Posts Tagged ‘রম্যরচনা’

প্রথম প্রেম বা প্রথম চুম্বনের মতন প্রথম রান্না-ও মানুষ ভুলতে পারেনা। বা বলা ভাল, ভুলতে চাইলেও এই নির্মম সমাজ তাকে ভুলতে দেয়না। আমি যখন ক্লাস এইট-এ পড়ি, তখন আমি প্রথম চা বানিয়েছিলাম। ব্যাপারটা দেখতে অনেকটা খুব নোংরা গামছা-ধোয়া-জলের মতন হয়েছিল; মা এক চুমুক খেয়েই মুখ ভেট্‌কে নামিয়ে রেখেছিল (নিষ্ঠুর মহিলা), বাবা ধন্যি ধন্যি করেছিল বটে কিন্তু আরেক কাপ অফার করতেই “শিবু’র মা খুব অসুস্থ, যাই এক্ষুণি  একবার দেখে আসি” বলে কেটে পড়েছিল। সে যাই হোক, তবু তো খেয়েছিল! কিন্তু তা বলে এখনও, এই যে আমি এরকম দামড়া মহিলা হয়ে গেছি, এ-খ-ন-ও আমার সেই চা বানানোর গপ্পো শুনিয়ে হাসতে হবে 😮 তাও আবার আমার-ই ছেলের সামনে। অত্যাচার!! অথচ তারপর যে কত হাজার বার কত্ত ভাল চা বানিয়ে খাইয়েছি,  এমনকী পার্ফেক্ট  আর্ল গ্রে বানিয়েছি, তার কোন উল্লেখ নেই কখনো। দুনিয়াটাই এরকম ইয়ে টাইপ 😦

এই চা বানানোর কয়েকদিন পর-ই আমার হঠাৎ ডিম-কষা করবার সাধ জাগে। কীভাবে কী হইয়াছিল তাহা জানে শ্যামলাল কিন্তু নেট রেজাল্ট দাঁড়িয়েছিল, এক বাটি মশলামাখা ব্রাউন রঙের জলে কয়েকটি শুভ্রকান্তি ডিম সুন্দর রাজহাঁসের মতন সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। এছাড়া, ফুঁ দিয়ে গ্যাস আভেন নিভিয়ে ফেলার রেকর্ড-ও আছে আমার… হুঁ হুঁ বাওয়া। তবে এসব সামান্য ব্যাপার এবং আমরা সকলেই অবগত আছি, বড়ে বড়ে দেশো মেঁ, অ্যাইসি ছোটি ছোটি বাঁতে হোতি রহতি হ্যায় ইত্যাদি প্রভৃতি।

আসল ব্যাপার হল আমার জীবনের প্রথম অ্যালকোহল পান করা। তখন আমি ক্লাস ইলেভ্‌ন। বন্ধুরা মিলে ঠিক হল, যে একদিন এই মদ খাওয়া ব্যাপারটা একবার ট্রাই না করলে সমাজে মুখ দেখানো যাচ্ছেনা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেই বা আমরা কী জবাবদিহি করবো :/  আমাদের এক বন্ধুর বাবা কর্মসূত্রে নিয়মিত বিদেশে যেতেন এবং বিভিন্ন ধরণের পানীয় নিয়ে আসতেন। He was, we can say, an afcionado in this matter. একদিন সেই বন্ধু, ধরা যাক তার নাম দীপিকা, এসে বলল, অমুকদিন বাবা-মা কেউ বাড়ি থাকবেনা, দুপুরবেলায় তোরা সবাই চলে আয়। সবাই বলতে আমরা পাঁচটি কৌতূহলী কিশোরী। “তথাস্তু” বলে আমরা গুটি গুটি বিকেল চারটে নাগাদ নির্দিষ্ট দিনে দীপিকাদের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম।

প্রথমেই ঝামেলা লাগল কী রঙের এবং কোন ডিজাইনের বোতল নামানো হবে, তা নিয়ে। আমাদের কারোর-ই বিন্দুমাত্র ধারণা ছিলনা সেই সময় বিভিন্ন ধরণের ওয়াইন, স্কচ বা হুইস্কি নিয়ে। দীপিকা’র নিজের জ্ঞান-ও দেখা গেল খুব-ই সীমিত। ফলে, একজনের পছন্দ পেটমোটা, খাঁজকাটা গোল কালো বোতল তো অন্যজন ভোট দিচ্ছে হালকা নীল স্লিক একটায়। বিস্তর ঝামেলা’র পর একখানা সবুজ বোতল নামানো হল 😀 নাম-টাম আজ আর মনে নেই।  অবশ্য সেইসময়-ও নাম দেখা হয়নি, “নামে কী-ই বা এসে যায়” থিওরি অবলম্বন করেছিলাম আমরা।

