Posts Tagged ‘গল্প’

gsrabani51_pic

ঠিক কীভাবে যে গাড়িটা স্কিড করেছিল ঠিকঠাক মনে করতে পারেনা কিছুতেই রচনা। পেছন পেছন আসা ট্রাকটার ওপর বোঝাই করা মাল ত্রিপল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা, ওপরে বসে আছে কয়েকজন ছোকরা গোছের খালাসী। মাঝেমধ্যেই তারা  সরস যৌনগন্ধী টিপ্পনী ছুঁড়ে দিচ্ছিল রচনাদের উদ্দেশ্যে। সেগুলো সব শোনা বা বোঝা না গেলেও অঙ্গভঙ্গি বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না দুজনের কারোরই।  মেজাজ হারাচ্ছিল অভি, রচনা কড়া চোখের ইশারায় বারণ করছিল রিঅ্যাক্ট করতে। দিনকাল ভাল নয়, কোত্থেকে কী হয় বলা যায়না…সন্ধ্যার ঝোঁকে এইসব রাস্তা, হাইওয়ে কানেক্টর বলা যায়,  খুব একটা ব্যস্ত নয়। হুশহাশ গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ কারো সাহায্যের জন্য দাঁড়াবে এমন ভাবার কোন কারণ নেই।

আসানসোল থেকে বেরোতেই দেরী হয়ে গিয়েছিল ওদের। রাতের আগেই কলকাতা ঢুকবে বলে অভি চালাচ্ছিলও বেশ ভাল স্পীডে, আর, আশ্চর্যজনকভাবে ট্রাকটা যেন ওদের ওভারটেক করতেই চাইছিল না।  এই রাস্তায় এভাবে ট্রাকের মাথায় বসে থাকা যথেষ্ট বিপজ্জনক- এই বোধও কী নেই ওদের! অভি দু-একবার সামান্য স্লো করে ইশারা করলেও পাত্তা দেয়নি ড্রাইভার। হাল ছেড়ে দিয়ে অভি যথাসম্ভব স্পীড তুলেছিল। হঠাৎ একটা বাঁকের পরেই আলো-ঝলমলে একটা ধাবা দেখে আচমকা ব্রেক কষেছিল, প্রায় পরক্ষণেই বিকট স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ আওয়াজ তুলে ওদের নীলরঙা ওয়াগনারের রঙ চটিয়ে সেটাকে প্রায় উলটে দিয়ে সামনের বিরাট গাছটাতে ধাক্কা মেরেছিল ট্রাকটা। রচনা ওই স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ অবধি মনে করতে পারে সব…তারপর অন্ধকার।

নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফেরার দুদিন পরে অভি বলেছিল ঘটনাটা। গাছে ধাক্কার অভিঘাতে উপরে বসা তিনজনই ছিট্‌কে পড়েছিল রাস্তায় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছন পেছন আসা আরেকটা লরী পিষে ফেলে ওদের।

“তুমি কি ইচ্ছে করেই ওভাবে ব্রেক কষেছিলে, অভি?”
আকুল স্বরে করা রচনার প্রশ্নটা শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল অভি।

“পাগল হয়ে গেছ নাকি? মানুষ খুন করেছি বলতে চাও? পুলিশ ইনভেস্টিগেশন হয়নি?… একশো আটরকম কথার জবাব দিতে হয়েছে…যারা ওখানে ছিল প্রত্যেকেই বলেছে দোষ ট্রাকটার…আর এখন কিনা তোমার কাছে এইসব আজগুবি কথা শুনতে হচ্ছে!!”

“কিন্তু…কিন্তু…তিনজন মারা গেছে… আর যে পেছনে ছিল? তার কী হল? বাঁচেনি না?”

হাঁ করে দু-সেকেন্ড রচনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অভি ধীরে ধীরে বলে,
“আর কেউ ছিলনা ওপরে, তিনজন; ড্রাইভার আর তার পাশে আরেকজন ছিল, তারা সাঙ্ঘাতিক ইঞ্জিওর্ড”

“কী বলছো কী! আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম যখন ট্রাকটা আমাদের গাড়ির গা ঘেঁষে ছেঁচড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পেছনে আরেকজন ছিল… কালো রঙের জামা-প্যান্ট, সাথে একটা কুকুর, সেটাও কালো রঙ…লাল জিভ বের করে পা চাটছিল… লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে হাত নাড়ল…”

