Posts Tagged ‘#গুমনামি’

ছোটবেলায় পাড়া’র একজন দাদা’র প্রতি আমার ক্রাশ ছিল। দাদাকে বেশ দেখতে, ঝক্‌ঝকে চেহারা, হাল্কা মাস্‌ল ছিল। সব মিলিয়ে, যাকে বলে বেশ নয়নমনোহর 🙂 তো, এই দাদাকে একদিন আমি দৈবাৎ পাড়া’র পুকুরে ল্যাঙট পরে স্নানরত অবস্থায় দেখতে পাই। তারপর, কোথা হইতে কী হইয়া গেল কে জানে, আমার সমস্ত ক্রাশ এক্কেবারে ক্রাশ্‌ড! সবাইকে কী আর জাঙিয়া পরে ঘুরে বেড়ালে ভাল লাগে রে ভাই 😦
আমি কিন্তু সেই ক্রাশ ইয়ে হয়ে যাওয়ায় ভয়াবহ মানসিক আঘাত পেয়েছিলাম সেই বয়সে। এই এত বছরে সেই ডিপ্রেশন অবশ্য কাটিয়ে উঠেছি, কিন্তু গতকাল “গুমনামি” দেখতে বসে, “আবার, আবার সেই কামান গর্জন! কাঁপাইয়া ধরাতল, বিদারিয়া রণস্থল” 😥 বড্ড কষ্ট পেলাম ফের। এক দৃশ্য, এক অনুভব। আমি যে অনির্বাণ ভট্টাচার্য’র জাব্‌রা ফ্যান ছিলাম গো! কেন জাঙিয়া-পরা অনির্বাণ, রাতদুপুরে নেতাজীকে বসার ঘরে দেখতে পেয়ে কথা বলতে গেল গো! কেন? মুন্নাভাই গান্ধীজি’র সঙ্গে কথা বলেছে বলে ওকেও নেতাজী’র সঙ্গে বলতে হবে 😦 ইকি!

যাক্‌গে, এসব ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের বলে লাভ কী আর। যা হওয়ার হয়ে গেছে। “গুমনামি” দেখে ভালোয় ভালোয় ফিরে এসেছি। আমি অবশ্য থ্রিলার ভেবে দেখতে গেছিলাম। মানে, পোস্টারে সিজিদ্দা সেরকমই লিখেছিলেন। গিয়ে দেখি ডকু-ফিচার ধরণের একটা কিছু ব্যাপার। চন্দ্রচূড় ঘোষ এবং অনুজ ধর– এঁরা দু’জনে ‘Conundrum: Subhas Bose’s Life after Death’ শীর্ষক যে গবেষণামূলক বইটি লিখেছেন, “গুমনামি” মুলতঃ সেটিকেই অনুসরণ করেছে।
সাড়ে-আটশোরও বেশি পৃষ্ঠার বইটি, কতজন পড়েছেন আমি জানিনা। যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা অবশ্যই বুঝবেন, ফিল্ম-এ যে সমস্ত ঘটনা, নথি, চিঠিপত্র এবং প্রমাণ ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট, ফরমোসা’র (এখন তাইপেই) বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজী’র মৃত্যুর বিপক্ষে তুলে ধরা হয়েছে, যেভাবে গুমনামি বাবা’র নেতাজী হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, তা প্রায় সমস্তটাই বইতে রয়েছে।