তা বোতল নামানো হয়েছে। দীপিকা “দাঁড়া, আমি গ্লাস আর ডালমুট নিয়ে আসছি” বলে ভেতরে গেছে, আমরা বসার ঘরে সোফায় বসে আলোচনা করছি ঠিক কীভাবে মদ খায়। এখন সমস্যা হল, আমি বরাবর নিজেকে হেব্বি ইয়ে, যাকে বলে এসস্মার্ট মনে করি (সব ছাগলেরাই তাই মনে করে, নতুন কিছু নয়); তো এইসব আলোচনা’র মধ্যেই আমি খুব কনফিডেন্টলি বলে উঠলাম, “কীভাবে আর খায়, দেখিসনি সিনেমায়? বোতল ধরে এইভাবে…” বলে বোতলটা তুলে থামস্‌ আপ খাওয়ার মতন ঢক্‌ঢকিয়ে গলায় ঢেলে দিলাম!! প্রথম ঢোঁকেই মনে হল উগ্‌রে দিই সবটা। কিন্তু প্রেস্টিজ কা ভি সওয়াল থা 😦 যো করে প্রেস্টিজ সে প্যয়ার, উয়ো কিসি ভি খতরনাক কাম সে ক্যায়সে করে ইন্‌কার। সুতরাং আমি প্রায় চার-পাঁচ ঢোঁক গিলে তবেই বোতল নামালাম।

ইতিমধ্যে দীপিকা গ্লাস-ট্রে ইত্যাদি নিয়ে ফিরে এসেছে এবং বিস্ফারিত চোখে আমাকে দেখছে। আমি জল-টল খেয়ে কিছুই হয়নি এরকম ভাব নিয়ে মিনিট কুড়ি কী আধঘন্টা বসার পরেই কেমন মনে হতে লাগল,  এ জীবন মায়া প্রপঞ্চময় বড়, কা তব কান্তা কাস্তে পুত্রঃ সংসারোহয়– এরকম একটা লেভেলে চলে যাচ্ছি ক্রমশঃ। বাকিরা আমার ওই পৈশাচিক খাওয়া দেখে সামান্য কন্সার্ন্ড হয়ে পড়লেও তখনও বোঝেনি কী হতে চলেছে। সত্যি বলতে কী, আমার মনে আছে যে আমি একবার বলেছিলাম’ “অ্যাই, ভূমিকম্প হচ্ছে না কি রে?” তারপর আমার আর কিছু মনে নেই 😥

এরপরের গপ্পো অনেক বড়। টু কাট আ লং স্টোরি শর্ট, কাকু-কাকীমা ফিরে এসেছিলেন এবং আমাদের কাউকেই একটুও বকাবকি করেননি। আমার বাড়িতে-ও ওনারাই পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে, বিভিন্ন পানীয় ঠিক কীভাবে টেস্ট করতে হয়, কীভাবেই বা স্কটল্যান্ডের এক অঞ্চলের পানীয় অন্য অঞ্চলের থেকে আলাদা– এসব-ও তাঁর কাছেই শোনা। গল্পের মত বলে যেতেন। (পরে কখনও এই নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে) দুঃখের বিষয়, ভূয়োদর্শী মানুষটি এখন পার্কিনসন্স রোগ-এ আক্রান্ত 😦 ।

যাইহোক, সব ভাল যার শেষ ভাল। বিয়ের প্রায় দু-তিন বছর পর থেকে আমি আস্তে আস্তে রান্না করা শিখেছি। শিখতে গিয়ে বুঝেছি, সামান্য একটু ইচ্ছা, জানার আগ্রহ, ধৈর্য আর ভালবাসা থাকলেই রান্না জিনিসটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমি এখন ইয়ে মানে… হেঁ হেঁ… মানে আমার রান্না খেয়ে লোকজন দিব্যি পোsongসা করে আর কী… সত্যি, মাক্কালীর দিব্যি।

Advertisements

লীলাবতী’র বিবাহ স্থির হইয়াছে। আত্মীয়স্বজনকে জানানো হইয়াছে, তাঁহারা একে একে আসিয়া সহর্ষ রোমাঞ্চে সারা বাড়ি উচ্চকিত করিয়া তুলিতেছেন। লীলা’র জ্যেষ্ঠতাত গম্ভীর মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পাত্র’র ব্যাপারে অগ্রে কিছু খোঁজখবর করিতে পারেন নাই। শুনিয়াছেন লীলা নিজেই পাত্র পছন্দ করিয়াছে। প্রেমের বিবাহ! তাঁহার ওষ্ঠাধর বঙ্কিম হইল। বিরাগপূর্ণ স্বরে লীলা’র পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,

— তা, ছেলে কী করে?

