Posts Tagged ‘রম্যরচনা’

সকালবেলা হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে কয়েকদিন আগে উজালাক্ষী এসে হাজির। উজালাক্ষী আমার বড়বেলার বন্ধু। হেব্বি পড়াশোনা-করা সিরিয়াস আঁতেল টাইপের পাবলিক। কীসব গবেষণা করে, গুচ্ছের পেপার লিখে, দেশ এবং দশকে উদ্ধার করার ফলে নামের আগে একখানা ডক্টর-ও বসে তার। এ হেন গুণবতী মামণি কীভাবে আমার মতন আকাটের বন্ধু হয়, এ নিয়ে যারা দু-লাইন পড়েই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, তাদের অবগতির জন্য জানাই, উজালাক্ষীকে একবার একটা বিপদের হাত থেকে আমি বাঁচিয়েছিলাম- সেই কারণেই, কিছুটা কৃতজ্ঞতা এবং কিছুটা আমার  অন্যান্য অপদার্থতার প্রতি  করুণাবশতঃ, বেচারী আমায় ফেলতে পারেনা। বিদেশ থেকে পারফ্যুমটা, লজেন্সটা, চকোলেটটা এনে দেয়। এমনকি, মাঝে মাঝে কোন কোন ব্যাপারে আমার পরামর্শও চায়। যদিও ওর সাহায্য চাওয়ার বিষয়গুলো ঠিক সাধারণ বলা যায়না। যেমন, একবার আইএসডি করে জিজ্ঞেস করেছিল, ওর বয়ফ্রেন্ড তার জাঙিয়া ওর বাড়িতে ফেলে গেছে, তো সেটা কি ও ট্র্যাশ ক্যান-এ ছুঁড়ে ফেলবে না কাচবে। তখন রাত্তির আড়াইটে বাজে প্রায়। তা, আমি ঘুমচোখে আর কিছু না জিজ্ঞেস করে বলেছিলাম কেচে ফেলতে। তখন বলল, কেচে বয়ফ্রেডকে কুরিয়র করে পাঠিয়ে দেবে না আলমারিতে রাখবে।! এইভাবে স্টেপ বাই স্টেপ ব্যাপারটা মিটতে প্রায় রাত ভোর হয়ে গেছিল।

সে হেন উজালাক্ষীকে রবিবার ভোর আটটা’র (হ্যাঁ, আটটা আমার কাছে ভোর-ই) সময় একটা জম্পেশ কায়দার বুটিকের ছাইরঙা হাই-লো কুর্তা আর সাদা পাজামা পরে হাঁপাতে হাঁপাতে আসতে দেখেই আমি প্রমাদ গুণলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই জানা গেল যে, বেশ একটা উঁচুদরের সাহিত্যসভায় ওর যাওয়ার কথা এগারোটার সময়। দুজনের জন্য ইনভিটিশন পাঠিয়েছেন উদ্যোক্তারা। কোন এক রহস্যময় কারণে ওর মনে হচ্ছে সঙ্গে কাউকে না নিয়ে একা গেলে ওর সম্মানহানি ঘটবে; তাই এই আক্রমণ…মানে ইয়ে… আগমন।

আমি প্রায় কেঁদে ফেলে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এই সাতসকালে আমার প্রাত্যহিক কোন কাজ তো হয়ই-নি এবং তার চেয়েও বড় কথা এসব সভায় আমাকে নিয়ে যাওয়া আর একটা দাঁড়কাক কে নিয়ে যাওয়া এক-ই ব্যাপার।

-তার চেয়ে এক কাজ কর বরং, তোকেও যেতে হবেনা। পাঁঠার মাংস রাঁধবো। আর বিয়ার আনাবো…আজ আমার এখানেই থেকে যা।

এসব লোভ দেখিয়েও কোন কাজ হলনা। এমনকি শেষে আমি বিয়ার থেকে স্কচ অবধি উঠেছিলাম, তাতেও না।

অদ্যই আমার জীবনের শেষ রজনী- এই ভেবে তৈরী হয়ে নিলাম ইষ্টনাম জপতে জপতে। এইরকম সব মেগাবিপদের সময় আমি আরো অনেকের মতই ভয়ানক ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়ে পড়ি L

