ছোটবেলায় পাড়া’র একজন দাদা’র প্রতি আমার ক্রাশ ছিল। দাদাকে বেশ দেখতে, ঝক্‌ঝকে চেহারা, হাল্কা মাস্‌ল ছিল। সব মিলিয়ে, যাকে বলে বেশ নয়নমনোহর 🙂 তো, এই দাদাকে একদিন আমি দৈবাৎ পাড়া’র পুকুরে ল্যাঙট পরে স্নানরত অবস্থায় দেখতে পাই। তারপর, কোথা হইতে কী হইয়া গেল কে জানে, আমার সমস্ত ক্রাশ এক্কেবারে ক্রাশ্‌ড! সবাইকে কী আর জাঙিয়া পরে ঘুরে বেড়ালে ভাল লাগে রে ভাই 😦
আমি কিন্তু সেই ক্রাশ ইয়ে হয়ে যাওয়ায় ভয়াবহ মানসিক আঘাত পেয়েছিলাম সেই বয়সে। এই এত বছরে সেই ডিপ্রেশন অবশ্য কাটিয়ে উঠেছি, কিন্তু গতকাল “গুমনামি” দেখতে বসে, “আবার, আবার সেই কামান গর্জন! কাঁপাইয়া ধরাতল, বিদারিয়া রণস্থল” 😥 বড্ড কষ্ট পেলাম ফের। এক দৃশ্য, এক অনুভব। আমি যে অনির্বাণ ভট্টাচার্য’র জাব্‌রা ফ্যান ছিলাম গো! কেন জাঙিয়া-পরা অনির্বাণ, রাতদুপুরে নেতাজীকে বসার ঘরে দেখতে পেয়ে কথা বলতে গেল গো! কেন? মুন্নাভাই গান্ধীজি’র সঙ্গে কথা বলেছে বলে ওকেও নেতাজী’র সঙ্গে বলতে হবে 😦 ইকি!

যাক্‌গে, এসব ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের বলে লাভ কী আর। যা হওয়ার হয়ে গেছে। “গুমনামি” দেখে ভালোয় ভালোয় ফিরে এসেছি। আমি অবশ্য থ্রিলার ভেবে দেখতে গেছিলাম। মানে, পোস্টারে সিজিদ্দা সেরকমই লিখেছিলেন। গিয়ে দেখি ডকু-ফিচার ধরণের একটা কিছু ব্যাপার। চন্দ্রচূড় ঘোষ এবং অনুজ ধর– এঁরা দু’জনে ‘Conundrum: Subhas Bose’s Life after Death’ শীর্ষক যে গবেষণামূলক বইটি লিখেছেন, “গুমনামি” মুলতঃ সেটিকেই অনুসরণ করেছে।
সাড়ে-আটশোরও বেশি পৃষ্ঠার বইটি, কতজন পড়েছেন আমি জানিনা। যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা অবশ্যই বুঝবেন, ফিল্ম-এ যে সমস্ত ঘটনা, নথি, চিঠিপত্র এবং প্রমাণ ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট, ফরমোসা’র (এখন তাইপেই) বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজী’র মৃত্যুর বিপক্ষে তুলে ধরা হয়েছে, যেভাবে গুমনামি বাবা’র নেতাজী হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, তা প্রায় সমস্তটাই বইতে রয়েছে।

সিনেমায় আমরা পুরো ন্যারেটিভ-ই দেখি সাংবাদিক এবং নেতাজী গবেষক চন্দ্রচূড় ধর-এর (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) চোখ দিয়ে। সে, অফিসে বসে একদিন নতুন একটি অ্যাসাইনমেন্টে পায় এবং তার জন্য পড়াশোনা, রিসার্চ ইত্যাদি করতে গিয়ে চন্দ্রচূড়ের নিজের জীবনযাত্রা ও জীবনবোধ সম্পূর্ণভাবে পালটে যায়। নেতাজীকে নিয়ে গবেষণায় মগ্ন হয়ে সে দাড়ি-টাড়ি পর্যন্ত আর কাটেনা, বৌ রণিতা’র (তনুশ্রী চক্রবর্তী) সঙ্গে শোয়না, এমনকি বৌ শোয়া’র জন্য যখন সিডিউস করতে চায়, তখনও তার নেতাজী’র জাপানি দোভাষীর কথা মনে পড়ে। এসব ঝামেলায়, রণিতা খুব ক্ষেপে গিয়ে একদিন চন্দ্রচূড়কে ডিভোর্স দিয়ে দেয় এবং জানায় যে, সুভাষ ঘরে ফিরেছে কিনা তা সে জানেনা, কিন্তু সুভাষের জন্যই তার আর ঘরে ফেরা হল না। চোখে জল এসে গিয়েছিল! মাইরি বলছি।

