মাতাল নিয়ে মহাভারত লেখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে-ও হবে, কিন্তু তবু-ও, তা যাকে বলে কালজয়ী। কিছু কিছু প্রবাদ সকলেই জানেন, যেমন, মাতাল ছেলে হলে লায়াবিলিটি আর মেয়ে হলে অ্যাসেট। মাতাল সর্বদা সত্যি কথা বলে। মাতাল যতটা মদ খায় তার ডবল খিস্তি খায়। মাতাল নিজের বাড়ি চিনতে পারেনা কিন্তু দশ হাত দূর থেকে গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারে বোতলে পিনকন আছে না টারজান ইত্যাদি প্রভৃতি। এছাড়া, মাতালের দয়া,  সংবেদনশীলতা এবং মাতালের গোঁ  সর্বজনবিদিত।

প্রভূত পুণ্য’র ফলে জীবনে বেশ কিছু মাতাল দেখা’র সৌভাগ্য হয়েছে আমার।এই সিরিজ সেই মহান মানব-মানবীদের দু-একটি কাহিনী বলার অক্ষম প্রচেষ্টা। 
প্রথম চরিত্র’র নাম, ধরা যাক,  চ্যাটার্জিদা।

ধুতি-পাঞ্জাবি পরা চ্যাটার্জিদা বাম এবং রাম  উভয়ের-ই ভক্ত ছিলেন যথাক্রমে সকালে এবং সন্ধেয়। একটি পুরোনো অ্যাম্বাসাডর গাড়ি ছিল তাঁদের পরিবারে, যেটি গ্যারেজে অন্য নতুন গাড়ি’র চাপে জায়গা না পেয়ে রাত্রে রাস্তাতেই থাকতো। চ্যাটার্জিদা রোজ রাত  সাড়ে-দশটা নাগাদ মালে’র ঠেক থেকে ফিরতেন রিক্শা করে। কদাচ গাড়ি ব্যবহার করতেন না। 
অ্যাম্বাসাডর-টা বলতে গেলে,  কালেভদ্রে ওনারা নিয়ে বেরোতেন। পাড়া’র রেসিডেন্ট নেড়ি, কালু, রাত হলেই গাড়িটা’র ভেতর ঢুকে ড্রাইভারের পাশের সিটে শুয়ে ঘুমোতো। হাগু-মুতু করেছে বলে শুনিনি কখনো। চ্যটার্জিদা রোজ রাতে সামান্য টলটলায়মান অবস্থায় গাড়িটা’র জানালা দিয়ে উঁকি মেরে কালু-কে দেখে গুডনাইট করতেন। 

দিব্যি চলছিল। 

এক রাতে কোথাও কিছু গণ্ডগোল হয়ে থাকবে। চ্যাটার্জিদা রিক্‌শা থেকে নেমেই যথারীতি কালু’র জানালা’র কাছে গেলেন এবং হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে বলতে লাগলেন…
“রোজ তুই বাড়ি যাবি বলে আমার ট্যাক্সিতে উঠিস কিন্তু তুই গরীব বলে, তোর পয়সা নেই বলে তোকে কেউ পৌঁছে দেয়না। আমায় তুই ক্ষমা কর্‌, ভাই। আজ আমি এর প্রায়শ্চিত্ত করবো, তোকে  তোর বাড়িতে ফিরিয়ে দেবো।” প্রসঙ্গতঃ, একসময় সত্যি-ই ওনাদের দশ-বারোটা ট্যাক্সি ভাড়া খাটতো। 