পৌঁছে দেখি সে এক এলাহি ব্যাপার! গম গম করে লাউডস্পীকারে নাম-টাম বলা হচ্ছে আর লোকজন গিয়ে হেসে হেসে পুষ্পস্তবক নিচ্ছে আর একটা বড় বাক্স। উজালাক্ষীও পেল। আমি যথারীতি বাক্সর একদিকের  কানা উঁচু করে দেখতে চেষ্টা করছিলাম যে ভেতরে মিষ্টি আছে কি-না, বা থাকলে কী কী মিষ্টি। ক্যামন দুর্বাসার মতন কট্‌মট করে তাকালো আমার দিকে। মরুকগে যাক, সামনে পুজো, আমি এখন ডায়েট করছি।

ইতিমধ্যে, বেশ মনোজ্ঞ আলোচনা শুরু হয়েছে; ভারতীয় সাহিত্যে লেবানীজ খাদ্যের গুরুত্ব, আর্স্টহোয়াইল সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন ধরণের লেখায় বা কার কার লেখায় গ্রামবাংলার শ্রেণীবৈষম্যের হুবহু চিত্রাবলী অঙ্কিত হয়েছে, দেরিদা’র ডিকন্সট্রাকশনের ওপর রবীন্দ্রনাথ এবং মাধ্যাকর্ষনের প্রভাব, গুলাগ-এর প্রথম উৎপত্তি এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ-এর ম্যাসাকার- দুই-ই ১৯১৯ সালে হয়েছিল, নিউমেরোলজির বিচারে এই দুইয়ের মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে কি-না—
এসবের মধ্যে বিভিন্ন বক্তা এবং শ্রোতাবৃন্দ বক্তব্য রাখছিলেন, পেন-ফেন দিয়ে মনোযোগ সহকারে নোট নিচ্ছিল উজালাক্ষী আর আমি ক্ষিদেয়  আধমরা হয়ে ভাবছিলাম সেই পেনটা যদি পাওয়া যেত  “that would be a syringe”! (না, ব্যোমকেশের দুর্গরহস্য নহে)

আমি মাঝে মাঝে মুখে সবজান্তা স্মিত হাসি এবং চোখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব এনে মাথা নেড়ে যাচ্ছিলাম। মাইরি বলছি, শোনার চেষ্টাও করছিলাম কিন্তু  কিচ্ছুটি মগজে সেঁধোচ্ছিল না। তার ওপর থেকে থেকেই একটা প্রাণকাড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম, বেশ একটা ভাজা চিকেন, ভাজা চিকেন গন্ধ। বেশ কয়েকবার জিভে জল চলে এসেছে, একবার তো টিস্যুতে মুছতে হল; লিপস্টিক ঠিক করার ভান করে মুছে নিলাম।

শেষে আর থাকতে না পেরে উজালাক্ষীকে জিগালাম, “হ্যাঁ রে এদের লাঞ্চ ব্রেক-টেক নেই?”
– চুপ, চুপ…দেখছিস না কী ভীষণ দরদ নিয়ে অমুকদা সার্ত্রে’র স্মৃতিচারণ করছেন…এই সময় তোর খিদে পাচ্ছে?
-পেলে কী করবো? ওনার সার্ত্র, আমার ন্যসিয়া, খিদেয়… আমি করুণ স্বরে জানাই।
-উফ! ওই তো পেছনদিকে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে…চলে যা… এই  গেস্ট কার্ডটা রাখ সঙ্গে… আমি এখন যাবোনা…একটু পরেই ডিবেট শুরু হবে।

এটা এতক্ষণ বলতে কী হয়েছিল। মনে মনে ভয়ানক একটা খিস্তি দিয়ে আমি গুটি গুটি কার্ড নিয়ে এগোই। খাওয়ার ব্যবস্থা বেশ ভালই। চিকেন কাটলেট, বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, জলভরা সন্দেশ, এগুলো দেখে একটু আগে দেওয়া খিস্তিটা ফিরিয়ে নেবো কিনা ভাবছি, এমন সময় একটা ছোকরা এসে এক গাল হেসে ‘হাই’ বলল। ছোকরাকে আমি চিনিনা, বলাই বাহুল্য। তাছাড়া তখন যমরাজ এসে ডাকলেও আমি ঘুঁষি চালিয়ে দেবো এরকম দশা, তার মধ্যে এ কী আপদ!

