টিপিক্যাল ইন্ট্রোভার্ট আমি। কথা বলি কম, শুনি বেশি। কথা বলতে হবে ভাবলে-ই শরীর খারাপ লাগে। তার বদলে তিন পাতা হাতের লেখা লিখলে যদি এক-ই কাজ হয়, আমি তাতে রাজী, এনি ডে। তো, সেসব তো আর হয়না। কাজের প্রয়োজনে, বকতে হয়, ফোনালাপ-ও করতে হয়। তবে, এর বাইরে, রাস্তাঘাটে নিতান্ত দায়ে না পড়লে সাধারণতঃ আমার মুখ থেকে হুঁ-হাঁ ছাড়া বিশেষ শব্দ বের হয়না। সেদিন হঠাৎ কী মনে হল, পাশে অটোচালক যখন অ্যাজ ইউজুয়াল গজ্‌গজ্‌ করছেন জ্যামে দাঁড়িয়ে,”এইজন্য শালা অফিস টাইমে এদিকে আসতে চাইনা, ফালতু বাঁ যত টাইম নষ্ট”, উত্তর দিয়ে ফেললাম।

— সত্যি অসুবিধে হয় আপনাদের, এই গরমে প্রতি ট্রিপে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা। সময় তো নষ্ট হয়-ই…

— (সামান্য অবাক হয়ে) কী বলবো আর দিদি…আমাদের-ই সবাই গালাগালি করে…আমরা-ও তো মানুষ। প্রতিদিন এই মিটিং-মিছিল-জ্যাম…পারা যায়…

এরপর দেশের অবস্থা নিয়ে আরো দু-একটি কথা’র মাঝে-ই আচমকা পাশ থেকে একটা ছোট প্রাইভেট বাস ওভারটেক করতে গিয়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে ফেলল আমাদের অটো-কে। দিয়েই সেই বাসের হেল্পার বা ওরকম কিছু, যে গেট-এ দাঁড়ানো ছিল, চিৎকার করে খিস্তি দিয়ে উঠল অটোচালক-কে। অথচ দোষটা ১০০% বাসটা’র!

এরপর যা হয়. তুমুল বাগবিতণ্ডা। এরমধ্যে জ্যাম কেটে যাওয়ায় বাস চলেছে সামনে খিস্তাতে খিস্তাতে, আর অটো যথাসম্ভব জোরে তার পেছনে।

যেটা অদ্ভুত লাগলো, যে লোক-টি পাঁচ মিনিট আগে সামান্য একটা বাক্যে দুটো খিস্তি মেরেছিল, সে এই ঝামেলা’র মধ্যে-ও, বাস-এর লোকটা-কে একটা বাজে কথা বললোনা। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে শুধু আমার উপস্থিতি’র জন্য উনি কিছু বলতে পারছেন না। খালি বলছেন, “মুখ খারাপ করছিস তো, দ্যাখ তোকে কী করি! মারলে তো মরেই যাবি।।যা চেহারা!!”

আমি গন্তব্যে নামতেই, ভাড়াটা কোনরকমে নিয়ে স্পীড তুললেন অটো-তে, মুখভঙ্গী দেখে মনে হল, এইবার শুরু হবে… 😀

সেদিন-ই সন্ধেবেলা, হুড়মুড় করে ছুটছি গড়িয়ায়; এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা, কিছু একটা দেখতে দেখতে আসছিলেন পাশের দোকানে, শেষমুহূর্তে একটা রিকশা-কে সাইড দিতে গিয়ে ওনা’র হাত থেকে পার্স-টা পড়ে গেল মাটিতে। অন্যসময় হ’লে, তুলে দিয়ে, কোনো কথা না বলেই চলে আসতাম হয়ত। কিন্তু সেদিন কথায় পেয়েছিল। তুলে দিয়ে বললাম, “সাবধানে দেখে হাঁটবেন তো…এত ভিড়”।

একটু হেসে বললেন,”তাও ভাগ্যিস তুলে দিলে। নয়ত সত্যি অসুবিধায় পড়তাম, নীচু হতে পারিনা তো”।