যাইহোক, সেই পূর্ণিমা রাতে কীভাবে কী হইয়াছিল তা আমরা অত জানিনা। শোনা যায়, চ্যাটার্জিদাকে ওরকম করতে দেখে কাঁচা ঘুম  ভেঙে কালু ভয়ানক ঘাবড়ে যায় প্রথমে। তা, অ্যানিম্যাল ইন্সটিঙ্কন্ট, বুঝেছিল যে প্রাণে বাঁচতে হ’লে চুপ করে থাকাই মঙ্গল। “ঘৌ” পর্যন্ত করেনি। কিন্তু শেষে যখন চ্যাটার্জিদা গাড়ি স্টার্ট মেরে প্রায় বড়রাস্তা’র মোড় অবধি চলে গেছেন, এবং কালুকে সিটবেল্ট পরানো’র চেষ্টা করছেন, তখন অ্যানিম্যাল ইন্সটিঙ্কন্ট পুনরায় বিপুলভাবে ট্রিগার করে। ফলতঃ, কালু প্রাণঘাতী “ঘৌ ঘৌ ঘোঁয়াক ঘোঁয়াক ঘাঁউ ঘাঁউ ঘাঁউ” করে চেঁচাতে চেঁচাতে গাড়ি’র জানালা দিয়ে লাফ মেরে তীরবেগে ছুটতে থাকে। মাতালের গোঁ, আগেই বলেছি– সুতরাং, চ্যাটার্জিদা’ও তার পেছনে পেছনে “খুচরো দিতে হবেনা, ওরে পয়সা দিতে হবেনা” ইত্যাদি বলে ছুটতে শুরু করেন। কালু’র চেঁচানিতে তার ভাই-বেরাদর সবাই জড়ো হয়ে যায় এবং তারা চ্যাটার্জিদা’র পেছনে ছোটা শুরু করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, কালু-চ্যাটার্জিদা-অন্য এক পাল কুকুর– এইভাবে রেস হচ্ছিল। এইসময় একটি পোঙ্গাপাকা কুকুরকূলের মিলখা সিং, সজোরে ছুটে গিয়ে চ্যাটার্জিদা’র ধুতি ধরে টান মারে, তিনি মুখ থুবড়ে পড়ে যান, তখন বাকিরা গিয়ে পুরো ধুতিটা খুলে, ছিঁড়ে ফালা-ফালা করে বিজয়গর্বে গলিতে ফেরত চলে যায়। “সকলি ফুরায়, ফুচকার প্রায়, পড়ে থাকে শালপাতা”– এই অমরবাণীটি’র মর্মার্থ নাকি সেই মুহূর্তে চ্যাটার্জিদা-কে দেখে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা যাচ্ছিল। 

এর পরের ঘটনা মহাভারতের ন্যায় এবং বাহুল্য। 
অ্যাম্বাসাডর-টা মাসখানেক পরে বেচে দেওয়া হয়। 
কালু সেই যে সেই রাতে পাড়া ছেড়েছিল, আর তাকে কেউ দেখেনি। 


 

Advertisements

ব্লগার এবং লেখক শ্রদ্ধেয় উত্তম চক্রবর্তী’র “ভালোবাসা কারে কয়” বইটি হাতে পেয়েছি বেশ কিছুদিন আগেই। পড়া-ও শেষ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু সময়ের অভাবে বইটি কেমন লাগলো তা লিখে উঠতে পারছিলাম না।

1-vv

আখর থেকে প্রকাশিত  বইটি উত্তমবাবু’র বইটির নাম দেখলেই বোঝা যায় এটি আদ্যন্ত প্রেমের গল্প বা ভালবাসার গল্প। তবে, একটি নয়, মোট ছ-টি গল্পের সঙ্কলন এই বই। প্রতিটি গল্পেই মানুষের চরিত্র তথা জীবনের বিভিন্ন রূপ উন্মোচিত হয়েছে। ষড়রিপু, অর্থাৎ, কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য যেভাবে মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার সাবলীল বর্ণনা ফুটে উঠেছে লেখকের কলমে। প্রতিটি গল্পেই প্রেম-ভালবাসা একটি বিশিষ্ট চরিত্র হিসেবে থাকলেও তা বাড়াবাড়ি’র পর্যায়ে যায়নি কখনো। ছয়টি গল্পের চরিত্র, ঘটনাপ্রবাহ এবং বুনন আলাদা হলেও তাদের মধ্যে যোগসূত্র হল– ভালবাসা।

আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে “অন্তঃসলিলা” নামক গল্পটি। প্রেম যে শুধু ভোগ নয়, ত্যাগ করতেও শেখায় এবং তা এক চরম তৃপ্তিও দিতে পারে, এই গল্পটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। “জীবনজুয়াড়ি” গল্পে  সমাপতন বড় বেশি, একটু যেন পৌনঃপুনিকতায় দুষ্ট গল্পের ঘটনাবলী। “আতরের গন্ধ” গল্পটি ভারি মায়াময়। শেষ গল্পটি’র নামেই বইটি’র নাম— “ভালবাসা কারে কয়”। সুন্দর উপস্থাপনা, একদিকে যেমন দেখানো হয়েছে একটি মেয়ের  স্বাধীন, অনমনীয় মনোভাব, অন্যদিকে তেমনি ফুটে উঠেছে প্রেমের চিরন্তন টান।

সব মিলিয়ে বইটি পড়তে ভাল লাগে।  হয়ত কোথাও যাচ্ছেন, ট্রেনে বা প্লেনে, তখন সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে রাখতেই পারেন উত্তম চক্রবর্তী’র এই বইটি।

সবশেষে, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, উত্তমদা, লেখকের সই সহ বইটি উপহার দেওয়ার জন্য। ভাল থাকুন, আরো অনেক লেখায় সমৃদ্ধ হোক আপনার পাঠককূল, এই শুভেচ্ছা রইল।

লেখকে’র ব্লগ লিঙ্কঃ এইখানে ক্লিক করুন

1-dur 016

— সাপ বানিয়েছে?
— না, এখন-ও বানায়নি। দেখছোনা রঙ হয়নি সব, বানানো হয়নি…
— বাবা, বাবা, দ্যাখো সিংহ বানিয়েছে, মহিষ বানিয়েছে, তা’লে সাপ বানায়নি কেন?
—  বানাবে, কালকেই বানাবে (নিরুপায় পিতা’র উত্তর)
— সাপ কামড়ে দেবে তাই বানায়নি।

কচি গলায় ভার্ডিক্ট দিয়ে তিনি প্রস্থান করলেন।

ছবি তুলতে গিয়ে এরকম দু-তিনটে বাচ্চা’র দেখা পেলাম। বাবা বা মা’র সঙ্গে এসেছে ঠাকুর বানানো দেখতে। এরকম আমি-ও যেতাম। আঁকা’র স্কুল থেকে ফেরা’র পথে অথবা এমনি বিকেলে দোকানে বেরিয়ে টেনে টেনে নিয়ে যেতাম সঙ্গে যে থাকতো তাকেই, ঠাকুর বানানো দেখবো বলে বায়না করে। চুপ করে বেশ খানিকক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখতাম। মাটি, তার্পিন তেল আর রঙের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত মিশ্র গন্ধের সৃষ্টি হত। সে গন্ধটা অন্য কোথাও আর কখনো পেতাম না।