ভদ্রতাবশে “হাই” বলতেই হয়। বললাম। চশমা পরলে আমাকেও বেশ আঁতেল লাগে, দু-একজন বলেছে, তাই আমি চশমা পরে গেছিলাম। ভুল করেছিলাম অবশ্যই কারণ ছোকরা এরপর ভীষণ স্মার্টভাবে নিজের নাম বলে হাত বাড়িয়ে দিল।
আ মোলো যা! দেখছিস এক হাতে প্লেট, আরেকহাতে চামচ। এখনও একটা কাটলেট পর্যন্ত তুলিনি প্লেটে! এর মধ্যে হ্যান্ডশেক!

কোনরকমে ব্যাপারটা ম্যানেজ করে মুখে মিষ্টি হাসি এবং মনে মনে ছোকরার চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে একটা কাটলেট তুলে দু-কামড় খেয়েছি কী খাইনি, ছোকরা প্লেট হাতে পাশে হাজির।
“আপনি আঁখিদির সঙ্গে এসেছেন , না? অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছি আপনাকে” (কেন ব্বে? আমি কি চিড়িয়াখানা থেকে এসেছি?)
খেতে খেতে এর উত্তরে হেঁ হেঁ ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা। কিন্তু সমস্যা হল, আগুনে ক্ষিদের মুখে আমার আরো দুটো কাটলেট নিতে ইচ্ছে করছে। মালটা এরা বানিয়েছেও ভাল। বিরিয়ানিও খাবো। ইদিকে ছোকরা বকেই যাচ্ছে। বকেই যাচ্ছে… 😦

হঠাৎ খেয়াল হল হতচ্ছাড়া কী একটা কথা বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের জন্য।
“অ্যাঁ?” আমি শুধোই।
-বলছিলাম যে, আপনি ডিবেটে কি দেরিদা’র গ্রুপে?
আমি নঞর্থক ভাবে মুন্ডু হেলাই। মুখে কাটলেট এবং শসার কুচি।
– তবে কি নেরুদা?

শালা আমায় এখনও পর্যন্ত একটা গোটা কাটলেট খেতে দেয়নি। মনে মনে বলি, “বসন্তি, এহি হ্যায় ওহ্‌ ম্যাজিক মোমেন্ট, হিলা দে ইউপি, হিলা দে এমপি”

অতঃপর, আমি পাশের টেবিলের ওপর প্লেটটা রেখে ছোকরার চোখে চোখ রেখে বলি,
“দেখুন, দেরিদা বা তাড়াতাড়িদা কাউকেই আমি চিনিনা। ন্যাড়াদা বা নেড়ুদা বলে আমাদের পাড়ায় একজন আছেন। মদ খেয়ে রোজ রাতে বাওলামি করেন বলে ওনার বৌ ওনাকে রামক্যালান ক্যালায়। তার কথা বলছেন? সেও এখানে এসেছে নাকি? আঁখি যে আমাকে বলল এখানে সব ভাল ভাল লোকেরা আসবে…”
শেষের লাইনটা সলিলকি স্টাইলে।

বললে পেত্যয় যাবেন না, ছোকরা পুরো চল্লিশ সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আমিও পেশেন্স দেখালাম। এতখানি যখন দেরি হয়েছে খেতে আরো এক মিনিটও সই। বেয়াল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় সে “আচ্ছা, আমিও খেয়ে আসি” বলে দ্রুতপদে উধাও হল।
ধীরেসুস্থে খাওয়ার ব্যাপারটা সেরে আবার হলে’র দিকে এগোতেই দেখি সেই ছোকরা উজালাক্ষীর পাশে বসে কীসব বলছে এবং মাঝে মাঝে ভীতভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ব্যাপার সুবিধের নয় বুঝে মানে মানে কেটে পড়াই মনস্থ করলাম। ঝটপট বেরিয়ে ওলায় বসেই উজালাক্ষীকে মেসেজ করলাম, “পেট কামড়াচ্ছে, বাড়ি যাচ্ছি”।

প্রায় দশদিন হয়ে গেছে। এখনও কোন রিপ্লাই দেয়নি। সামনের মাসে ও আবার কোথায় যেন বিদেশে যাচ্ছে। চকোলেট আনবে কি-না আমার জন্য, সেই ভাবনাই আপাততঃ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে… 😥