— (সহর্ষে) ফেসবুক করে। তিনটে দশ লাখি গ্রুপের অ্যাডমিন, দুটো পাঁচ লাখি’র মডারেটর। বেচারা’র নাওয়াখাওয়ার সময় পর্যন্ত নেই, অ্যাত্তো চাপ! সামনের মাসেই জাকারবার্গে’র সঙ্গে মিটিং করতে হন্ডুরাস যাচ্ছে, ওখানকার ক্রাইম রেট কেন বেশি সেই নিয়ে “হন্ডুরাসে হাহা কর” গ্রুপ-এ বিরাট ঝামেলা হয়েছে কিনা, জামাইকে তাই ডেকে পাঠিয়েছে; ও-ই অ্যাডমিন তো…

— আহা, আহা, ভাবা যায়! বেঁচে থাকুক, বাবাজীবন। হীরে’র টুকরো জামাই হয়েছে আমাদের লীলা’র…ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল!

——————————
উপরোক্ত কথোপকথন আপাততঃ কাল্পনিক হলে-ও, এমন দিন যে অদূর ভবিষ্যতে আসবেনা, এমন কথা জোর গলায় বলা যায়না। ফেসবুক এখন আমাদের শিরায়-উপশিরায় বাহিত হয়। আপনার আধার কার্ড নাও থাকতে পারে, কিন্তু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকতেই হবে। এক অজানা জগতের অপার সম্ভাবনাসমৃদ্ধ ইশারা দেয় ফেসবুক। কত্ত কিছু যে জানতে পারবেন, কত জানা জিনিস যে ভুলে যাবেন ফেসবুক করতে করতে, তা আপনি নিজেই টের পাবেন না।

আমি যা কোনোদিন-ও শিখতে পারবো বলে স্বপ্নে-ও ভাবিনি, ফেসবুক আমাকে তা শিখিয়েছে। ঘাসের ওপর প্রথম পড়া শিশির সামান্য নুন দিয়ে খেলে কোষ্ঠ সাফ হবে, টোম্যাটো বেশি খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়, ইউনেস্কো আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে অন্য সব দেশের-ও জাতীয় সঙ্গীত করা’র পরামর্শ দিয়েছে, কীভাবে বসলে মাথায় কোনদিন-ও টাক পড়বেনা, কেন ঠিক দুপুরবেলা রোজ হেঁড়ে গলা’য় গান গাইলে  বাত-এ ধরেনা, ফুলকপি’র  কেক, তরমুজ’র চকোলেট ম্যুজ  বা নিমপাতার টক-মিষ্টি ফিরনি– এ সব-ই আমাকে ফেসবুক শিখিয়েছে। যে বই আমি কখনো পড়িনি, যে সিনেমা আমার কখনো দেখতে ইচ্ছে হয়নি, ফেসবুক আমাকে সেইসব বই/সিনেমা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করেছে, সমাজে আমি মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছি।

তবে, শুধু এটুকু-ই নয়। আরো কয়েক-টা জিনিস বলা দরকার।
এখন আমাদের অনেক বন্ধু। নিত্যনতুন বন্ধুরা তো আছেই, তাছাড়া সেই ছোটবেলা’র ফেলে আসা দিনের বন্ধুদের-ও খুঁজে পেয়েছি এইখানেই। ভারচুয়াল জগত এটা, আমরা সবাই জানি, তবু-ও কারো কারো সঙ্গে তৈরি হয় নতুন সম্পর্ক, দু-দিন অনলাইন না দেখলেই ভাবি “আরে, দেখছিনা তো অমুক-কে, ভাল আছে তো”! ভারচুয়াল হোক বা রিয়্যাল, কৃত্রিমতা চারপাশে বেড়ে-ই চলেছে। ফেসবুকে’র জগতে এইটুকু ভালবাসা, বন্ধুত্ব বা স্নেহের গল্প নাহয় হল। অ্যাবসল্যুট ব্লিস বলে কিছু হয়না। ফেসবুকে-ও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, মনোমালিন্য বা বন্ধুবিচ্ছেদ। তবু-ও দিনশেষে যখন ছবি ফুটে ওঠে একের পর এক স্ক্রিণ-এ, প্রবহমান ভারচুয়ালিটি অজান্তেই কখন আপাত এক নিশ্চিন্তির সন্ধান দেয়। অস্ফুটে কেউ বা বলে-ও ফেলেন, “ভাগ্যিস ফেসবুক ছিল!”

