Posts Tagged ‘প্রেম’

খুব চেনা ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন হয়; স্বামী রিটায়ার করেছেন এক যুগ হয়ে গেছে, স্ত্রী বয়সে খুব বেশি ছোট নন স্বামী’র থেকে। অনেক, অনেক বছর আগে হলেও তাঁদের ছিল ভালবাসার বিয়ে।  দুজনকে-ই এখন “ওয়াকিং স্টিক”-এর ভরসায় হাঁটাচলা করতে হয়। কিন্তু, সেটা তাঁরা করেন না বেশিরভাগ সময়ে। একে-অপরকে আঁকড়ে ধরে পা টিপে টিপে রাস্তার এক পাশ দিয়ে সাবধানে হাঁটেন। স্ত্রী মাঝে মাঝে চকিতে দেখে নেন পেছন ফিরে, আচমকা কোনো কাণ্ডজ্ঞানহীন রিকশা বা অটো বেমক্কা উঠে এল নাকি গায়ের ওপর! স্বামী সেটা-ও আবার পারেন না, গলায় মোটা বেল্ট, স্পন্ডিলিসিস।

ছেলে-মেয়ে দুজনেই যথাক্রমে অন্য দেশে এবং প্রদেশে থাকে। ওনারা একাই আছেন এবং, দিব্যি আছেন।
হাজার অসুস্থতা, শারীরিক অসুবিধে এবং বহুবিধ অন্য নিত্যকার ঝামেলা সামলিয়ে-ও আমি ওনাদের হাসতে দেখি। সকলেই দ্যাখে। আমার মতন অবাক-ও হয় হয়তো। আমরা যেখানে এই বয়সেই “আর পারছিনা” লব্জ আওড়াতে থাকি পান থেকে চুন খসলেই, সেখানে ওঁরা এখন-ও হাসেন। ফরসা মুখে বলিরেখা উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, চোখের কোণে অগুন্তি হাঁসের পায়ের ছাপ সোচ্চারে জানান দেয়, এ হাসি অনেক পুরনো।

বেশ কিছুদিন আগে, পাড়া’র ওষুধের দোকানে গেছি মা’র ওষুধ কিনতে। সেদিন কোন কারণে কর্মচারী খুব কম। ব্যস্ততা’র শেষ নেই। মাসের প্রথমে যেকোন ওষুধের দোকানে আজকাল গেলে দেখা যায়, বয়স্ক এবং নট-সো-বয়স্ক মানুষরা মাসকাবারী বাজার করা’র মত ওষুধ কিনছেন 😦 আমার সামনেই একজনের বিল হল প্রায় সাত হাজার টাকা’র কাছাকাছি। সারা মাসের ওষুধ। তো যাইহোক, আমি ওষুধ নিয়ে বেরোতে যাবো, এমন সময়ে দোকানদার কাকু একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন “ওমুক বাড়িতে এই ক’টা ওষুধ দিয়ে দিবি একটু যাওয়ার সময়? তোদের পাড়াতেই, চিনিস মনে হয়। আজ একটাও লোক নেই যে পৌঁছে দেবে। এদিকে বয়স্ক মানুষের জিনিস, না দিলেই নয়”। না করা’র কারণ নেই। এই দোকানদার কাকু আমায় ছোটবেলা থেকে চেনেন। আর বাড়িটা বুঝলাম, যে বৃদ্ধ দম্পতি-কে মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখি, চোখাচোখি হয়, সামান্য হাসি কখনো, তাঁদের।

সেই প্রথম তাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি কথা হল। দুজনেই ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন ভেতরে ঢুকে চা খাওয়ার জন্য। অন্যদিন আসবো প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ফিরে এলাম।

তারপর গেছি বার দুয়েক।

কয়েকদিন আগে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক প্রায় শয্যাশায়ী। কোনোভাবে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগিয়েছেন। কথাই বেরোচ্ছেনা গলা দিয়ে। তাও, আমি যেতেই ইশারা করে বোঝালেন স্ত্রী-কে, চা করো। আমি যত বলি খাবোনা, তিনি তত-ই ইশারা করে এক-ই কথা বলেন। মাসিমা স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে বললেন, “তুমি ভেবোনা আর। তোমায় খেতেই হবে, নইলে ইনি এই দশ মিনিট আগে চা খেয়েই আবার খাবেন কী করে!”
ধরা পড়ে মুখ গোঁজ করে স্ত্রী-কে কাঁচকলা দেখালেন। এবার আমি আগে হাসলাম।

টুকটাক কথা হচ্ছিল। হাসতে হাসতেই হঠাৎ মাসিমা বললেন। “জানো তো, আমি সবসময় ঠাকুরকে বলি এই মানুষটা যেন আগে রওনা দেয়। আমি আগে গেলে  খুব কষ্ট হবে ওর।”

কাঠ হয়ে গেলাম শুনে। কতখানি ভালবাসলে এরকম বলা যায়! আমরা তো সবসময়েই বলি, তোমাকে ছাড়া বাঁচব না– এই বাক্যটি-ই নাকি শ্রেষ্ঠ প্রেমের উক্তি। অথচ, তার মধ্যে মিশে থাকে এক অপরিসীম স্বার্থপরতা। সেখানেও আমরা চিন্তা করি নিজের সুখটুকু, ভালবাসার মানুষটি না থাকলে দিনযাপন ভয়ানক হয়ে ওঠে, বিশেষতঃ বার্ধক্যে। আমরা ভাবি, সেই সীমাহীন শূন্যতা আমায় অন্ততঃ যেন ভোগ করতে না হয়, অন্ধকারের স্মৃতি হাতড়ে, অশক্ত টলমল পায়ে, আমি যেন অন্ততঃ জীবনের কাছে মুক্তি ভিক্ষা না করি। সঙ্গী বা সঙ্গিনী’র যা হয় হোক, আমায় যেন নিংড়ে-নেওয়া মানসিক যন্ত্রণা না পেতে হয়। হয়ত বা অতিরঞ্জত ভাবনা, কিন্তু এরকম-ই মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে।