তা সে যাইহোক, বৌ চলে যেতেই চন্দ্রচূড় দাড়ি-টাড়ি কামিয়ে ফেলে, চাকরি ছেড়ে দিয়ে, ফের গবেষণায় মন দেয়। আগে দাড়ি কাটতে কী অসুবিধে ছিল কে জানে।

তারপর যা যা ঘটনা ঘটে, নেতাজী’র অন্তর্ধান বিষয়ক কন্সপিরেসি থিওরি, তৎকালীন সরকারের কার্যাবলী ইত্যাদি, সেসব সিনেমা দেখলে জানতে পারবেন। ওই বইটা পড়লে, অবশ্য আরো বেশি জানবেন।

আমাদের পিয়ো বুম্বাদা নেতাজী’র ভূমিকায় ক্যামন অভিনয় করেছেন, তা জানতে গেলেও আপনাকে ওই সিনেমা দেখতে হবে। এ হল ওঁর আ-আ-আ-আম্মি চ্চুরি ক্করিনি থেকে উত্তরণের সিনেমা। মেকআপ খুব খারাপ হয়েছে, একথা শত্তুরেও বলবেনা (আমি তো না-ই, আমি সিজিদ্দা’র সব সিনিমা ফার্স্ট ডে সেকেণ্ড বা থার্ড শো দেখি। ভয় করে, চেনাশোনা বন্ধুরা খিস্তি মারে, তবুও যাই), কিন্তু ম্যানারিজম থেকে বুম্বাদা পুরোপুরি বেরোতে পারেননি। গালে সুপুরি নিয়ে কথা বললে যেমন হয়, অমন লেগেছে কিছু জায়গায়। তনুশ্রী যথাযথ। অনির্বাণ কিছু জায়গায় বেশি স্মার্টনেস দেখিয়ে ফেলেছেন ‘রেবেল’ ভাব আনতে গিয়ে। অতটা না করলেও হত মনে হয়। আর, তনুশ্রী’র এটা জানা উচিত ছিল যে কাঁচের দরজা, ভারি কোনো টেব্‌ল বা ওই জাতীয় কিছু দিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব :/ এইসব সাধারণ জিনিস-ও যদি মানুষ শিখতে না পারে সিনেমা দেখে… tch tch।

তো যান, আজ সবে পঞ্চমী… গিয়ে দেখে আসুন। তবে, সিনিমা দেক্তে যাচ্চি, ক্কী বালো, ক্কী মজ্‌জা— এরকম মনোভাব নিয়ে না যাওয়াই ভাল। বরং, আমি সর্বহারা, আমার হারানোর আর কিছুই নাই–এরকম ভেবে যান, ভাল লাগবে। ইন্ট্যারভেলের পর, সামান্য ঘুম পেতে পারে, তখন পপকর্ন এবং কফি খান।

ডিসক্লেইমারঃ প্রায় প্রত্যেক বাঙালি তথা ভারতবাসীর মতন আমিও নেতাজীকে নিয়ে গর্বিত এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে, যদি নেতাজী থাকতেন, আমাদের ইতিহাস অন্যরকম হত। যা লেখা হয়েছে, তা শুধুমাত্র “গুমনামি” নামক ফিল্মের ভিত্তিতে।

সিজিদ্দা, #ভিঞ্চিদা এবং আমি

“দাদা”– এই শব্দবন্ধ নিয়ে বাঙালির আদিখ্যেতা চিরকালীন। মহারাজ জন্মানোর বহু আগে থেকেই বাঙালি দাদা জ্বরে আক্রান্ত। যেকোন কিছু বা যেকোন কারো পশ্চাৎদেশে একখানি “দা” লাগিয়েই বাঙালি বরাবর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে এসেছে। যেমন, হাঁ-দা, ভোঁ-দা, না-দা, চো…. আচ্ছা ইয়ে, এটা থাক :/  এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলেন  সর্বজনপ্রিয় মদন্দা ❤ তো, এইরকম একটা মরশুমে #ভিঞ্চিদা মুক্তি পেলেন। পোস্টারে ভিট্রুদা’র ছাপ্পা মারা, ট্রেলার দেখে বেশিরভাগ পেটরোগা বাঙালি “উফ্‌! বাবা! ক্কী টেনশন! ক্কী থ্রিল রে দাদ্দা” বলে উঠেছে।

এমতাবস্থায়, শনিবারের পুণ্য বারবেলায় আমার দুই বন্ধু এবং আমি ঠিক করলাম একটা সিনেমা দেখলে হয় 🙂 আমার ইচ্ছে ছিল অন্য একটি ফিল্ম দেখার, যেটি “নন্দন”-এ চলছে। কিন্তু এক বন্ধু  নীল, লাল বা গেরুয়া কিছু’র একটা উপোস করেছে, সে বড় নাকি কাহিল, দুব্বল যাকে বলে  :/  অদ্দূর যাবে না। বাড়ি’র কাছে হাইল্যান্ড পার্কে সে #ভিঞ্চিদা দেখতে চায়। আমি যেহেতু উপোস করিনি, তাই আমি লেসার হিউম্যান বিয়িং এবং তার কথা-ই শেষ পর্যন্ত গ্রাহ্য হল। অবশ্য, আমি ব্যাটাকে রসিয়ে রসিয়ে গপ্পো শুনিয়ে দিয়েছি সেদিন কী কী রান্না করেছি বাড়িতে (স্যাডিস্ট প্লেজার)।