***”মাধুকরী” অনলাইন ম্যাগাজিন, জুন সংখ্যায় প্রকাশিত***

টিপিক্যাল ইন্ট্রোভার্ট আমি। কথা বলি কম, শুনি বেশি। কথা বলতে হবে ভাবলে-ই শরীর খারাপ লাগে। তার বদলে তিন পাতা হাতের লেখা লিখলে যদি এক-ই কাজ হয়, আমি তাতে রাজী, এনি ডে। তো, সেসব তো আর হয়না। কাজের প্রয়োজনে, বকতে হয়, ফোনালাপ-ও করতে হয়। তবে, এর বাইরে, রাস্তাঘাটে নিতান্ত দায়ে না পড়লে সাধারণতঃ আমার মুখ থেকে হুঁ-হাঁ ছাড়া বিশেষ শব্দ বের হয়না। সেদিন হঠাৎ কী মনে হল, পাশে অটোচালক যখন অ্যাজ ইউজুয়াল গজ্‌গজ্‌ করছেন জ্যামে দাঁড়িয়ে,”এইজন্য শালা অফিস টাইমে এদিকে আসতে চাইনা, ফালতু বাঁ যত টাইম নষ্ট”, উত্তর দিয়ে ফেললাম।

— সত্যি অসুবিধে হয় আপনাদের, এই গরমে প্রতি ট্রিপে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা। সময় তো নষ্ট হয়-ই…

— (সামান্য অবাক হয়ে) কী বলবো আর দিদি…আমাদের-ই সবাই গালাগালি করে…আমরা-ও তো মানুষ। প্রতিদিন এই মিটিং-মিছিল-জ্যাম…পারা যায়…

এরপর দেশের অবস্থা নিয়ে আরো দু-একটি কথা’র মাঝে-ই আচমকা পাশ থেকে একটা ছোট প্রাইভেট বাস ওভারটেক করতে গিয়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে ফেলল আমাদের অটো-কে। দিয়েই সেই বাসের হেল্পার বা ওরকম কিছু, যে গেট-এ দাঁড়ানো ছিল, চিৎকার করে খিস্তি দিয়ে উঠল অটোচালক-কে। অথচ দোষটা ১০০% বাসটা’র!

এরপর যা হয়. তুমুল বাগবিতণ্ডা। এরমধ্যে জ্যাম কেটে যাওয়ায় বাস চলেছে সামনে খিস্তাতে খিস্তাতে, আর অটো যথাসম্ভব জোরে তার পেছনে।

যেটা অদ্ভুত লাগলো, যে লোক-টি পাঁচ মিনিট আগে সামান্য একটা বাক্যে দুটো খিস্তি মেরেছিল, সে এই ঝামেলা’র মধ্যে-ও, বাস-এর লোকটা-কে একটা বাজে কথা বললোনা। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে শুধু আমার উপস্থিতি’র জন্য উনি কিছু বলতে পারছেন না। খালি বলছেন, “মুখ খারাপ করছিস তো, দ্যাখ তোকে কী করি! মারলে তো মরেই যাবি।।যা চেহারা!!”

আমি গন্তব্যে নামতেই, ভাড়াটা কোনরকমে নিয়ে স্পীড তুললেন অটো-তে, মুখভঙ্গী দেখে মনে হল, এইবার শুরু হবে… 😀

সেদিন-ই সন্ধেবেলা, হুড়মুড় করে ছুটছি গড়িয়ায়; এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা, কিছু একটা দেখতে দেখতে আসছিলেন পাশের দোকানে, শেষমুহূর্তে একটা রিকশা-কে সাইড দিতে গিয়ে ওনা’র হাত থেকে পার্স-টা পড়ে গেল মাটিতে। অন্যসময় হ’লে, তুলে দিয়ে, কোনো কথা না বলেই চলে আসতাম হয়ত। কিন্তু সেদিন কথায় পেয়েছিল। তুলে দিয়ে বললাম, “সাবধানে দেখে হাঁটবেন তো…এত ভিড়”।