তারপর হাত-টা একটু ছুঁয়ে বললেন “ভাল থেকো”।

সেদিনের পর থেকে কেন জানি মনে হচ্ছে, এত অসহিষ্ণু, এত উগ্র আমরা, সে কি কেউ কারো কথা শুনিনা বলে? আমাদের দাঁড়ানো’র সময় নেই। কথা বলা’র প্রয়োজন নেই, শোনা’র তো নেই-ই।

একটু মন দিয়ে শুনলে, একটু সময় দিলে কি বদলে যায় চারপাশ… কী জানি…

Advertisements

বেশ কিছু বছর আগে এক ঘরোয়া আসরে, এক পরিচিতা পৃথুলা মহিলাকে আরেকজন মহিলা বলে বসেন, “একটু ওজন কমানো’র চেষ্টা কোরো, নয়ত বয়স বাড়লে নানারকম সমস্যা দেখা দেবে।” তাতে তাঁর উত্তর ছিল, “আমার বর এরকম-ই পছন্দ করে”।

কী ভীষণ অদ্ভুত! স্বামী’র পছন্দ-অপছন্দ’র ওপরেই নির্ভর করবে একটি মেয়ের ওজন। সে কেমন পোষাক পরবে, কী খাবে, কোথায় যাবে, কীভাবে হাঁটবে– সবকিছু-ই ঠিক করবে তার পরিবার, যা কিনা বৃহত্তর সমাজের অংশ। যুগ যুগ ধরে মেয়েরা এইসব বাধানিষেধ মানতে মানতে, কখন যেন ভুলেই গেছে এই বেড়াজালে’র বাইরে তার নিজস্ব অস্তিত্বের কথা। সমাজ তাকে যা পাখি-পড়া করে শিখিয়েছে, তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়ে জিন-এর চরিত্র-ই বোধহয় বদলে দিয়েছে। আমরা তাই এখন, এই সময়ে দাঁড়িয়ে-ও দেখি ফর্সা হওয়া’র ক্রিম দেদার বিক্রি হয়, তা মেখে ত্বকে’র গুরুতর ক্ষতি হতে পারে জেনে-ও শুধুমাত্র নিজেকে সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য করে তোলা’র জন্য শ্যামবর্ণা সুন্দরী  তা প্রাণপণে গালে ঘষতে থাকে। কেন? কারণ তার সেই জোরটা-ই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, নিজেকে নিজের মতো করে তুলে ধরা’র। সেই এক-ই কারণে, যে দেশে এখনও বহুসংখ্যক মেয়ে ঋতুস্রাব-এর দিনগুলোতে নোংরা ন্যাকড়া ব্যবহার করতে বাধ্য হন এবং অস্বাভাবিক হারে  ইউ. টি. আই -তে (Urinary Tract Infection) ভোগেন, সেই দেশে’র একটি রাজ্য ঘোষণা করে স্তনবৃদ্ধিকারী কোন অপারেশন হলে, দরিদ্র মেয়েরা বিনামূল্যে তা করাতে পারবেন সরকারী খরচে। অবাক হবেন না, স্তন এবং যোনি ছাড়া আর আছেটাই বা কী আমাদের। সেগুলো-ও আবার ঠিক ঠিক মাপ-এ হওয়া দরকার, মানে, যে মাপগুলো সমাজ ঠিক করে দিয়েছে। তাই, যোনিপথ যাতে “টাইট” থাকে (বুঝলেন না বুঝি? অর্থাৎ, পুরুষ যাতে সর্বোচ্চ আনন্দ উপভোগ করতে পারে মিলনের সময়, সেই মাপ আর কী)  সেইজন্য নর্ম্যাল ডেলিভারি’র সময় অনেক ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া হয় একটা সেলাই বেশি দিয়ে দিতে। তাতে, নারী’র যন্ত্রণা’র শেষ থাকে না এবং মিলনসুখ বা “অর্গ্যাজম” অনুভব-ও করতে পারেনা আর, কিন্তু এটুকু কষ্ট করা-ই যায় পুরুষের সন্তুষ্টির জন্য, তাই না? খানিকটা এক-ই যুক্তি(!) দেখানো হয় FGM বা Female genital mutilation-এর ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে, মেয়েরা যাতে জীবনে আর কোনদিন-ও যৌনসুখ পেতে  না পারে, সেই বিষয়টা কনফার্ম করা হয়। It’s a tool to control female sexual desire. মেয়েদের ওসব-এর দরকার নেই তো। পুরুষের যৌনক্ষুধা মিটলেই হল। বাকি সব এলেবেলে বি-এ পাশ 🙂

