Posts Tagged ‘নারী’

1-dur 016

— সাপ বানিয়েছে?
— না, এখন-ও বানায়নি। দেখছোনা রঙ হয়নি সব, বানানো হয়নি…
— বাবা, বাবা, দ্যাখো সিংহ বানিয়েছে, মহিষ বানিয়েছে, তা’লে সাপ বানায়নি কেন?
—  বানাবে, কালকেই বানাবে (নিরুপায় পিতা’র উত্তর)
— সাপ কামড়ে দেবে তাই বানায়নি।

কচি গলায় ভার্ডিক্ট দিয়ে তিনি প্রস্থান করলেন।

ছবি তুলতে গিয়ে এরকম দু-তিনটে বাচ্চা’র দেখা পেলাম। বাবা বা মা’র সঙ্গে এসেছে ঠাকুর বানানো দেখতে। এরকম আমি-ও যেতাম। আঁকা’র স্কুল থেকে ফেরা’র পথে অথবা এমনি বিকেলে দোকানে বেরিয়ে টেনে টেনে নিয়ে যেতাম সঙ্গে যে থাকতো তাকেই, ঠাকুর বানানো দেখবো বলে বায়না করে। চুপ করে বেশ খানিকক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখতাম। মাটি, তার্পিন তেল আর রঙের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত মিশ্র গন্ধের সৃষ্টি হত। সে গন্ধটা অন্য কোথাও আর কখনো পেতাম না।

রোদ্দুরে’র একটা গন্ধ পাই এখনো মাঝে মাঝে; আকাশ পরিষ্কার এবং মন ভাল থাকলে। নাকি ওই গন্ধটা-ই মন ভাল করে দেয় হয়তো, কে জানে। মন ভাল রাখা এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গড়িয়াহাট ব্রিজে’র নিচে যে পরিবারগুলো পার্মানেন্টলি বসবাস করে, সেখান দিয়ে সেদিন যাওয়া’র সময় একটা বাচ্চা ছেলে ভিক্ষা চাইলো। বললাম যে আমি পয়সা হাতে দেবোনা, কিছু খেতে চাইলে কিনে দিতে পারি। পয়সা হাতে পেলেই হয় এরা নিজেরা ডেন্ড্রাইট কিনে নেশা করবে নয়ত বাপ-মা কেড়ে নিয়ে সেই নেশা-ই করবে। আমি তাই পয়সা দিইনা। যাইহোক, একে সামনের একটা ফলে’র দোকান থেকে দুটো আপেল কিনে দিলাম, দু-হাতে নিয়ে চলে গেল। খানিক এগিয়েছি, জামায় টান। রোগাপানা, অপুষ্টি-তে ভোগা একটা বছর তেরো-চোদ্দ’র মেয়ে, কোলে আবার একটা বাচ্চা, ভাই হবে বোধহয়, পয়সা চাইছে।এদের নেটওয়ার্ক খুব ভাল, আগেও দেখেছি। একজনকে কিছু দিয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়ালেই পরপর লাইন পড়ে যায়। কিন্তু মহা জ্বালা, এ  আপেল খাবেনা, এর পুজোয় জামা হয়নি।

তাড়া ছিল, নিজের বিবেকের অল্প  কামড় উপেক্ষা করে পঞ্চাশ-টা টাকা ধরিয়ে দিলাম হাতে। জানালাম, আমি পরে তার জন্য জামা নিয়ে আসবো। এর পর কেটে গেছে আজ নিয়ে বারো দিন। যাওয়া হয়নি আমার আর। হয়ত যখন যাবো, মেয়েটাকে খুঁজেই পাবোনা আর। কালো, রোগা, অপুষ্টিতে-ভোগা, সদ্য-জাগা নারীত্বের ছাপ লুকোতে সচেষ্ট কত্ত বাচ্চা এই শহরে ঘুরে বেড়ায়। বাচ্চা বলে-ও ভাবেনা অনেকে তাদের, মেয়েমানুষ ভেবে হাত বাড়ায় ছেঁড়া জামা’র তলা দিয়ে। অবশ্য, এই নয় যে বাচ্চা ব’লে ছাড় আছে, তাও আর কী! মেয়েটা-কে জামা না দিতে পারা’র মন-খারাপ সারা পুজো-তে কুট্‌কুট্‌ করে কামড়াবে হয়ত, ঝেড়ে ফেলে নতুন জামা পরবো। ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো, দেবী মায়ে’র আরাধনায় সামিল হওয়া’র চেষ্টায় নিজেকে খুলে দেবে ওই মেয়েটা কারো কাছে… কোন মায়ের পুজারী ভোগ খেয়ে এসে ভোগ করবেন 🙂 মা সর্বংসহা জগজ্জননী, আরো কত সহ্য করবেন কে জানে! ওঁ দুর্গে দুর্গে রক্ষণি স্বাহা ওঁ দুর্গায়ৈ নমঃ