একটু হেসে বললেন,”তাও ভাগ্যিস তুলে দিলে। নয়ত সত্যি অসুবিধায় পড়তাম, নীচু হতে পারিনা তো”।

তারপর হাত-টা একটু ছুঁয়ে বললেন “ভাল থেকো”।

সেদিনের পর থেকে কেন জানি মনে হচ্ছে, এত অসহিষ্ণু, এত উগ্র আমরা, সে কি কেউ কারো কথা শুনিনা বলে? আমাদের দাঁড়ানো’র সময় নেই। কথা বলা’র প্রয়োজন নেই, শোনা’র তো নেই-ই।

একটু মন দিয়ে শুনলে, একটু সময় দিলে কি বদলে যায় চারপাশ… কী জানি…

সকালবেলা হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে কয়েকদিন আগে উজালাক্ষী এসে হাজির। উজালাক্ষী আমার বড়বেলার বন্ধু। হেব্বি পড়াশোনা-করা সিরিয়াস আঁতেল টাইপের পাবলিক। কীসব গবেষণা করে, গুচ্ছের পেপার লিখে, দেশ এবং দশকে উদ্ধার করার ফলে নামের আগে একখানা ডক্টর-ও বসে তার। এ হেন গুণবতী মামণি কীভাবে আমার মতন আকাটের বন্ধু হয়, এ নিয়ে যারা দু-লাইন পড়েই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, তাদের অবগতির জন্য জানাই, উজালাক্ষীকে একবার একটা বিপদের হাত থেকে আমি বাঁচিয়েছিলাম- সেই কারণেই, কিছুটা কৃতজ্ঞতা এবং কিছুটা আমার  অন্যান্য অপদার্থতার প্রতি  করুণাবশতঃ, বেচারী আমায় ফেলতে পারেনা। বিদেশ থেকে পারফ্যুমটা, লজেন্সটা, চকোলেটটা এনে দেয়। এমনকি, মাঝে মাঝে কোন কোন ব্যাপারে আমার পরামর্শও চায়। যদিও ওর সাহায্য চাওয়ার বিষয়গুলো ঠিক সাধারণ বলা যায়না। যেমন, একবার আইএসডি করে জিজ্ঞেস করেছিল, ওর বয়ফ্রেন্ড তার জাঙিয়া ওর বাড়িতে ফেলে গেছে, তো সেটা কি ও ট্র্যাশ ক্যান-এ ছুঁড়ে ফেলবে না কাচবে। তখন রাত্তির আড়াইটে বাজে প্রায়। তা, আমি ঘুমচোখে আর কিছু না জিজ্ঞেস করে বলেছিলাম কেচে ফেলতে। তখন বলল, কেচে বয়ফ্রেডকে কুরিয়র করে পাঠিয়ে দেবে না আলমারিতে রাখবে।! এইভাবে স্টেপ বাই স্টেপ ব্যাপারটা মিটতে প্রায় রাত ভোর হয়ে গেছিল।

সে হেন উজালাক্ষীকে রবিবার ভোর আটটা’র (হ্যাঁ, আটটা আমার কাছে ভোর-ই) সময় একটা জম্পেশ কায়দার বুটিকের ছাইরঙা হাই-লো কুর্তা আর সাদা পাজামা পরে হাঁপাতে হাঁপাতে আসতে দেখেই আমি প্রমাদ গুণলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই জানা গেল যে, বেশ একটা উঁচুদরের সাহিত্যসভায় ওর যাওয়ার কথা এগারোটার সময়। দুজনের জন্য ইনভিটিশন পাঠিয়েছেন উদ্যোক্তারা। কোন এক রহস্যময় কারণে ওর মনে হচ্ছে সঙ্গে কাউকে না নিয়ে একা গেলে ওর সম্মানহানি ঘটবে; তাই এই আক্রমণ…মানে ইয়ে… আগমন।

আমি প্রায় কেঁদে ফেলে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এই সাতসকালে আমার প্রাত্যহিক কোন কাজ তো হয়ই-নি এবং তার চেয়েও বড় কথা এসব সভায় আমাকে নিয়ে যাওয়া আর একটা দাঁড়কাক কে নিয়ে যাওয়া এক-ই ব্যাপার।