তা যা বলছিলাম, আমাদের মেয়েদের এরকম-ই ভাবতে শেখানো হয়ে এসেছে এবং আগামী একশো বছরে-ও এর কতটুকু পরিবর্তন হবে, সেই বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। আধুনিক সমাজে, কোন মেয়ে সাধারণভাবে যৌনতা’র প্রতি তার আসক্তি ব্যক্ত করলে, তাকে আমরা দাগিয়ে দিই- “নিম্‌ফোম্যানিয়াক” বলে। সেই এক-ই আসক্তি পুরুষ দেখালে হেব্বি “মাচো” ব্যাপার আর কী O:)  আমরা এখন-ও জানি এবং মানি “পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা”; মেয়ে-ফেয়ে হলে, স্রেফ গলা টিপে বা দুধে’র গামলায় চুবিয়ে মেরে ফেলা হয় অনেক জায়গায়। ছেলে হবে না মেয়ে- সেই ব্যাপারটাও, বিজ্ঞানের ক্যাঁতায় আগুন দিয়ে, মেয়েদের ওপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। এখন-ও ধরে নেওয়া হয়, মা হওয়া-ই মেয়েদের জীবনের পরম মোক্ষ এবং সেটি না হতে পারলে, তোমার নারীজন্ম বৃথা। শুধু তাই নয়, মা হওয়ার পর, সন্তানের জন্য জীবনের যাবতীয় সুখ-আহ্লাদ-চাকরি-পড়াশোনা বিসর্জন দেওয়া-ই “ভাল মা” হওয়া’র অন্যতম শর্ত। মাতৃত্ব-কে এক সুমহান (পড়ুন ওভারহাইপড)  রূপে উপস্থাপিত করতে পুরোপুরি সক্ষম এই সমাজ। “বাজে মা” আর “বেশ্যা” –এই দু-টি এখন-ও মেয়েদের প্রতি সর্বোচ্চ গালি হিসেবে সর্বত্র স্বীকৃত। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ সেই নারীকেই উত্তম বলা হয়েছে, যে নারী তার স্বামীকে সন্তুষ্ট করে, পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় এবং স্বামীর কথার উপর কথা বলে না। সুতরাং, হুঁ হুঁ বাওয়া, অত্ত সোজা না। শুক্লযজুর্বেদের অন্তর্গত শতপথ ব্রাহ্মণে নারীকে তুলনা করা হয়েছে এভাবে, “সে ব্যক্তিই ভাগ্যবানযার পশুসংখ্যা স্ত্রীর সংখ্যার চেয়ে বেশি”। কীরকম “Dogs and Indians are not allowed” মনে পড়ছে, কী বলেন!

দুঃখের কথা এই যে, আমরা মেয়েরাও বেশীর ভাগ সময়ে এই সমাজের খাঁচা’য় ঢুকে পড়ি। খাঁচা’য় দানাপানি পাওয়া যায়, আদর-যত্ন-ও কপালে থাকলে জোটে বৈকি। আসলে, বুঝতেই পারি না যে এটা খাঁচা। খাঁচা’র মধ্যে যেসব মেয়েরা একটু “আলাদা”, মানে যারা তেমন ফর্সা নয়, সুন্দরী নয়, যাদের স্তন ছোট বা অতিরিক্ত বড়, যারা মা হতে পারেনি, যার বিয়ে হয়নি বা হলেও টেঁকেনি, যে অফিসে রাতভর পরিশ্রম করে সকালে ফেরে, যে সিগারেট খায় বা মদ খায়, যে ছেলে বা মেয়ে দেখে বন্ধুত্ব করেনা- মানে সোজা কথায় বলতে গেলে সবরকম মেয়েদের দিকে, আমরা, এই মেয়েরাই আঙুল তুলি। কোনো কোনো সময় পুরুষের-ও আগে আমাদের আঙুল ওঠে একে-অপরের দিকে।