 

 

Advertisements

বেশ কিছু বছর আগে এক ঘরোয়া আসরে, এক পরিচিতা পৃথুলা মহিলাকে আরেকজন মহিলা বলে বসেন, “একটু ওজন কমানো’র চেষ্টা কোরো, নয়ত বয়স বাড়লে নানারকম সমস্যা দেখা দেবে।” তাতে তাঁর উত্তর ছিল, “আমার বর এরকম-ই পছন্দ করে”।

কী ভীষণ অদ্ভুত! স্বামী’র পছন্দ-অপছন্দ’র ওপরেই নির্ভর করবে একটি মেয়ের ওজন। সে কেমন পোষাক পরবে, কী খাবে, কোথায় যাবে, কীভাবে হাঁটবে– সবকিছু-ই ঠিক করবে তার পরিবার, যা কিনা বৃহত্তর সমাজের অংশ। যুগ যুগ ধরে মেয়েরা এইসব বাধানিষেধ মানতে মানতে, কখন যেন ভুলেই গেছে এই বেড়াজালে’র বাইরে তার নিজস্ব অস্তিত্বের কথা। সমাজ তাকে যা পাখি-পড়া করে শিখিয়েছে, তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়ে জিন-এর চরিত্র-ই বোধহয় বদলে দিয়েছে। আমরা তাই এখন, এই সময়ে দাঁড়িয়ে-ও দেখি ফর্সা হওয়া’র ক্রিম দেদার বিক্রি হয়, তা মেখে ত্বকে’র গুরুতর ক্ষতি হতে পারে জেনে-ও শুধুমাত্র নিজেকে সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য করে তোলা’র জন্য শ্যামবর্ণা সুন্দরী  তা প্রাণপণে গালে ঘষতে থাকে। কেন? কারণ তার সেই জোরটা-ই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, নিজেকে নিজের মতো করে তুলে ধরা’র। সেই এক-ই কারণে, যে দেশে এখনও বহুসংখ্যক মেয়ে ঋতুস্রাব-এর দিনগুলোতে নোংরা ন্যাকড়া ব্যবহার করতে বাধ্য হন এবং অস্বাভাবিক হারে  ইউ. টি. আই -তে (Urinary Tract Infection) ভোগেন, সেই দেশে’র একটি রাজ্য ঘোষণা করে স্তনবৃদ্ধিকারী কোন অপারেশন হলে, দরিদ্র মেয়েরা বিনামূল্যে তা করাতে পারবেন সরকারী খরচে। অবাক হবেন না, স্তন এবং যোনি ছাড়া আর আছেটাই বা কী আমাদের। সেগুলো-ও আবার ঠিক ঠিক মাপ-এ হওয়া দরকার, মানে, যে মাপগুলো সমাজ ঠিক করে দিয়েছে। তাই, যোনিপথ যাতে “টাইট” থাকে (বুঝলেন না বুঝি? অর্থাৎ, পুরুষ যাতে সর্বোচ্চ আনন্দ উপভোগ করতে পারে মিলনের সময়, সেই মাপ আর কী)  সেইজন্য নর্ম্যাল ডেলিভারি’র সময় অনেক ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া হয় একটা সেলাই বেশি দিয়ে দিতে। তাতে, নারী’র যন্ত্রণা’র শেষ থাকে না এবং মিলনসুখ বা “অর্গ্যাজম” অনুভব-ও করতে পারেনা আর, কিন্তু এটুকু কষ্ট করা-ই যায় পুরুষের সন্তুষ্টির জন্য, তাই না? খানিকটা এক-ই যুক্তি(!) দেখানো হয় FGM বা Female genital mutilation-এর ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে, মেয়েরা যাতে জীবনে আর কোনদিন-ও যৌনসুখ পেতে  না পারে, সেই বিষয়টা কনফার্ম করা হয়। It’s a tool to control female sexual desire. মেয়েদের ওসব-এর দরকার নেই তো। পুরুষের যৌনক্ষুধা মিটলেই হল। বাকি সব এলেবেলে বি-এ পাশ 🙂

