Posts Tagged ‘গদ্য’

খুব চেনা ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন হয়; স্বামী রিটায়ার করেছেন এক যুগ হয়ে গেছে, স্ত্রী বয়সে খুব বেশি ছোট নন স্বামী’র থেকে। অনেক, অনেক বছর আগে হলেও তাঁদের ছিল ভালবাসার বিয়ে।  দুজনকে-ই এখন “ওয়াকিং স্টিক”-এর ভরসায় হাঁটাচলা করতে হয়। কিন্তু, সেটা তাঁরা করেন না বেশিরভাগ সময়ে। একে-অপরকে আঁকড়ে ধরে পা টিপে টিপে রাস্তার এক পাশ দিয়ে সাবধানে হাঁটেন। স্ত্রী মাঝে মাঝে চকিতে দেখে নেন পেছন ফিরে, আচমকা কোনো কাণ্ডজ্ঞানহীন রিকশা বা অটো বেমক্কা উঠে এল নাকি গায়ের ওপর! স্বামী সেটা-ও আবার পারেন না, গলায় মোটা বেল্ট, স্পন্ডিলিসিস।

ছেলে-মেয়ে দুজনেই যথাক্রমে অন্য দেশে এবং প্রদেশে থাকে। ওনারা একাই আছেন এবং, দিব্যি আছেন।
হাজার অসুস্থতা, শারীরিক অসুবিধে এবং বহুবিধ অন্য নিত্যকার ঝামেলা সামলিয়ে-ও আমি ওনাদের হাসতে দেখি। সকলেই দ্যাখে। আমার মতন অবাক-ও হয় হয়তো। আমরা যেখানে এই বয়সেই “আর পারছিনা” লব্জ আওড়াতে থাকি পান থেকে চুন খসলেই, সেখানে ওঁরা এখন-ও হাসেন। ফরসা মুখে বলিরেখা উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, চোখের কোণে অগুন্তি হাঁসের পায়ের ছাপ সোচ্চারে জানান দেয়, এ হাসি অনেক পুরনো।

বেশ কিছুদিন আগে, পাড়া’র ওষুধের দোকানে গেছি মা’র ওষুধ কিনতে। সেদিন কোন কারণে কর্মচারী খুব কম। ব্যস্ততা’র শেষ নেই। মাসের প্রথমে যেকোন ওষুধের দোকানে আজকাল গেলে দেখা যায়, বয়স্ক এবং নট-সো-বয়স্ক মানুষরা মাসকাবারী বাজার করা’র মত ওষুধ কিনছেন 😦 আমার সামনেই একজনের বিল হল প্রায় সাত হাজার টাকা’র কাছাকাছি। সারা মাসের ওষুধ। তো যাইহোক, আমি ওষুধ নিয়ে বেরোতে যাবো, এমন সময়ে দোকানদার কাকু একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন “ওমুক বাড়িতে এই ক’টা ওষুধ দিয়ে দিবি একটু যাওয়ার সময়? তোদের পাড়াতেই, চিনিস মনে হয়। আজ একটাও লোক নেই যে পৌঁছে দেবে। এদিকে বয়স্ক মানুষের জিনিস, না দিলেই নয়”। না করা’র কারণ নেই। এই দোকানদার কাকু আমায় ছোটবেলা থেকে চেনেন। আর বাড়িটা বুঝলাম, যে বৃদ্ধ দম্পতি-কে মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখি, চোখাচোখি হয়, সামান্য হাসি কখনো, তাঁদের।

সেই প্রথম তাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি কথা হল। দুজনেই ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন ভেতরে ঢুকে চা খাওয়ার জন্য। অন্যদিন আসবো প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ফিরে এলাম।