আমরা এক হতে পারিনি। হয়ত পারবো কোনোদিন-ও, যেদিন সমস্ত বস্তাপচা ধ্যানধারণাগুলো মন থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হবো। দিল্লি অনেক দূর, জানি, তবু আশায় আশায় বসে থাকি… বসেই থাকি… আমরা সবাই।

1-040

একেকটা দিন বড় অদ্ভুত কাটে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখি একরাশ রোদ এসে নিমগাছটার সঙ্গে এক্কা-দোক্কা খেলছে। তবে, এ তো আর আমাদের মতন খেলা না, তাই এই-আছে-এই-নেই করে হিলিবিলি কেটে যাচ্ছে আলো আর ছায়া, মাটি’র গায়ে, দেওয়ালে। একটা বড় ডুমো নীলমার্কা মাছি, অল্প অল্প করে এগিয়ে যাচ্ছে প্রায়-অদৃশ্য মাকড়শা’র জাল-এর দিকে; একটু যায়, আবার থামে। “Will you walk into my parlour?” কী মোহ, কী মায়া– এরকম-ই তো সবকিছু। ছেড়ে যেতে খুব নাকি কষ্ট হয়। মাছিটা-কে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিই, উড়িয়ে দিতে পারতাম অবশ্য-ই। এক-মুখ-ভর্তি জল নিয়ে জোরে টিপ করে কুলকুচি করলেই হত। কত্ত করেছি ছোটবেলায়। তারপর নাম-পাতাপাতি, রুমাল-চোর, ডাংগুলি, এই কুমির, জল্‌কে যাবি? —

ফেরা যায় না আর। মাছিটা’র মত-ই… এগিয়েই যেতে হবে। জাল-টা কাছে আসে আস্তে আস্তে, দৃশ্যমান হয়। মাছিটা হয়ত বুঝতে পারে, ফিরতে চায়… নাকি চায় না…

নষ্টালজিয়া’র সমাস কী? নষ্ট হল জিয়া?

amazon-825

তা প্রথমেই হলে ঢুকতে গিয়ে আঁতকে উঠলাম। পাতা-ফাতা, গাছের শিকড়-বাকড় দিয়ে কী একটা ভয়াবহ জিনিস তৈরি করা হয়েছে “নবীনা” সিনেমাহল’র সামনে! আমি ভেবেছিলাম কোন ভি আই পি বুঝি মারা গেছেন, তার শ্রাদ্ধের জন্য ভাড়া করেছে বুঝি হলটাকে। প্রায় হায় হায় করে উঠতে যাচ্ছিলাম আমার তিনশো টাকা জলে গেল ভেবে, তখন একজন পাশ থেকে বলল যে ওটাই অ্যামাজনের জঙ্গল 😥

