Archive for the ‘ছন্দের কারিকুরি’ Category

আয়না’র সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে মুখ ভ্যাংচালে বেশ আমোদ পাওয়া যায়। এছাড়া, মুখভর্তি জল নিয়ে টিপ করে পাশের বাড়ি’র দেওয়ালে বা টিকটিকি’র গায়ে, এসব-ও আমি করে থাকি। একটা প্রশ্ন মাঝে মাঝেই মনে হয়, আমার মাথায় ছিট্‌ আছে কিনা :/ লোকে মুখের উপর বলেনা, ভয় পায় হয়ত, যদি কামড়ে দিই, কিন্তু আমার কেমন সন্দেহ হয়, মনে মনে ভাবে। একমাত্র, পুত্র চরম বিশ্বাসঘাতকে’র মত মাঝেই মাঝেই বলে “পাগল না কী!” এই ক’দিন আগে যে ভয়ানক ঝড় হল, সেদিন আমি হাতে ছাতা এবং পকেটে পয়সা থাকা সত্ত্বে-ও ভিজে ভিজে, খানিক ডালপালা কুড়িয়ে বাড়ি ফিরলাম, সেদিন পতিদেব-ও আমি উপুড়চুপুড় ভিজে ঘরে ঢোকামাত্র-ই “পাগ…” অবধি বলে, তারপর আমার জ্বলন্ত চক্ষুযুগল দেখে, সামলে নিয়েছিলেন। এই ইয়েদের কে বোঝাবে যে বিষ্টি গায়ে মাখতে কী ভাল যে লাগে! বাড়িতে এসে একটু গরম জল দিয়ে চান করে নিলে-ই আর সর্দিকাশির ভয় নেই O:)

আরেকটা ব্যাপার আছে; আমি, শুকনো ডালপালা, পাতা, কুটি কুটি ছেত্‌রে যাওয়া ফুল— এসবের শুধু ছবি তুলি তাই না, ঘরে এনে জমিয়ে-ও রাখি। এর ফলে, রাস্তা’র র‍্যান্ডম লোকজন-ও আমার দিকে মাঝে মাঝে খুব সন্দেহের চোখে তাকায় 😦  একবার একটা জংলা মতন জায়গায় দাঁড়িয়ে ভর-দুপুরবেলায় শুকনো পাতা’র ছবি তুলছিলাম, একটা আপদ রামছাগল (সত্যিকারের চারপেয়ে, দুপেয়ে না) কোত্থেকে এসে প্রায় গুঁতিয়ে দিচ্ছিল 😡 ব্যাটা ওই শুকনো পাতা চিবাবে! সাধে কী বলে, ছাগলে কী না খায়।

এই ব্লগে আমি ছবি-টবি বিশেষ দিই না, এবার কয়েকটা ছবি এখানে রইল…

1-shanti 317

বটফল

1-shanti 360

পাতা যখন ফুল!

1-pedong 007

শুকনো পাতা’র উজ্জ্বল রঙ

1-014

বাঁশে’র গায়ে গজিয়ে ওঠা ছত্রাক

1-033

কিছুমিছু

 

Advertisements

আপেল, আপেল

Posted: ডিসেম্বর 11, 2017 in ছন্দের কারিকুরি

হঠাৎ মনে হল আপেল জিনিসটা বেশ গোলমেলে। সেই কোন যুগে ইভ্‌ নাম্নী এক অতি-কৌতূহলী মহিলা  তার অভাবনীয়-সরল সঙ্গীকে এই আপেল-ফাপেল খাইয়েই যাবতীয় ঝামেলা শুরু করেছিল। তারপর নিউটন একদিন আপেলগাছের তলায় শুয়ে শুয়ে আকাশপাতাল ভাবছিল কী করে সব জিনিস নিম্নগামী হয়। আমার কেমন জানি মনে হয় ব্যাটা বাঙালি ছিল :/ নয়ত যাবতীয় জিনিসকে এভাবে টেনে নীচে নামানোর কথা ভাবতে পারতোনা (পান ইন্টেন্ডেড) আবার দেখুন, কেমন সেয়ানা মাল, বেল গাছ বা নারকেল গাছের নীচে বসেনি, জানে, কীভাবে সেফ খেলতে হয়।

