একটি প্রখ্যাত প্রসাধনী কোম্পানি সুরবালাকে তাহাদের কিছু  মূল্যবান সামগ্রী পাঠাইয়াছেন; উদ্দেশ্য, সুরবালা যেন সে সকল ব্যবহার করিয়া নিজের মতামত জানান। সুরবালার নিজেকে প্রথমে কেমন গিনিপিগ বোধ হইতেছিল। একবার ভাবিলেন, সবসুদ্ধ ব্যাগটি সোনা হেন মুখ করিয়া কাহাকেও পাচার করিবেন এবং যা-হয় একটা কিছু মতামত লিখিবেন। কিন্তু তাহার পর তিনি “বাহুবলী” দেখিলেন, হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করিলেন এবং ঠিক করিলেন যা হয় হইবে, একবার মাখিয়া দেখাই যাক!

সুরবালার পতিদেবতাটি সুবিধের নহেন। ফাঁক পাইলেই তিনি তির্যক মন্তব্য করিয়া সুরবালার ঝাঁ… অর্থাৎ গা-পিত্তি জ্বালাইয়া থাকেন। অতএব, সুরবালা ঠিক করিলেন, যে “মুখলেপন” বা ফেসপ্যাকটি আছে, উহা সকলে ঘুমাইয়া পড়িলে রাত্রে মাখিয়া দেখিবেন।  :/

সেইমত, গতকল্য রাত্রে মৃদু “ঘুরররর- ঘোঁত” শুরু হইতেই সুরবালা সতর্কভাবে খাট হইতে নামিয়া কৌটা খুলিয়া গোময় সদৃশ অর্ধতরল পদার্থটি মুখে মাখিতে শুরু করিলেন। দেখিতে খারাপ হইলেও উহার সুবাস বেশ মনোরম, সুরবালার কষ্ট হইতেছিল না। এর পর দেখিলেন কৌটার গায়ে লেখা আছে, মুখে লেপন লাগাইয়া বসিয়া থাকিতে হইবে যতক্ষণ না উহা শুকাইয়া যায়। দীর্ঘঃশ্বাস ফেলিয়া সুরবালা খাটে বসিয়া, টেবল-বাতি জ্বালাইয়া, বহুবার পড়া “হ্যারী পটার” পুনরায় পড়িতে আরম্ভ করিলেন।

এক্ষণে হ্যারী “সাপের ভাষা সাপের শিষ” সবেমাত্র আধো আধো বলিতে ও বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছে, এমন মাহেন্দ্রক্ষণে, পতিদেব সামান্য নড়িয়াচড়িয়া উঠিলেন। মাগ্‌ল বলিয়াই হয়ত, সুরবালা ইতিমধ্যে তাহার মুখে যে লেপন রহিয়াছে, উহার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছিলেন। বেশ কয়েকবার মুখ চুলকাইয়া ফেলিবার ফলে যে বেশ সাদায়-কালোয় চিত্রবিচিত পট তাহার মুখে রচিত হইয়াছিল, সে বিষয়েও অবগত ছিলেন না।

সুতরাং,পতিদেব জল খাইবেন বলিয়া চোখ খুলিয়া পাশের টেবলে হাত বাড়াইলেন, সুরবালা বিরক্ত হইয়া নিজমুখের সম্মুখ হইতে বইটি সরাইয়া কড়া চোখে তাকাইলেন এবং……

“বাপ্‌রে, ডাইনি কোথাকার” বলিয়া পতিদেব লম্ফ দিয়া উঠিতে গিয়া জলের বোতল সহ ভূপতিত হইলেন 😦

তবে, তিনি চোট পান নাই এবং সুরবালা যথেষ্ট আমোদ পাইয়াছেন। ভাল ভাল কথা লিখিবেন প্রসাধনী সম্পর্কে, ঠিক করিয়া ফেলিয়াছেন।