Advertisements

একটি প্রখ্যাত প্রসাধনী কোম্পানি সুরবালাকে তাহাদের কিছু  মূল্যবান সামগ্রী পাঠাইয়াছেন; উদ্দেশ্য, সুরবালা যেন সে সকল ব্যবহার করিয়া নিজের মতামত জানান। সুরবালার নিজেকে প্রথমে কেমন গিনিপিগ বোধ হইতেছিল। একবার ভাবিলেন, সবসুদ্ধ ব্যাগটি সোনা হেন মুখ করিয়া কাহাকেও পাচার করিবেন এবং যা-হয় একটা কিছু মতামত লিখিবেন। কিন্তু তাহার পর তিনি “বাহুবলী” দেখিলেন, হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করিলেন এবং ঠিক করিলেন যা হয় হইবে, একবার মাখিয়া দেখাই যাক!

সুরবালার পতিদেবতাটি সুবিধের নহেন। ফাঁক পাইলেই তিনি তির্যক মন্তব্য করিয়া সুরবালার ঝাঁ… অর্থাৎ গা-পিত্তি জ্বালাইয়া থাকেন। অতএব, সুরবালা ঠিক করিলেন, যে “মুখলেপন” বা ফেসপ্যাকটি আছে, উহা সকলে ঘুমাইয়া পড়িলে রাত্রে মাখিয়া দেখিবেন।  :/

সেইমত, গতকল্য রাত্রে মৃদু “ঘুরররর- ঘোঁত” শুরু হইতেই সুরবালা সতর্কভাবে খাট হইতে নামিয়া কৌটা খুলিয়া গোময় সদৃশ অর্ধতরল পদার্থটি মুখে মাখিতে শুরু করিলেন। দেখিতে খারাপ হইলেও উহার সুবাস বেশ মনোরম, সুরবালার কষ্ট হইতেছিল না। এর পর দেখিলেন কৌটার গায়ে লেখা আছে, মুখে লেপন লাগাইয়া বসিয়া থাকিতে হইবে যতক্ষণ না উহা শুকাইয়া যায়। দীর্ঘঃশ্বাস ফেলিয়া সুরবালা খাটে বসিয়া, টেবল-বাতি জ্বালাইয়া, বহুবার পড়া “হ্যারী পটার” পুনরায় পড়িতে আরম্ভ করিলেন।

এক্ষণে হ্যারী “সাপের ভাষা সাপের শিষ” সবেমাত্র আধো আধো বলিতে ও বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছে, এমন মাহেন্দ্রক্ষণে, পতিদেব সামান্য নড়িয়াচড়িয়া উঠিলেন। মাগ্‌ল বলিয়াই হয়ত, সুরবালা ইতিমধ্যে তাহার মুখে যে লেপন রহিয়াছে, উহার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছিলেন। বেশ কয়েকবার মুখ চুলকাইয়া ফেলিবার ফলে যে বেশ সাদায়-কালোয় চিত্রবিচিত পট তাহার মুখে রচিত হইয়াছিল, সে বিষয়েও অবগত ছিলেন না।

সুতরাং,পতিদেব জল খাইবেন বলিয়া চোখ খুলিয়া পাশের টেবলে হাত বাড়াইলেন, সুরবালা বিরক্ত হইয়া নিজমুখের সম্মুখ হইতে বইটি সরাইয়া কড়া চোখে তাকাইলেন এবং……

“বাপ্‌রে, ডাইনি কোথাকার” বলিয়া পতিদেব লম্ফ দিয়া উঠিতে গিয়া জলের বোতল সহ ভূপতিত হইলেন 😦

তবে, তিনি চোট পান নাই এবং সুরবালা যথেষ্ট আমোদ পাইয়াছেন। ভাল ভাল কথা লিখিবেন প্রসাধনী সম্পর্কে, ঠিক করিয়া ফেলিয়াছেন।

ফেসবুকের “আদার” ইনবক্স একটি স্বর্ণ খনি বিশেষ। নারী মাত্রেই জানেন এর তাৎপর্য‍্য। কত কিসিমের যে লোক হয় এই নেট দুনিয়ায়, তা বোঝার এবং জানার সহজতম উপায় এই “আদার”। আপনি আদার ব্যাপারি হন বা জাহাজের কারবারী, আউট অভ দ্য বক্স ভাবনাচিন্তা কাকে বলে এই ইনবক্স তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