“স্টপ ইট, প্লীজ। তোমার এইসব গালগল্প শোনার মানসিকতা নেই আমার… ট্রমা আমারও আছে, রচনা, কিন্তু তাই বলে তোমার মতন মাথা খারাপ হয়ে যায়নি আমার…আই জাস্ট কান্ট টেক এনি মোর অভ দিস্‌ বুলশীট”

সেই শুরু।

*******

মাস সাতেক পর, রচনার ছোটকাকার পঁচাত্তর বছরের জন্মদিন খুব বড় করে পালন করা হবে বলে ওরা সব ভাইবোনেরা মিলে ডিসিশন নিল। এই কাকা অবিবাহিত, ভাইপো-ভাইঝিদের বড়ই প্রিয় এবং আদরের। ্সকাল থেকেই বাপের বাড়িতে রচনা। হই-হুল্লোড়, আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়ার দাপটে সাত মাস আগে ঘটে যাওয়া ভয়ানক স্মৃতিটা মন থেকে ব্লটিং পেপার দিয়ে কেউ শুষে নিয়েছে যেন। অভিও দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে খুড়শ্বশুরের সঙ্গে বিয়ার নিয়ে বসে হাল্কা রসিকতা করে চলেছে…অন্যান্য জামাই, শালারাও সঙ্গে যোগ দিয়েছে। মাঝে মাঝেই ছোটকাকার উদাত্ত হা-হা হাসির আওয়াজ ভেসে  আসছে দোতলার  হল থেকে। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে রচনা ছুটল সদর দরজা খুলতে।

বড়পিসি বাতের ব্যথায় কেঁপেঝেঁপেও এসে হাজির হয়েছে। কত্তদিন বাদে দেখা…জড়িয়ে ধরে রচনা পিসিকে।

ঠিক সেই সময়েই চোখে পড়ে সদর দরজার উল্টোদিকের পাঁচিলে বসা লোকটাকে।

কালো রঙের জামা-প্যান্ট, সাথে একটা কালো কুকুর… লাল জিভ বের করল না কুকুরটা?…পা-টা কি চাটছে? লোকটা হাসছে…হাতটা নাড়বে বলে ওঠাচ্ছে … পিসির গায়ের ওপরেই এলিয়ে পড়ে রচনা।

..আবার অন্ধকার… আবার নার্সিংহোম।

তবে এবার আর একা ফেরা নয়, সঙ্গে ছিল ছোটকাকার বডি। পিসির আর্তনাদ শুনে হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা স্লিপ করে যায় কাকার…ইন্ট্যারন্যাল হেমারেজ… কয়েক ঘন্টায় সব শেষ।

*******

অনেক চেষ্টা করেও অভিকে ঘটনাটা বলে উঠতে পারেনি রচনা। জানে যে, বিশ্বাস করবেনা, শুধু শুধু ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি…আজকাল একদম পারেনা এসব চাপ নিতে সে…

তিন দিন আগে, পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস দেশাইয়ের ছেলের বাচ্চা হয়েছে শুনে দেখা করতে গেছিল। মিষ্টি, ফুট্‌ফুটে একটা পুতুল যেন মেয়েটা। খোলা জানালা দিয়ে সটান চোখ গেল সামনের ব্যালকনিতে।

আবার… মৃদু হাসল বোধহয়…কুকুরটা লোলুপ লোল জিহ্বা বের করে তাকিয়ে আছে।

ঝট্‌ করে চোখটা সরিয়ে নেয়… কিন্তু জানত কী হবে।

বাচ্চাটা দু-দিন পরে মারা গেল। টাইফয়েড হয়েছিল নাকি… বোঝা যায়নি।

********

অভি প্রথমে কোন কথাই বললনা কিছুক্ষণ। মাথা নীচু করে কিছু ভাবছিল। যখন মুখ তুলল, তখন দু-চোখে মায়া মাখানো।
“আমায় ভুল বুঝোনা প্লিজ, কিন্তু তুমি বুঝতে পারছনা কী সাঙ্ঘাতিক একটা মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে তুমি যাচ্ছ। আমি জানি রচনা, এই ধরণের অ্যাকসিডেন্টের পর অনেক সময়েই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে… আর তুমি তো কিছু বুঝতেই দাওনি কখনো…শুধু কয়েকবার ব্ল্যাক-আউট…যাইহোক, আমি কালই ডক্টর সোমের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করছি, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে…কিছু ভেবোনা,সোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে।” হালকা করে একটা চুমু খায় অভি রচনার ভেজা গালে।