ছোটবেলা থেকেই আমার ধারণা আমি ভাল গান গাই। এই ধারণাটা আরোই পোক্ত হয়েছিল কারণ গান শুরু করলেই আমার কপালে ছোটখাটো পুরস্কার জুটতো। মানে ধরো এই আমি, “তুমি নির্মল করো-ও-ও-ও”…শুরু করে সবে মঙ্গলে এসেছি কী আসিনি অম্‌নি ফুলমাসি, “এই নে ল্যাবেঞ্চুস খা” বলে ভয়ার্ত হাসি হাসত। টু বি অন দ্য সেফ সাইড, একই লজেন্সের রিপিটিশনও খুব কমই করতো। বাচ্চার মুড, বলা তো যায়না। এরকম ভাবে বিভিন্ন সময়ে আমি এত বেশী টফি, ক্যাডবেরী, পেন্সিল, ইরেজার ইত্যাদি পেয়েছিলাম যে নিজের ওপর আমার বিশ্বাস এবং ভরসা দুই-ই বেড়ে গেছিল। ম্যাক্স আমাকে দু-তিন লাইন গাইতে হোত, তারপরেই… যাদের কাছে উপঢৌকন স্বরূপ কিছু থাকতোনা, তারা, আমি কত মিষ্টি, একা একা চুল বাঁধতে পারি কিনা, মা আমাকে এখনও খাইয়ে দেয় না নিজেই খাই ইত্যাদি নানা অবান্তর প্রসঙ্গের অবতারণা করতেন।  একবার তো একজন আমাকে একটা পুতুলও দিয়েছিল… (কে ঠিক মনে নেই, তবে সেবার আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতে বসেছিলাম, মনে আছে)

আমাদের স্কুলের মিউজিক টিচার একটু বদরাগী ছিলেন। কেউ বা কারা রটিয়েছিল, ওনার মাথায় আসলে টাক এবং সেটা ঢাকতে উনি উইগ ব্যবহার করেন। টাকের কারণেই হোক বা পরচুলার কারণে বা আরো কোন গূঢ় কারণে, তিনি সর্বদাই তিরিক্ষি মেজাজে থাকতেন। কিন্তু সেই মিসের সামনেও আমাকে বেশী গাইতে-ফাইতে হয়নি কোনদিনও… এমনিতেই বেশ ভাল মার্ক্স পেতাম। পরে বুঝেছি, আমি যেমন ওনাকে, উনিও সেরকমই  আমাকে ভয় পেতেন 😦 বা আমার গানকে ভয় পেতেন, টু বি প্রিসাইজ।

ক্রমশঃ, বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্যসমাজ ছাড়িয়ে আমার গানের খ্যাতি পশু-পক্ষীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি গান শুরু করলেই সানন্দে বেশ কিছু কাক সঙ্গত করত। অন্যান্য পাখি চুপটি করে থাকত; কোথাও কোন অন্য শব্দ নেই… এ বিশ্বচরাচরে, শুধু আমি ও আমার কাকেরা (ডিসক্লেইমারঃ  কোন বিশিষ্ট বিদ্বজনকে মীন করে কিছু বলা হয়নি)

কিন্তু বাপেরও বাপ থাকে অওর হামলোগ উসে দাদাজী বোলতে হ্যায়। অতএব, এক পুণ্য প্রভাতে, আমার ঠিক পাশের বাড়ির দামড়া খোকাটির হঠাৎ গান পেল। পেল মানে সে প্রায় আমাশার বেগ! সেই বেগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার আরো দু-তিনজন বন্ধু তবলা, গীটার আরো কীসব বাজাতে লাগল। শব্দই যে ব্রহ্ম বা স্বয়ং ব্রহ্মদত্যি তা একেবারে মোক্ষম মালুম হতে লাগল।

