Posts Tagged ‘#রুদ্রনীলঘোষ’

সিজিদ্দা, #ভিঞ্চিদা এবং আমি

“দাদা”– এই শব্দবন্ধ নিয়ে বাঙালির আদিখ্যেতা চিরকালীন। মহারাজ জন্মানোর বহু আগে থেকেই বাঙালি দাদা জ্বরে আক্রান্ত। যেকোন কিছু বা যেকোন কারো পশ্চাৎদেশে একখানি “দা” লাগিয়েই বাঙালি বরাবর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে এসেছে। যেমন, হাঁ-দা, ভোঁ-দা, না-দা, চো…. আচ্ছা ইয়ে, এটা থাক :/  এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলেন  সর্বজনপ্রিয় মদন্দা ❤ তো, এইরকম একটা মরশুমে #ভিঞ্চিদা মুক্তি পেলেন। পোস্টারে ভিট্রুদা’র ছাপ্পা মারা, ট্রেলার দেখে বেশিরভাগ পেটরোগা বাঙালি “উফ্‌! বাবা! ক্কী টেনশন! ক্কী থ্রিল রে দাদ্দা” বলে উঠেছে।

এমতাবস্থায়, শনিবারের পুণ্য বারবেলায় আমার দুই বন্ধু এবং আমি ঠিক করলাম একটা সিনেমা দেখলে হয় 🙂 আমার ইচ্ছে ছিল অন্য একটি ফিল্ম দেখার, যেটি “নন্দন”-এ চলছে। কিন্তু এক বন্ধু  নীল, লাল বা গেরুয়া কিছু’র একটা উপোস করেছে, সে বড় নাকি কাহিল, দুব্বল যাকে বলে  :/  অদ্দূর যাবে না। বাড়ি’র কাছে হাইল্যান্ড পার্কে সে #ভিঞ্চিদা দেখতে চায়। আমি যেহেতু উপোস করিনি, তাই আমি লেসার হিউম্যান বিয়িং এবং তার কথা-ই শেষ পর্যন্ত গ্রাহ্য হল। অবশ্য, আমি ব্যাটাকে রসিয়ে রসিয়ে গপ্পো শুনিয়ে দিয়েছি সেদিন কী কী রান্না করেছি বাড়িতে (স্যাডিস্ট প্লেজার)।

“ভিঞ্চিদা” একটি থ্রিলার। ক্রিস্টি, ডয়েল বা নেসবোসুলভ Whodunnit থ্রিলার নয়। এখানে আপনি জানেন কে ক্রাইম করছে, কেন করছে, কীভাবে করছে। তাকে পুলিশ ধরতে পারে কি-না বা তার  জীবনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় যে চরিত্রটি, তার সঙ্গে মানসিক টানাপোড়েন ও দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হয়– এই উত্তেজনা এবং কৌতূহল দর্শক-কে বসিয়ে রাখে। খানিকটা হিগাসিনো টাইপ থ্রিলার।

রুদ্রনীল ঘোষ এখানে একজন মেকআপ আর্টিস্ট। সাধারণ নন, তাঁর অসাধারণত্ব হল, তিনি প্রস্থেটিক মেকআপ করতে পারেন অপরিসীম দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তাঁর প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ এবং তিনি-ও কাজ পাওয়ার জন্য কারো কাছে মাথা নোয়াবেন না বলে বদ্ধপরিকর। রুদ্রনীল’র মুখে বেশ কিছু চোখা ডায়ালগ আছে টালিগঞ্জ নিয়ে। সত্যবচন যারে কয় আর কী। রুদ্রনীল অভিনয় খারাপ করেন এমন কথা বোধহয় কেউ বলবে না। কিন্তু মাঝে মাঝে একটু অতি-নাটকীয়তা করে ফেলেন বা স্বাভাবিকত্বের অভিনয়টা সামান্য বেশি হয়ে যায়। এখানেও কিছু জায়গায় তাই হয়েছে। তবু, তাঁর (তিনিই ভিঞ্চিদা), ঋত্বিক চক্রবর্তী (আদি বোস) এবং  অনির্বাণ চক্রবর্তী (ডিসিডিডি পোদ্দার)-এর অভিনয় দর্শক-কে বাধ্য করে বসে থাকতে। বিশেষ করে ঋত্বিক-এর চরিত্র খুব অল্পক্ষণের জন্য হলেও, একটা subliminal anxiety তৈরি করে দর্শকের মনে, থ্রিলারের জন্য যেটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা ফ্যাক্টর বলে আমার অন্ততঃ মনে হয়।