তারপর গেছি বার দুয়েক।

কয়েকদিন আগে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক প্রায় শয্যাশায়ী। কোনোভাবে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগিয়েছেন। কথাই বেরোচ্ছেনা গলা দিয়ে। তাও, আমি যেতেই ইশারা করে বোঝালেন স্ত্রী-কে, চা করো। আমি যত বলি খাবোনা, তিনি তত-ই ইশারা করে এক-ই কথা বলেন। মাসিমা স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে বললেন, “তুমি ভেবোনা আর। তোমায় খেতেই হবে, নইলে ইনি এই দশ মিনিট আগে চা খেয়েই আবার খাবেন কী করে!”
ধরা পড়ে মুখ গোঁজ করে স্ত্রী-কে কাঁচকলা দেখালেন। এবার আমি আগে হাসলাম।

টুকটাক কথা হচ্ছিল। হাসতে হাসতেই হঠাৎ মাসিমা বললেন। “জানো তো, আমি সবসময় ঠাকুরকে বলি এই মানুষটা যেন আগে রওনা দেয়। আমি আগে গেলে  খুব কষ্ট হবে ওর।”

কাঠ হয়ে গেলাম শুনে। কতখানি ভালবাসলে এরকম বলা যায়! আমরা তো সবসময়েই বলি, তোমাকে ছাড়া বাঁচব না– এই বাক্যটি-ই নাকি শ্রেষ্ঠ প্রেমের উক্তি। অথচ, তার মধ্যে মিশে থাকে এক অপরিসীম স্বার্থপরতা। সেখানেও আমরা চিন্তা করি নিজের সুখটুকু, ভালবাসার মানুষটি না থাকলে দিনযাপন ভয়ানক হয়ে ওঠে, বিশেষতঃ বার্ধক্যে। আমরা ভাবি, সেই সীমাহীন শূন্যতা আমায় অন্ততঃ যেন ভোগ করতে না হয়, অন্ধকারের স্মৃতি হাতড়ে, অশক্ত টলমল পায়ে, আমি যেন অন্ততঃ জীবনের কাছে মুক্তি ভিক্ষা না করি। সঙ্গী বা সঙ্গিনী’র যা হয় হোক, আমায় যেন নিংড়ে-নেওয়া মানসিক যন্ত্রণা না পেতে হয়। হয়ত বা অতিরঞ্জত ভাবনা, কিন্তু এরকম-ই মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে।

এরকম-ও ভালবাসা হয়। এরকম-ও ভালবাসা যায়।

খুব ভোরে আজ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল রাধিকার । চোখ খুলে প্রথমে বুঝতেই পারছিলেন না যে কোথায় রয়েছেন । একটা পাতলা কুয়াশার স্তর যেন ঝুলেছিল মাথার ওপর । সেটাকে ভেদ করে অভ্যাসমাফিক চশমার জন্য হাত বাড়াতেই মনে পড়ে গেল সবকিছু । আবছা আলো বাইরে , তার মধ্যেই গিয়ে দাঁড়ালেন লাগোয়া একফালি ব্যালকনিতে …। এমনি করে ভোর দ্যাখা হয়না কত বছর । আর দেখবেন-ই বা কখন । জীবনের বেশীর  ভাগটাই তো কেটে গেল  পায়ের তলার নরম , নড়বড়ে জমিটাকে সামান্য একটু শক্ত করতে । একেক সময় যেন ভূমিকম্প এসেছে , ফিন্‌ফিনে একটা শুকনো পাতার মতন কেঁপেছেন তিনি ,এই বুঝি ডুবে যেতে হয় গরম গলিত লাভা আর ম্যাগমার ঢেউয়ের তান্ডবে ! কিন্তু কোথা থেকে যেন শক্তি পেতেন , হার-না-মানা একটা আগাছার মতন আবার ঠিক উঠে দাঁড়াতেন দুর্বল হাত দুটো বাড়িয়ে সূর্যের দিকে ।