তা যা বলছিলাম, আমাদের মেয়েদের এরকম-ই ভাবতে শেখানো হয়ে এসেছে এবং আগামী একশো বছরে-ও এর কতটুকু পরিবর্তন হবে, সেই বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। আধুনিক সমাজে, কোন মেয়ে সাধারণভাবে যৌনতা’র প্রতি তার আসক্তি ব্যক্ত করলে, তাকে আমরা দাগিয়ে দিই- “নিম্‌ফোম্যানিয়াক” বলে। সেই এক-ই আসক্তি পুরুষ দেখালে হেব্বি “মাচো” ব্যাপার আর কী O:)  আমরা এখন-ও জানি এবং মানি “পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা”; মেয়ে-ফেয়ে হলে, স্রেফ গলা টিপে বা দুধে’র গামলায় চুবিয়ে মেরে ফেলা হয় অনেক জায়গায়। ছেলে হবে না মেয়ে- সেই ব্যাপারটাও, বিজ্ঞানের ক্যাঁতায় আগুন দিয়ে, মেয়েদের ওপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। এখন-ও ধরে নেওয়া হয়, মা হওয়া-ই মেয়েদের জীবনের পরম মোক্ষ এবং সেটি না হতে পারলে, তোমার নারীজন্ম বৃথা। শুধু তাই নয়, মা হওয়ার পর, সন্তানের জন্য জীবনের যাবতীয় সুখ-আহ্লাদ-চাকরি-পড়াশোনা বিসর্জন দেওয়া-ই “ভাল মা” হওয়া’র অন্যতম শর্ত। মাতৃত্ব-কে এক সুমহান (পড়ুন ওভারহাইপড)  রূপে উপস্থাপিত করতে পুরোপুরি সক্ষম এই সমাজ। “বাজে মা” আর “বেশ্যা” –এই দু-টি এখন-ও মেয়েদের প্রতি সর্বোচ্চ গালি হিসেবে সর্বত্র স্বীকৃত। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ সেই নারীকেই উত্তম বলা হয়েছে, যে নারী তার স্বামীকে সন্তুষ্ট করে, পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় এবং স্বামীর কথার উপর কথা বলে না। সুতরাং, হুঁ হুঁ বাওয়া, অত্ত সোজা না। শুক্লযজুর্বেদের অন্তর্গত শতপথ ব্রাহ্মণে নারীকে তুলনা করা হয়েছে এভাবে, “সে ব্যক্তিই ভাগ্যবানযার পশুসংখ্যা স্ত্রীর সংখ্যার চেয়ে বেশি”। কীরকম “Dogs and Indians are not allowed” মনে পড়ছে, কী বলেন!

দুঃখের কথা এই যে, আমরা মেয়েরাও বেশীর ভাগ সময়ে এই সমাজের খাঁচা’য় ঢুকে পড়ি। খাঁচা’য় দানাপানি পাওয়া যায়, আদর-যত্ন-ও কপালে থাকলে জোটে বৈকি। আসলে, বুঝতেই পারি না যে এটা খাঁচা। খাঁচা’র মধ্যে যেসব মেয়েরা একটু “আলাদা”, মানে যারা তেমন ফর্সা নয়, সুন্দরী নয়, যাদের স্তন ছোট বা অতিরিক্ত বড়, যারা মা হতে পারেনি, যার বিয়ে হয়নি বা হলেও টেঁকেনি, যে অফিসে রাতভর পরিশ্রম করে সকালে ফেরে, যে সিগারেট খায় বা মদ খায়, যে ছেলে বা মেয়ে দেখে বন্ধুত্ব করেনা- মানে সোজা কথায় বলতে গেলে সবরকম মেয়েদের দিকে, আমরা, এই মেয়েরাই আঙুল তুলি। কোনো কোনো সময় পুরুষের-ও আগে আমাদের আঙুল ওঠে একে-অপরের দিকে।

আমরা এক হতে পারিনি। হয়ত পারবো কোনোদিন-ও, যেদিন সমস্ত বস্তাপচা ধ্যানধারণাগুলো মন থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হবো। দিল্লি অনেক দূর, জানি, তবু আশায় আশায় বসে থাকি… বসেই থাকি… আমরা সবাই।

মাকে খুব বকছিল বাবা
আর মা কাঁদছিল ।
বাবা বারবার বলছিল সব দোষ মা-র
খুব রাগ হচ্ছিল আমার ,
চিৎকার করে বলতে চাইছিলাম
মা কী করবে , মা’র সমস্ত সত্তা জুড়ে
তো শুধুই আমি — মা-র মেয়ে
দোষ তোমার বাবা, তুমি পারোনি |

যখন ইঁদুর দৌড়ের খেলায়
গর্ভের গভীর অন্ধকারে, হারিয়ে
দিয়েছিলাম সব ভাইদের ;
খুব আনন্দ হয়েছিল
মা-র কথা শুনতে পেতাম,ছুঁতাম মা-কে
আর ভাবতাম কবে মায়ের কোলে উঠবো !

খুব  কাঁদছিল মা, মিনতি করছিল ,
বোকা মা আমার !
পারে নাকি ওদের সঙ্গে কখনো
!

সাদা কাপড়ে মোড়া , রক্তের ডেলা
জঞ্জালে ফেলে দিয়ে গেছে আমাকে
কন্যাভ্রুণ আমি…