ভয়ে ভয়ে চাদ্দিক দেখতে দেখতে ভেতরে ঢুকে দেখি “মেম্বৌ” -এর অ্যাড দেখাচ্ছে। একটি মেয়ে চোখেমুখে কষ্টের ছাপ অনেক কষ্ট করেও না আনতে পেরে, ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে “আমি শুঢু টোমার জন্ন অনেখ আশা নিয়ে ভিডেশ ঠেকে এখানে এসেচি”। পরমুহূর্তেই অবশ্য আমাদের সবার পিয়ো দেব কে দেখে ভুল ভাঙল ❤ মেয়েটা হল গিয়ে আপনার শ্বেতলানা গুলাকোভা ওরফে আনা। সে এসেছে শঙ্করকে অ্যামাজনের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে এল ডোরাডো খুঁজতে, যা কিনা আবার তার বাপ মার্কো আগেরবার গিয়ে খুঁজে পায়নি এবং মরতে মরতে ফিরে এসেছে। বেঁচে থাকার আনন্দ সেলিব্রেট করতে করতে ফ্রাঙ্কো বেচারা অ্যালকোহলিক হয়ে গেছে তাই আনা এল ডোরাডো খুঁজে পেতে  প্রাইভেট ডিটেক্‌টিভ’র মতন প্রাইভেট এক্সপ্লোরার ভাড়া করতে ইণ্ডিয়ায় এসেছে।

শঙ্করকে বেশি সাধাসাধি করতে হল না। যেতে রাজি হয়ে গেল। কাশির দমকে লাবণী সরকার ছেলেকে নিরূপা রয় স্টাইলে বিদায় জানালেন 😦

এরপরেই সব ঘটনা অতি দ্রুত ঘটতে লাগল। শঙ্করকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আনা বলল, “এই যে তোমার গাড়” (না, চন্দ্রবিন্দু নেই)। দেখা গেল শঙ্কর অ্যামাজন সম্পর্কে স-অ-ব জানে। তাই তিনজনে একটা পিকনিকে যাওয়ার মেজাজে এল ডোরাডো খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল O:)

তারপর এক জায়গায় একটা দুলন্ত, ঝুলন্ত ব্রিজ দেখিয়ে মার্কো বলল যে ব্রিজটা বহুত পুরনো, পার হতে গেলেই ভেঙে যাবে। বলেই তিনজনে একসঙ্গে তিনটে ঘোড়া নিয়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ব্রিজটা যথারীতি একজায়গায় ছেত্‌রে পড়ল। সে ক্কী চীৎকার, চেঁচামেচি! আউপাতালি ব্যাপার যাকে বলে। শেষে ঘোড়াটোড়া সুদ্ধ তিনজনে ওপারে পৌঁছে জিঙ্গো জিঙ্গো ট্যাঙ্গো ট্যাঙ্গো করতে লাগল।
এরমধ্যে মার্কো ‘র বন্ধুর রাবার ফার্ম-এ গিয়ে একজন কালো ক্রীতদাসীকে শঙ্কর অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচালো, জাগুয়ার নিয়ে আলোচনা হতে না হতেই হঠাৎ রাত্তিরবেলা একটা জাগুয়ার এসে ফার্মে’র একটা মেয়েকে কয়েক সেকেন্ডে মেরে ফেলল, তার পেছনে ছুটে গেল মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড আর আমাদের অকুতোভয় শঙ্কর। জাগুয়ারটা বয়ফ্রেন্ডটাকে তিন সেকেন্ডে মেরে ফেলল, শঙ্কর জাগুয়ারকে এক সেকেন্ডে মেরে ফেলতেই দেখে আরেকটা জাগুয়ার ছুটে আসছে 😥 ব্যস্‌! শঙ্কর বাঘাযতীন হয়ে গেল, মানে খালি হাতে জাগুয়ারের সঙ্গে খানিক কুস্তি করে তাপ্পর রিভ্লবার বের করে ঠাঁই করে এক গুলিতে মেরে দিল। অবশ্য না মারলেও জাগুয়ারটা লজ্জায় মরে যেত :/  ও হ্যাঁ, এই যে জাগুয়ারদ্বয় নিহত হল, কারোরই একফোঁটা রক্ত দেখা গেলনা। কী চাপ!