আশেপাশের বাড়ির দরজা-জানালা পু্রো সেই নকশাল আমলে পাড়ায় পুলিশ ঢুকলে যেমন হত, তেমনভাবে তড়িৎগতিতে বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করল। চাদ্দিকে শুন্‌শান, যেন কারফিউ জারি হয়েছে 😦 কিন্তু এদিকে আমাদের তো জানালা বন্ধ করেও কোন সুরাহা হচ্ছেনা। ছেলের পরীক্ষা, সে করুণ মুখে বসে আছে। শাশুড়ি-মা বসে চা খাচ্ছিলেন, চল্‌কে শাড়িতে পড়ে গেছে…একটা মোটামতন টিক্‌টিকির লেজটা খসে পড়ায় সেটা কাঁদো কাঁদো মুখে এর একটা বিহিত চাইছে…এসব দেখে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। মনে মনে নিজেকেই বললাম, “চল্‌ ধন্নো, ইয়ে না, বসন্তী, বসন্তী… আজ তেরি ইজ্জত কা সওয়াল হ্যায়!!”

প্রথমে একটু কালোয়াতী দিয়ে শুরু করবো ভাবছিলাম কিন্তু তারপরে ভাবলাম ব্যাপারটা কালান্তক হয়ে যেতে পারে। তাই, অল্পের ওপর… ভৈরবীতে, “বাবুল মোরা নৈহার ছুট হি যায়ে” দিয়ে স্টার্ট করলাম। সত্যি বলতে কী, ব্যাপারটা   আশানুরূপ হলনা, পাশের বাড়ি থেকে সেরকম কোন সাড়াই পাওয়া গেলনা। নেক্সট, একদম অন্য রুট… “পাপা, ডোন্ট প্রীচ…” এটা বেশ দরদ দিয়ে গাইছিলাম…ফলতঃ, শাশুড়ি-মা চমকে উঠে কাপটা টেবিল থেকে ফেলে দিলেন… ছেলে বই একেবারে বন্ধ করে গেম খেলতে শুরু করল।

কথায় বলে বারবার তিনবার। দু-দুবার ব্যর্থ হওয়ার পর আমি এমনিতেই মরীয়া হয়ে উঠেছিলাম। এ আমার কত বছরের সাধনার অপমান…আমার মাথা থেকে মুকুট এভাবে সেদিনের একটা ছোঁড়া কেড়ে নিতে পারেনা। হে ভারত, ভুলিওনা, মূর্খ ভারতবাসী, চন্ডাল… যাগ্‌গে, যাগ্‌গে… আবেগ, বুইলেন না…আবেগ…

যা বলছিলাম, তৃতীয় বার…হ্যাঁ, অগ্নিপরীক্ষা। অতএব… করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে…
টেবিলটা টেনে নিয়ে বাজিয়ে শুরু করলাম…
এ এ এ এ বঙ্কাসসস…
আ আ রে প্রীতম প্যায়ারে
বন্দুক মে না তো গোলি মেরে…

রিপিট (প্রবল উচ্চস্বরে)

আ আ রে প্রীতম প্যায়ারে
বন্দুক মে না তো গোলি মেরে..

পাশের বাড়ির জগঝম্প থেমেছে বেশ বুঝতে পারছিলাম তবুও কোন রিস্ক না নিয়ে আমি “পাল্লু কে নীচে ছুপাকে” অব্দি গেয়ে তবেই থামলাম।

পিনপতন নিস্তব্ধতা। কাক-চিল-চড়ুই জাস্ট অজ্ঞান হয়ে গেছে।

পাঁচ মিনিট পর নিম্নোক্ত কথোপকথন কানে এলোঃ

– ভাই, পরের সপ্তাহে তাহলে আমার বাড়িতে…
-হ্যাঁ ভাই, দ্যাখা হচ্ছে…

—————-

ঠিকই করে রেখেছি, যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে তবেই আমি ওই যার বাড়িতে পরের সপ্তাহে  রিহার্স্যাল হবে, তার পাড়ার লোকেদের সাহায্য করবো। সময়ের একটা দাম আছে তো নাকি…