“ভিঞ্চিদা” একটি থ্রিলার। ক্রিস্টি, ডয়েল বা নেসবোসুলভ Whodunnit থ্রিলার নয়। এখানে আপনি জানেন কে ক্রাইম করছে, কেন করছে, কীভাবে করছে। তাকে পুলিশ ধরতে পারে কি-না বা তার  জীবনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় যে চরিত্রটি, তার সঙ্গে মানসিক টানাপোড়েন ও দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হয়– এই উত্তেজনা এবং কৌতূহল দর্শক-কে বসিয়ে রাখে। খানিকটা হিগাসিনো টাইপ থ্রিলার।

রুদ্রনীল ঘোষ এখানে একজন মেকআপ আর্টিস্ট। সাধারণ নন, তাঁর অসাধারণত্ব হল, তিনি প্রস্থেটিক মেকআপ করতে পারেন অপরিসীম দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তাঁর প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ এবং তিনি-ও কাজ পাওয়ার জন্য কারো কাছে মাথা নোয়াবেন না বলে বদ্ধপরিকর। রুদ্রনীল’র মুখে বেশ কিছু চোখা ডায়ালগ আছে টালিগঞ্জ নিয়ে। সত্যবচন যারে কয় আর কী। রুদ্রনীল অভিনয় খারাপ করেন এমন কথা বোধহয় কেউ বলবে না। কিন্তু মাঝে মাঝে একটু অতি-নাটকীয়তা করে ফেলেন বা স্বাভাবিকত্বের অভিনয়টা সামান্য বেশি হয়ে যায়। এখানেও কিছু জায়গায় তাই হয়েছে। তবু, তাঁর (তিনিই ভিঞ্চিদা), ঋত্বিক চক্রবর্তী (আদি বোস) এবং  অনির্বাণ চক্রবর্তী (ডিসিডিডি পোদ্দার)-এর অভিনয় দর্শক-কে বাধ্য করে বসে থাকতে। বিশেষ করে ঋত্বিক-এর চরিত্র খুব অল্পক্ষণের জন্য হলেও, একটা subliminal anxiety তৈরি করে দর্শকের মনে, থ্রিলারের জন্য যেটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা ফ্যাক্টর বলে আমার অন্ততঃ মনে হয়।

ভিঞ্চিদা’র চরিত্র হয়ত এ-দেশের অনেক নাম-না-জানা মেকআপ আর্টিস্টের জীবন। তাঁরা পয়সা কত পান আমি জানিনা, কিন্তু সম্মান খুব একটা যে পান না, সে বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। কয়েক বছর আগে, একবার শান্তিনিকেতন থেকে ফিরছিলাম। এমনিতে আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, যারা “শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসের” এসি কামরায় ওঠে, তাদের বেশিরভাগের হাবভাব দেখলে মনে হয়, সদ্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গোলটেব্‌ল বৈঠক সেরে  ট্রেনে উঠেছে। এবং, কোনো এক অজানা কারণে, তারা ইংরিজিতে কথা বলে। (আপনি ভাবতেই পারেন আমি কেন উঠেছিলাম, সেক্ষেত্রে গামছা, ধোপাবাড়ি, কুঁজো, চিৎ হওয়া ইত্যাদি মনে করুন) তো, আমার পাশের ভদ্রলোক আচমকা ফোনে উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠেন,
— খব্বদ্দার তুই মেয়েটা’র চুলে-মুখে হাত দিবিনা। শুধু হাত কর আর পা…বাকি আমি বুঝে নেবো!

ফোন রেখে দেওয়া’র পর আমি সামান্য ভীতভাবে তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি মুচকি হেসে জানিয়েছিলেন তিনি একজন মেকআপম্যান। যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গে সাধারণ কিছু কথা হয়েছিল কিন্তু তার মধ্যেই নিজের প্রোফেশন  নিয়ে তাঁর ভালবাসা টের পেয়েছিলাম। এবং এটাও বুঝেছিলাম যে এই মানুষগুলোর পরিশ্রমের কথা আমরা কিছুই জানতে পারিনা। এদেশের বিখ্যাত মেকআপ (SFX) আর্টিস্ট সুভাষ শিন্ডে পর্যন্ত “মেরি কম” ফিল্ম নিয়ে একটা ইন্টারভিউতে জানিয়েছিলেন সেখানে তাঁকে টক্কর দিতে হয়েছিল হলিউডের সঙ্গে কাজটা পাওয়ার জন্য।