এরপর নদীতে নৌকো করে যেতে যেতে এক জায়গায় মার্কো জানালো যে এখানেই তার আগেরবার জাহাজডুবি হয়েছিল। বলতেই তিনজনে অক্সিজেন মাস্ক-ফাস্ক নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিল ম্যাপ খুঁজতে।
জাহাজে ম্যাপ খুঁজতে খুঁজতেই একটা বেঁটে-মোটা ইলেক্ট্রিক ঈল এসে শঙ্করকে শক্‌ দিল। বেচারা কেলিয়ে পড়ল। মার্কো তাকে ওপরে নিয়ে এসে মুখে মুখ দিয়ে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে। তাও মাল নট নড়নচড়ন নট কিচ্ছু। তখন মার্কো বলল, “ও গড্‌ প্লিজ প্লিজ”। বলতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিষ্টি নামল। শঙ্কর বেঁচে গেল। O:)

এক জায়গায় নেমে ওরা তিনজনে একটা পোড়োবাড়ি খুঁজে পেল (হ্যাঁ, ওই অ্যামাজনের জঙ্গলেই। কি মিষ্টি না? ) তা সে বাড়িতে খালি ট্যারান্টুলা’র জাল। কিন্তু মার্কো  বলল এখন আর এখানে ট্যারান্টুলারা থাকেনা। কে জানে, হয়ত ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল 😦  তো, সেই বাড়িটায় বসে বসে শঙ্কর আর মার্কো খোশগপ্পো করছে আর একলা মেয়েটাকে পাঠিয়েছে নদী থেকে জল আনতে (কেমন বাপ তুই? অ্যাঁ!) গপ্পো করতে করতে হঠাৎ দ্যাখে কী, এক ঝাঁক ট্যারান্টুলা! দুজনে চুপিসাড়ে বেরিয়ে এসেছে যেই না, টপ্‌টপ্‌ করে মার্কো ‘র হাতে চ্যাটচ্যাটে কীসব পড়ল :-O বলে নাকি ওটা ফেরোমন 😦 ফেরোমন সম্বন্ধে আমার যাবতীয় ভুল ধারণা ঘুচিয়ে দিয়েছে এই সিনেমা। তা হবেও বা ফেরোমন। আমার অবশ্য দেখে আরো খারাপ কিছুই মনে হচ্ছিল। সে যাক।

ফেরোমন দেখেই  মার্কো আবার ভেতরে ঢুকল। ইদিকে আনা নদীর ধার থেকে চিল্লাচ্ছে। শঙ্কর ছুটল আনাকে বাঁচাতে। এটা ঠিক কাজ অবশ্য। সোমত্থ ছেলে, আনাকে বাঁচাবে না তো কি ওর বাপ কে বাঁচাবে নাকি! তো নদীর ধারে গিয়ে দ্যাখে ইয়াব্বড় অ্যানাকোন্ডা। দেখেই দুম ফটাশ! কিন্তু পাজি সাপটা কেমন করে জানি নদীর ধার থেকে মুহূর্তের মধ্যে ওই ঘরের মধ্যে ঢুকে মার্কো ‘র মাথাটা চিবিয়ে, তারপর কিছুই নেই দেখে, থু করে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল 😥

এরপর হচ্ছে সেই ঐতিহাসিক বুনিপ নিধন স্টাইলে অ্যানাকোন্ডা মারার রাজসূয় যজ্ঞ। সেই এক স্টাইল, “তুই আমার বাপকে মেরেছিস, আমার মা’কে বিধবা বানিয়েছিস, আমার বোনে’র ইজ্জত…(ওহো না…এটা না) তোঁকে আঁমি ছাঁড়বোঁনাঁ”। বললে বিশ্বাস করবেন না মাইরি, জাস্ট গাছে দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে বেচারা সাপটাকে মেরে ফেলল। ❤

এবার শঙ্কর আর আনা দুজনে মিলে ছুটল এল ডোরাডো খুঁজতে। না খেয়েদেয়ে, খালি হাতে (একটা দড়ি বা গাঁইতি পর্যন্ত নেই!!!) পাহাড়-ফাহাড় ডিঙ্গিয়ে, ইয়ানোমামি সর্দার’র কাছ থেকে ম্যাপ বাগিয়ে নিয়ে, কোড ডিসাইফার করে, সেই কোড আবার ইংরিজিতে অনুবাদ করে, শঙ্কর অবশেষে আমজাদ খান’এর মত একটা হাসি দিল। হিহিহ্যা, হিহিহ্যাহ্যা, হিহিহ্যাহ্যাহ্যা।