-তার চেয়ে এক কাজ কর বরং, তোকেও যেতে হবেনা। পাঁঠার মাংস রাঁধবো। আর বিয়ার আনাবো…আজ আমার এখানেই থেকে যা।

এসব লোভ দেখিয়েও কোন কাজ হলনা। এমনকি শেষে আমি বিয়ার থেকে স্কচ অবধি উঠেছিলাম, তাতেও না।

অদ্যই আমার জীবনের শেষ রজনী- এই ভেবে তৈরী হয়ে নিলাম ইষ্টনাম জপতে জপতে। এইরকম সব মেগাবিপদের সময় আমি আরো অনেকের মতই ভয়ানক ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়ে পড়ি L

পৌঁছে দেখি সে এক এলাহি ব্যাপার! গম গম করে লাউডস্পীকারে নাম-টাম বলা হচ্ছে আর লোকজন গিয়ে হেসে হেসে পুষ্পস্তবক নিচ্ছে আর একটা বড় বাক্স। উজালাক্ষীও পেল। আমি যথারীতি বাক্সর একদিকের  কানা উঁচু করে দেখতে চেষ্টা করছিলাম যে ভেতরে মিষ্টি আছে কি-না, বা থাকলে কী কী মিষ্টি। ক্যামন দুর্বাসার মতন কট্‌মট করে তাকালো আমার দিকে। মরুকগে যাক, সামনে পুজো, আমি এখন ডায়েট করছি।

ইতিমধ্যে, বেশ মনোজ্ঞ আলোচনা শুরু হয়েছে; ভারতীয় সাহিত্যে লেবানীজ খাদ্যের গুরুত্ব, আর্স্টহোয়াইল সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন ধরণের লেখায় বা কার কার লেখায় গ্রামবাংলার শ্রেণীবৈষম্যের হুবহু চিত্রাবলী অঙ্কিত হয়েছে, দেরিদা’র ডিকন্সট্রাকশনের ওপর রবীন্দ্রনাথ এবং মাধ্যাকর্ষনের প্রভাব, গুলাগ-এর প্রথম উৎপত্তি এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ-এর ম্যাসাকার- দুই-ই ১৯১৯ সালে হয়েছিল, নিউমেরোলজির বিচারে এই দুইয়ের মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে কি-না—
এসবের মধ্যে বিভিন্ন বক্তা এবং শ্রোতাবৃন্দ বক্তব্য রাখছিলেন, পেন-ফেন দিয়ে মনোযোগ সহকারে নোট নিচ্ছিল উজালাক্ষী আর আমি ক্ষিদেয়  আধমরা হয়ে ভাবছিলাম সেই পেনটা যদি পাওয়া যেত  “that would be a syringe”! (না, ব্যোমকেশের দুর্গরহস্য নহে)

আমি মাঝে মাঝে মুখে সবজান্তা স্মিত হাসি এবং চোখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব এনে মাথা নেড়ে যাচ্ছিলাম। মাইরি বলছি, শোনার চেষ্টাও করছিলাম কিন্তু  কিচ্ছুটি মগজে সেঁধোচ্ছিল না। তার ওপর থেকে থেকেই একটা প্রাণকাড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম, বেশ একটা ভাজা চিকেন, ভাজা চিকেন গন্ধ। বেশ কয়েকবার জিভে জল চলে এসেছে, একবার তো টিস্যুতে মুছতে হল; লিপস্টিক ঠিক করার ভান করে মুছে নিলাম।

শেষে আর থাকতে না পেরে উজালাক্ষীকে জিগালাম, “হ্যাঁ রে এদের লাঞ্চ ব্রেক-টেক নেই?”
– চুপ, চুপ…দেখছিস না কী ভীষণ দরদ নিয়ে অমুকদা সার্ত্রে’র স্মৃতিচারণ করছেন…এই সময় তোর খিদে পাচ্ছে?
-পেলে কী করবো? ওনার সার্ত্র, আমার ন্যসিয়া, খিদেয়… আমি করুণ স্বরে জানাই।
-উফ! ওই তো পেছনদিকে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে…চলে যা… এই  গেস্ট কার্ডটা রাখ সঙ্গে… আমি এখন যাবোনা…একটু পরেই ডিবেট শুরু হবে।

