে বলে সে।
ওই তো অভি গাড়ি বের করছে। বসলো স্টিয়ারিঙে…  হাত নাড়ছে হাসিমুখে।

অপস্রিয়মাণ গাড়িটার দিকে তাকাতে ঠিক তখনই…

পেছনে কালো জামা, কালো প্যান্ট পরা কে ও!

পাগলের মতন বেড্রুমে গিয়ে মোবাইলে অভির নাম্বার ডায়াল করে সে…আটকাতেই হবে অভিকে…

সামনে টেবিলে পড়ে থাকা অভির মোবাইলের রিংটোন ছাপিয়েও কানে আসে অনেক লোকের গলার আওয়াজ…অ-নে-ক  লো-ক… আর বীভৎস স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ…।

zulfiqar-trailer-review-3_147211421562

#Zulfiqar

প্রথমেই বলা দরকার, যে বাংলা সিনেমা আমি দস্তুরমতন গ্যাঁটের কড়ি খচ্চা করে দেখে থাকি। কারণ, সেই যে আপ্তবাক্য; বাঙালি কে বাঙালি না দেখিলে আর কে দেখিবে! সুতরাং “জুলফিকর” যে দেখবো সেটা ঠিক করাই ছিল।

দেখে-টেখে ফিরে এসেছি। মন-মেজাজ অতীব প্রফুল্ল এমনটা বলা যায়না। তার কারণ এটাও হতে পারে, পেপ্‌সিটা তেমন ঠান্ডা ছিলনা, ইদিকে এসির ঠান্ডায় প্রায় জমে যাওয়ার দশা। যাইহোক, ভ্যানতাড়া ছেড়ে কাজের কথায় আসা যাক। “জুলফিকর” সম্বন্ধে আমার সামান্য দু-পয়সা…

#১ সিনেমা শুরু হয় টোনি অর্থাৎ পরমব্রতর (অ্যাজ অ্যান্টনি) হসপিটালে শুয়ে থাকার দৃশ্য দিয়ে। সেখানে অঙ্কুশ (অ্যাজ অক্টাভিয়াস সিজার) এবং রাহুল ( অ্যাজ লেপিডাস) উপস্থিত। সিনেমাতে প্রথমজন ব্যান্ডের গান গাওয়া ভাইপো থেকে ডনে পরিণত হয়েছে এবং দ্বিতীয়জন পুলিশ। ফুড-চেইন বিষয়ক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা চলে। হঠাৎ করে মনে হতে পারে পোর্ট এরিয়ার ডন বা পুলিশ নয়, বেশ আঁতেল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এসে পড়েছি। -_-

#২ টোনি ইংরেজি ছাড়া কথা কয় না বললেই হয়। সেটা আশ্চর্য ব্যাপার নয় তেমন, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল যে সীজারের খুনের পর অ্যান্টনি’র সেই বিখ্যাত sarcastic speech এখানে প্রায় circustic মনে হয় যখন আমজনতার সামনেও টোনি ইঞ্জিরি তেই বকে যায় এবং,  অহো শিক্ষাব্যবস্থা (!) তারা দিব্য সব বুঝতে পারে :/

#৩ নুসরত জাহানের কিছু করার ছিলনা। শুধু সারাক্ষণ ম্যাচিং স্লিভ্লেস ব্লাউজের সঙ্গে শিফন শাড়ি পরে এদিক-ওদিক তাকানো বা এর-তার সঙ্গে শুয়ে পড়া ছাড়া। শোয়া মানে জাস্ট শোয়াই, অন্য কিছু না।
পাওলি’র কেস টা ঠিক বোধগম্য হয়নি প্রথম থেকে শেষ অবধি। কিছু একটা মানসিক রোগ আছে এটা বোঝা যাচ্ছিল কিন্তু কেন যে তার অ্যাটাক শুধু পোসেঞ্জিত মানে জুল্‌ফিদা থাকাকালীন-ই হয়, সেটা বোঝা গেলনা। আর অত্ত বড় ডনের বাড়িতে আর কেউ নেই গো যে অভাগী বউ টাকে একটু দেখাশোনা করে… 😥
জুন মাল্য’র আরোই কিছু করার ছিলনা, বেশ কষ্টই হল ওনার জন্য। 😦