এখানেই শেষ নয়।

আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলাম, এল ডোরাডো কেন খুঁজছে ওরা। সেটার উত্তর পেলাম যখন শঙ্কর বলল, “উই ওয়ান্ট টু ফাইন্দ দা টুথ” … কীসের দাঁত, তা জানিনা অবশ্য, ইয়েতির হতে পারে; আফটার অল, সব পথ এসে, মিলে যায় শেষে।

এখনও শেষ হয়নি।

এরপর তেমন আর বিশেষ কোন চেষ্টা না করেই সোনার শহর এল ডোরাডো খুঁজে পাওয়া গেল। দুজনে যখন  নেচে নেচে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন এক পাল ব্ল্যাক প্যান্থার এসে ওদের মেরে ফেলতে চাইল। ওরা ব্ল্যাক প্যান্থারের থেকেও জোরে দৌড়ে পালিয়ে যেত, কিন্তু আনা’র পা মচ্‌কে গেল 😦 তখন কোথা হইতে কী হইয়া গেল, একদল দারুণ মেকআপ করা সুন্দরী, যারা নাকি “ভার্জিন্স অভ দ্য সান”, তারা এসে তীর ছুঁড়ে ওদের বাঁচালো।

হলসুদ্ধু সকলেই বাঁচল।

প্রচুর কচিকাঁচা গেছিল। হাতে টেডি-ফেডি নিয়ে। একজন জিজ্ঞেস করছিল, “বাবা, বুনিপ কখন আসবে?” 😥  শিশুর মন তো। সহজে সন্তুষ্ট হয় না, কিন্তু আমি ব্যাপারটা ভেবেই শিউরে উঠলাম 😦

#অ্যামাজন_অভিযান
#Amazon_Obhijaan
#film
#review

আপেল, আপেল

Posted: ডিসেম্বর 11, 2017 in ছন্দের কারিকুরি

হঠাৎ মনে হল আপেল জিনিসটা বেশ গোলমেলে। সেই কোন যুগে ইভ্‌ নাম্নী এক অতি-কৌতূহলী মহিলা  তার অভাবনীয়-সরল সঙ্গীকে এই আপেল-ফাপেল খাইয়েই যাবতীয় ঝামেলা শুরু করেছিল। তারপর নিউটন একদিন আপেলগাছের তলায় শুয়ে শুয়ে আকাশপাতাল ভাবছিল কী করে সব জিনিস নিম্নগামী হয়। আমার কেমন জানি মনে হয় ব্যাটা বাঙালি ছিল :/ নয়ত যাবতীয় জিনিসকে এভাবে টেনে নীচে নামানোর কথা ভাবতে পারতোনা (পান ইন্টেন্ডেড) আবার দেখুন, কেমন সেয়ানা মাল, বেল গাছ বা নারকেল গাছের নীচে বসেনি, জানে, কীভাবে সেফ খেলতে হয়।

সে যাইহোক, হচ্ছিল আপেলের কথা। তা, আপেল বলতে গেলে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইন ফ্যাক্ট, “মানুষ” হওয়ার প্রথম পাঠ শুরু হয় আপেল দিয়ে; এ ফর অ্যাপল…

এ ছাড়া,  একটা আধখাওয়া আপেল-ই আজ ধনী-দরিদ্র’র মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে তুলেছে। সুতরাং, আর্থ-সামাজিক দিক থেকেও এর একটা বিশাল অবদান রয়েছে। সবাই রোজ একটা করে আপেল খেলে ডাক্তাররা না খেতে পেয়ে মারা যাবেন, এরকম ইঙ্গিত-ও পাওয়া যায় পুরনো প্রবাদে। আপেল ছাড়া আর কোন ফল মানুষের অগ্রগতির ইতিহাসে এরকম সুস্পষ্ট ছাপ ফেলতে পারেনি।