বহু পুরোনো একটা কথা মনে পড়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল রাধিকার । কী যেন বলত অর্ক …” দ্যাখো বস্‌ আমি তোমার কেষ্ট ঠাকুরটি হতে পারবোনা কোনোদিনও , তুমি আমার আকাশ , আমি তোমার সূর্য … এই কম্বো অনেক বেটার ” । সেই  সূর্য যখন বিনা নোটিশে অস্ত গেল মাত্র সাতদিন কী এক অজানা মারণ-জ্বরে ভুগে , দু-বছরের সৌম্য কে নিয়ে অথৈ জলে পড়েছিলেন রাধিকা । সে সময় অর্কর অফিসের সহকর্মীরা সাহায্য করেছিল যথেষ্ট ; নইলে হয়ত এই সামান্য চাকরীটুকু জুটতো না রাধিকার । বিনিময়ে অন্যায় বা অনৈতিক দাবী করেনি কেউ-ই , একা অল্পবয়সী সুন্দরী বিধবা বলে হেনস্থা পোয়াতে হলেও তা কখনো মাত্রা ছাড়িয়ে যায়নি । নিজের ভাবাবেগ এবং রুচিকে সংযত করতে শিখে নিয়েছিলেন রাধিকা আঠাশ বছর বয়সেই । তাই হয়তো অনেক অঘটন এড়াতে পেরেছিলেন ।

তাও একদিন , সে দিনটা স্পষ্ট মনে পড়ে আজও , শরীর খারাপ বলে অফিসে যাননি সেদিন। সৌম্য বিকেলে খেলতে গেছে সেই সময় হঠাৎ আদিত্য এসে হাজির ; রাধিকা অফিসে যায়নি বলে খোঁজ নিতে এসেছে । অর্করই বন্ধু ছিল আদিত্য  , অর্ক  মারা যাওয়ার পর যাতায়াত বেড়ে গেছিল । তার ওপর এক অফিসেই কাজ , সেই সুবাদেও প্রায়ই আসত ছেলেটা । রাধিকা বুঝতেন আদিত্যর মনোভাব , এমনকি মনে মনে পছন্দও করতেন   । কিন্তু জানতেন যে এক বাচ্চার মা-কে বিয়ে করে সংসার পাতা সম্ভব নয় বনেদী বাড়ির ছেলে আদিত্যর । তাই কোনদিন নিজের ইচ্ছেকে প্রশ্রয় দেননি । সেই শেষ বিকেলে যখন আদিত্য এসে  “সেকী জ্বর নাকি ”  বলে কপালে হাত দিয়েছিল নিজের অজান্তেই কেঁপে উঠেছিলেন তিনি । আদিত্যর হাত যখন আরেকটু অবাধ্য হয়ে উঠতে চাইছিল নীরব সম্মতির আঁচ পেয়ে তখনও তো একটা চোরা শিরশিরানি উঠে আসছিল হাঁটু বেয়ে …আরো ওপরে । নরম , কোমল এক গভীরতায় ।  আচমকা চোখ পড়েছিল দেয়ালে টাঙানো অর্কর ছবিটা র দিকে । গ্রীলের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে আসা দিনশেষের নিভন্ত সূর্যের আলো বড় বেশী উজ্জ্বল করে তুলেছিল ফ্রেমবন্দী কাঁচটাকে । এক লহমায় সামলে নিয়েছিলেন নিজেকে । পদস্খলন বলা যায় কী একে ? জানেন না তিনি । শরীরের খিদে আলাদা…সে তার চাহিদা জানিয়েছিল কিন্তু তিনি বজ্র আঁটুনি দিয়ে বেঁধেছিলেন তাকে । আদিত্য অবাক হয়েছিল , আহত-ও হয়ত বা । কিন্তু মুখে কোনদিনও কিছু বলেনি ।

” এ কী মা , আপনি এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছেন  …ওদিকে তো সাড়ে ছটা বেজে গেল । এক্ষুণি আমাকে বাথরুমে ঢুকতে হবে তো । যান যান , আপনি সেরে নিন ”

