Archive for the ‘ছন্দের কারিকুরি’ Category

“মিসোজিনি” বা নারীবিদ্বেষ জিনিসটা এতটাই পুরনো, এতটাই গভীরে প্রোথিত তার শিকড়, যে, কখন কীভাবে আমরা না চেয়েও এটাকে উৎসাহ দিয়ে ফেলি, তা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারিনা। কিছু কিছু মানুষ আছেন, ঘোরতরভাবে বিশ্বাস করেন মহিলারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, শুধু দুনিয়ার শোভাবর্ধন, পুরুষের অঙ্কশায়িনী এবং সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্যই তাদের সৃষ্টি। এঁদের নিয়ে তেমন সমস্যা হয়না। এনারা নিয়মিতভাবে মহিলাদের হেয় করে হোয়াট্‌স অ্যাপে ‘জোক’ শেয়ার করেন, ট্রামে-বাসে কোন মহিলা অসুবিধেয় পড়েছে দেখলে প্রভূত মানসিক আনন্দ লাভ করেন, কর্মক্ষেত্রে মহিলা সহকর্মীদের সাজপোশাক, চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে প্রায় অর্গ্যাজমিক তৃপ্তি পান এবং বাড়িতে ফেরার আগে বৌ-এর দেওয়া লিস্টি মিলিয়ে বাজারহাট সেরে ত্রস্তপদে ঘরে ঢোকেন।

কিছু পুরুষ আছেন, যাঁরা সত্যি সত্যিই নারীকে পাশেপাশে দেখতে চান; সহকারী এবং বন্ধুরূপে। আর, বেশ কিছু আছেন, তাঁরা “আহা, ছাড় দিকি, মেয়ে তো” সুলভ দার্শনিকতা নিয়ে স্মিত হাসি হাসেন সবেতেই। সত্যি বলতে কী, সমস্যা সেরকম কোনকিছু নিয়েই নেই। তবুও চুলকানি হয় মাঝে মাঝে আমার মতন কিছু পাগলাইয়ে লোকের যখন, যেদিকে চোখ ফেরাই, সর্বত্রই দেখি কী অমায়িকভাবে,কখনও ঝলমলে বিজ্ঞাপনের মোড়কে, কখনও বা সুপারডুপার হিট সিনেমার ততোধিক হিট সংলাপের আড়ালে মোলায়েমভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে সমাজে তথা পৃথিবীতে, পুরুষতন্ত্রই শেষ কথা বলে আসছে।

“দিলওয়ালে দুল্‌হনিয়া লে জায়েঙ্গে” ছবির সেই দৃশ্যটার কথা মনে আছে? যেখানে রাজরূপী শাহ্‌রুখের বাবা অনুপম খের বলছেন, “বেটা, দুল্‌হন তো উসিকি হোতা হ্যায় যো উসে উঠাকে ডোলি মেঁ বৈঠাতা হ্যায়”। (যে ‘দুল্‌হন” সেজেছে তার মর্জি, ইচ্ছে-অনিচ্ছের ১০৮!) বা “থ্রী ইডিয়টস” ছবিতে চতুরের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা? ধর্ষণ ব্যাপারটাকে যে এতখানি ট্রিভিয়ালাইজ করা যায় মাইরি ভাবতে পারিনি! অথচ মজার ব্যাপার হল, এই দুটো (এ দুটো ছবি সকলেই দেখেছেন প্রায়, তাই উল্লেখ করলাম)  এবং এই ধরণের আরো কয়েক কোটি জিনিস কিন্তু আমরা দেখেছি, হেসেছি এবং উপভোগ করেছি (ভবিষ্যতেও করবো) এবং ঠিক যেমনভাবে ভিকি না জেনে অমেত্ত ভেবে মার্জারিন খেতো, ঠিক সেইভাবেই নারীবিদ্বেষকে নিজের অজান্তেই প্রোমোট করে ফেলেছি।