এমনিতে সবাই জানে যে মেয়ে হওয়া এদেশে মোটামুটি একটা অপরাধের সামিল; এই মেয়েদের জন্যেই ধর্ষণের মতন একটা জঘন্য অপরাধ ঘটছে প্রতিনিয়ত; এই অসভ্য, হায়াহীন প্রজাতি কম কম জামাকাপড় পরে, সেজেগুজে দিনের বেলা তো বটেই এমনকি রাত্তিরবেলাতেও রাস্তায় ঘোরাফেরা করে পুরুষ কে প্রলুব্ধ করতে! কী সাংঘাতিক! শাড়ি-সালোয়ার প্রভৃতি সো-কল্ড ভদ্র পোষাকের বাবা-মেসো করে এরা জিন্‌স, হাপু, এমনকি গরম প্যান্ট পর্যন্ত অনায়াসে পরে ঘুরে বেড়ায়। এসব দেখে যদি পাঁচটা ছেলে একটু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাদের দোষ কোথায়?  আর একথা ব্যাদে আছে যে ছেলেদের মন মেয়েদের মতন প্যাঁচালো নয়, হুঁ হুঁ বাওয়া, ওদের মনে যা, মুখেও তাই।  তাই রাস্তায় এর’ম মেয়ে দেখে যদি মধ্যমা অটোমেটিক্যালি উঠে যায় বা চাট্টি রসের কথা মুখ থেকে বেরোয়- তাহলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়, বুঝিনা।

এত্তসব ট্র্যাফিক আইন হয়েছে, লাইট রে, পুলিশের প্যাট্রোল ভ্যান রে, ক্যমেরা রে, দাদুগীতি রে- আরে বস্‌, কয়েকটা ঝক্কাস দেখতে মেয়ে-পুলিশকে (ইয়েস, আগে মেয়ে, পরে পুলিশ, স্বাভাবিক নিয়মেই) ঝিঙ্কু ড্রেস পরিয়ে মোড়ে মোড়ে দাঁড় করিয়ে দাও, মার্সিডিজ টু রিক্সা , স-ও-ব দেখবে ঠিক জায়গামতন থামছে, চাখছে, যাচ্ছে। Total egalitarian concept- সব্বাই এক, আমরা সবাই রাজা… ইত্যাদি প্রভৃতি।

আচ্ছা, আচ্ছা, যা বলছিলাম… আসলে এই টপিক নিয়ে লিখতে বসলেই আমি একটু, ইয়ে মানে, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি আর কী। ক্ষমাঘেন্না করে দেবেন নিজগুণে…
যাইহোক, হচ্ছিল “আদার” ইনবক্স এর কথা। আমি একদিন এক সুন্দর, সুবাসিত সকালে একটি মেসেজ পেলাম, একজন ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে জানতে চেয়েছেন, আমি শুতে কত নিয়ে থাকি। এতে আমি যারপরনাই অবাক হয়ে রিপ্লাই দিয়েছিলাম যে আমি এমনিতেই ঘুমাতে ভালবাসি, তার জন্য কেউ কখনও টাকাপয়সা দেয়নি আমাকে। ওনার বাড়ির মহিলারা শোয়া বা ঘুমানোর জন্য চার্জ করেন বলে সবাইকে অমন ভাবা ঠিক না। এতে করে কেন জানিনা উনি ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে গেছিলেন। আরো দু-চারটে কথার পর আমাকে ব্লক করে দিলেন অথচ আমি বুঝতেই পারলাম না যে আমার দোষটা কোথায়!