“আমি পাগল নই, অভি! মানসিক রোগ হয়নি আমার। আমি যা তোমাকে বললাম সব বর্ণে বর্ণে সত্যি। কীকরে বোঝাবো তোমাকে…লোকটা আসে, প্রতিবার, আমি জানি কিছু একটা ভয়ানক অমঙ্গল নিয়ে আসে ও…”

দুজনেই দুজনকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে চলে… শব্দ-প্রতিশব্দরা দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরতে থাকে, ঘুরতেই থাকে। তারপর একসময় প্রবল বিস্ফোরণে আছড়ে পড়ে। মাথার ভেতর প্রতিটি শব্দ বিস্ফোরণে ছিটকে আসা লোহার টুকরো…গেঁথে যেতে থাকে রচনার মগজে… শিরায়-উপশিরায়।

“পাগল, তুমি পাগল…মানসিক রোগী তুমি”

*********

গতকাল রাত্রে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে কখন যেন। টের পায়নি রচনা। এত ঘুম ঘুমোয় ও আজকাল যে কিছু টের পায়না। স্বপ্নও দেখেনা। কোথাও বেরোতে ভয় পায়। অভির সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ বললেই চলে। ডাক্তার দেখায়নি ও। কেন দ্যাখাবে? সব সত্যি, ও জানে…

তবুও আজ সকালটা অন্যরকম লাগছিল। অসময়ের বৃষ্টির ঝাপ্‌টায় বারান্দার গাছগুলো ভিজে চুপ্পুস। ইস্‌, জেগে থাকলে ও-ও দেখতে পেত, জলের ঝরোখার ওপারে ভিজতে থাকা  গাছগুলোর আনন্দ।  বহুদিন পরে হঠাৎ যেন বড় বেশী করে বাইরে বেরোতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ। বলবে কি অভিকে তাড়াতাড়ি আসতে?

ঘোরটা কেটে যায় অভির গলার আওয়াজে। আজকাল আর বাড়িতে ব্রেকফাস্ট করেনা অভি, বাইরেই খেয়ে নেয়। শুধু বেরোনর আগে নিয়ম করে একটা কথা রোজ জিজ্ঞেস করে…আজও সেটাই বলছে।

“যাবে একবার ডক্টর সোমের কাছে? প্লীজ?”

দমকা হাওয়ায় টবের গোলাপ গাছটা দুলে ওঠে, দু-ফোঁটা জল ঢেলে দিয়ে যায় আদর করে হাতের ওপর। অভিকে চূড়ান্ত হতবাক করে মাথা নাড়ে রচনা, যাবে।

হতভম্ব হয়ে কোন কথা না বলে রচনাকে  শুধু জড়িয়ে ধরে অভি; “রেডি হয়ে থেকো, ঠিক ছ’টা।”

আজ অনেকদিন পরে অভির যাওয়ার সময় সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ঠিক হয়ে যাবে সব, মনে মনে বলে সে।
ওই তো অভি গাড়ি বের করছে। বসলো স্টিয়ারিঙে…  হাত নাড়ছে হাসিমুখে।

অপস্রিয়মাণ গাড়িটার দিকে তাকাতে ঠিক তখনই…

পেছনে কালো জামা, কালো প্যান্ট পরা কে ও!

পাগলের মতন বেড্রুমে গিয়ে মোবাইলে অভির নাম্বার ডায়াল করে সে…আটকাতেই হবে অভিকে…

সামনে টেবিলে পড়ে থাকা অভির মোবাইলের রিংটোন ছাপিয়েও কানে আসে অনেক লোকের গলার আওয়াজ…অ-নে-ক  লো-ক… আর বীভৎস স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ…।

ফেসবুকের “আদার” ইনবক্স একটি স্বর্ণ খনি বিশেষ। নারী মাত্রেই জানেন এর তাৎপর্য‍্য। কত কিসিমের যে লোক হয় এই নেট দুনিয়ায়, তা বোঝার এবং জানার সহজতম উপায় এই “আদার”। আপনি আদার ব্যাপারি হন বা জাহাজের কারবারী, আউট অভ দ্য বক্স ভাবনাচিন্তা কাকে বলে এই ইনবক্স তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