সে যাইহোক, হচ্ছিল আপেলের কথা। তা, আপেল বলতে গেলে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইন ফ্যাক্ট, “মানুষ” হওয়ার প্রথম পাঠ শুরু হয় আপেল দিয়ে; এ ফর অ্যাপল…

এ ছাড়া,  একটা আধখাওয়া আপেল-ই আজ ধনী-দরিদ্র’র মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে তুলেছে। সুতরাং, আর্থ-সামাজিক দিক থেকেও এর একটা বিশাল অবদান রয়েছে। সবাই রোজ একটা করে আপেল খেলে ডাক্তাররা না খেতে পেয়ে মারা যাবেন, এরকম ইঙ্গিত-ও পাওয়া যায় পুরনো প্রবাদে। আপেল ছাড়া আর কোন ফল মানুষের অগ্রগতির ইতিহাসে এরকম সুস্পষ্ট ছাপ ফেলতে পারেনি।

কালীপুজোয় ভাসান যাচ্ছে সেই রবিবার থেকে। একটা কাজে গতকাল সন্ধ্যেবেলায় বেরোতে হয়েছিল, তা দেখি দু-পা অন্তত অন্তর ঠাকুর আর ভাসান। তা, পুজো যখন হয়েছে, ভাসান-ও হবে, সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু মাইরি, এ  পুরো একটা  আউট অভ দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাপার মনে হচ্ছিল!

একটা ভ্যান বা চারশো সাত; তার পেছনে  মিনিমাম পঞ্চাশজন বিভিন্ন বয়সের মানুষ, তার সামনে গোটা পাঁচ-ছয় ঢাকী, ভ্যাঁপ্পোর ভোঁ ভ্যাঁপ্পোর ভোঁ করতে থাকা আরেকটা দল, যারা মার্চ করার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা, সঙ্গে তাসা পার্টি– যারা আবার অ-নে-ক সামনে থাকায় ঠিক কোন পাড়ার পুজোর সঙ্গে এসেছে বা কী বাজাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছেনা। এবার, প্রত্যেকটা দলে দশ-বারো জন আছে যারা নাচছে! তান্ডব + মোহিনীআট্যম + নাগিন ড্যান্স = ভাসান নাচ। তার মধ্যে আবার সারা মুখ সিঁদুরে মাখামাখি, সীতা-সাবিত্রী কে বলে সাইড হয়ে যা– এমন অবস্থা।  মাঝে মাঝে কোথা থেকে একজন চিমড়েমার্কা লোক এসে নাচুড়েদের (এরকম শব্দ হয়না কিন্তু এদের দেখে এটাই মনে এল) মুখে সন্দেশ গুঁজে দিচ্ছে। সাইড দিয়ে যাওয়ার সময় বাংলা এবং  বিদেশি, দুইয়ের গন্ধই পাওয়া যাচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট, আলাদা করা যাচ্ছেনা, মিলেমিশে একটা বেশ সাররিয়াল গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে।

দু-তিনজন পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক “অ্যাই, দিদিদের যেতে দে”, ” ন্না ন্না, দ্দাদা, এখন বাইক নিয়ে যাওয়া যাবেনা, ওই ডানদিকের গলি দিয়ে যান” ইত্যাদি বলছেন। নিষেধাজ্ঞার মা-মাসি করে দুমাদ্দুম বোম ফাটছে এবং কিছু উব্যার- ন্যাকা মামণি সেই শব্দে অস্কার পাওয়ার মতন করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিনয় করছে। একজন পুলিশকাকুকে দেখতে পেলাম, বেশ খারাপ লাগলো অসহায় মুখটা দেখে। যাইহোক, আমায় গম্ভীর মুখে ছবি তুলতে দেখে আমার সামনে এসে কয়েকজন নৃত্য প্রদর্শন করলো, আমিও তাদের ছবি তুলছি এমন ভাব দেখালাম তারপর, “দেখি ওপাশ থেকে ছবি তুলবো” বলতেই তারা তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে আমায় রাস্তা পেরোতে দিল। নইলে আরো দশ মিনিট ওখানেই হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। সবই মায়ের লীলা! রাস্তা পেরিয়ে পাশের গলিতে গিয়ে দই- ফুচকা খেলাম, আসলে, ওটাই কাজ ছিল, ওর জন্যেই বেরিয়েছিলাম …হেঁ হেঁ…খাওয়াই সব রে পাগলা!