বিদিশার কথায় হুঁশ ফেরে রাধিকার । লজ্জাও পান একটু ।সত্যিই তো দেরি হয়ে যাচ্ছে । তবু আবার মনে হয় আজ একটা দিন , বিদিশা একটু দেরী করেই না হয় ঢুকতো স্নানঘরে ।কী-ই বা হতো …কাল থেকে তো আর কোন তাড়া নেই জীবনে ।

তাড়াহুড়ো করেই তৈরী হয়ে নেন রাধিকা …আজ চাকরী জীবনের শেষ দিনে এক মিনিটও যেন দেরী না হয় । রোজকার মত পাউঁরুটি টোস্টারে বসাতে যেতেই বিদিশা কন্ঠস্বর বেজে ওঠে…
” মা , আজ দিনটা স্পেশাল কিনা , তাই আমি-ই রেডি করে রেখেছি জলখাবার , আর রাত্তিরের খাবার সৌম্য  ‘ বিগ বস্‌ ‘ থেকে নিয়ে আসবে বলেছে …আপনি তো চাইনীজ পছন্দ করেন  ”
একটু আগের তিতকুটে ভাবটা কেটে গেল রাধিকার । নাঃ , মেয়েটা বুঝদার বলতে হবে ।

” তা তুমি একটু তাড়াতাড়ি ফিরো আজ বিদিশা ,  একসাথে বসে সবাই মিলে গল্প করা যাবে …”

” হ্যাঁ মা , আপনাকে একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার আছে …” মুচকি হেসে বলে বিদিশা ।

আর দেরী করলে চলেনা  , তাই কথা না বাড়িয়ে রাস্তায় বেরোতেই কিরকম সব কিছু অন্যরকম লাগে রাধিকার । দীর্ঘ পঁচিশটা বছর।এই পথ দিয়ে  চলা …সেই একই সময়ে বাস ধরে অফিসে যাওয়া …এই রুটিন আর নেই কাল থেকে । এত্তখানি বাড়তি সময় নিয়ে কী করবেন তিনি ? সময়ের ভার দুঃসহ হয়ে উঠবে না তো ? শেষ বারের মত যেন স্মৃতির আয়নায় সমস্ত খুঁটিনাটি ধরে রাখতে  চেয়ে তৃষ্ণার্ত ভাবে তিনি চেয়ে থাকেন বাসের জানালা দিয়ে ।

অফিসে ঢুকতেই হই হই করে ওঠে সমীর , কেয়া , রাকা ।সব অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে , সৌম্যর চেয়ে ছোট বৈ বড় নয় , যদিও সম্বোধন করে দিদি বলে । খুব স্নেহ করতেন ওদের দলটাকে তিনি । চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন বড্ড বেশী মিস্‌ করবেন তিনি এই টেবিল-চেয়ার , পুরোনো আদ্যিকালের অনবরত   ঘ্রর্‌র্‌র্‌ আওয়াজ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে ঘুরতে থাকা ফ্যান , ঘুলঘুলির চড়াই-এর বাসা , অবিরত চেনামুখ গুলি…ধূলো পড়া ফাইল…সব স-অ-ব…চোখ টা জ্বালা করে ওঠে । এই সেরেছে , কেঁদে ফেলবেন নাকি এই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে গুলোর সামনে …প্রাণপনে মুখ হাসি আনেন তিনি । ” তা তোরা সব মন দিয়ে কাজকম্ম করিস কিন্তু , বুঝলি ।আর মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করিস ।এখন তো  কী সব  ‘ অ্যাপস্‌ ” বেরিয়েছে …কথা বলতে পয়সা লাগেনা  ”

” বাব্বা , রাধিকাদি হোয়াটস অ্যাপ এর খবর রাখো …কী ব্যাপার !! ”  বরাবরে ফাজিল  রাকা হিহি করে হেসে ওঠে ।