ধর্ম ব্যাপারটাও অনেকটা এরকমই। কোথায়, কীভাবে যে আপনার মনে নিজের ধর্মের প্রতি একটা আনুগত্য রয়ে গেছে, আপনি নিজেই বুঝবেন না। Religion শব্দের ইটিমোলজি, রোমান ব্যাকরণবিশারদ সার্ভিয়াসের মতে, এসেছে ল্যাটিন religare থেকে, যার নিকটতম অর্থ হল, ”to bind”। এই বন্ধনে আমি, আপনি কেউ সাধ করে আবদ্ধ হইনি, জন্মসূত্রেই হতে হয়েছে। কথা হল, চাইলেই উপবীত বা শাখা-সিঁদুরের মতন একে বর্জন করা যায়না। মানে, অবশ্যই করা যায়, কিন্তু নিজের কাছে কখনও না কখনও ঠিক ধরা পড়ে যেতে হয়। কারণ,  ধর্মহীন হতে  গেলে নিজের এবং পরিবারে দীর্ঘকাল ধরে  চলে-আসা আচারবিচার, উৎসব এবং বিভিন্ন সম্পর্ক গুলোকেও একেবারে মনের গভীর থেকে উপড়ে ফেলতে হয়, সেটা কেউ পারে বলে মনে হয়না। আমি নিজেও অনেক চেষ্টা করেছি, কা কস্য পরিবেদনা।

সুতরাং, ভড়ং দেখিয়ে আর বলতে পারিনা যে আমি সেক্যুলার। আমি আমার ধর্মকে (যদিও, হিন্দুত্ব ঠিক ধর্ম নয়, একটা জীবনযাত্রা) শ্রদ্ধা করি এবং সেই সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষদেরও সমান সম্মান করি। কেউ বিপদে পড়েছে দেখলে, আমি তাকে আগে সাহায্য করবো তার ধর্ম জিজ্ঞেস না করেই। আমার শিক্ষা এবং মূল্যবোধ তাই বলে। ধর্ম নিয়ে ভ্যাজর ভ্যাজর তাই অসহ্য লাগে। কোন বিশেষ খাদ্যাভ্যাস নিয়েও আমার কোন মাথাব্যথা নেই। ভাল করে রান্না করে ডেকে খাওয়ালে সবই খাই (ফলিডল ছাড়া)।

ও, হ্যাঁ, আরেকটা কথা। ধরুন আপনাকে কেউ বিনা কারণে অপমান করলো বা ঠাস্‌ করে একটা চড় কষালো, আপনি কি ছেড়ে দেবেন? দিতেও পারেন, সেটা আপনার অভিরুচি। আমি দিইনা। আমি যেকোন মন্তব্য, যেকোন মতবাদ, যেকোন মানুষকে খোলা মনেই গ্রহণ করি এবং তাকে যোগ্য সম্মান এবং সমাদর দেওয়ার চেষ্টা করি। সেই ব্যবহার তার থেকেও আশা করাটা অন্যায় নয় নিশ্চয়ই। মানে, মোদ্দা কথা, গান্ধীজির এক গালে চড় খেয়ে আরেক গাল এগিয়ে দেওয়াতে বিশ্বাস করিনা। সব ধর্মই সমান; আমার ধর্ম নিয়ে যদি কারো ফালতু মাথাব্যথা না থাকে, আমারও তারটা নিয়ে বিন্দুমাত্র নেই। অন্যথা হলে… আছে। 🙂

এই লেখা পড়ে বেশ কিছু লোক মনে মনে উদ্‌মা খিস্তি এবং প্রকাশ্যে ছিছিক্কার দিয়ে আমাকে আনফ্রেন্ড  বা আনফলো করবেন, এই আশা রাখি। 😑

Advertisements

তোমাকে বাড়ি বলে ডাকবো।
আমার বাড়ি, আমার নিজস্ব আস্তানা
যেখানে যেতে, অনেক পথ পেরিয়েও,
একটুও কষ্ট হয়না আমার।
যেখানে, সমস্ত অপূর্ণতা আমার
স্বচ্ছ, সুন্দর হয়ে ওঠে।
যেখানে, বেতাল সুরে সুর মিলিয়ে
জীবন মুচকি হাসে।
তোমাকে বাড়ি বলে ডাকবো, কেমন?