“মিসোজিনি” বা নারীবিদ্বেষ জিনিসটা এতটাই পুরনো, এতটাই গভীরে প্রোথিত তার শিকড়, যে, কখন কীভাবে আমরা না চেয়েও এটাকে উৎসাহ দিয়ে ফেলি, তা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারিনা। কিছু কিছু মানুষ আছেন, ঘোরতরভাবে বিশ্বাস করেন মহিলারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, শুধু দুনিয়ার শোভাবর্ধন, পুরুষের অঙ্কশায়িনী এবং সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্যই তাদের সৃষ্টি। এঁদের নিয়ে তেমন সমস্যা হয়না। এনারা নিয়মিতভাবে মহিলাদের হেয় করে হোয়াট্‌স অ্যাপে ‘জোক’ শেয়ার করেন, ট্রামে-বাসে কোন মহিলা অসুবিধেয় পড়েছে দেখলে প্রভূত মানসিক আনন্দ লাভ করেন, কর্মক্ষেত্রে মহিলা সহকর্মীদের সাজপোশাক, চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে প্রায় অর্গ্যাজমিক তৃপ্তি পান এবং বাড়িতে ফেরার আগে বৌ-এর দেওয়া লিস্টি মিলিয়ে বাজারহাট সেরে ত্রস্তপদে ঘরে ঢোকেন।

কিছু পুরুষ আছেন, যাঁরা সত্যি সত্যিই নারীকে পাশেপাশে দেখতে চান; সহকারী এবং বন্ধুরূপে। আর, বেশ কিছু আছেন, তাঁরা “আহা, ছাড় দিকি, মেয়ে তো” সুলভ দার্শনিকতা নিয়ে স্মিত হাসি হাসেন সবেতেই। সত্যি বলতে কী, সমস্যা সেরকম কোনকিছু নিয়েই নেই। তবুও চুলকানি হয় মাঝে মাঝে আমার মতন কিছু পাগলাইয়ে লোকের যখন, যেদিকে চোখ ফেরাই, সর্বত্রই দেখি কী অমায়িকভাবে,কখনও ঝলমলে বিজ্ঞাপনের মোড়কে, কখনও বা সুপারডুপার হিট সিনেমার ততোধিক হিট সংলাপের আড়ালে মোলায়েমভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে সমাজে তথা পৃথিবীতে, পুরুষতন্ত্রই শেষ কথা বলে আসছে।

“দিলওয়ালে দুল্‌হনিয়া লে জায়েঙ্গে” ছবির সেই দৃশ্যটার কথা মনে আছে? যেখানে রাজরূপী শাহ্‌রুখের বাবা অনুপম খের বলছেন, “বেটা, দুল্‌হন তো উসিকি হোতা হ্যায় যো উসে উঠাকে ডোলি মেঁ বৈঠাতা হ্যায়”। (যে ‘দুল্‌হন” সেজেছে তার মর্জি, ইচ্ছে-অনিচ্ছের ১০৮!) বা “থ্রী ইডিয়টস” ছবিতে চতুরের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা? ধর্ষণ ব্যাপারটাকে যে এতখানি ট্রিভিয়ালাইজ করা যায় মাইরি ভাবতে পারিনি! অথচ মজার ব্যাপার হল, এই দুটো (এ দুটো ছবি সকলেই দেখেছেন প্রায়, তাই উল্লেখ করলাম)  এবং এই ধরণের আরো কয়েক কোটি জিনিস কিন্তু আমরা দেখেছি, হেসেছি এবং উপভোগ করেছি (ভবিষ্যতেও করবো) এবং ঠিক যেমনভাবে ভিকি না জেনে অমেত্ত ভেবে মার্জারিন খেতো, ঠিক সেইভাবেই নারীবিদ্বেষকে নিজের অজান্তেই প্রোমোট করে ফেলেছি।