” থাম রে পাকা মেয়ে …ছেলে বলে তাই এসব কানে আসে ” মুহূর্তেই চারপাশের বাতাস একটু হালকা লাগে …

সারাদিন অসংখ্য শুভেচ্ছা , টুকরো স্মৃতিচারণ , হাসিঠাট্টার মধ্যে দিয়ে দিনটা শেষ হয়ে আসে একসময় …সবাই মিলে একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল…পুরনো সহকর্মীরা অনেক কথা বললেন , উপহারে হাত ভরে উঠছিল রাধিকার কিন্তু শত অনুরোধেও তিনি কিছু বলতে রাজী হলেননা…ভয় হচ্ছিল , নিজেকে সামলাতে পারবেননা , ঠিক কেঁদে ফেলবেন ।

আস্তে আস্তে ভীড় পাতলা হতে শুরু করলো । সকলেরই বাড়ি ফেরার তাড়া , শুধু রাধিকার সামনে অনন্ত অবসর । রাকা এসে বলল ” চল তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দি  , একা একা এত জিনিস নিয়ে ট্যাক্সি তে উঠতে পারবেনা তুমি ” …

এগোতে যাবেন এমন সময় চেনা স্বর ” তুমি তো উল্টোদিকে থাকো রাকা ,অসুবিধে হবে তোমার ফিরতে , আর দিনকাল ভালো না । আমি পৌঁছে  দিয়ে আসছি রাধিকা কে ” পেছন ফিরে না তাকিয়েও বুঝতে পারলেন রাধিকা …আদিত্য ।

রাকা কী বুঝলো কে জানে , হাসি মুখে ‘বাই’ বলে চলে গেল ।

ট্যাক্সির সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মত হলদে বাড়িটার দিকে তাকালেন রাধিকা । কত সময় ভেবেছেন কবে এই গোলামির নাগপাশ থেকে মুক্তি পাবেন আর আজ যখন সত্যিই ছুটি পেলেন কেন এমন ভারী হয়ে আসে পা ? হৃদয় ? কেন মনে হয় জীবন থেকে সমস্ত রস টুকু কে যেন শুষে নিল ? শুধুই কী অর্থনৈতিক চিন্তা ? নাকি অনেকদিনের একটা অভ্যাস কে ছেড়ে যাওয়ার অস্বস্তি …

ট্যাক্সিতে উঠে আদিত্যর দিকে চোখ পড়ে গেল । তার দিকেই তাকিয়ে আছে , মুখে স্মিত হাসি । বয়সের আচঁড় পড়েছে মুখে কিন্তু হাসিটা বদলায়নি । এক ছেলে , এক মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার । ” হাসছো যে ? ” না বলে থাকতে পারেন না তিনি ।

” না  , ভাবছি অর্ক আজ থাকলে বাড়িতে খেতে ডাকতো শিওর ”  হাসিটা আরেকটু চওড়া হয়  আদিত্যর ঠোঁটে কিন্তু রাধিকা আর সামলাতে পারেননা । চোখে জল উপ্‌চে আসে । বিব্রত হয়ে পড়ে আদিত্য ,” আরে , একি , তুমি তো অনেক শক্ত মেয়ে রাধিকা  । ” পিঠে সান্ত্বনার হাত রাখতে গিয়েও সরিয়ে নেন আদিত্য ; পুরোনো ক্ষত আজও তাঁর কাছে দগ্‌দগে ।

প্রায় নীরবেই কেটে যায় বাকি রাস্তা । অনুরোধ সত্ত্বেও ভিতরে না ঢুকে পরে একদিন আসবে বলে ওই ট্যাক্সিতেই ফিরতি পথ ধরে আদিত্য। একটা না-বলা গল্প , না -দেখা স্বপ্ন…একটা অধ্যায় শেষ হল আজ ।