রোদ্দুরে’র একটা গন্ধ পাই এখনো মাঝে মাঝে; আকাশ পরিষ্কার এবং মন ভাল থাকলে। নাকি ওই গন্ধটা-ই মন ভাল করে দেয় হয়তো, কে জানে। মন ভাল রাখা এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গড়িয়াহাট ব্রিজে’র নিচে যে পরিবারগুলো পার্মানেন্টলি বসবাস করে, সেখান দিয়ে সেদিন যাওয়া’র সময় একটা বাচ্চা ছেলে ভিক্ষা চাইলো। বললাম যে আমি পয়সা হাতে দেবোনা, কিছু খেতে চাইলে কিনে দিতে পারি। পয়সা হাতে পেলেই হয় এরা নিজেরা ডেন্ড্রাইট কিনে নেশা করবে নয়ত বাপ-মা কেড়ে নিয়ে সেই নেশা-ই করবে। আমি তাই পয়সা দিইনা। যাইহোক, একে সামনের একটা ফলে’র দোকান থেকে দুটো আপেল কিনে দিলাম, দু-হাতে নিয়ে চলে গেল। খানিক এগিয়েছি, জামায় টান। রোগাপানা, অপুষ্টি-তে ভোগা একটা বছর তেরো-চোদ্দ’র মেয়ে, কোলে আবার একটা বাচ্চা, ভাই হবে বোধহয়, পয়সা চাইছে।এদের নেটওয়ার্ক খুব ভাল, আগেও দেখেছি। একজনকে কিছু দিয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়ালেই পরপর লাইন পড়ে যায়। কিন্তু মহা জ্বালা, এ  আপেল খাবেনা, এর পুজোয় জামা হয়নি।

তাড়া ছিল, নিজের বিবেকের অল্প  কামড় উপেক্ষা করে পঞ্চাশ-টা টাকা ধরিয়ে দিলাম হাতে। জানালাম, আমি পরে তার জন্য জামা নিয়ে আসবো। এর পর কেটে গেছে আজ নিয়ে বারো দিন। যাওয়া হয়নি আমার আর। হয়ত যখন যাবো, মেয়েটাকে খুঁজেই পাবোনা আর। কালো, রোগা, অপুষ্টিতে-ভোগা, সদ্য-জাগা নারীত্বের ছাপ লুকোতে সচেষ্ট কত্ত বাচ্চা এই শহরে ঘুরে বেড়ায়। বাচ্চা বলে-ও ভাবেনা অনেকে তাদের, মেয়েমানুষ ভেবে হাত বাড়ায় ছেঁড়া জামা’র তলা দিয়ে। অবশ্য, এই নয় যে বাচ্চা ব’লে ছাড় আছে, তাও আর কী! মেয়েটা-কে জামা না দিতে পারা’র মন-খারাপ সারা পুজো-তে কুট্‌কুট্‌ করে কামড়াবে হয়ত, ঝেড়ে ফেলে নতুন জামা পরবো। ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো, দেবী মায়ে’র আরাধনায় সামিল হওয়া’র চেষ্টায় নিজেকে খুলে দেবে ওই মেয়েটা কারো কাছে… কোন মায়ের পুজারী ভোগ খেয়ে এসে ভোগ করবেন 🙂 মা সর্বংসহা জগজ্জননী, আরো কত সহ্য করবেন কে জানে! ওঁ দুর্গে দুর্গে রক্ষণি স্বাহা ওঁ দুর্গায়ৈ নমঃ

 

 

বৃষ্টি

Posted: জুলাই 21, 2018 in ছন্দের কারিকুরি
ট্যাগসমূহ:,

বৃষ্টি তোর প্রতি ফোঁটায় আদিম সে সুর বাজে
বৃষ্টি তুই আসিস যখন মন লাগেনা কাজে
বৃষ্টি তোকে দিতে পারি আমার সবকিছু
বৃষ্টি আমার স্মৃতি হাঁটে তোরই পিছুপিছু
বৃষ্টি আমার চিতার ‘পরে ঝরিস এমন করে
শরীর জুড়াক, মন তো আমার কবেই গেছে পুড়ে ……।

আমার এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে “আগামীকাল” অনলাইন ম্যাগাজিনে। সাধারণতঃ, গল্পটা শেয়ার করি তবে এটি সদ্য প্রকাশিত বলে এখানে লিঙ্ক দিলাম। যাঁরা পড়বেন, মতামত জানাতে পারেন এখানে বা ম্যাগাজিনের “মন্তব্য” অংশে…  🙂

https://aagamikal.com/%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7/