 

 

 

ছোটবেলা থেকেই আমার ধারণা আমি ভাল গান গাই। এই ধারণাটা আরোই পোক্ত হয়েছিল কারণ গান শুরু করলেই আমার কপালে ছোটখাটো পুরস্কার জুটতো। মানে ধরো এই আমি, “তুমি নির্মল করো-ও-ও-ও”…শুরু করে সবে মঙ্গলে এসেছি কী আসিনি অম্‌নি ফুলমাসি, “এই নে ল্যাবেঞ্চুস খা” বলে ভয়ার্ত হাসি হাসত। টু বি অন দ্য সেফ সাইড, একই লজেন্সের রিপিটিশনও খুব কমই করতো। বাচ্চার মুড, বলা তো যায়না। এরকম ভাবে বিভিন্ন সময়ে আমি এত বেশী টফি, ক্যাডবেরী, পেন্সিল, ইরেজার ইত্যাদি পেয়েছিলাম যে নিজের ওপর আমার বিশ্বাস এবং ভরসা দুই-ই বেড়ে গেছিল। ম্যাক্স আমাকে দু-তিন লাইন গাইতে হোত, তারপরেই… যাদের কাছে উপঢৌকন স্বরূপ কিছু থাকতোনা, তারা, আমি কত মিষ্টি, একা একা চুল বাঁধতে পারি কিনা, মা আমাকে এখনও খাইয়ে দেয় না নিজেই খাই ইত্যাদি নানা অবান্তর প্রসঙ্গের অবতারণা করতেন।  একবার তো একজন আমাকে একটা পুতুলও দিয়েছিল… (কে ঠিক মনে নেই, তবে সেবার আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতে বসেছিলাম, মনে আছে)

আমাদের স্কুলের মিউজিক টিচার একটু বদরাগী ছিলেন। কেউ বা কারা রটিয়েছিল, ওনার মাথায় আসলে টাক এবং সেটা ঢাকতে উনি উইগ ব্যবহার করেন। টাকের কারণেই হোক বা পরচুলার কারণে বা আরো কোন গূঢ় কারণে, তিনি সর্বদাই তিরিক্ষি মেজাজে থাকতেন। কিন্তু সেই মিসের সামনেও আমাকে বেশী গাইতে-ফাইতে হয়নি কোনদিনও… এমনিতেই বেশ ভাল মার্ক্স পেতাম। পরে বুঝেছি, আমি যেমন ওনাকে, উনিও সেরকমই  আমাকে ভয় পেতেন 😦 বা আমার গানকে ভয় পেতেন, টু বি প্রিসাইজ।

ক্রমশঃ, বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্যসমাজ ছাড়িয়ে আমার গানের খ্যাতি পশু-পক্ষীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি গান শুরু করলেই সানন্দে বেশ কিছু কাক সঙ্গত করত। অন্যান্য পাখি চুপটি করে থাকত; কোথাও কোন অন্য শব্দ নেই… এ বিশ্বচরাচরে, শুধু আমি ও আমার কাকেরা (ডিসক্লেইমারঃ  কোন বিশিষ্ট বিদ্বজনকে মীন করে কিছু বলা হয়নি)

কিন্তু বাপেরও বাপ থাকে অওর হামলোগ উসে দাদাজী বোলতে হ্যায়। অতএব, এক পুণ্য প্রভাতে, আমার ঠিক পাশের বাড়ির দামড়া খোকাটির হঠাৎ গান পেল। পেল মানে সে প্রায় আমাশার বেগ! সেই বেগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার আরো দু-তিনজন বন্ধু তবলা, গীটার আরো কীসব বাজাতে লাগল। শব্দই যে ব্রহ্ম বা স্বয়ং ব্রহ্মদত্যি তা একেবারে মোক্ষম মালুম হতে লাগল।

আশেপাশের বাড়ির দরজা-জানালা পু্রো সেই নকশাল আমলে পাড়ায় পুলিশ ঢুকলে যেমন হত, তেমনভাবে তড়িৎগতিতে বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করল। চাদ্দিকে শুন্‌শান, যেন কারফিউ জারি হয়েছে 😦 কিন্তু এদিকে আমাদের তো জানালা বন্ধ করেও কোন সুরাহা হচ্ছেনা। ছেলের পরীক্ষা, সে করুণ মুখে বসে আছে। শাশুড়ি-মা বসে চা খাচ্ছিলেন, চল্‌কে শাড়িতে পড়ে গেছে…একটা মোটামতন টিক্‌টিকির লেজটা খসে পড়ায় সেটা কাঁদো কাঁদো মুখে এর একটা বিহিত চাইছে…এসব দেখে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। মনে মনে নিজেকেই বললাম, “চল্‌ ধন্নো, ইয়ে না, বসন্তী, বসন্তী… আজ তেরি ইজ্জত কা সওয়াল হ্যায়!!”