তাছাড়া, প্রত্যেক মেয়েই কোন না কোন সময় মেসেজ পেয়ে থাকে যে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কেউ তাকে মডেল বানাতে চায় বা ফোটোশুট, বা  নিদেনপক্ষে, কোন বিশেষ পোজে তার ছবি দেখতে চায়। সুদূর মরক্কো থেকে শুরু করে নিকারাগুয়া, পারস্য এমনকি মঙ্গল্গ্রহ থেকেও এমত অনুরোধ এলে কোন মেয়েই অবাক হয়না। হওয়ার কথাও নয়, আমরা তো জানি, “আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী” … কিন্তু ভুসুকু এও বলেছেন যে, “মূঢ়া হিঅহি ণ পইসঈ” অর্থাৎ গাড়লের মগজে এতসব ঢোকেনা, তাই অবাক হওয়া বাদ দিলেও মাঝে মাঝেই মেয়েরা এইসব নিয়ে চিল্লামিল্লি করে, মানে মেয়েদের তো বুদ্ধিশুদ্ধি টেন্ডস টু জিরো …তাই আর কী…। এসব ছাড়াও, আমি_শুধু_চেয়েছি_তোমায়, বল্গাহীন_ভালবাসা, বিছানায়_বক, Sexy_Stud, Eternal_erection, DiscoDick- এরা সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে খোঁজখবর নিয়ে থাকে, বিচিত্র বানানে “ভালবাষা” জানায়।  Lyf roxxx!

তবু, এতকিছুর মধ্যেও ভরসার কথা এই যে, ইহজীবনে যত এরকম “হাম তো (মহা) পুরুষ হ্যায়, হাম ক্যা নেহি কর স্যকতা, সবকুছ জায়েজ হ্যায়” টাইপ ছেলে দেখেছি, তার দ্বিগুণ দেখেছি ঠিক মানুষের মতন পুরুষ। নিজের বাবা, দাদা,কাকা, স্বামী বা ছেলের কথা বাদ দিলেও বন্ধুস্থানীয় তাদের সংখ্যাটাও বড় কম নয়। এইসব নিয়েই তো জীবন, আমাদের জীবন; সবাই “ওম্মা, দ্যাখ কী ভাল, তকাই আমার” হবে, আয় তবে সহচরী গাইবে নেচে নেচে, তাই হয় নাকি? না হওয়া উচিৎ ।

বেঁচে থাক আমার নারীত্ব, আমার মেয়েলী সারল্য, আমার অকারণ হাসি, (পড়ুন ন্যাকামো) আমার চকিত সতর্কতা, আমার সঙ্গীর পায়ে-পা মিলিয়ে এগিয়ে চলার আনন্দ। সে পিছিয়ে পড়লে দাঁড়াব তার জন্য, কারণ আমি জানি সেও ঠিক তাই-ই করবে। পুনর্জন্ম আছে নাকি? কেউ জানেন? থাকলে, অগলে জনম মে মোহে বিটিয়া হি কিজো।

সারাদিন ধরে মাঝে মাঝেই সরু-মোটা-চিকন-গম্ভীর নানা গলায় ফোন আসে। আসতেই থাকে। কেউ আমাকে জানায় যে অমুক মিটিঙয়ে আমার উপস্থিতি একান্তই কাম্য, কেউ বা ইনভেস্টমেন্ট করতে চায় কয়েক কোটি, কেউ আবার গদগদ স্বরে আমাকে জানায় যে সুদূর নাইজিরিয়ার কোন এক অবলা, প্রকান্ড ধনী, বিধবা মহিলা আমাকেই কোন এক অজানা কারণে তাঁর সমস্ত সঞ্চিত অর্থ দান করতে চান- ইত্যাদি প্রভৃতি। আমার রেসপন্স এসব ব্যাপারে খুব-ই রিলেটিভ, সমস্তই ডিপেন্ড করে আমার মুডের ওপর। যেমন একদিন আমি বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম, সেইসময় একজন ফোন করে, “অ্যাম আই স্পিকিং টু মিস্টার ম্যানিপারনা?” আমি তাকে গলায় বিনয় ঝরিয়ে জিগাই যে কোত্থেকে তিনি এই নাম্বার পেলেন। তাতে তিনি বলেন যে তাদের ভি আই পি ডেটাবেসে আছে এই নম্বর। তখন আমি কান্না কান্না গলায় জানাই যে মিস্টার ম্যানিপারনা ইজ নো মোর, তিনি এন্তেকাল প্রাপ্ত হয়েছেন এই জাস্ট গতকাল। তারপর ফুঁপিয়ে কাঁদতে যাচ্ছিলাম কিন্তু তিনি ফোন কেটে দ্যান।

তারপর আরেকদিন মেজাজ খাট্টা ছিল, সেসময় একটা ফোন আসে যে বিজনেস সংক্রান্ত ব্যাপারে একটি কোম্পানী আমার সঙ্গে বাড়ি এসে কথা বলতে চায়। মিস মণিপর্ণা আছেন কিনা জানতে চাওয়া হলে আমি গম্ভীর গলায় জানাই যে উনি নেই, খাজুরাহো তে নাচতে গেছেন।

কালকের ব্যাপারটা অন্যরকম হল। অচেনা নাম্বার দেখে প্রথমে তুলিনি, দ্বিতীয়বার আবার ফোনটা আসাতে তুললাম। একজন একটু গ্রাম্য উচ্চারণে বললেন “বড়বাবু নি?”