এতখানি ডাইগ্রেস করা’র  কারণ একটাই। রুদ্রনীলের চরিত্রটি রিয়ালিস্টিক। কিন্তু ওই বাংলা সিনেমায় যা হয় আর কী 😦 একটু না ছড়ালে বদহজম হয় মনে হয়। তাই আমরা দেখি বেকার, দুখী, রাগী, মনমরা, বাপ-হারা, গরিব রুদ্রনীল পাড়ার নাটকে দুর্ধর্ষ মাস্ক-ফাস্ক বানিয়ে দিচ্ছে! ওসব বানাতে যা খরচ পড়বে তাতে বাচ্চাদের বাপ-মা কেলিয়ে লাট করে দেবে তবু নাটক করতে দেবেনা ছেলেমেয়েদের। তাছাড়া, ফরেন্সিক সায়েন্সকে তুশ্চু করা কিছু ব্যাপার-ও আছে। স্পয়লার হয়ে যাবে তাই বলা যাবেনা। তা, সেসব দশ-বিশটা লুপ্‌হোল্‌স ম্যাক্সিমাম থ্রিলারেই থাকে। সিজিদ্দা বলে-ই যে বেশি বেশি ভুল ধত্তে হবে তা তো না…হুঃ!

তাহলে কী দাঁড়াল? (কী, কি নয়) এই যে, #ভিঞ্চিদা হল নির্বাক রাজকাহিনী’র শাহজাহান রিজেন্সি-তে ইয়েতি অভিযানে’র পর যেন বাড়ির পুকুরে সানি লিওনের স্নান, যেন মাসের শেষে’র “ইয়োর অ্যাকাউন্ট হ্যাজ বিন ক্রেডিটেড উইদ”, যেন পয়লা বৈশাখের সকালে ফুলকো লুচি আর সাদা আলু’র তরকারি, যেন নিজের বরের মধ্যে ব্র্যাড পিটের ঝলক দেখা, যেন…… যাক্‌গে…দেখে আসুন গিয়ে। পয়লা বৈশাখ ভালই কাটবে 🙂

খুব চেনা ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন হয়; স্বামী রিটায়ার করেছেন এক যুগ হয়ে গেছে, স্ত্রী বয়সে খুব বেশি ছোট নন স্বামী’র থেকে। অনেক, অনেক বছর আগে হলেও তাঁদের ছিল ভালবাসার বিয়ে।  দুজনকে-ই এখন “ওয়াকিং স্টিক”-এর ভরসায় হাঁটাচলা করতে হয়। কিন্তু, সেটা তাঁরা করেন না বেশিরভাগ সময়ে। একে-অপরকে আঁকড়ে ধরে পা টিপে টিপে রাস্তার এক পাশ দিয়ে সাবধানে হাঁটেন। স্ত্রী মাঝে মাঝে চকিতে দেখে নেন পেছন ফিরে, আচমকা কোনো কাণ্ডজ্ঞানহীন রিকশা বা অটো বেমক্কা উঠে এল নাকি গায়ের ওপর! স্বামী সেটা-ও আবার পারেন না, গলায় মোটা বেল্ট, স্পন্ডিলিসিস।

ছেলে-মেয়ে দুজনেই যথাক্রমে অন্য দেশে এবং প্রদেশে থাকে। ওনারা একাই আছেন এবং, দিব্যি আছেন।
হাজার অসুস্থতা, শারীরিক অসুবিধে এবং বহুবিধ অন্য নিত্যকার ঝামেলা সামলিয়ে-ও আমি ওনাদের হাসতে দেখি। সকলেই দ্যাখে। আমার মতন অবাক-ও হয় হয়তো। আমরা যেখানে এই বয়সেই “আর পারছিনা” লব্জ আওড়াতে থাকি পান থেকে চুন খসলেই, সেখানে ওঁরা এখন-ও হাসেন। ফরসা মুখে বলিরেখা উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে, চোখের কোণে অগুন্তি হাঁসের পায়ের ছাপ সোচ্চারে জানান দেয়, এ হাসি অনেক পুরনো।

বেশ কিছুদিন আগে, পাড়া’র ওষুধের দোকানে গেছি মা’র ওষুধ কিনতে। সেদিন কোন কারণে কর্মচারী খুব কম। ব্যস্ততা’র শেষ নেই। মাসের প্রথমে যেকোন ওষুধের দোকানে আজকাল গেলে দেখা যায়, বয়স্ক এবং নট-সো-বয়স্ক মানুষরা মাসকাবারী বাজার করা’র মত ওষুধ কিনছেন 😦 আমার সামনেই একজনের বিল হল প্রায় সাত হাজার টাকা’র কাছাকাছি। সারা মাসের ওষুধ। তো যাইহোক, আমি ওষুধ নিয়ে বেরোতে যাবো, এমন সময়ে দোকানদার কাকু একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন “ওমুক বাড়িতে এই ক’টা ওষুধ দিয়ে দিবি একটু যাওয়ার সময়? তোদের পাড়াতেই, চিনিস মনে হয়। আজ একটাও লোক নেই যে পৌঁছে দেবে। এদিকে বয়স্ক মানুষের জিনিস, না দিলেই নয়”। না করা’র কারণ নেই। এই দোকানদার কাকু আমায় ছোটবেলা থেকে চেনেন। আর বাড়িটা বুঝলাম, যে বৃদ্ধ দম্পতি-কে মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখি, চোখাচোখি হয়, সামান্য হাসি কখনো, তাঁদের।