সিনেমায় আমরা পুরো ন্যারেটিভ-ই দেখি সাংবাদিক এবং নেতাজী গবেষক চন্দ্রচূড় ধর-এর (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) চোখ দিয়ে। সে, অফিসে বসে একদিন নতুন একটি অ্যাসাইনমেন্টে পায় এবং তার জন্য পড়াশোনা, রিসার্চ ইত্যাদি করতে গিয়ে চন্দ্রচূড়ের নিজের জীবনযাত্রা ও জীবনবোধ সম্পূর্ণভাবে পালটে যায়। নেতাজীকে নিয়ে গবেষণায় মগ্ন হয়ে সে দাড়ি-টাড়ি পর্যন্ত আর কাটেনা, বৌ রণিতা’র (তনুশ্রী চক্রবর্তী) সঙ্গে শোয়না, এমনকি বৌ শোয়া’র জন্য যখন সিডিউস করতে চায়, তখনও তার নেতাজী’র জাপানি দোভাষীর কথা মনে পড়ে। এসব ঝামেলায়, রণিতা খুব ক্ষেপে গিয়ে একদিন চন্দ্রচূড়কে ডিভোর্স দিয়ে দেয় এবং জানায় যে, সুভাষ ঘরে ফিরেছে কিনা তা সে জানেনা, কিন্তু সুভাষের জন্যই তার আর ঘরে ফেরা হল না। চোখে জল এসে গিয়েছিল! মাইরি বলছি।

তা সে যাইহোক, বৌ চলে যেতেই চন্দ্রচূড় দাড়ি-টাড়ি কামিয়ে ফেলে, চাকরি ছেড়ে দিয়ে, ফের গবেষণায় মন দেয়। আগে দাড়ি কাটতে কী অসুবিধে ছিল কে জানে।

তারপর যা যা ঘটনা ঘটে, নেতাজী’র অন্তর্ধান বিষয়ক কন্সপিরেসি থিওরি, তৎকালীন সরকারের কার্যাবলী ইত্যাদি, সেসব সিনেমা দেখলে জানতে পারবেন। ওই বইটা পড়লে, অবশ্য আরো বেশি জানবেন।

আমাদের পিয়ো বুম্বাদা নেতাজী’র ভূমিকায় ক্যামন অভিনয় করেছেন, তা জানতে গেলেও আপনাকে ওই সিনেমা দেখতে হবে। এ হল ওঁর আ-আ-আ-আম্মি চ্চুরি ক্করিনি থেকে উত্তরণের সিনেমা। মেকআপ খুব খারাপ হয়েছে, একথা শত্তুরেও বলবেনা (আমি তো না-ই, আমি সিজিদ্দা’র সব সিনিমা ফার্স্ট ডে সেকেণ্ড বা থার্ড শো দেখি। ভয় করে, চেনাশোনা বন্ধুরা খিস্তি মারে, তবুও যাই), কিন্তু ম্যানারিজম থেকে বুম্বাদা পুরোপুরি বেরোতে পারেননি। গালে সুপুরি নিয়ে কথা বললে যেমন হয়, অমন লেগেছে কিছু জায়গায়। তনুশ্রী যথাযথ। অনির্বাণ কিছু জায়গায় বেশি স্মার্টনেস দেখিয়ে ফেলেছেন ‘রেবেল’ ভাব আনতে গিয়ে। অতটা না করলেও হত মনে হয়। আর, তনুশ্রী’র এটা জানা উচিত ছিল যে কাঁচের দরজা, ভারি কোনো টেব্‌ল বা ওই জাতীয় কিছু দিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব :/ এইসব সাধারণ জিনিস-ও যদি মানুষ শিখতে না পারে সিনেমা দেখে… tch tch।

তো যান, আজ সবে পঞ্চমী… গিয়ে দেখে আসুন। তবে, সিনিমা দেক্তে যাচ্চি, ক্কী বালো, ক্কী মজ্‌জা— এরকম মনোভাব নিয়ে না যাওয়াই ভাল। বরং, আমি সর্বহারা, আমার হারানোর আর কিছুই নাই–এরকম ভেবে যান, ভাল লাগবে। ইন্ট্যারভেলের পর, সামান্য ঘুম পেতে পারে, তখন পপকর্ন এবং কফি খান।

ডিসক্লেইমারঃ প্রায় প্রত্যেক বাঙালি তথা ভারতবাসীর মতন আমিও নেতাজীকে নিয়ে গর্বিত এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে, যদি নেতাজী থাকতেন, আমাদের ইতিহাস অন্যরকম হত। যা লেখা হয়েছে, তা শুধুমাত্র “গুমনামি” নামক ফিল্মের ভিত্তিতে।