উপহারগুলো খুলতে গিয়েও রাধিকা থমকালেন । থাক , বৌ-ছেলে ফিরলে নাহয় একসাথে খুলে দেখা যাবে ; তাড়াতাড়ি ফিরবে নিশ্চয়ই আজ । বিদিশা মেয়েটা খারাপ নয় , কখনও কটু কথা বলেনি তাঁকে । অবশ্য তিনিও  ওদের কোন কাজেই মাথা গলান না । সৌম্য যখন নিজে পছন্দ করে বিয়ে করল তখনও তিনি কিছু বলেননি । কেন-ই বা বলবেন ? তাঁরা নিজেরাও তো প্রেম করেই বিয়ে করেছিলেন । মেয়েটা অফিসে হাড়-ভাঙ্গা খাটুনি খাটে । নাঃ , কাল থেকে ওকে আর কোন কাজই করতে দেবেননা  রাধিকা । সময়ের তো অভাব নেই তাঁর এখন।
সাত-পাঁচ ভাবনার মধ্যেই ডোর-বেলের পাখি ডেকে ওঠে । দুজনে একসাথেই ফিরেছে  । সৌম্য ঢুকতে ঢুকতেই প্যাকেট গুলো ধরিয়ে হাঁক পাড়ে  ” শীগগির খাবা্রটা বাড়ো মা  ,পেট জ্বলে যাচ্ছে ! তারপর তোমার গল্প শুনছি ” ।

খেতে  বসে বিদিশা উচ্ছ্বসিত , ” মা কত্তকিছু গিফট পেয়েছেন তো ! মায় একটা মাইক্রো ওয়েভ  !  আর কি কি হলো বলুন  ”

হাসেন রাধিকা  ” বলছি বলছি , আগে তোমরা বলো ।কী সারপ্রাইজ দেবে যেন বলছিলে ? ”

পরিবেশটা কী সামান্য বদলে যায় আচমকা ? ধরতে পারেননা তিনি । দু-সেকেণ্ড পরে চামচ দিয়ে চিলি-চিকেনের একটা পিস্‌ গেঁথে নিয়ে সৌম্য বলে …” তোমাকে বলা হয়নি মা , গত দু-মাস ধরে একটা বড় প্রোমোশোনের জন্য প্রাণপণ ট্রাই করছিলাম , সেটা গতকাল কনফারমড হয়েছে ; এখন বলতে পারো আমি আমার অফিসের দু-নম্বর পজিশনে …”

” বাহ্‌ , এতো দারুণ খবর রে , সত্যিই সারপ্রাইজ , তোর বাবা খুব খুশী হতো আজ থাকলে ”

” হ্যাঁ মা , কিন্তু এর জন্যে অফিস আমাকে একটা ট্রেনিং -এ পাঠাতে চায় …এক সপ্তাহের মধ্যেই যেতে হবে ”
” তা বেশ তো … যা না … আমরা বৌমা – শাশুড়ি দিব্যি থাকবো ”
” উফ্‌ মা , ” এবার যেন একটু অধৈর্য লাগে সৌম্যকে …
” আমাকে মিনিমাম্‌ দু-বছরের জন্য যেতে হচ্ছে ,  প্রয়োজনে সেটা পাঁচ বছরও এক্সটেন্ড হতে পারে…   নিউ জার্সি …ফ্যামিলি অ্যালাউড তাই বিদিশা ও সঙ্গে যাচ্ছে  ”

হেমন্তের হাল্কা হিমেল বাতাস বয়ে আসে জানলা দিয়ে , বয়সজনিত কারণেই হয়ত , খুব শীত করতে থাকে রাধিকার । সকালের দেখা সেই পাতলা কুয়াশার স্তরটা আবার নেমে আসতে থাকে …এবার চারপাশে ঘিরে নেয় যেন  , একা বসে থাকেন তিনি । অবসর জীবন  । অখণ্ড সময় , থমকে দাঁড়িয়ে ।