প্রথমে একটু কালোয়াতী দিয়ে শুরু করবো ভাবছিলাম কিন্তু তারপরে ভাবলাম ব্যাপারটা কালান্তক হয়ে যেতে পারে। তাই, অল্পের ওপর… ভৈরবীতে, “বাবুল মোরা নৈহার ছুট হি যায়ে” দিয়ে স্টার্ট করলাম। সত্যি বলতে কী, ব্যাপারটা   আশানুরূপ হলনা, পাশের বাড়ি থেকে সেরকম কোন সাড়াই পাওয়া গেলনা। নেক্সট, একদম অন্য রুট… “পাপা, ডোন্ট প্রীচ…” এটা বেশ দরদ দিয়ে গাইছিলাম…ফলতঃ, শাশুড়ি-মা চমকে উঠে কাপটা টেবিল থেকে ফেলে দিলেন… ছেলে বই একেবারে বন্ধ করে গেম খেলতে শুরু করল।

কথায় বলে বারবার তিনবার। দু-দুবার ব্যর্থ হওয়ার পর আমি এমনিতেই মরীয়া হয়ে উঠেছিলাম। এ আমার কত বছরের সাধনার অপমান…আমার মাথা থেকে মুকুট এভাবে সেদিনের একটা ছোঁড়া কেড়ে নিতে পারেনা। হে ভারত, ভুলিওনা, মূর্খ ভারতবাসী, চন্ডাল… যাগ্‌গে, যাগ্‌গে… আবেগ, বুইলেন না…আবেগ…

যা বলছিলাম, তৃতীয় বার…হ্যাঁ, অগ্নিপরীক্ষা। অতএব… করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে…
টেবিলটা টেনে নিয়ে বাজিয়ে শুরু করলাম…
এ এ এ এ বঙ্কাসসস…
আ আ রে প্রীতম প্যায়ারে
বন্দুক মে না তো গোলি মেরে…

রিপিট (প্রবল উচ্চস্বরে)

আ আ রে প্রীতম প্যায়ারে
বন্দুক মে না তো গোলি মেরে..

পাশের বাড়ির জগঝম্প থেমেছে বেশ বুঝতে পারছিলাম তবুও কোন রিস্ক না নিয়ে আমি “পাল্লু কে নীচে ছুপাকে” অব্দি গেয়ে তবেই থামলাম।

পিনপতন নিস্তব্ধতা। কাক-চিল-চড়ুই জাস্ট অজ্ঞান হয়ে গেছে।

পাঁচ মিনিট পর নিম্নোক্ত কথোপকথন কানে এলোঃ

– ভাই, পরের সপ্তাহে তাহলে আমার বাড়িতে…
-হ্যাঁ ভাই, দ্যাখা হচ্ছে…

—————-

ঠিকই করে রেখেছি, যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে তবেই আমি ওই যার বাড়িতে পরের সপ্তাহে  রিহার্স্যাল হবে, তার পাড়ার লোকেদের সাহায্য করবো। সময়ের একটা দাম আছে তো নাকি…

একজোড়া

Posted: মার্চ 2, 2017 in ছন্দের কারিকুরি
ট্যাগসমূহ:, ,

হৃদয়ের ওমে বোনা
পশমী মাফলার
উশ্‌কে তোলে উষ্ণতা,
রঙিন সুতোয় যত্নে তোলা
আবছা হওয়া নাম…

বারাণসীর ঘাটে
সে যে ভাসিয়ে দিল শব
স্মৃতির স্রোতে যতেক ডালা
তোমার-ই সে সব…

হোয়াট্‌স অ্যাপ যে ভাল জিনিস, সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ ছিলনা প্রথম থেকেই। বেশি ভাল আমার সয়না, তাই নিজের ফোনে ব্যাপারটা রাখিনি অনেকদিন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের অবহেলা, অনাদর উপেক্ষা করেও একা কুম্ভ’র মতন লড়ে যাচ্ছিলাম। পয়সা খরচা করে ফোন করতাম বা এস এম এস তবুও মাথা নোয়াইনি।