এটা এতক্ষণ বলতে কী হয়েছিল। মনে মনে ভয়ানক একটা খিস্তি দিয়ে আমি গুটি গুটি কার্ড নিয়ে এগোই। খাওয়ার ব্যবস্থা বেশ ভালই। চিকেন কাটলেট, বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, জলভরা সন্দেশ, এগুলো দেখে একটু আগে দেওয়া খিস্তিটা ফিরিয়ে নেবো কিনা ভাবছি, এমন সময় একটা ছোকরা এসে এক গাল হেসে ‘হাই’ বলল। ছোকরাকে আমি চিনিনা, বলাই বাহুল্য। তাছাড়া তখন যমরাজ এসে ডাকলেও আমি ঘুঁষি চালিয়ে দেবো এরকম দশা, তার মধ্যে এ কী আপদ!

ভদ্রতাবশে “হাই” বলতেই হয়। বললাম। চশমা পরলে আমাকেও বেশ আঁতেল লাগে, দু-একজন বলেছে, তাই আমি চশমা পরে গেছিলাম। ভুল করেছিলাম অবশ্যই কারণ ছোকরা এরপর ভীষণ স্মার্টভাবে নিজের নাম বলে হাত বাড়িয়ে দিল।
আ মোলো যা! দেখছিস এক হাতে প্লেট, আরেকহাতে চামচ। এখনও একটা কাটলেট পর্যন্ত তুলিনি প্লেটে! এর মধ্যে হ্যান্ডশেক!

কোনরকমে ব্যাপারটা ম্যানেজ করে মুখে মিষ্টি হাসি এবং মনে মনে ছোকরার চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে একটা কাটলেট তুলে দু-কামড় খেয়েছি কী খাইনি, ছোকরা প্লেট হাতে পাশে হাজির।
“আপনি আঁখিদির সঙ্গে এসেছেন , না? অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছি আপনাকে” (কেন ব্বে? আমি কি চিড়িয়াখানা থেকে এসেছি?)
খেতে খেতে এর উত্তরে হেঁ হেঁ ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা। কিন্তু সমস্যা হল, আগুনে ক্ষিদের মুখে আমার আরো দুটো কাটলেট নিতে ইচ্ছে করছে। মালটা এরা বানিয়েছেও ভাল। বিরিয়ানিও খাবো। ইদিকে ছোকরা বকেই যাচ্ছে। বকেই যাচ্ছে… 😦

হঠাৎ খেয়াল হল হতচ্ছাড়া কী একটা কথা বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের জন্য।
“অ্যাঁ?” আমি শুধোই।
-বলছিলাম যে, আপনি ডিবেটে কি দেরিদা’র গ্রুপে?
আমি নঞর্থক ভাবে মুন্ডু হেলাই। মুখে কাটলেট এবং শসার কুচি।
– তবে কি নেরুদা?

শালা আমায় এখনও পর্যন্ত একটা গোটা কাটলেট খেতে দেয়নি। মনে মনে বলি, “বসন্তি, এহি হ্যায় ওহ্‌ ম্যাজিক মোমেন্ট, হিলা দে ইউপি, হিলা দে এমপি”

অতঃপর, আমি পাশের টেবিলের ওপর প্লেটটা রেখে ছোকরার চোখে চোখ রেখে বলি,
“দেখুন, দেরিদা বা তাড়াতাড়িদা কাউকেই আমি চিনিনা। ন্যাড়াদা বা নেড়ুদা বলে আমাদের পাড়ায় একজন আছেন। মদ খেয়ে রোজ রাতে বাওলামি করেন বলে ওনার বৌ ওনাকে রামক্যালান ক্যালায়। তার কথা বলছেন? সেও এখানে এসেছে নাকি? আঁখি যে আমাকে বলল এখানে সব ভাল ভাল লোকেরা আসবে…”
শেষের লাইনটা সলিলকি স্টাইলে।

বললে পেত্যয় যাবেন না, ছোকরা পুরো চল্লিশ সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আমিও পেশেন্স দেখালাম। এতখানি যখন দেরি হয়েছে খেতে আরো এক মিনিটও সই। বেয়াল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় সে “আচ্ছা, আমিও খেয়ে আসি” বলে দ্রুতপদে উধাও হল।
ধীরেসুস্থে খাওয়ার ব্যাপারটা সেরে আবার হলে’র দিকে এগোতেই দেখি সেই ছোকরা উজালাক্ষীর পাশে বসে কীসব বলছে এবং মাঝে মাঝে ভীতভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ব্যাপার সুবিধের নয় বুঝে মানে মানে কেটে পড়াই মনস্থ করলাম। ঝটপট বেরিয়ে ওলায় বসেই উজালাক্ষীকে মেসেজ করলাম, “পেট কামড়াচ্ছে, বাড়ি যাচ্ছি”।