“লেখালেখি” ওয়েবজিন , শ্রাবণ ১৪২১ সংখ্যায় প্রকাশিত
http://www.lekhalekhi.in/lekhalekhi/

ছোটবেলায় ঠাকুমা-দিদিমার আদরে মানুষ হওয়ার সৌভাগ্য সকলের ক্ষেত্রে হয়না , আমার হয়েছিল এবং যে প্রশ্নাতীত প্রশ্রয় আমি তাঁদের কাছে পেয়েছিলাম তাতে আদরে বাঁদর ( এক্ষেত্রে বাদঁরী ) হয়েই প্রায় গেছিলাম বলা চলে।  আজ হঠাৎ খুব বেশী করে ঠাকুমার কথা মনে পড়ছে কারণ আমার বাংলা ভাষা শিক্ষার শুরু তাঁর কাছেই । অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন এবং তাঁর রূপের খ্যাতি এমন ছিল যে তাঁর আসল নামটাই তার তলায় চাপা পড়ে গেছিল , সকলেই তাঁকে সুন্দর বউদি, সুন্দরদি ,সুন্দরকাকীমা  এই জাতীয় সম্বোধন করত । সেই যুগেও যথেষ্ট লেখাপড়া জানা মহিলা ছিলেন, বাংলায় তাঁর ব্যুৎপত্তি ছিল রীতিমত সমীহ উদ্রেককারী এবং  ইংরেজিতেও মোটামুটি অক্ষরজ্ঞান ছিল ।  কোন এক জটিল কারণে সেই বয়সে আমার মাথায় এসেছিল যে ঠাকুমা যখন আমায় বাংলা পড়াচ্ছেন তখন আমারও তাঁকে কিছু শিক্ষাদান করা উচিৎ …অতএব একটি এ-বি-সি-ডি ‘র বই নিয়ে এক রোদ-ঝল্‌মল সকালে শুরু হয়ে গ্যালো আমার শিক্ষকতা ! যে সময়ের কথা বলছি তখনও ঠাম্মি সব কাজ নিজে করেন, বয়েস তখন আচঁড়াতে শুরু করেছে ঠিকই কিন্তু থাবা বসাতে পারেনি …শুধু তিনি কানে একটু কম শুনতেন আর এই সামান্য দোষের জন্য তিনি বড় কম বকুনি খাননি আমার কাছে ।  হয়ত আমি বললাম ” লীলা ইজ প্লেয়িং হার গীটার ” , তিনি শুনে শুনে বললেন ” নীলা ইজ প্লেয়িং হার হীটার ” ব্যস্‌ !! আর যায় কোথায় ! ”ইয়ু সিলি গার্ল , পুট ইয়োর হেড ডাউন ” | তিনিও বিনা বাক্যব্যয়ে মাথা নীচু করে থাকতেন যেন সত্যিই তিনি অপরাধী । এই পড়াশোনার সেশনটা বেশির ভাগ সময়েই চলত বাবা-মার চোখের আড়ালে কারণ স্পন্ডিলিসিস নিয়ে তাঁকে অমন মাথা নীচু করিয়ে রেখেছি দেখলে আমার দিদিমণিগিরির অবসান ঘটা ছিল অবশ্যম্ভাবী । এরকমই বেশ চলছিল কিন্তু একদিন পালে বাঘ পড়ল । আমার পড়া শেষ হওয়ার পর যথারীতি আমার তাঁকে পড়ানো শুরু হয়েছে এবং ” জেব্রা ” বানান লিখতে পারেননি বলে আমি তাঁকে সবেমাত্র নিল ডাউন করবার আদেশ দিয়েছি …এমন সময় আচমকা বাবার গর্জন শুনতে পেলাম ” এগুলো কী হচ্ছে ? ঠাম্মিকে  অমন ভাবে কেন বসিয়ে রেখেছ ? জানোনা ঠাম্মির হাঁটুতে ব্যথা ? ” ভয়ের চোটে আমার মুখ দিয়ে কোন কথাই বেরোচ্ছেনা ( ঠাম্মির সমস্যাগুলো আমি অবশ্যই জানতাম কিন্তু তার ফলে কোন্‌ কোন্‌ কাজ তাঁর করা নিষেধ সেই ব্যাপারে ওই বয়সে আমার কোন জ্ঞানই ছিলনা ) এমন সময়ে ঠাম্মি ঝাঁঝিয়ে উঠলেন ” তর কী হইসে ? আমারে হেইদিন বিম্‌লার মায় কইল মাঝে মাঝে হাঁটু ম্যুইড়া বইবেন ,তাই বইয়া আSI…তুই যা তর কাZE …সুদুসুদু মাইয়াডারে বকত্যাছোস্‌ ”
সেদিন বুঝিনি কিন্তু আজ বুঝতে পারি কি অত্যাচারটাই না আমি করতাম তাঁর ওপর ।