এরকম-ও ভালবাসা হয়। এরকম-ও ভালবাসা যায়।

Advertisements

ব্লগার এবং লেখক শ্রদ্ধেয় উত্তম চক্রবর্তী’র “ভালোবাসা কারে কয়” বইটি হাতে পেয়েছি বেশ কিছুদিন আগেই। পড়া-ও শেষ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু সময়ের অভাবে বইটি কেমন লাগলো তা লিখে উঠতে পারছিলাম না।

1-vv

আখর থেকে প্রকাশিত  বইটি উত্তমবাবু’র বইটির নাম দেখলেই বোঝা যায় এটি আদ্যন্ত প্রেমের গল্প বা ভালবাসার গল্প। তবে, একটি নয়, মোট ছ-টি গল্পের সঙ্কলন এই বই। প্রতিটি গল্পেই মানুষের চরিত্র তথা জীবনের বিভিন্ন রূপ উন্মোচিত হয়েছে। ষড়রিপু, অর্থাৎ, কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য যেভাবে মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার সাবলীল বর্ণনা ফুটে উঠেছে লেখকের কলমে। প্রতিটি গল্পেই প্রেম-ভালবাসা একটি বিশিষ্ট চরিত্র হিসেবে থাকলেও তা বাড়াবাড়ি’র পর্যায়ে যায়নি কখনো। ছয়টি গল্পের চরিত্র, ঘটনাপ্রবাহ এবং বুনন আলাদা হলেও তাদের মধ্যে যোগসূত্র হল– ভালবাসা।

আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে “অন্তঃসলিলা” নামক গল্পটি। প্রেম যে শুধু ভোগ নয়, ত্যাগ করতেও শেখায় এবং তা এক চরম তৃপ্তিও দিতে পারে, এই গল্পটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। “জীবনজুয়াড়ি” গল্পে  সমাপতন বড় বেশি, একটু যেন পৌনঃপুনিকতায় দুষ্ট গল্পের ঘটনাবলী। “আতরের গন্ধ” গল্পটি ভারি মায়াময়। শেষ গল্পটি’র নামেই বইটি’র নাম— “ভালবাসা কারে কয়”। সুন্দর উপস্থাপনা, একদিকে যেমন দেখানো হয়েছে একটি মেয়ের  স্বাধীন, অনমনীয় মনোভাব, অন্যদিকে তেমনি ফুটে উঠেছে প্রেমের চিরন্তন টান।

সব মিলিয়ে বইটি পড়তে ভাল লাগে।  হয়ত কোথাও যাচ্ছেন, ট্রেনে বা প্লেনে, তখন সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে রাখতেই পারেন উত্তম চক্রবর্তী’র এই বইটি।

সবশেষে, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, উত্তমদা, লেখকের সই সহ বইটি উপহার দেওয়ার জন্য। ভাল থাকুন, আরো অনেক লেখায় সমৃদ্ধ হোক আপনার পাঠককূল, এই শুভেচ্ছা রইল।

লেখকে’র ব্লগ লিঙ্কঃ এইখানে ক্লিক করুন

খেলবি নাকি আমার সাথে? আয়
চোট্টামি তোর ফেলছি ধরে, প্রায়
হোমওয়ার্ক, বই-খাতা তুই ছাদের ঘরে, একা
বুঝিসনা কিচ্ছুটি… না? সবজান্তা ন্যাকা!
প্রথম চোখে চোখ রাখা তোর, প্রথম গোঁফের রেখা
হল্‌দে শাড়ি, সোনালী রোদ, নতুন তোকে দ্যাখা
বলবো ভাবি, একটা কথা, আজ থাক নয়, কাল
দুচোখে তোর জলের ধারা, উফ্‌ফ্‌ ফুচকাটা কী ঝাল!
অন্য খাতে গড়ায় জীবন, কাল আসেনা আর
রাইকিশোরী, কৃষ্ণকিশোর, স্মৃতিটুকুই সার।

মন খারাপের ধূসর রঙা বিকেলবেলা
আজ আকাশে চলছে শুধু মেঘের খেলা
সেই যে চুমু প্রথম পাওয়া তোমার কাছে
এই বুঝি কেউ, মেঘলা স্বপন, দেখলো পাছে
চকিত নয়ন, স্খলিত বসন, চমকে ওঠা
মনের মাঝে দাগ কেটে যায় আলুথালু বৃষ্টি ফোঁটা।

পাখীর মতো উড়তে পারি আজো
তুমি যদি বলো তবে ছাড়তে পারি লাজও|
গানের খাতায় তোমার ছোঁয়া , কৈশোর শেষ প্রান্ত
গনগনে রোদ,বিনা মেঘে,ঝিলিক তবু হানত
ধূসর আলোর কুয়াশারা ছায়ার মতো ডাকে
আসব আমি,দ্যাখা হবে তেপান্তরের বাঁকে
তোমার লেখা তোমার ছবি হারিয়ে গেছে স্ক্রিনে
কে ফেরাবে ? হৃদয় উথাল, যন্ত্রণা নেয়  চিনে |

DSCN0481