প্রায় দশদিন হয়ে গেছে। এখনও কোন রিপ্লাই দেয়নি। সামনের মাসে ও আবার কোথায় যেন বিদেশে যাচ্ছে। চকোলেট আনবে কি-না আমার জন্য, সেই ভাবনাই আপাততঃ কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে… 😥

একটি প্রখ্যাত প্রসাধনী কোম্পানি সুরবালাকে তাহাদের কিছু  মূল্যবান সামগ্রী পাঠাইয়াছেন; উদ্দেশ্য, সুরবালা যেন সে সকল ব্যবহার করিয়া নিজের মতামত জানান। সুরবালার নিজেকে প্রথমে কেমন গিনিপিগ বোধ হইতেছিল। একবার ভাবিলেন, সবসুদ্ধ ব্যাগটি সোনা হেন মুখ করিয়া কাহাকেও পাচার করিবেন এবং যা-হয় একটা কিছু মতামত লিখিবেন। কিন্তু তাহার পর তিনি “বাহুবলী” দেখিলেন, হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করিলেন এবং ঠিক করিলেন যা হয় হইবে, একবার মাখিয়া দেখাই যাক!

সুরবালার পতিদেবতাটি সুবিধের নহেন। ফাঁক পাইলেই তিনি তির্যক মন্তব্য করিয়া সুরবালার ঝাঁ… অর্থাৎ গা-পিত্তি জ্বালাইয়া থাকেন। অতএব, সুরবালা ঠিক করিলেন, যে “মুখলেপন” বা ফেসপ্যাকটি আছে, উহা সকলে ঘুমাইয়া পড়িলে রাত্রে মাখিয়া দেখিবেন।  :/

সেইমত, গতকল্য রাত্রে মৃদু “ঘুরররর- ঘোঁত” শুরু হইতেই সুরবালা সতর্কভাবে খাট হইতে নামিয়া কৌটা খুলিয়া গোময় সদৃশ অর্ধতরল পদার্থটি মুখে মাখিতে শুরু করিলেন। দেখিতে খারাপ হইলেও উহার সুবাস বেশ মনোরম, সুরবালার কষ্ট হইতেছিল না। এর পর দেখিলেন কৌটার গায়ে লেখা আছে, মুখে লেপন লাগাইয়া বসিয়া থাকিতে হইবে যতক্ষণ না উহা শুকাইয়া যায়। দীর্ঘঃশ্বাস ফেলিয়া সুরবালা খাটে বসিয়া, টেবল-বাতি জ্বালাইয়া, বহুবার পড়া “হ্যারী পটার” পুনরায় পড়িতে আরম্ভ করিলেন।

এক্ষণে হ্যারী “সাপের ভাষা সাপের শিষ” সবেমাত্র আধো আধো বলিতে ও বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছে, এমন মাহেন্দ্রক্ষণে, পতিদেব সামান্য নড়িয়াচড়িয়া উঠিলেন। মাগ্‌ল বলিয়াই হয়ত, সুরবালা ইতিমধ্যে তাহার মুখে যে লেপন রহিয়াছে, উহার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছিলেন। বেশ কয়েকবার মুখ চুলকাইয়া ফেলিবার ফলে যে বেশ সাদায়-কালোয় চিত্রবিচিত পট তাহার মুখে রচিত হইয়াছিল, সে বিষয়েও অবগত ছিলেন না।

সুতরাং,পতিদেব জল খাইবেন বলিয়া চোখ খুলিয়া পাশের টেবলে হাত বাড়াইলেন, সুরবালা বিরক্ত হইয়া নিজমুখের সম্মুখ হইতে বইটি সরাইয়া কড়া চোখে তাকাইলেন এবং……

“বাপ্‌রে, ডাইনি কোথাকার” বলিয়া পতিদেব লম্ফ দিয়া উঠিতে গিয়া জলের বোতল সহ ভূপতিত হইলেন 😦

তবে, তিনি চোট পান নাই এবং সুরবালা যথেষ্ট আমোদ পাইয়াছেন। ভাল ভাল কথা লিখিবেন প্রসাধনী সম্পর্কে, ঠিক করিয়া ফেলিয়াছেন।