এমনিতে সবাই জানে যে মেয়ে হওয়া এদেশে মোটামুটি একটা অপরাধের সামিল; এই মেয়েদের জন্যেই ধর্ষণের মতন একটা জঘন্য অপরাধ ঘটছে প্রতিনিয়ত; এই অসভ্য, হায়াহীন প্রজাতি কম কম জামাকাপড় পরে, সেজেগুজে দিনের বেলা তো বটেই এমনকি রাত্তিরবেলাতেও রাস্তায় ঘোরাফেরা করে পুরুষ কে প্রলুব্ধ করতে! কী সাংঘাতিক! শাড়ি-সালোয়ার প্রভৃতি সো-কল্ড ভদ্র পোষাকের বাবা-মেসো করে এরা জিন্‌স, হাপু, এমনকি গরম প্যান্ট পর্যন্ত অনায়াসে পরে ঘুরে বেড়ায়। এসব দেখে যদি পাঁচটা ছেলে একটু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাদের দোষ কোথায়?  আর একথা ব্যাদে আছে যে ছেলেদের মন মেয়েদের মতন প্যাঁচালো নয়, হুঁ হুঁ বাওয়া, ওদের মনে যা, মুখেও তাই।  তাই রাস্তায় এর’ম মেয়ে দেখে যদি মধ্যমা অটোমেটিক্যালি উঠে যায় বা চাট্টি রসের কথা মুখ থেকে বেরোয়- তাহলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়, বুঝিনা।

এত্তসব ট্র্যাফিক আইন হয়েছে, লাইট রে, পুলিশের প্যাট্রোল ভ্যান রে, ক্যমেরা রে, দাদুগীতি রে- আরে বস্‌, কয়েকটা ঝক্কাস দেখতে মেয়ে-পুলিশকে (ইয়েস, আগে মেয়ে, পরে পুলিশ, স্বাভাবিক নিয়মেই) ঝিঙ্কু ড্রেস পরিয়ে মোড়ে মোড়ে দাঁড় করিয়ে দাও, মার্সিডিজ টু রিক্সা , স-ও-ব দেখবে ঠিক জায়গামতন থামছে, চাখছে, যাচ্ছে। Total egalitarian concept- সব্বাই এক, আমরা সবাই রাজা… ইত্যাদি প্রভৃতি।

আচ্ছা, আচ্ছা, যা বলছিলাম… আসলে এই টপিক নিয়ে লিখতে বসলেই আমি একটু, ইয়ে মানে, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি আর কী। ক্ষমাঘেন্না করে দেবেন নিজগুণে…
যাইহোক, হচ্ছিল “আদার” ইনবক্স এর কথা। আমি একদিন এক সুন্দর, সুবাসিত সকালে একটি মেসেজ পেলাম, একজন ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে জানতে চেয়েছেন, আমি শুতে কত নিয়ে থাকি। এতে আমি যারপরনাই অবাক হয়ে রিপ্লাই দিয়েছিলাম যে আমি এমনিতেই ঘুমাতে ভালবাসি, তার জন্য কেউ কখনও টাকাপয়সা দেয়নি আমাকে। ওনার বাড়ির মহিলারা শোয়া বা ঘুমানোর জন্য চার্জ করেন বলে সবাইকে অমন ভাবা ঠিক না। এতে করে কেন জানিনা উনি ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে গেছিলেন। আরো দু-চারটে কথার পর আমাকে ব্লক করে দিলেন অথচ আমি বুঝতেই পারলাম না যে আমার দোষটা কোথায়!

তাছাড়া, প্রত্যেক মেয়েই কোন না কোন সময় মেসেজ পেয়ে থাকে যে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কেউ তাকে মডেল বানাতে চায় বা ফোটোশুট, বা  নিদেনপক্ষে, কোন বিশেষ পোজে তার ছবি দেখতে চায়। সুদূর মরক্কো থেকে শুরু করে নিকারাগুয়া, পারস্য এমনকি মঙ্গল্গ্রহ থেকেও এমত অনুরোধ এলে কোন মেয়েই অবাক হয়না। হওয়ার কথাও নয়, আমরা তো জানি, “আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী” … কিন্তু ভুসুকু এও বলেছেন যে, “মূঢ়া হিঅহি ণ পইসঈ” অর্থাৎ গাড়লের মগজে এতসব ঢোকেনা, তাই অবাক হওয়া বাদ দিলেও মাঝে মাঝেই মেয়েরা এইসব নিয়ে চিল্লামিল্লি করে, মানে মেয়েদের তো বুদ্ধিশুদ্ধি টেন্ডস টু জিরো …তাই আর কী…। এসব ছাড়াও, আমি_শুধু_চেয়েছি_তোমায়, বল্গাহীন_ভালবাসা, বিছানায়_বক, Sexy_Stud, Eternal_erection, DiscoDick- এরা সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে খোঁজখবর নিয়ে থাকে, বিচিত্র বানানে “ভালবাষা” জানায়।  Lyf roxxx!

তবু, এতকিছুর মধ্যেও ভরসার কথা এই যে, ইহজীবনে যত এরকম “হাম তো (মহা) পুরুষ হ্যায়, হাম ক্যা নেহি কর স্যকতা, সবকুছ জায়েজ হ্যায়” টাইপ ছেলে দেখেছি, তার দ্বিগুণ দেখেছি ঠিক মানুষের মতন পুরুষ। নিজের বাবা, দাদা,কাকা, স্বামী বা ছেলের কথা বাদ দিলেও বন্ধুস্থানীয় তাদের সংখ্যাটাও বড় কম নয়। এইসব নিয়েই তো জীবন, আমাদের জীবন; সবাই “ওম্মা, দ্যাখ কী ভাল, তকাই আমার” হবে, আয় তবে সহচরী গাইবে নেচে নেচে, তাই হয় নাকি? না হওয়া উচিৎ ।

বেঁচে থাক আমার নারীত্ব, আমার মেয়েলী সারল্য, আমার অকারণ হাসি, (পড়ুন ন্যাকামো) আমার চকিত সতর্কতা, আমার সঙ্গীর পায়ে-পা মিলিয়ে এগিয়ে চলার আনন্দ। সে পিছিয়ে পড়লে দাঁড়াব তার জন্য, কারণ আমি জানি সেও ঠিক তাই-ই করবে। পুনর্জন্ম আছে নাকি? কেউ জানেন? থাকলে, অগলে জনম মে মোহে বিটিয়া হি কিজো।

কলিযুগ শেষ প্রায়, দেশের এই দুর্দিন
দাদু খায় নাতি খায় ব্রিটানিয়া থিন্‌
“ইন্টলারেন্ট, ইন্টলারেন্ট”- ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
টাকা মাটি, মাটি টাকা, কড়োরপতি কওন?
নীলাকাশ , রোদ-জল, ঘাস-পাতা-পাখি
বিবেক তো ওবেরয়, নিদ্রিত আঁখি
ফাস্ট ফুড, পাঁচতারা, গুড় আর রুটি
খালি পেট বসে ভাবে কবে পাবে ছুটি!
চলতা হ্যায় সবকুছ, কৃষ্ণের বাঁশি
খ্যাক খ্যাক, খিক খিক, হায়নার হাসি
যা আছে, থাকবেও, স্থবির এ প্রবাহ
আজ রাতে প্যাঁচা আর ময়ুরের বিবাহ!

আমাদের এক দাদা কাম বন্ধু রঞ্জনদার দুটি ভয়ানক বদভ্যাসের একটি হল যে কোন কিছুর নাম ভুলে যাওয়া এবং অন্যটি, আরো ডেঞ্জারাস, তা হল, কলকাতার বাইরে গেলেই হিন্দি বলা!
শোনা যায় মেয়ে ছো্টথাকাকালীন বৌদি  একবার রঞ্জনদাকে দোকানে পাঠিয়েছিলেন এবং তিনি দোকানে গিয়ে জনি ওয়াকার বেবী পাউডার চাওয়াতে দোকানদার ভদ্রলোক যারপরনাই বিরক্ত এবং বিব্রত হয়েছিলেন। আমরা এটা অবিশ্বাস করিনা কারণ নিজেদের অভিজ্ঞতায় ভাইজাগে দেখেছি রঞ্জনদাকে গাড়ি ঠিক করতে পাঠানো হয়েছে ওখান থেকে ঋষিকোন্ডা যাবো বলে, প্রায় চল্লিশ মিনিট পর উনি ফিরে এসে তর্জনগর্জন করতে লাগলেন এই বলে যে ওরকম কোন জায়গা নেই এখানে। আমরা হতবাক! বৌদি’র সন্দেহ হওয়াতে শুধোলেন, “কী নাম বলেছো তুমি?” মারাত্মক কনফিডেন্স নিয়ে রঞ্জনদা বললেন , “ক্যানো, অ্যানাকোণ্ডা”!

আরেকবার নাকি দিল্লীতে কোন অটোওয়ালাই ওনাকে নিচ্ছিল না। নেওয়ার কথাও না কারণ প্রতিবার-ই উনি বলছিলেন,” ভাইসাব, মুঝে চাঁদনী চক পে গিরনা হ্যায়”। মূর্খ অটোওয়ালা গুলো ওনাকে স্যুট-বুট পরা বেওড়া মাতাল ভেবেছিল বোধহয়।

পুঁচু এখন সর্বদাই নিজের হাবভাবে একটা ভারিক্কি ভাব আনার চেষ্টা করে থাকে। কোন এক অজ্ঞাত কারণে তার ধারণা হয়েছে যে এর ফলে লোকে তাকে ‘কুট্টি, পুঁচকু, খুকু’ এসব বলা বন্ধ করবে। যদিও এরকম কিছু ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই এবং সেই কারণে মানবজাতির বুদ্ধি-বিবেচনার প্রতি তার বেশ বিরক্তি জন্মেছে।

অবশ্য পুঁচু আজকাল যথেষ্ট বড়দের মতোই আচরণ করে, গতবারের মতন এবার আর ঠাকুরের ভোগে চিকেন খুঁজে বৃথা সময় নষ্ট করেনি বা ক্যাপ-বন্দুক দিয়ে আরশোলা মারবার চেষ্টা করেনি। মা’র সঙ্গে ঠাকুর বরণ করতে গেছিল, সেখানে এক মাসীমা থালায় ‘জলভরা’ সন্দেশ সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন; অবশ্যই মা দুগ্‌গার মিষ্টিমুখ করাবেন বলে- তা পুঁচু যখন প্রথমবার গম্ভীর কিন্তু দৃঢ় স্বরে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে জানাল,”আমি ওই সন্দেশগুলো খেতে ভালবাসি”, তখন তিনি মিষ্টি হেসে তার মাথায় হাত বোলালেও দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বার একই কথা শুনে বাক্স থেকে একটা তুলে দিতে বাধ্য হলেন। “মুখে মধু, মনে বিষ”- এই আপ্তবাক্য ঠিক কী ধরণের মুখ দেখে বানানো হয়েছিল, মাসীমা’র মুখ দেখলে তখন বোঝা যেত!
পুঁচুর মা অত্যন্ত লজ্জিত হলেও পুঁচুর মধ্যে বিন্দুমাত্র হেলদোল দ্যাখা যায়নি এবং হাতে রস লেগে গেছিল বলে নাকি সে হাতটা অন্য একজনের আঁচলে মুছে নিয়েছিল। এসব-ই পুঁচুর মা’র জ্বলন্ত চোখ সহ অসহায় মুখ নিয়ে আমার কাছে বলছিলেন -_-

যাই হোক, এহ বাহ্য। ভাইফোঁটার দিন একমাত্র মামা আসায় পুঁচুর আহ্লাদে আটখানা। মামা আবার তার জন্যে নতুন একটা বার্বি আর ফেয়ারি টেল্‌সের বই-ও এনেছিল, এবং অবশ্যই চকোলেট। তাছাড়া প্রচুর ভালমন্দ রান্না হয়েছে, রাতে খেতে যাওয়ার কথা আছে- সব মিলিয়ে যাকে বলে একটা তূরীয় আনন্দের ব্যাপার।

ফোঁটা দিয়ে মামা’র হাতে পুঁচুর মা একটা প্যাকেট ধরালেন, মামা লজ্জা-খুশি মিশ্রিত মুখে প্যাকেট খুলতেই বেরিয়ে পড়লো একটি নামী কোম্পানির দামী রিস্টওয়াচ। “কী যে করিস দিদি, এত দাম দিয়ে কেন যে কিনিস এসব……” বলতে না বলতেই চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে গম্ভীর স্বরে পুঁচু’র মন্তব্য, “বাবাও মা-কে ঠিক এই কথা বলছিল রাত্তিরে…আমি শুনেছি”।

শ্যালক  জামাইবাবুকে মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ‘শ্যালক’ সম্বোধন করে কি কি বলতে পারেন তা সহজেই অনুমেয় :3