কাল মেজাজ ভাল ছিল সুতরাং…

– বড়বাবু ব্যস্ত, কে বলছেন?
–  অ, বৌদিমণি, পেন্নাম। আমার ত কইলক্যাতা যাওয়া লাগেক আসছে সমবার। ত বুইলত্যেছিলাম কি বাগানের আমগুলান ন্যেয়া যাই? হাওড়া ইস্টিশানে কাউক্যে পাঠায়ে দিলেই হবেক…

আম আমার বড়ই প্রিয়। কিন্তু বাগান তো দূরে থাক, একখানা গোটা গাছও নেই আমার। তাই আমি একটু উৎসাহিত হয়ে পড়ি।

– হ্যাঁ হ্যাঁ, নিয়ে এসো… কখন, কোথায় আসবে?

আরো কিছু ডিটেইলস জানা যায় আম সম্বন্ধে। তারপর অপরপ্রান্ত বলে যে অতি অবশ্যই যেন হাওড়া ইস্টিশানে আম-নিতে-যাওয়া ব্যক্তির হাতে দু-হাজার টাকা পাঠাই… বাগানের বেড়া ভেঙ্গে গেছে…গরু-ছাগল ঢুকছে… 😦

এরপর আমের আশা ত্যাগ করে ফোন রেখে দেওয়াই শ্রেয় মনে করলাম। 😥

“তুনে মারি এন্ট্রি অওর দিল মে বজী ঘন্টি”- সুরবালা ধড়মড় করিয়া প্রায় লাফাইয়া উঠিলেন। চক্ষু পুরোপুরি উন্মীলিত করিতে না পারার দরুণ প্রথমে বুঝিতে পারিতেছিলেন না শব্দের উৎসস্থল। “টং টং টং” অনুসরণ করিয়া কায়ক্লেশে বাম চক্ষুটি নিমীলিত করিয়া বুঝিতে পারিলেন, পরমপূজ্য পতিদেবের চলমান দূরভাষ হইতে এমত মধুর ধ্বনি ভাসিয়া আসিতেছে। ষড়যন্ত্রটি বুঝিতে আর বাকি রহিলনা। গতরাত্রে স্বামীদেবতা কহিয়াছিলেন যে, অদ্য রবিবার হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার বিশেষ কর্মযজ্ঞ রহিয়াছে, সুতরাং সুরবালা যেন রবিবাসরীয় প্রভাতের নিদ্রালস্য ত্যাগ করিয়া অতি অবশ্য তাঁহাকে ভোর ছয়টায় ডাকিয়া দেন এবং যদি সামান্য এক পেয়ালা চা তিনি দয়া করিয়া প্রস্তুত করিতে পারেন তাহা হইলে তাঁহার ঊর্ধ্বতন চৌদ্দপুরুষ সৌভাগ্য লাভ করিবেন- ইহাও জানাইয়াছিলেন।

ইহাতে সুরবালা সুললিত ঝঙ্কারসহ বলিয়াছিলেন, যাহার বিবাহ তাহার হুঁশ না থাকিলে পত্নী বা প্রতিবেশীগণকে কেহ দিব্যি দেয় নাই যে সে বা তাহারা তাঁহাকে ছাদনাতলায় বসিবার জন্য হাঁক পাড়িবে। বলাই বাহুল্য, এরপর উভয়ের কন্ঠস্বরই উচ্চগ্রামে ওঠে, এমনকি পুর্নবিবাহের প্রস্তাবও বিবেচ্য হয়। ইহার পর ক্লান্ত হইয়া সুরবালা শয়ন করেন, তাহার পর আর তাহার কিছু মনে নাই। ইত্যবসরে, পতিদেব নিদ্রা যাওয়ার পূর্বে চলমান দূরভাষে এই কুকর্মটি করিয়া রাখিয়াছেন। সুরবালার নিদ্রা ভোরের দিকে অগভীর হইয়া পড়ে, এবং তাঁহার নিজেরটি সুগভীর হয়, ইহা তিনি সম্যক জ্ঞাত আছেন। ফলতঃ…