সেই প্রথম তাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি কথা হল। দুজনেই ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন ভেতরে ঢুকে চা খাওয়ার জন্য। অন্যদিন আসবো প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ফিরে এলাম।

তারপর গেছি বার দুয়েক।

কয়েকদিন আগে গিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক প্রায় শয্যাশায়ী। কোনোভাবে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগিয়েছেন। কথাই বেরোচ্ছেনা গলা দিয়ে। তাও, আমি যেতেই ইশারা করে বোঝালেন স্ত্রী-কে, চা করো। আমি যত বলি খাবোনা, তিনি তত-ই ইশারা করে এক-ই কথা বলেন। মাসিমা স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে বললেন, “তুমি ভেবোনা আর। তোমায় খেতেই হবে, নইলে ইনি এই দশ মিনিট আগে চা খেয়েই আবার খাবেন কী করে!”
ধরা পড়ে মুখ গোঁজ করে স্ত্রী-কে কাঁচকলা দেখালেন। এবার আমি আগে হাসলাম।

টুকটাক কথা হচ্ছিল। হাসতে হাসতেই হঠাৎ মাসিমা বললেন। “জানো তো, আমি সবসময় ঠাকুরকে বলি এই মানুষটা যেন আগে রওনা দেয়। আমি আগে গেলে  খুব কষ্ট হবে ওর।”

কাঠ হয়ে গেলাম শুনে। কতখানি ভালবাসলে এরকম বলা যায়! আমরা তো সবসময়েই বলি, তোমাকে ছাড়া বাঁচব না– এই বাক্যটি-ই নাকি শ্রেষ্ঠ প্রেমের উক্তি। অথচ, তার মধ্যে মিশে থাকে এক অপরিসীম স্বার্থপরতা। সেখানেও আমরা চিন্তা করি নিজের সুখটুকু, ভালবাসার মানুষটি না থাকলে দিনযাপন ভয়ানক হয়ে ওঠে, বিশেষতঃ বার্ধক্যে। আমরা ভাবি, সেই সীমাহীন শূন্যতা আমায় অন্ততঃ যেন ভোগ করতে না হয়, অন্ধকারের স্মৃতি হাতড়ে, অশক্ত টলমল পায়ে, আমি যেন অন্ততঃ জীবনের কাছে মুক্তি ভিক্ষা না করি। সঙ্গী বা সঙ্গিনী’র যা হয় হোক, আমায় যেন নিংড়ে-নেওয়া মানসিক যন্ত্রণা না পেতে হয়। হয়ত বা অতিরঞ্জত ভাবনা, কিন্তু এরকম-ই মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে।

এরকম-ও ভালবাসা হয়। এরকম-ও ভালবাসা যায়।

“ছাড়! ছাড়!” আর্তনাদে সচকিত হয়ে উঠলেন প্রদ্যোতবাবু।  কী ভয়ঙ্কর তীক্ষ্ণ সেই নারী কণ্ঠস্বর, বুঝি বা জীবনের অন্তিম ক্ষণ উপস্থিত। দিনকাল একেবারেই ভাল নয়, নারী নিযার্তনের খবর অহরহ মেলে সর্বত্র। যদি-ও সময়টা ভরদুপুর এবং স্থান খাস গড়িয়াহাট, তাও প্রদ্যোতবাবু যারপরনাই বিচলিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু মুহূর্তমধ্যে তাঁর সমস্ত আশঙ্কা ধূলিসাৎ করে, হাই-হিলের গুঁতোয় তাঁকে কেৎরে দিয়ে, তীব্রবেগে কণ্ঠস্বরে’র অধিকারিণী ছুটে গেলেন একটি বিশেষ দোকানের দিকে, যার সাইনবোর্ড সগৌরবে ঘোষণা করছে ৮০% ছাড়! তাঁকে এক-ই গতিতে অনুসরণ করলেন আরো কয়েকজন। প্রদ্যোতবাবু’র বিস্ময়াহত এবং হাই-হিলাহত চেহারা এক ঝলক দেখে গিন্নি মন্তব্য করলেন, “এইজন্যেই বলেছিলাম ঘরে বসে থাকো। সেল থেকে কিনবে তো নিজের খান-দুই সাদা পাঞ্জাবি আর সম্বচ্ছরের স্যান্ডো গেঞ্জি, সে আমি-ই কিনতে পারতাম। কিন্তু তা-না! বাবু’র আসা চাই… আসলে ক্রেডিট কার্ড আমার হাতে দেবে না…হুঃ, আমি যেন বুঝিনা! এখন খাও জুতো’র গুঁতো।”