ভিঞ্চিদা’র চরিত্র হয়ত এ-দেশের অনেক নাম-না-জানা মেকআপ আর্টিস্টের জীবন। তাঁরা পয়সা কত পান আমি জানিনা, কিন্তু সম্মান খুব একটা যে পান না, সে বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। কয়েক বছর আগে, একবার শান্তিনিকেতন থেকে ফিরছিলাম। এমনিতে আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, যারা “শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসের” এসি কামরায় ওঠে, তাদের বেশিরভাগের হাবভাব দেখলে মনে হয়, সদ্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গোলটেব্‌ল বৈঠক সেরে  ট্রেনে উঠেছে। এবং, কোনো এক অজানা কারণে, তারা ইংরিজিতে কথা বলে। (আপনি ভাবতেই পারেন আমি কেন উঠেছিলাম, সেক্ষেত্রে গামছা, ধোপাবাড়ি, কুঁজো, চিৎ হওয়া ইত্যাদি মনে করুন) তো, আমার পাশের ভদ্রলোক আচমকা ফোনে উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠেন,
— খব্বদ্দার তুই মেয়েটা’র চুলে-মুখে হাত দিবিনা। শুধু হাত কর আর পা…বাকি আমি বুঝে নেবো!

ফোন রেখে দেওয়া’র পর আমি সামান্য ভীতভাবে তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি মুচকি হেসে জানিয়েছিলেন তিনি একজন মেকআপম্যান। যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গে সাধারণ কিছু কথা হয়েছিল কিন্তু তার মধ্যেই নিজের প্রোফেশন  নিয়ে তাঁর ভালবাসা টের পেয়েছিলাম। এবং এটাও বুঝেছিলাম যে এই মানুষগুলোর পরিশ্রমের কথা আমরা কিছুই জানতে পারিনা। এদেশের বিখ্যাত মেকআপ (SFX) আর্টিস্ট সুভাষ শিন্ডে পর্যন্ত “মেরি কম” ফিল্ম নিয়ে একটা ইন্টারভিউতে জানিয়েছিলেন সেখানে তাঁকে টক্কর দিতে হয়েছিল হলিউডের সঙ্গে কাজটা পাওয়ার জন্য।

এতখানি ডাইগ্রেস করা’র  কারণ একটাই। রুদ্রনীলের চরিত্রটি রিয়ালিস্টিক। কিন্তু ওই বাংলা সিনেমায় যা হয় আর কী 😦 একটু না ছড়ালে বদহজম হয় মনে হয়। তাই আমরা দেখি বেকার, দুখী, রাগী, মনমরা, বাপ-হারা, গরিব রুদ্রনীল পাড়ার নাটকে দুর্ধর্ষ মাস্ক-ফাস্ক বানিয়ে দিচ্ছে! ওসব বানাতে যা খরচ পড়বে তাতে বাচ্চাদের বাপ-মা কেলিয়ে লাট করে দেবে তবু নাটক করতে দেবেনা ছেলেমেয়েদের। তাছাড়া, ফরেন্সিক সায়েন্সকে তুশ্চু করা কিছু ব্যাপার-ও আছে। স্পয়লার হয়ে যাবে তাই বলা যাবেনা। তা, সেসব দশ-বিশটা লুপ্‌হোল্‌স ম্যাক্সিমাম থ্রিলারেই থাকে। সিজিদ্দা বলে-ই যে বেশি বেশি ভুল ধত্তে হবে তা তো না…হুঃ!

তাহলে কী দাঁড়াল? (কী, কি নয়) এই যে, #ভিঞ্চিদা হল নির্বাক রাজকাহিনী’র শাহজাহান রিজেন্সি-তে ইয়েতি অভিযানে’র পর যেন বাড়ির পুকুরে সানি লিওনের স্নান, যেন মাসের শেষে’র “ইয়োর অ্যাকাউন্ট হ্যাজ বিন ক্রেডিটেড উইদ”, যেন পয়লা বৈশাখের সকালে ফুলকো লুচি আর সাদা আলু’র তরকারি, যেন নিজের বরের মধ্যে ব্র্যাড পিটের ঝলক দেখা, যেন…… যাক্‌গে…দেখে আসুন গিয়ে। পয়লা বৈশাখ ভালই কাটবে 🙂