প্রবল গাত্রদাহ ও বক্র ওষ্ঠাধর  লইয়া মনে মনে ভয়াবহ কুবাক্য উচ্চারণ করিতে করিতে  মুখ পর্যন্ত না ধুইয়া কোনক্রমে চা প্রস্তুত করিয়া মিনিট দশেক পর যখন শয়নকক্ষে আসিয়া সুরবালা দেখিলেন তদবধি পতিদেব নিষ্ঠা সহকারে নিদ্রা যাইতেছেন। সুরবালার ওষ্ঠাধর বক্রতর হইল।

“চা” বলিয়া ঠকাৎ করিয়া তিনি পেয়ালা-পিরিচ নামাইয়া রাখিলেন এবং সূচালো নখাগ্র দিয়া শায়িত পতির পৃষ্ঠে  একটি মনোরম খোঁচা দিলেন।

“অঃকুঃ” জাতীয় কিছু বলিয়া পতিদেব পাশ ফিরিয়া শুইলেন।

এইবার প্রতিহিংসাপরায়ণ সুরবালার মনে হইল যে যথেষ্ট হইয়াছে; উঠিয়াছি, চা করিয়াছি, ডাকিয়াছি। আমার কর্তব্যকর্ম সমাপ্ত। আর ডাকিবনা। ইহা ভাবিয়া  এবং #হোক_দেরি থিওরি অবলম্বন করিয়া সুরবালা পুনরায় শয়নেই উদ্যোগ করিলেন।

একবার ভাঙিলে পুনরায় আবাহন করিয়া আনা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার, তাও নিদ্রাদেবী হাসি হাসি মুখে প্রায় আসিব আসিব করিতেছেন এমন সময়, আবার! আবার! “তু লড়কী বিউটফুল কর গ্যয়ী চুল”…!!!!

ক্রোধে সুরবালা প্রায় অন্ধ, চলমান দূরভাষটি  ছুঁড়িয়া ফেলিবেন না ভাঙ্গিয়া ফেলিবেন সে বিষয়ে মানসিক দোলাচলে ভুগিতেছেন, এমন সময় পতিদেব লম্ফ দিয়া উঠিয়া লড়কীর কন্ঠস্বর রোধ করিলেন।

সম্মুখে পেয়ালা-পিরিচ দেখিয়া যারপরনাই আহ্লাদিত হইয়া সুরবালা কে সুপ্রভাত জানাইলেন এবং পূর্বের এলার্মেই তিনি নিদ্রোত্থিতা হইয়াছেন দেখিয়া হর্ষ প্রকাশ করিলেন।

যাহার ছয়টায় উঠিবার কথা, ছয়টা বাজিয়া পঁয়তাল্লিশে উঠিয়া সে কীভাবে এমন নাচন-কোঁদন করে, সুরবালার এই প্রশ্নের জবাবে একটি দীর্ঘ বিজৃম্ভণ সহকারে তিনি বলিলেন যে, আটটা নাগাদ রওয়ানা হইলেই যথেষ্ট … দুই ঘন্টা আগে এলার্ম না দিলে এই সামান্য চা-টুকু তাহার জুটিতনা… কেহ কেহ সামান্য কষ্ট স্বীকার করিতে পারেনা…ইত্যাদি…

ইহার পর, সুরবালা যদি তপ্ত তৈলে নিক্ষিপ্ত বার্তাকুর ন্যায় জ্বলিয়া উঠিয়া, পতি পরম গুরু আপ্তবাক্য বিস্মৃত হইয়া, স্বামীকে বিজয় মাল্য’র ন্যায় ষড়যন্ত্রকারী, অনৃতভাষী এবং সুযোগসন্ধানী বলিয়া সম্বোধন করে, উহাকে দোষ দেওয়া যায় কী?

কলিযুগ হইলেও আমাদের বিশ্বাস, ভগবান আছেন, তিনি ইহার যোগ্য বিচার করিবেন।

-_- -_-