মিনমিন করে কিছু বলতে গিয়ে-ও চেপে গেলেন প্রদ্যোতবাবু। ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারটা ধরা পড়ে গেছে, গতিক সুবিধার না। জোরে জোরে দু-তিনবার নিঃশ্বাস নিয়ে মন শান্ত করা’র বৃথা চেষ্টা করে দু-পাশে তাকাতেই মনে হল কবি এই চৈত্র সেল দেখে-ই বোধহয় লিখেছিলেন “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান”।
নানা বয়সের, নানা রঙের, নানা সাইজের মানুষ কিল্‌বিল করছে চাদ্দিকে। তার মধ্যে মহিলা’র সংখ্যায় শতকরা নব্বই শতাংশ। প্রত্যেকের চোখে-মুখেই বেশ একটা লড়্‌কে লেঙ্গে হিন্দুস্থান জাতীয় হাবভাব। চোখে শিকারী’র মনোযোগ এবং ধূর্ততা। এক দশাসই মহিলা একটা টপ্‌ তুলে সেটা গায়ে হবে না বলেই বোধহয় রেখে দিয়েছেন কী দেননি, দুটো দুরকম হাত দু-দিক থেকে এসে সেটা ধরে ফেলল।

প্রথমাঃ আমি তো এটা আগে নিলাম।
দ্বিতীয়াঃ আপনার আগে আমি টাচ করেছি, দিদি…
প্রঃ বললেই হল! আমি যখন এটা ধরেছি, আপনার আঙুল তখন-ও অ্যাট লিস্ট চার সেন্টিমিটার দূরে…
দ্বিঃ একদম বাজে কথা বলছেন…

এরকম বাক্যালাপ কোথায়, কীভাবে শেষ হত কে জানে, কিন্তু দোকানদার ছেলেটা হঠাৎ কতগুলো লেগিংস পতাকা’র মত উড়িয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “জল জল জল, সমুদ্র, পুকুর, মিনারেল। জলের দর, জলের দর, জলের দর।” দুই মহিলাই চরম পিপাসার্তের মত  তৎক্ষণাৎ সেই “জল”-এর দিকে হাত বাড়ালেন।

পেছন থেকে ভেসে এল একটা রিন্‌রিনে স্বর।

— ছিঃ, তুমি ওখানে গিয়ে লুঙ্গি তুলছো!

কী দেখতে হবে না হবে ভেবে আতঙ্কিত হয়ে-ও অসীম কৌতূহলে প্রদ্যোতবাবু ঘাড় ঘোরালেন।

একটা অল্পবয়সী মেয়ে’র সামনে সম্ভবতঃ তার বয়ফ্রেন্ড দাঁড়ানো। অসহায় চোখমুখ।
ছেলেটা’র গলা শোনা যাচ্ছে, “আরে মা একটা নিতে বলেছিল বাবা’র জন্য। তোমার সঙ্গে যখন এলাম-ই এদিকে তাই দেখছিলাম যদি কিনে নেওয়া যায়।”

মেয়েটা গজগজ করে কিছু একটা বলল। প্রদ্যোতবাবু আর শোনা’র চেষ্টা করলেন না।

এদিকে গিন্নি এগিয়ে গেছেন অনেকটা। দূর থেকে অদ্ভুত মুখভঙ্গী করে ডাকছেন।

পা চালিয়ে এগিয়ে যেতেই মুখঝামটা।

— এসেছো যখন ব্যাগগুলো তো একটু ধরবে। বয়স হচ্ছে, একা একা এত বোঝা বওয়া যায় নাকি!

বোঝা বানানো’র কী দরকার ছিল, এটা মনে এলে-ও মুখে আনলেন না আর।

— আচ্ছা, দ্যাখো তো এই “মেঘে’র মা” শাড়িটা ভাল নাকি এই “কুসুম দোলা”-টা?

গিন্নি’র কথা শুনে যাকে বলে হুব্বা হয়ে গেলেন তিনি। কে মেঘ, তার মা’র শাড়ি কেন-ই বা বিক্রি হচ্ছে কিছুই বুঝলেন না। তবু কিছু একটা বলতেই হয়, বলে বসলেন, “ওই কুসুম শাড়ি-ই নাও। কার না কার মায়ের শাড়ি, সেকেন্ড হ্যান্ড শাড়ি কিনোনা, যত-ই ডিস্কাউন্ট দিক”।

বলেই, গিন্নি’র গন্‌গনে মুখে’র দিকে তাকিয়েই বুঝলেন কিছু একটা গণ্ডগোল করেছেন। সেটা কী বা কোথায়, তা বুঝতে না পেরে মনোযোগ দিয়ে উল্টোদিকের একটা রোলে’র দোকানের দিকে চেয়ে থাকাই নিরাপদ বলে মনে হল।

হঠাৎ  কানে এল ছোট শালী সুমেধা’র সুমধুর কণ্ঠস্বর,

— আরে, দিদি, তুই এখানে? ও বাবা, প্রদ্যোতদা-ও আছেন দেখছি। বাজার করতে বেরিয়েছিস নাকি এই গরমে?