পাতার পর পাতা আমি লিখে যেতে পারি ঠাম্মিকে নিয়ে …ঠাম্মির স্মৃতি নিয়ে এবং তার বেশীরভাটাই সুখ-স্মৃতি । তাঁর কাছে শোনা সেইসব অজানা রাজ্যের ভূত-পেত্নী-জ্বিন- পরীরা যারা থাকে সুদূর তেপান্তরের জ্বলজ্বলে জোনাকি জ্বলা ঝুপ্‌সি অন্ধকারে…তাদেরকে পেরিয়ে যেতে হয় সাহস করে …ভয় পেলে চলবেনা …ভয় পেলে আর আলো ঝলমল সব-পেয়েছির-রাজ্যে পৌঁছনো যাবেনা । তাঁর কাছে শোনা রূপকথার গল্প কখনো আমাকে ভয় শেখায়নি , শিখিয়েছে ভয় কে জয় করতে । তিনি গল্প শেষ করতেন এই বলে ” তাইলে বোঝলা ত মনু , ভয় পাইবা না , ভয় পাইলে আর কিস্যু করনের পারবানা । ভীতুরা ভয়েই মরতাম…আসল মরণের আগে ” | না… শেক্সপিয়ারের নাম-ও তিনি শোনেননি…. তবু জানতেন জীবনের মূল মন্ত্র ।

আর জানতেন বাংলাদেশ । যে দেশ থেকে তাঁকে চলে আসতে হয়েছে ,ফেলে আসতে হয়েছে শৈশব এবং কৈশোর বেলার সমস্ত স্মৃতি  সেই দেশ কেই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি নিজের দেশ বলে ভাবতে ভালবাসতেন …বরিশালের গ্রাম আর তার গল্প ।তিনি বলে যেতে পারতেন অক্লান্তভাবে …তাঁর চোখ জুড়ে তখন হয়তো থাকত সেই সারি সারি আমগাছ, বাঁধানো পুকুরঘাট…আ চৈ , আ চৈ ডাক ভেসে আসত দুর্বল কানে…।

ঠাম্মি নেই আজ বহু বছর । জীবন ভুলিয়ে দিয়েছে শোকের প্রাবল্য এবং উত্তাপ… তবু আজও কোন কোন নির্জন দুপুরে যখন মন খারাপের জানালার কাছে বসে থাকি আচমকা কানে বেজে ওঠে ” মন খারাপ আবার কী…হ্যায়রে বুঝাও…ZA বোঝাবা হেইডা তাই-ই বোঝবো …হেইডা হইল গিয়া তুমি নিজেই বোঝলা ? “…মাথা নাড়ি আমি…হ্যাঁ , বুঝেছি…না কি…বুঝিনি…ক্যানো জানি ঝাপসা হয়ে আসে চারপাশ …।

ক্রমশঃ