ধর্ম ব্যাপারটাও অনেকটা এরকমই। কোথায়, কীভাবে যে আপনার মনে নিজের ধর্মের প্রতি একটা আনুগত্য রয়ে গেছে, আপনি নিজেই বুঝবেন না। Religion শব্দের ইটিমোলজি, রোমান ব্যাকরণবিশারদ সার্ভিয়াসের মতে, এসেছে ল্যাটিন religare থেকে, যার নিকটতম অর্থ হল, ”to bind”। এই বন্ধনে আমি, আপনি কেউ সাধ করে আবদ্ধ হইনি, জন্মসূত্রেই হতে হয়েছে। কথা হল, চাইলেই উপবীত বা শাখা-সিঁদুরের মতন একে বর্জন করা যায়না। মানে, অবশ্যই করা যায়, কিন্তু নিজের কাছে কখনও না কখনও ঠিক ধরা পড়ে যেতে হয়। কারণ,  ধর্মহীন হতে  গেলে নিজের এবং পরিবারে দীর্ঘকাল ধরে  চলে-আসা আচারবিচার, উৎসব এবং বিভিন্ন সম্পর্ক গুলোকেও একেবারে মনের গভীর থেকে উপড়ে ফেলতে হয়, সেটা কেউ পারে বলে মনে হয়না। আমি নিজেও অনেক চেষ্টা করেছি, কা কস্য পরিবেদনা।

সুতরাং, ভড়ং দেখিয়ে আর বলতে পারিনা যে আমি সেক্যুলার। আমি আমার ধর্মকে (যদিও, হিন্দুত্ব ঠিক ধর্ম নয়, একটা জীবনযাত্রা) শ্রদ্ধা করি এবং সেই সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষদেরও সমান সম্মান করি। কেউ বিপদে পড়েছে দেখলে, আমি তাকে আগে সাহায্য করবো তার ধর্ম জিজ্ঞেস না করেই। আমার শিক্ষা এবং মূল্যবোধ তাই বলে। ধর্ম নিয়ে ভ্যাজর ভ্যাজর তাই অসহ্য লাগে। কোন বিশেষ খাদ্যাভ্যাস নিয়েও আমার কোন মাথাব্যথা নেই। ভাল করে রান্না করে ডেকে খাওয়ালে সবই খাই (ফলিডল ছাড়া)।

ও, হ্যাঁ, আরেকটা কথা। ধরুন আপনাকে কেউ বিনা কারণে অপমান করলো বা ঠাস্‌ করে একটা চড় কষালো, আপনি কি ছেড়ে দেবেন? দিতেও পারেন, সেটা আপনার অভিরুচি। আমি দিইনা। আমি যেকোন মন্তব্য, যেকোন মতবাদ, যেকোন মানুষকে খোলা মনেই গ্রহণ করি এবং তাকে যোগ্য সম্মান এবং সমাদর দেওয়ার চেষ্টা করি। সেই ব্যবহার তার থেকেও আশা করাটা অন্যায় নয় নিশ্চয়ই। মানে, মোদ্দা কথা, গান্ধীজির এক গালে চড় খেয়ে আরেক গাল এগিয়ে দেওয়াতে বিশ্বাস করিনা। সব ধর্মই সমান; আমার ধর্ম নিয়ে যদি কারো ফালতু মাথাব্যথা না থাকে, আমারও তারটা নিয়ে বিন্দুমাত্র নেই। অন্যথা হলে… আছে। 🙂

এই লেখা পড়ে বেশ কিছু লোক মনে মনে উদ্‌মা খিস্তি এবং প্রকাশ্যে ছিছিক্কার দিয়ে আমাকে আনফ্রেন্ড  বা আনফলো করবেন, এই আশা রাখি। 😑

তোমাকে বাড়ি বলে ডাকবো।
আমার বাড়ি, আমার নিজস্ব আস্তানা
যেখানে যেতে, অনেক পথ পেরিয়েও,
একটুও কষ্ট হয়না আমার।
যেখানে, সমস্ত অপূর্ণতা আমার
স্বচ্ছ, সুন্দর হয়ে ওঠে।
যেখানে, বেতাল সুরে সুর মিলিয়ে
জীবন মুচকি হাসে।
তোমাকে বাড়ি বলে ডাকবো, কেমন?