#৪ কৌশিক সেন বশির বা ব্রুটাস হিসেবে দিব্যি; শুধু যদি গলার স্বর টা অ্যাস্থমা রোগীর মতন না করার চেষ্টা করতেন, ভাল লাগত। “রাজকাহিনী”র ঋতুপর্ণা’র মেল ভার্সন আর কি।

#৫ ক্যাসিয়াস বা কাশীনাথ হিসেবে যীশুকে বেশ ভাল লেগেছে। সত্যি কথা বলতে কি, হল-এ তিনবার হাততালি পড়েছে, প্রথমবার, যখন দেবরূপী মার্কাসের এন্ট্রি হয়, দ্বিতীয়বার, যখন কাশীনাথ বলে, “আমার কপালে কী লেখা আছে বলে মনে হয়? বোকাচোদা?” (I’m really disappointed, একটা বিসি শুনে হাত্তালি :/ ) এবং শেষবার, যখন ভূতরূপী জুলফিকর যুদ্ধশেষে দ্যাখা দ্যান। এখানে কেন জনতা হাত্তালি দিল, মাইরি বুঝিনি… :/

#৬ একটা জিনিস বোঝা গেল, দেব ইজ দেব, দ্য বস্‌! মাক্কালীর দিব্যি, এতটুকু বাড়িয়ে বলছিনা, আমারও দারুণ লেগেছে ❤ :* ও হ্যাঁ, বলেছি কী, যে, এখানে দেবের কোন ডায়ালগ নেই, চরিত্রটি কথা বলতে পারেনা। তবে এর সঙ্গে আমার ভাললাগার যোগসূত্র খুঁজবেন না প্লীজ। শুধু লুক্‌স বিচার করলে, দেব-ই বেস্ট। সে বাকি পথ, রথ, মূর্তি, যতই ভাবুক “আমি দেব”… অন্তর্যামী মুচকি হাসবেন।

#৭ কয়েকটা দৃশ্যায়ণ বেশ লেগেছে। খিদিরপুরের ক্যান্টিলিভার ব্রিজের ঠিক জোড়টায় দেব এবং নুসরতের দাঁড়িয়ে থাকা তাদের সম্পর্কের ভঙ্গুরতা কে খুব subtle ভাবে বোঝায়। বা বশিরের গলার ইন-ইয়াং লকেট বা মাইকের গায়ে “বাঁশ” লেখা- এগুলি বেশ ইঙ্গিতবাহী।

আরো দু-একটা জিনিস না বললেই নয়, সেটা হল, কিছু ঐতিহাসিকের মতে, অ্যান্টনি আর ক্লিওপ্যাট্রা ঈজিপ্টে অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করাকালীন একটি সোসাইটি গঠন করেছিলেন, Inimitable Livers নামে, হয়ত সেটা মনে রেখেই এখানে রানী তলাপাত্ররূপী নুসরতের (হ্যাঁ, উনিই ক্লিওপ্যাট্রা  😥 ) বার-এর উপস্থাপনা।

শেষটা অসম্ভব প্রেডিক্টেবল…যা যা হবে বলে ভাবছিলাম, তাই তাই হয়েছে। এখন আপনার ভাবনার সঙ্গে সেই সেই ভাবনা মেলে কি-না সেটা জানার জন্যেও একবার অন্ততঃ দেখতেই পারেন সিনেমাটা :3

পুঃ- সেন্সর এটাকে এ-মার্কা বলে সার্টিফাই করেছে, ইন্টারনেটে টিকিট কাটতে গেলেও ডিক্লারেশন দিতে হচ্ছে বয়সের, সুতরাং অবধারিত ভাবেই হলে প্রায় 40% ছেলেমেয়েকে দেখে গাল টিপলে দুধ বেরোবে মনে হল ঢোকার সময়। বেরোনোর সময় সেই মুখগুলোয় যে হতাশা, ক্রোধ এবং প্রতিশোধমূলক ভাব দেখলাম… সত্যি বলছি, চোখে জল এসে যাচ্ছিল… 😥 বেচারারা… পুজোর পকেট্মানি থেকে টাকা দিয়ে টিকিট কেটে…  বাচ্চা বলে কি মানুষ না… সাধ-আহ্লাদ থাকতে নেই গো…