তা কয়েকমাস আগে একটি ঘটনা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

এবছর পয়লা বৈশাখের পরদিন জনৈক বয়স্কা প্রতিবেশীর সঙ্গে মুখোমুখি হওয়াতে বলেই ফেললাম, “শুভ নববর্ষ”।  এমনিতে ওনার সঙ্গে মাঝে মাঝে বাক্যালাপ হয় বটে তবে তেমন কিছুনা। ভদ্রমহিলা কেমন ভূত দ্যখার মতন কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলে্ন, তারপর আমতা আমতা করে “নববর্ষ” বা ওরকম কিছু একটা বলে ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে গেলেন। রকমসকম দেখে সুবিধের লাগলোনা। হঠাৎ দেখি উনি হাতে একটা কী নিয়ে আবার আসছেন। নিশ্চয়ই মিষ্টি-ফিষ্টি দেবে ভেবে খুশি হয়ে গেলাম O:) নাঃ, লোককে এত অল্পে ভুল বোঝা ঠিক না, ভাবতে ভাবতেই দেখি এগিয়ে এসে ভয়ানক রহস্যময়ভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই, তুমি আমাদের “কোন এক পাড়ার বধূ” গ্রুপে নেই? কাল যে অতগুলো  নববর্ষ ফরওয়ার্ড করলাম, উইশ করলাম, পাওনি?”
আমি, সত্যি বলতে কী, এক অজানা জগতের অপার সম্ভাবনাসমৃদ্ধ এই সাংকেতিক প্রশ্নের সামনে যাকে বলে হুব্বা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আরো কিছু তীব্র, তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণের পর আমি বাড়ি এসে, অতঃপর, নিজের উপর লজ্জায়, ঘেন্নায়, ফোনে  হোয়াট্‌স অ্যাপ ইন্সটল করলাম।

এর পরদিন থেকে সকালগুলি যারপনাই অজস্র বন্ধুদের ফরওয়ার্ড স্বরূপ আশীর্বাদে সততই গুডমর্ণিং হয়ে উঠতে শুরু করল। দুপুর, বিকেল এবং রাতেও ভাব-ভালবাসার অন্ত নেই। কিছু কিছু মানুষ আবার কমপক্ষে চার-পাঁচটা “গুড-নাইট” লেখা ছবি পোস্ট না করে ঘুমোতে পারেননা। কারো কারো দৃঢ় বিশ্বাস, ২০ জনকে “ভগবান তোমার ভাল করুন” মেসেজ ফরওয়ার্ড করলে ভগবান অবশ্যই যাবতীয় কাজ ফেলে ছুটে এসে তাদের মঙ্গল, বুধ বা বেস্পতি কিছু একটা করবেন। কারো আবার বদ্ধমূল ধারণা, ৫০ জনকে কোন বিশেষ লিঙ্ক পাঠালে সে ৫০০ টাকার টকটাইম ফ্রী পাবে! এছাড়া, গেঞ্জি-জামা-ব্রা-প্যান্টি এসব ফ্রী-তে পাওয়া যাবে
সুধ্‌ধু ফরওয়ার্ড করলেই, এরকম লোভনীয় হাতছানিও পাওয়া যায়।

ফরওয়ার্ড- এর উপরেই দুনিয়া কায়েম হ্যায়। ঘাসের ওপর প্রথম পড়া শিশির সামান্য নুন দিয়ে খেলে কোষ্ঠ সাফ হবে, টোম্যাটো বেশি খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়, ইউনেস্কো আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে বাকী সব দেশেরও জাতীয় সঙ্গীত করার পরামর্শ দিয়েছে, কীভাবে বসলে মাথায় কোনদিন টাক পড়বেনা, কার কার ব্যাঙ্কে ঠিক কত পরিমাণ কালো টাকা আছে, কালো টাকা গোলাপী করার ১০ টি সহজ পদ্ধতি, কীভাবে দু-কিলোমিটার দূর থেকে গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারবেন সবচেয়ে নিকটবর্তী এটিএম-এ টাকা আছে না নেই, বা, নিমপাতার টক-মিষ্টি ফিরনি- এ সবই আমি হোয়াট্‌স অ্যাপ ফরওয়ার্ড থেকেই জেনেছি। যে বই আমি কখনো পড়িনি, যে সিনেমা আমার কখনো দেখতে ইচ্ছে হয়নি, ফরওয়ার্ড আমাকে সেইসব বই/সিনেমা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করেছে, সমাজে আমি মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছি।

আজ তাই নতমস্তকে, ছলোছলো চোখে বলতে বাধ্য হচ্ছি… হে হোঅ্যা, আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব ,ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব……