Posts Tagged ‘গল্প’

চিংড়ি

Posted: সেপ্টেম্বর 15, 2017 in গদ্য হাবিজাবি
ট্যাগসমূহ:, , ,

প্রতিদিন এই সময় দোকানের পেছনে ছোট্ট খুপরি ঘরটায় বসে মোমবাতির আলোয়  পড়া মুখস্থ  করে চিংড়ি। এমন নয় যে ওদের এই আধা গ্রাম-আধা শহর চন্দ্রপুরে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। খুব আছে; ইলেক্ট্রিসিটি আছে, রবিবারের হাট আছে, সবজির আড়ত আছে, সাহাবাবুর পেল্লায় লাল ট্র্যাক্টর আছে, একপাশ দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাওয়া একটা অখ্যাত নদী পর্যন্ত আছে। নেই শুধু চিংড়িদের টাকা। চিংড়ি জানে, ওরা খুব গরীব। বাবা অনেক বলেকয়ে পাশের চন্দ্রকাকুর  চালের দোকান থেকে লাইন টেনে একটা টিম্‌টিমে বাল্ব জ্বালায় দোকানের ভিতরে। তাতে যেন অন্ধকারগুলো সন্ধ্যার পর আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। তার মধ্যেই বাবা উনুন ধরিয়ে চা বানিয়ে খদ্দেরদের দেয়। আর খদ্দের কেই-বা। এই তো এখানের লোকজন সব। কজন-ই বা এই মফস্বলে দোকানে চা খাওয়ার বিলাসিতা করে। তার ওপর বাবা ভাল চা বানায়, বাবাকে খুব ভালবাসলেও একথা চিংড়ি বলতে পারবেনা। তাই তাদের দোকান প্রায় চলেনা বলতে গেলে। বাবা মাঝে মাঝেই মাথা নেড়ে নেড়ে বিড়বিড় করে আর বলে, “আর বাঁচতে হবেনা, আর পারবনা”।

সেইরকম সময়ে খুব মন খারাপ হয় চিংড়ির । তার তো দিব্যি লাগে বেঁচে থাকতে। সকালবেলা উঠে পুকুরধারে যখন দাঁত মাজতে যায়, তখন দেখে একটা জলফড়িং অকারণে ঘাস বেয়ে উঠছে আর নামছে, নামছে আর উঠছে, কোনদিকে তাকাচ্ছে না। অবাক হয়ে চেয়েই থাকে সে। কী সুন্দর পরীর মতন পাখা ফড়িংটার, রোদ পড়ে ঝিলমিল করছে। পরীদের পাখা মনে হয় আট্টু বড় হয়। নয়ত আকাশে ওড়ে কী করে! এইসব ভাবতে ভাবতেই একটা ঢোঁড়া সাপ পায়ের পাশ দিয়ে হিলিবিলি কেটে জলে নেমে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে পুকুরপাড়ের বন-কলমির ঝোপ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নামে ইঁট রঙের বেজিটা, বেকুবের মতন চেয়ে থাকে জলের দিকে। ঠিক এই সময়েই বাবার গলা ভেসে আসে।
– “হল তোমার? নাকি সারাদিন জলের দিকে চেয়েই কাটিয়ে দেবে? ইশ্‌কুল যেতে হবেনা আর।”

এইভাবেই প্রায় রোজ শুরু হয় চিংড়ির সকাল। ভাল লাগে তো তার। খুব ভাল লাগে বেঁচে থাকতে।

এমনকি, এই যে এখন সন্ধ্যেবেলা কাঁপা কাঁপা মোমের আলোয় বসে সে ইতিহাস পড়ছে, এও তার ভাল লাগে। থোকা থোকা অন্ধকার জমে থাকে ঘরটার চার কোণায়। মাঝেমাঝেই দু-একটা জোনাকি রাস্তা ভুল করে ঢুকে পড়ে আর সব্‌জে আলো দপ্‌দপ্‌ করে ওঠে। চিংড়ি তখন স্পষ্ট যেন দেখতে পায় সেই আদিম মানুষেরা গুহায় ছবি আঁকছে। ওই তো বর্শা নিয়ে হরিণের পেছনে ছুটে গেল একজন, গাছের ফাঁক দিয়ে দুটো হিংস্র হলুদ চোখ শিকারীকে দেখছে— গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে ওঠে!

সত্যি বলতে কী, পড়াশোনায় চিংড়ি মোটেই খারাপ না। স্কুলে স্যররা তাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন। পরীক্ষায় প্রথম তিনজনের মধ্যে চিংড়ি থাকেই প্রতিবার। তবে, ইতিহাস ওর প্রিয় বিষয়। বাবা অবশ্য বলে, সে সারাক্ষণ হাবিজাবি ভাবে আর আজগুবি সব কল্পনা করে বলেই ইতিহাস ভাল লাগে তার। দ্যুত্‌! এরকম হয় নাকি আবার। অবশ্য বাবাও নাকি খুব ভাল ছাত্র ছিল; সুবীরকাকুর কাছে শুনেছে সে। দারুণ ভাল ছিল ইংরেজি আর অঙ্কে। তারপর সেই যে রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে ঠাকুমা, দাদু, আর তার ছোট্ট এক পিসি ছিল, সবাই মরে গেল, তারপরেই বাবার আর পড়াশোনা করা হলনা। কলকাতায় কাজ করত কোথায় যেন। তারপর মা’র সঙ্গে বাবার বিয়ে হয়েছিল। মা-কে অবশ্য মনে নেই চিংড়ির। সে যখন খুব ছোট তখন মা’র কী একটা খুব কঠিন অসুখ হওয়ায় মা’ও মরে গিয়ে আকাশের তারা হয়ে গেছে। ্তারপর থেকে বাবাও কেমন হয়ে গেছে। যখন হাঁটুর উপর ধুতি তুলে রং-ওঠা একটা ফতুয়া পরে মাথা নীচু করে চা বানায়, তখন মনেই হয়না এই মানুষটা মুখে মুখে সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্কগুলো করে দিতে পারে। খুব মায়া হয় তখন চিংড়ির বাবাকে দেখে। বড় হয়ে সে নিজে চা বানাবে বাবার জন্য আর বাবাকে একটা বড় হাতলওয়ালা চেয়ারে বসিয়ে রাখবে। ওই জয়ন্তদের বাড়িতে যেমন আছে, সেরকম নরম গদী দেওয়া চেয়ার।

সেসব কথা থাক। আপাততঃ কাল ভূগোল পরীক্ষা, সেই নিয়ে হিমশিম অবস্থা। ইতিহাস মুড়ে রেখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভূগোল বই খুলতে হয়। পৃথিবীটা কমলালেবুর মতন না ন্যাসপাতির মত, তা জেনে কোন কচুপোড়া হবে শুনি! ন্যাসপাতি হলেই বরং ভাল হত। ঘোষবাবুদের  বাগানে তিনটে গাছ আছে, চুরি করে খায় তারা বন্ধুরা। একটু বিটনুন দিলে যা লাগে না…উফ! জিভের জলটা সুড়ুৎ করে গিলে নিল চিংড়ি। ঘোষবাবুদের মালী অবশ্য একবার টের পেয়ে লাঠি তুলে তাড়া করেছিল কিন্তু তবু ন্যাসপাতি তো খেয়েছে। কমলালেবু একবার-ই খেয়েছিল। গেল শীতে একদিন স্কুল থেকে সবাইকে একটা করে দিয়েছিল। বেশ টক। খাওয়ার চিন্তা জোর করে মাথা থেকে তাড়াতে একটা মশাকে হাতের তালুর ওপর বসে মনের সুখে রক্ত খেতে দেখেও মারলনা চিংড়ি … আহা, খাক…ওর-ও হয়ত তার মতই খালি পেট আর তাছাড়া মশার কামড়ের চুলকানিতে খাওয়ার ভাবনা বিদায় নেবে একটুখানি হলেও।

টুংটাং করে কী একটা বাজাচ্ছিল কে যেন। আর সারা ঘরময় একটা কেমন গন্ধ, ছাই ছাই, পোড়া পোড়া। অনেকগুলো জোনাকি ঢুকে পড়েছে কখন যেন,সবুজ আভা ঘরময়। মোমবাতিটা জ্বলছেনা নাকি! অবাক লাগে চিংড়ির। নাকি ও স্বপ্ন দেখছে। তাই তো! মুখ থেকে লালা বেরিয়ে ভূগোলের ভূ প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। মোমটা কখন নিভে গেছে কে জানে। সামনে দোকানঘরে বাবা নেই বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে বাবা কেটলিতে চা তৈরি করে রেখে বাড়ি যায় রান্না করতে। সেই সময় কেউ এলে চিংড়িই চা ঢেলে দেয়। কিন্তু আজ তো কেউ নেই। তবে আওয়াজ একটা হচ্ছে… টুংটাং না …বিস্কুটের বয়াম খোলার আওয়াজ। একটুখানি সিঁটিয়ে যায় চিংড়ি ভয়ে। কে রে বাবা!

পরক্ষণেই মনে হল, এ  নিঘ্‌ঘাত বিল্টুর কাজ। বিল্টুর সঙ্গে বাজি ধরেছিল কালকেই যে ভূত বলে কিছু নেই। নিশ্চয়ই ব্যাটা ভয় দেখাতে এসেছে মওকা পেয়ে। এটা মাথায় আসতেই লাফ দিয়ে দোকানঘরে ঢুকেই ব্যোমকে যায় চিংড়ি। কেউ কোত্থাও নেই। বাল্বের জোর যেন আরো কমে এসেছে। আশ্বিন মাসের শেষ, গাঁ-গঞ্জে এই সময় ভালই কুয়াশা পড়তে শুরু করে, তবে আজকে যেন সামনেটা একটু বেশিই ধোঁয়াটে। পাতলা একটা ছেয়েরঙা আস্তরণ দোকানটাকে যেন আলাদা করে দিয়েছে বাইরের দুনিয়ার থেকে। হালকা শীতও করছে। নিজের অজান্তেই শিউরে ওঠে চিংড়ি।

ঠিক তখনই খেয়াল হয় একটা পাঁচ টাকার বিস্কুটের প্যাকের আধখোলা হয়ে পড়ে আছে উনুনের পাশে। মাথাটা গরম হয়ে যায় টং করে। হাজার খিদে পেলেও চিংড়ি নিজে কখনও দোকানের জিনিস ছোঁয়না। বাবা বলেছে, এগুলো বদভ্যাস। আর এখন কে না কে এসে প্যাকেট খুলে এরকম ছড়িয়ে রেখেছে!
আর বাবার পাঁচটা টাকা তো নষ্ট হল। এটা ভাবা মাত্রই সব ভয় চলে গেল চিংড়ির।

রীতিমতন হুংকার দিতে চেষ্টা করে সে।

– কে রে বিস্কুট চুরি করে খাচ্ছিস?

কিন্তু চিংড়ির বয়স যেহেতু মাত্র দশ সেহেতু হুংকারটা তেমন জুতসই হয়না। কেউ উত্তরও দেয়না।

এমন সময় হঠাৎ দোকানের বাল্বটা নিভে যায়। এ অবশ্য রোজকার ব্যাপার, সাড়ে সাতটা বাজলেই চন্দ্রকাকু  নিজের  চালের দোকান বন্ধ করে আর লাইট চলে যায় চিংড়িদের দোকানে।

চিংড়ি ভয় পায়না তাই কিন্তু অন্য কে একটা যেন হাঁউমাউ করে ওঠে আলো নেভার সঙ্গে সঙ্গেই।

– “কে রে , কে রে”… বলতে বলতেই চিংড়ি টের পায় একটা ঠাণ্ডা মতন হালকা কিছু তাকে প্রায় জড়িয়ে ধরেছে। সে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই কে যেন সরু কান্না কান্না গলায় বলতে থাকে,
“ওরে বাবাগো, অন্ধকারে আমার ভীষণ ভয়! লাইট জ্বালাও শিগ্‌গির”

হাঁ হয়ে যায় চিংড়ি। কে এটা!

– কে তুই? এত ঠাণ্ডা কেন তোর গা? এখনও তো শীত পড়েইনি…
– আমি রবি। আর আমার গা তো এরকম ঠাণ্ডা-ই হবে। আমাদের সবার এরকম। আসলে রক্ত নেই  তো, তাই।
– রক্ত নেই মানে?  ও, তোর বুঝি ডেঙ্গু হয়েছিল? এই তো কিছুদিন আগে সোনালিদিদির ডেঙ্গু হয়েছিল, তখনও হাসপাতালে ডাক্তার বলেছিল রক্ত নেই।
– দুৎ , ডেঙ্গু না…আমার জন্ডিস হয়েছিল।
– জন্ডিস হলেও রক্ত থাকেনা? বলিস কী! আচ্ছা, তুই-ই তাহলে বিস্কুট খাচ্ছিলি। শরীর খারাপ যখন, খেয়ে নে বিস্কুটগুলো, আমি না হয় বাবাকে বলব আমি খেয়ে ফেলেছি।

কিন্তু বিস্কুত খাওয়ার বদলে হঠাৎ ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কান্না জুড়ে দেয় রবি। নাক থেকে সর্দি টানার মতন আওয়াজ হতে থাকে।

-কাঁদছিস কেন? এ কী রে বাবা! বললাম তো কাউকে বলবোনা … খেয়ে নে তুই বিস্কুট।
– আমি তো খেতে পারিনা-আ-আ-আ… কিছহু খেহেতে পারিনাআ-আ-আ…

বলে কী ছেলেটা। খাইয়ে দিতে হবে নাকি। সে তো কত ছোটবেলা থেকে নিজে নিজে খায়।

-খেতে পারিসনা মানে! ইয়ার্কি হচ্ছে!

এতক্ষণ অন্ধকারে থেকে চোখ সয়ে গেছিল। প্যাকেট থেকে একটা বিস্কুট বের করে আন্দাজে রবির মুখে ঢোকাতে যেতেই চিংড়ি বুঝতে পারে তার হাত কালো ছায়াটা ভেদ করে শূন্যে দুলছে।

সেই সময় রবি আরো জোরে কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে,

“ও দাদাগো, ও চিংড়িদা, তোমার পায়ে পড়ি, আলো জ্বালাও, আমার খুব ভয় করছে”

ছোট হলেও চিংড়ি একা একা থাকে কি-না আর ওকে বাবা বলেছে যে ভূত বলে কিছু হয়না, তাই চিংড়ি অজ্ঞান হতে হতেও হলনা। গুটি গুটি পায়ে পেছনের খুপরিতে ঢুকে হাতড়ে মোমবাতি জ্বালতেই দেখে একটা চিম্‌সে মত কালো ছায়া দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে।

মোম দেখেই ছায়াটা যেন ফ্যাক করে একটা হাসির আওয়াজ করল মনে হল।

-তুমি আমায় দেখে ভয় পাওনি তো, চিংড়িদা?
-ক্কে…ক্কেন? ভয়ের কী আছে… তুই তো রবি
– সবাই ভয় পেয়ে যায় তো। কেউ আমার দুঃখ বোঝেনা। ভূত হয়ে গেছি বলে কি আমার ডাংগুলি খেলতে ইচ্ছে করেনা বল? টিভিতে কার্টুন দেখতেও তো ইচ্ছে করে। আর সেদিন তোমাদের পাড়ার বিল্টুদের বাড়িতে কষা মাংস হচ্ছিল, তা আমি একটু চারপাশ ঘুরে গন্ধ শুঁকছিলাম, খেতে তো আর পারবোনা। তা ওদের বাড়ীর কুকুরটা কী চিল্লান চিল্লাতে শুরু করল…শেষে পালিয়ে বাঁচি…
– খেতে পারবিনা কেন?
– তুমি কি বুদ্ধু নাকি! খাবো কী করে… আমার তো শরীরটাই নেই…খেতে খুব ইচ্ছে করে কিন্তু খেতে পারিনা। আবার প্রায় কান্না শুরু করে রবি।
– আচ্ছা, থাক থাক…খেতে পারিসনা কিন্তু গন্ধ পাস…আহা রে…

চিংড়ি ভূত না হয়েও হাড়ে হাড়ে জানে এরকম হ’লে কী কষ্টটাই  না হয়।

এমন সময় বাইরে হঠাৎ বাবা’র গলা পাওয়া যায়।
-চিংড়ি, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি বাবা? চল, চল, আটটা বেজে গেল… দোকান বন্ধ করি…

মুহূর্তের মধ্যে রবি উধাও হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর বাড়ি ফিরে চিংড়ি যখন গরম ভাত, ডাল আর আলুসেদ্ধ খাচ্ছে, তখন টের পায় বারান্দার একটা কোণের অন্ধকার যেন একটু ঘন হল… বাতাসে কার যেন ফিস্‌ফিসানি ভেসে আসে…
“কাঁচালঙ্কাটা ভাল করে আরেকটু ডলে দাও তো… আহা-হা…দারুণ গন্ধ।”

চিংড়ির আবারও কেমন মনে হয়, বেঁচে থাকাটা ভীষণ সুন্দর একটা ব্যাপার।

Advertisements

gsrabani51_pic

ঠিক কীভাবে যে গাড়িটা স্কিড করেছিল ঠিকঠাক মনে করতে পারেনা কিছুতেই রচনা। পেছন পেছন আসা ট্রাকটার ওপর বোঝাই করা মাল ত্রিপল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা, ওপরে বসে আছে কয়েকজন ছোকরা গোছের খালাসী। মাঝেমধ্যেই তারা  সরস যৌনগন্ধী টিপ্পনী ছুঁড়ে দিচ্ছিল রচনাদের উদ্দেশ্যে। সেগুলো সব শোনা বা বোঝা না গেলেও অঙ্গভঙ্গি বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না দুজনের কারোরই।  মেজাজ হারাচ্ছিল অভি, রচনা কড়া চোখের ইশারায় বারণ করছিল রিঅ্যাক্ট করতে। দিনকাল ভাল নয়, কোত্থেকে কী হয় বলা যায়না…সন্ধ্যার ঝোঁকে এইসব রাস্তা, হাইওয়ে কানেক্টর বলা যায়,  খুব একটা ব্যস্ত নয়। হুশহাশ গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ কারো সাহায্যের জন্য দাঁড়াবে এমন ভাবার কোন কারণ নেই।

আসানসোল থেকে বেরোতেই দেরী হয়ে গিয়েছিল ওদের। রাতের আগেই কলকাতা ঢুকবে বলে অভি চালাচ্ছিলও বেশ ভাল স্পীডে, আর, আশ্চর্যজনকভাবে ট্রাকটা যেন ওদের ওভারটেক করতেই চাইছিল না।  এই রাস্তায় এভাবে ট্রাকের মাথায় বসে থাকা যথেষ্ট বিপজ্জনক- এই বোধও কী নেই ওদের! অভি দু-একবার সামান্য স্লো করে ইশারা করলেও পাত্তা দেয়নি ড্রাইভার। হাল ছেড়ে দিয়ে অভি যথাসম্ভব স্পীড তুলেছিল। হঠাৎ একটা বাঁকের পরেই আলো-ঝলমলে একটা ধাবা দেখে আচমকা ব্রেক কষেছিল, প্রায় পরক্ষণেই বিকট স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ আওয়াজ তুলে ওদের নীলরঙা ওয়াগনারের রঙ চটিয়ে সেটাকে প্রায় উলটে দিয়ে সামনের বিরাট গাছটাতে ধাক্কা মেরেছিল ট্রাকটা। রচনা ওই স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ অবধি মনে করতে পারে সব…তারপর অন্ধকার।

নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফেরার দুদিন পরে অভি বলেছিল ঘটনাটা। গাছে ধাক্কার অভিঘাতে উপরে বসা তিনজনই ছিট্‌কে পড়েছিল রাস্তায় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছন পেছন আসা আরেকটা লরী পিষে ফেলে ওদের।

“তুমি কি ইচ্ছে করেই ওভাবে ব্রেক কষেছিলে, অভি?”
আকুল স্বরে করা রচনার প্রশ্নটা শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল অভি।

“পাগল হয়ে গেছ নাকি? মানুষ খুন করেছি বলতে চাও? পুলিশ ইনভেস্টিগেশন হয়নি?… একশো আটরকম কথার জবাব দিতে হয়েছে…যারা ওখানে ছিল প্রত্যেকেই বলেছে দোষ ট্রাকটার…আর এখন কিনা তোমার কাছে এইসব আজগুবি কথা শুনতে হচ্ছে!!”

“কিন্তু…কিন্তু…তিনজন মারা গেছে… আর যে পেছনে ছিল? তার কী হল? বাঁচেনি না?”

হাঁ করে দু-সেকেন্ড রচনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অভি ধীরে ধীরে বলে,
“আর কেউ ছিলনা ওপরে, তিনজন; ড্রাইভার আর তার পাশে আরেকজন ছিল, তারা সাঙ্ঘাতিক ইঞ্জিওর্ড”

“কী বলছো কী! আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম যখন ট্রাকটা আমাদের গাড়ির গা ঘেঁষে ছেঁচড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পেছনে আরেকজন ছিল… কালো রঙের জামা-প্যান্ট, সাথে একটা কুকুর, সেটাও কালো রঙ…লাল জিভ বের করে পা চাটছিল… লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে হাত নাড়ল…”

“স্টপ ইট, প্লীজ। তোমার এইসব গালগল্প শোনার মানসিকতা নেই আমার… ট্রমা আমারও আছে, রচনা, কিন্তু তাই বলে তোমার মতন মাথা খারাপ হয়ে যায়নি আমার…আই জাস্ট কান্ট টেক এনি মোর অভ দিস্‌ বুলশীট”

সেই শুরু।

*******

মাস সাতেক পর, রচনার ছোটকাকার পঁচাত্তর বছরের জন্মদিন খুব বড় করে পালন করা হবে বলে ওরা সব ভাইবোনেরা মিলে ডিসিশন নিল। এই কাকা অবিবাহিত, ভাইপো-ভাইঝিদের বড়ই প্রিয় এবং আদরের। ্সকাল থেকেই বাপের বাড়িতে রচনা। হই-হুল্লোড়, আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়ার দাপটে সাত মাস আগে ঘটে যাওয়া ভয়ানক স্মৃতিটা মন থেকে ব্লটিং পেপার দিয়ে কেউ শুষে নিয়েছে যেন। অভিও দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে খুড়শ্বশুরের সঙ্গে বিয়ার নিয়ে বসে হাল্কা রসিকতা করে চলেছে…অন্যান্য জামাই, শালারাও সঙ্গে যোগ দিয়েছে। মাঝে মাঝেই ছোটকাকার উদাত্ত হা-হা হাসির আওয়াজ ভেসে  আসছে দোতলার  হল থেকে। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে রচনা ছুটল সদর দরজা খুলতে।

বড়পিসি বাতের ব্যথায় কেঁপেঝেঁপেও এসে হাজির হয়েছে। কত্তদিন বাদে দেখা…জড়িয়ে ধরে রচনা পিসিকে।

ঠিক সেই সময়েই চোখে পড়ে সদর দরজার উল্টোদিকের পাঁচিলে বসা লোকটাকে।

কালো রঙের জামা-প্যান্ট, সাথে একটা কালো কুকুর… লাল জিভ বের করল না কুকুরটা?…পা-টা কি চাটছে? লোকটা হাসছে…হাতটা নাড়বে বলে ওঠাচ্ছে … পিসির গায়ের ওপরেই এলিয়ে পড়ে রচনা।

..আবার অন্ধকার… আবার নার্সিংহোম।

তবে এবার আর একা ফেরা নয়, সঙ্গে ছিল ছোটকাকার বডি। পিসির আর্তনাদ শুনে হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা স্লিপ করে যায় কাকার…ইন্ট্যারন্যাল হেমারেজ… কয়েক ঘন্টায় সব শেষ।

*******

অনেক চেষ্টা করেও অভিকে ঘটনাটা বলে উঠতে পারেনি রচনা। জানে যে, বিশ্বাস করবেনা, শুধু শুধু ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি…আজকাল একদম পারেনা এসব চাপ নিতে সে…

তিন দিন আগে, পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস দেশাইয়ের ছেলের বাচ্চা হয়েছে শুনে দেখা করতে গেছিল। মিষ্টি, ফুট্‌ফুটে একটা পুতুল যেন মেয়েটা। খোলা জানালা দিয়ে সটান চোখ গেল সামনের ব্যালকনিতে।

আবার… মৃদু হাসল বোধহয়…কুকুরটা লোলুপ লোল জিহ্বা বের করে তাকিয়ে আছে।

ঝট্‌ করে চোখটা সরিয়ে নেয়… কিন্তু জানত কী হবে।

বাচ্চাটা দু-দিন পরে মারা গেল। টাইফয়েড হয়েছিল নাকি… বোঝা যায়নি।

********

অভি প্রথমে কোন কথাই বললনা কিছুক্ষণ। মাথা নীচু করে কিছু ভাবছিল। যখন মুখ তুলল, তখন দু-চোখে মায়া মাখানো।
“আমায় ভুল বুঝোনা প্লিজ, কিন্তু তুমি বুঝতে পারছনা কী সাঙ্ঘাতিক একটা মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে তুমি যাচ্ছ। আমি জানি রচনা, এই ধরণের অ্যাকসিডেন্টের পর অনেক সময়েই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে… আর তুমি তো কিছু বুঝতেই দাওনি কখনো…শুধু কয়েকবার ব্ল্যাক-আউট…যাইহোক, আমি কালই ডক্টর সোমের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করছি, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে…কিছু ভেবোনা,সোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে।” হালকা করে একটা চুমু খায় অভি রচনার ভেজা গালে।

“আমি পাগল নই, অভি! মানসিক রোগ হয়নি আমার। আমি যা তোমাকে বললাম সব বর্ণে বর্ণে সত্যি। কীকরে বোঝাবো তোমাকে…লোকটা আসে, প্রতিবার, আমি জানি কিছু একটা ভয়ানক অমঙ্গল নিয়ে আসে ও…”

দুজনেই দুজনকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে চলে… শব্দ-প্রতিশব্দরা দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরতে থাকে, ঘুরতেই থাকে। তারপর একসময় প্রবল বিস্ফোরণে আছড়ে পড়ে। মাথার ভেতর প্রতিটি শব্দ বিস্ফোরণে ছিটকে আসা লোহার টুকরো…গেঁথে যেতে থাকে রচনার মগজে… শিরায়-উপশিরায়।

“পাগল, তুমি পাগল…মানসিক রোগী তুমি”

*********

গতকাল রাত্রে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে কখন যেন। টের পায়নি রচনা। এত ঘুম ঘুমোয় ও আজকাল যে কিছু টের পায়না। স্বপ্নও দেখেনা। কোথাও বেরোতে ভয় পায়। অভির সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ বললেই চলে। ডাক্তার দেখায়নি ও। কেন দ্যাখাবে? সব সত্যি, ও জানে…

তবুও আজ সকালটা অন্যরকম লাগছিল। অসময়ের বৃষ্টির ঝাপ্‌টায় বারান্দার গাছগুলো ভিজে চুপ্পুস। ইস্‌, জেগে থাকলে ও-ও দেখতে পেত, জলের ঝরোখার ওপারে ভিজতে থাকা  গাছগুলোর আনন্দ।  বহুদিন পরে হঠাৎ যেন বড় বেশী করে বাইরে বেরোতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ। বলবে কি অভিকে তাড়াতাড়ি আসতে?

ঘোরটা কেটে যায় অভির গলার আওয়াজে। আজকাল আর বাড়িতে ব্রেকফাস্ট করেনা অভি, বাইরেই খেয়ে নেয়। শুধু বেরোনর আগে নিয়ম করে একটা কথা রোজ জিজ্ঞেস করে…আজও সেটাই বলছে।

“যাবে একবার ডক্টর সোমের কাছে? প্লীজ?”

দমকা হাওয়ায় টবের গোলাপ গাছটা দুলে ওঠে, দু-ফোঁটা জল ঢেলে দিয়ে যায় আদর করে হাতের ওপর। অভিকে চূড়ান্ত হতবাক করে মাথা নাড়ে রচনা, যাবে।

হতভম্ব হয়ে কোন কথা না বলে রচনাকে  শুধু জড়িয়ে ধরে অভি; “রেডি হয়ে থেকো, ঠিক ছ’টা।”

আজ অনেকদিন পরে অভির যাওয়ার সময় সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ঠিক হয়ে যাবে সব, মনে মনে বলে সে।
ওই তো অভি গাড়ি বের করছে। বসলো স্টিয়ারিঙে…  হাত নাড়ছে হাসিমুখে।

অপস্রিয়মাণ গাড়িটার দিকে তাকাতে ঠিক তখনই…

পেছনে কালো জামা, কালো প্যান্ট পরা কে ও!

পাগলের মতন বেড্রুমে গিয়ে মোবাইলে অভির নাম্বার ডায়াল করে সে…আটকাতেই হবে অভিকে…

সামনে টেবিলে পড়ে থাকা অভির মোবাইলের রিংটোন ছাপিয়েও কানে আসে অনেক লোকের গলার আওয়াজ…অ-নে-ক  লো-ক… আর বীভৎস স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ…।

ফেসবুকের “আদার” ইনবক্স একটি স্বর্ণ খনি বিশেষ। নারী মাত্রেই জানেন এর তাৎপর্য‍্য। কত কিসিমের যে লোক হয় এই নেট দুনিয়ায়, তা বোঝার এবং জানার সহজতম উপায় এই “আদার”। আপনি আদার ব্যাপারি হন বা জাহাজের কারবারী, আউট অভ দ্য বক্স ভাবনাচিন্তা কাকে বলে এই ইনবক্স তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

এমনিতে সবাই জানে যে মেয়ে হওয়া এদেশে মোটামুটি একটা অপরাধের সামিল; এই মেয়েদের জন্যেই ধর্ষণের মতন একটা জঘন্য অপরাধ ঘটছে প্রতিনিয়ত; এই অসভ্য, হায়াহীন প্রজাতি কম কম জামাকাপড় পরে, সেজেগুজে দিনের বেলা তো বটেই এমনকি রাত্তিরবেলাতেও রাস্তায় ঘোরাফেরা করে পুরুষ কে প্রলুব্ধ করতে! কী সাংঘাতিক! শাড়ি-সালোয়ার প্রভৃতি সো-কল্ড ভদ্র পোষাকের বাবা-মেসো করে এরা জিন্‌স, হাপু, এমনকি গরম প্যান্ট পর্যন্ত অনায়াসে পরে ঘুরে বেড়ায়। এসব দেখে যদি পাঁচটা ছেলে একটু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাদের দোষ কোথায়?  আর একথা ব্যাদে আছে যে ছেলেদের মন মেয়েদের মতন প্যাঁচালো নয়, হুঁ হুঁ বাওয়া, ওদের মনে যা, মুখেও তাই।  তাই রাস্তায় এর’ম মেয়ে দেখে যদি মধ্যমা অটোমেটিক্যালি উঠে যায় বা চাট্টি রসের কথা মুখ থেকে বেরোয়- তাহলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়, বুঝিনা।

এত্তসব ট্র্যাফিক আইন হয়েছে, লাইট রে, পুলিশের প্যাট্রোল ভ্যান রে, ক্যমেরা রে, দাদুগীতি রে- আরে বস্‌, কয়েকটা ঝক্কাস দেখতে মেয়ে-পুলিশকে (ইয়েস, আগে মেয়ে, পরে পুলিশ, স্বাভাবিক নিয়মেই) ঝিঙ্কু ড্রেস পরিয়ে মোড়ে মোড়ে দাঁড় করিয়ে দাও, মার্সিডিজ টু রিক্সা , স-ও-ব দেখবে ঠিক জায়গামতন থামছে, চাখছে, যাচ্ছে। Total egalitarian concept- সব্বাই এক, আমরা সবাই রাজা… ইত্যাদি প্রভৃতি।

আচ্ছা, আচ্ছা, যা বলছিলাম… আসলে এই টপিক নিয়ে লিখতে বসলেই আমি একটু, ইয়ে মানে, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি আর কী। ক্ষমাঘেন্না করে দেবেন নিজগুণে…
যাইহোক, হচ্ছিল “আদার” ইনবক্স এর কথা। আমি একদিন এক সুন্দর, সুবাসিত সকালে একটি মেসেজ পেলাম, একজন ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে জানতে চেয়েছেন, আমি শুতে কত নিয়ে থাকি। এতে আমি যারপরনাই অবাক হয়ে রিপ্লাই দিয়েছিলাম যে আমি এমনিতেই ঘুমাতে ভালবাসি, তার জন্য কেউ কখনও টাকাপয়সা দেয়নি আমাকে। ওনার বাড়ির মহিলারা শোয়া বা ঘুমানোর জন্য চার্জ করেন বলে সবাইকে অমন ভাবা ঠিক না। এতে করে কেন জানিনা উনি ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে গেছিলেন। আরো দু-চারটে কথার পর আমাকে ব্লক করে দিলেন অথচ আমি বুঝতেই পারলাম না যে আমার দোষটা কোথায়!

তাছাড়া, প্রত্যেক মেয়েই কোন না কোন সময় মেসেজ পেয়ে থাকে যে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কেউ তাকে মডেল বানাতে চায় বা ফোটোশুট, বা  নিদেনপক্ষে, কোন বিশেষ পোজে তার ছবি দেখতে চায়। সুদূর মরক্কো থেকে শুরু করে নিকারাগুয়া, পারস্য এমনকি মঙ্গল্গ্রহ থেকেও এমত অনুরোধ এলে কোন মেয়েই অবাক হয়না। হওয়ার কথাও নয়, আমরা তো জানি, “আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী” … কিন্তু ভুসুকু এও বলেছেন যে, “মূঢ়া হিঅহি ণ পইসঈ” অর্থাৎ গাড়লের মগজে এতসব ঢোকেনা, তাই অবাক হওয়া বাদ দিলেও মাঝে মাঝেই মেয়েরা এইসব নিয়ে চিল্লামিল্লি করে, মানে মেয়েদের তো বুদ্ধিশুদ্ধি টেন্ডস টু জিরো …তাই আর কী…। এসব ছাড়াও, আমি_শুধু_চেয়েছি_তোমায়, বল্গাহীন_ভালবাসা, বিছানায়_বক, Sexy_Stud, Eternal_erection, DiscoDick- এরা সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে খোঁজখবর নিয়ে থাকে, বিচিত্র বানানে “ভালবাষা” জানায়।  Lyf roxxx!

তবু, এতকিছুর মধ্যেও ভরসার কথা এই যে, ইহজীবনে যত এরকম “হাম তো (মহা) পুরুষ হ্যায়, হাম ক্যা নেহি কর স্যকতা, সবকুছ জায়েজ হ্যায়” টাইপ ছেলে দেখেছি, তার দ্বিগুণ দেখেছি ঠিক মানুষের মতন পুরুষ। নিজের বাবা, দাদা,কাকা, স্বামী বা ছেলের কথা বাদ দিলেও বন্ধুস্থানীয় তাদের সংখ্যাটাও বড় কম নয়। এইসব নিয়েই তো জীবন, আমাদের জীবন; সবাই “ওম্মা, দ্যাখ কী ভাল, তকাই আমার” হবে, আয় তবে সহচরী গাইবে নেচে নেচে, তাই হয় নাকি? না হওয়া উচিৎ ।

বেঁচে থাক আমার নারীত্ব, আমার মেয়েলী সারল্য, আমার অকারণ হাসি, (পড়ুন ন্যাকামো) আমার চকিত সতর্কতা, আমার সঙ্গীর পায়ে-পা মিলিয়ে এগিয়ে চলার আনন্দ। সে পিছিয়ে পড়লে দাঁড়াব তার জন্য, কারণ আমি জানি সেও ঠিক তাই-ই করবে। পুনর্জন্ম আছে নাকি? কেউ জানেন? থাকলে, অগলে জনম মে মোহে বিটিয়া হি কিজো।

কলিযুগ শেষ প্রায়, দেশের এই দুর্দিন
দাদু খায় নাতি খায় ব্রিটানিয়া থিন্‌
“ইন্টলারেন্ট, ইন্টলারেন্ট”- ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
টাকা মাটি, মাটি টাকা, কড়োরপতি কওন?
নীলাকাশ , রোদ-জল, ঘাস-পাতা-পাখি
বিবেক তো ওবেরয়, নিদ্রিত আঁখি
ফাস্ট ফুড, পাঁচতারা, গুড় আর রুটি
খালি পেট বসে ভাবে কবে পাবে ছুটি!
চলতা হ্যায় সবকুছ, কৃষ্ণের বাঁশি
খ্যাক খ্যাক, খিক খিক, হায়নার হাসি
যা আছে, থাকবেও, স্থবির এ প্রবাহ
আজ রাতে প্যাঁচা আর ময়ুরের বিবাহ!

আমাদের এক দাদা কাম বন্ধু রঞ্জনদার দুটি ভয়ানক বদভ্যাসের একটি হল যে কোন কিছুর নাম ভুলে যাওয়া এবং অন্যটি, আরো ডেঞ্জারাস, তা হল, কলকাতার বাইরে গেলেই হিন্দি বলা!
শোনা যায় মেয়ে ছো্টথাকাকালীন বৌদি  একবার রঞ্জনদাকে দোকানে পাঠিয়েছিলেন এবং তিনি দোকানে গিয়ে জনি ওয়াকার বেবী পাউডার চাওয়াতে দোকানদার ভদ্রলোক যারপরনাই বিরক্ত এবং বিব্রত হয়েছিলেন। আমরা এটা অবিশ্বাস করিনা কারণ নিজেদের অভিজ্ঞতায় ভাইজাগে দেখেছি রঞ্জনদাকে গাড়ি ঠিক করতে পাঠানো হয়েছে ওখান থেকে ঋষিকোন্ডা যাবো বলে, প্রায় চল্লিশ মিনিট পর উনি ফিরে এসে তর্জনগর্জন করতে লাগলেন এই বলে যে ওরকম কোন জায়গা নেই এখানে। আমরা হতবাক! বৌদি’র সন্দেহ হওয়াতে শুধোলেন, “কী নাম বলেছো তুমি?” মারাত্মক কনফিডেন্স নিয়ে রঞ্জনদা বললেন , “ক্যানো, অ্যানাকোণ্ডা”!

আরেকবার নাকি দিল্লীতে কোন অটোওয়ালাই ওনাকে নিচ্ছিল না। নেওয়ার কথাও না কারণ প্রতিবার-ই উনি বলছিলেন,” ভাইসাব, মুঝে চাঁদনী চক পে গিরনা হ্যায়”। মূর্খ অটোওয়ালা গুলো ওনাকে স্যুট-বুট পরা বেওড়া মাতাল ভেবেছিল বোধহয়।