সুমেধা-কে দেখে তিনি যারপরনাই আহ্লাদিত হলেন। মেয়ে-টা দিদি’র মত নয়। একেবারে আলাদা। এই সু্যোগ কাজে লাগাতে হবে।

— আর বোলোনা, তোমার দিদি শপিং শপিং করে পা… এই অবধি বলে, গিন্নি’র মুখের দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গিলে, …না, মানে, এই তোমার বাবা-মায়ের জন্য, তারপর বাড়ি’র জন্য কিছু তো কিনতেই হয়। আমি ব্যাগ বইবো বলে এসেছি… হেঁ হেঁ করে কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলেন তিনি।

মুচকি হেসে সুমেধা দিদি’র হাত ধরে টান লাগায়।

— চল্‌ তো! অনেক কিনেছিস। কী যে এত কিনিস বুঝিনা। এসব তো সারা বছর পাওয়া যায়। আমাদের এক বন্ধু’র গানের অনুষ্ঠান আছে  কাছেই, পয়লা বৈশাখ সামনে, সেই উপলক্ষ্যে, ওখানে গিয়ে শান্তি-তে গান শুনবি। তুই তো গান ভালবাসিস।

দিদি’র হাতের ভারী ব্যাগ-টা  নিজের হাতে নিয়ে, এক নজর ভেতরে দেখেই আবার অবাক স্বর শোনা যায় সুমেধা’র।

— এ কী রে, এত গাদাগুচ্ছের ফ্রক কিনেছিস কেন? বাবান কি ফ্রক পরে নাকি?  আবার ক্লিপ, হেয়ার-ব্যান্ড…এসব কী রে…

— চুপ, চুপ…

গিন্নি’র নীচু গলা কানে আসে প্রদ্যোতবাবু’র।

—  না রে, একটা বাচ্চা মেয়েদের সংস্থা আছে; অনাথ, গরীব মেয়েরা থাকে। বচ্ছরকার দিন… ওদের কিছু দেবোনা? আমাদের বাড়ির কাছেই রে… সেইজন্য…

বলতে বলতে গিন্নি এগিয়ে গিয়েছিলেন। পেছন ফিরে প্রদ্যোতবাবু’র দিকে তাকিয়ে এগোতে ইশারা করলেন। শেষ বিকেলের আলোয় ঘর্মাক্ত মধ্যবয়সিনী’র মুখ অন্য আভায় উজ্জ্বল।

সহসা সেই অমোঘ লাইন ক’টি মনে পড়ে যায় তাঁর…

“প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস-
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।।
এ সংসারের নিত্য খেলায় প্রতিদিনের প্রাণের মেলায়
বাটে ঘাটে হাজার লোকের হাস্য-পরিহাস–
মাঝখানে তার তোমার চোখে আমার সর্বনাশ।।

মাতাল নিয়ে মহাভারত লেখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে-ও হবে, কিন্তু তবু-ও, তা যাকে বলে কালজয়ী। কিছু কিছু প্রবাদ সকলেই জানেন, যেমন, মাতাল ছেলে হলে লায়াবিলিটি আর মেয়ে হলে অ্যাসেট। মাতাল সর্বদা সত্যি কথা বলে। মাতাল যতটা মদ খায় তার ডবল খিস্তি খায়। মাতাল নিজের বাড়ি চিনতে পারেনা কিন্তু দশ হাত দূর থেকে গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারে বোতলে পিনকন আছে না টারজান ইত্যাদি প্রভৃতি। এছাড়া, মাতালের দয়া,  সংবেদনশীলতা এবং মাতালের গোঁ  সর্বজনবিদিত।

প্রভূত পুণ্য’র ফলে জীবনে বেশ কিছু মাতাল দেখা’র সৌভাগ্য হয়েছে আমার।এই সিরিজ সেই মহান মানব-মানবীদের দু-একটি কাহিনী বলার অক্ষম প্রচেষ্টা। 
প্রথম চরিত্র’র নাম, ধরা যাক,  চ্যাটার্জিদা।

ধুতি-পাঞ্জাবি পরা চ্যাটার্জিদা বাম এবং রাম  উভয়ের-ই ভক্ত ছিলেন যথাক্রমে সকালে এবং সন্ধেয়। একটি পুরোনো অ্যাম্বাসাডর গাড়ি ছিল তাঁদের পরিবারে, যেটি গ্যারেজে অন্য নতুন গাড়ি’র চাপে জায়গা না পেয়ে রাত্রে রাস্তাতেই থাকতো। চ্যাটার্জিদা রোজ রাত  সাড়ে-দশটা নাগাদ মালে’র ঠেক থেকে ফিরতেন রিক্শা করে। কদাচ গাড়ি ব্যবহার করতেন না। 
অ্যাম্বাসাডর-টা বলতে গেলে,  কালেভদ্রে ওনারা নিয়ে বেরোতেন। পাড়া’র রেসিডেন্ট নেড়ি, কালু, রাত হলেই গাড়িটা’র ভেতর ঢুকে ড্রাইভারের পাশের সিটে শুয়ে ঘুমোতো। হাগু-মুতু করেছে বলে শুনিনি কখনো। চ্যটার্জিদা রোজ রাতে সামান্য টলটলায়মান অবস্থায় গাড়িটা’র জানালা দিয়ে উঁকি মেরে কালু-কে দেখে গুডনাইট করতেন। 

দিব্যি চলছিল। 

এক রাতে কোথাও কিছু গণ্ডগোল হয়ে থাকবে। চ্যাটার্জিদা রিক্‌শা থেকে নেমেই যথারীতি কালু’র জানালা’র কাছে গেলেন এবং হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে বলতে লাগলেন…
“রোজ তুই বাড়ি যাবি বলে আমার ট্যাক্সিতে উঠিস কিন্তু তুই গরীব বলে, তোর পয়সা নেই বলে তোকে কেউ পৌঁছে দেয়না। আমায় তুই ক্ষমা কর্‌, ভাই। আজ আমি এর প্রায়শ্চিত্ত করবো, তোকে  তোর বাড়িতে ফিরিয়ে দেবো।” প্রসঙ্গতঃ, একসময় সত্যি-ই ওনাদের দশ-বারোটা ট্যাক্সি ভাড়া খাটতো। 

যাইহোক, সেই পূর্ণিমা রাতে কীভাবে কী হইয়াছিল তা আমরা অত জানিনা। শোনা যায়, চ্যাটার্জিদাকে ওরকম করতে দেখে কাঁচা ঘুম  ভেঙে কালু ভয়ানক ঘাবড়ে যায় প্রথমে। তা, অ্যানিম্যাল ইন্সটিঙ্কন্ট, বুঝেছিল যে প্রাণে বাঁচতে হ’লে চুপ করে থাকাই মঙ্গল। “ঘৌ” পর্যন্ত করেনি। কিন্তু শেষে যখন চ্যাটার্জিদা গাড়ি স্টার্ট মেরে প্রায় বড়রাস্তা’র মোড় অবধি চলে গেছেন, এবং কালুকে সিটবেল্ট পরানো’র চেষ্টা করছেন, তখন অ্যানিম্যাল ইন্সটিঙ্কন্ট পুনরায় বিপুলভাবে ট্রিগার করে। ফলতঃ, কালু প্রাণঘাতী “ঘৌ ঘৌ ঘোঁয়াক ঘোঁয়াক ঘাঁউ ঘাঁউ ঘাঁউ” করে চেঁচাতে চেঁচাতে গাড়ি’র জানালা দিয়ে লাফ মেরে তীরবেগে ছুটতে থাকে। মাতালের গোঁ, আগেই বলেছি– সুতরাং, চ্যাটার্জিদা’ও তার পেছনে পেছনে “খুচরো দিতে হবেনা, ওরে পয়সা দিতে হবেনা” ইত্যাদি বলে ছুটতে শুরু করেন। কালু’র চেঁচানিতে তার ভাই-বেরাদর সবাই জড়ো হয়ে যায় এবং তারা চ্যাটার্জিদা’র পেছনে ছোটা শুরু করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, কালু-চ্যাটার্জিদা-অন্য এক পাল কুকুর– এইভাবে রেস হচ্ছিল। এইসময় একটি পোঙ্গাপাকা কুকুরকূলের মিলখা সিং, সজোরে ছুটে গিয়ে চ্যাটার্জিদা’র ধুতি ধরে টান মারে, তিনি মুখ থুবড়ে পড়ে যান, তখন বাকিরা গিয়ে পুরো ধুতিটা খুলে, ছিঁড়ে ফালা-ফালা করে বিজয়গর্বে গলিতে ফেরত চলে যায়। “সকলি ফুরায়, ফুচকার প্রায়, পড়ে থাকে শালপাতা”– এই অমরবাণীটি’র মর্মার্থ নাকি সেই মুহূর্তে চ্যাটার্জিদা-কে দেখে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা যাচ্ছিল। 

এর পরের ঘটনা মহাভারতের ন্যায় এবং বাহুল্য। 
অ্যাম্বাসাডর-টা মাসখানেক পরে বেচে দেওয়া হয়। 
কালু সেই যে সেই রাতে পাড়া ছেড়েছিল, আর তাকে কেউ দেখেনি।