gsrabani51_pic

ঠিক কীভাবে যে গাড়িটা স্কিড করেছিল ঠিকঠাক মনে করতে পারেনা কিছুতেই রচনা। পেছন পেছন আসা ট্রাকটার ওপর বোঝাই করা মাল ত্রিপল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা, ওপরে বসে আছে কয়েকজন ছোকরা গোছের খালাসী। মাঝেমধ্যেই তারা  সরস যৌনগন্ধী টিপ্পনী ছুঁড়ে দিচ্ছিল রচনাদের উদ্দেশ্যে। সেগুলো সব শোনা বা বোঝা না গেলেও অঙ্গভঙ্গি বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না দুজনের কারোরই।  মেজাজ হারাচ্ছিল অভি, রচনা কড়া চোখের ইশারায় বারণ করছিল রিঅ্যাক্ট করতে। দিনকাল ভাল নয়, কোত্থেকে কী হয় বলা যায়না…সন্ধ্যার ঝোঁকে এইসব রাস্তা, হাইওয়ে কানেক্টর বলা যায়,  খুব একটা ব্যস্ত নয়। হুশহাশ গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ কারো সাহায্যের জন্য দাঁড়াবে এমন ভাবার কোন কারণ নেই।

আসানসোল থেকে বেরোতেই দেরী হয়ে গিয়েছিল ওদের। রাতের আগেই কলকাতা ঢুকবে বলে অভি চালাচ্ছিলও বেশ ভাল স্পীডে, আর, আশ্চর্যজনকভাবে ট্রাকটা যেন ওদের ওভারটেক করতেই চাইছিল না।  এই রাস্তায় এভাবে ট্রাকের মাথায় বসে থাকা যথেষ্ট বিপজ্জনক- এই বোধও কী নেই ওদের! অভি দু-একবার সামান্য স্লো করে ইশারা করলেও পাত্তা দেয়নি ড্রাইভার। হাল ছেড়ে দিয়ে অভি যথাসম্ভব স্পীড তুলেছিল। হঠাৎ একটা বাঁকের পরেই আলো-ঝলমলে একটা ধাবা দেখে আচমকা ব্রেক কষেছিল, প্রায় পরক্ষণেই বিকট স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ আওয়াজ তুলে ওদের নীলরঙা ওয়াগনারের রঙ চটিয়ে সেটাকে প্রায় উলটে দিয়ে সামনের বিরাট গাছটাতে ধাক্কা মেরেছিল ট্রাকটা। রচনা ওই স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ অবধি মনে করতে পারে সব…তারপর অন্ধকার।

নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফেরার দুদিন পরে অভি বলেছিল ঘটনাটা। গাছে ধাক্কার অভিঘাতে উপরে বসা তিনজনই ছিট্‌কে পড়েছিল রাস্তায় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছন পেছন আসা আরেকটা লরী পিষে ফেলে ওদের।

“তুমি কি ইচ্ছে করেই ওভাবে ব্রেক কষেছিলে, অভি?”
আকুল স্বরে করা রচনার প্রশ্নটা শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল অভি।

“পাগল হয়ে গেছ নাকি? মানুষ খুন করেছি বলতে চাও? পুলিশ ইনভেস্টিগেশন হয়নি?… একশো আটরকম কথার জবাব দিতে হয়েছে…যারা ওখানে ছিল প্রত্যেকেই বলেছে দোষ ট্রাকটার…আর এখন কিনা তোমার কাছে এইসব আজগুবি কথা শুনতে হচ্ছে!!”

“কিন্তু…কিন্তু…তিনজন মারা গেছে… আর যে পেছনে ছিল? তার কী হল? বাঁচেনি না?”

হাঁ করে দু-সেকেন্ড রচনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অভি ধীরে ধীরে বলে,
“আর কেউ ছিলনা ওপরে, তিনজন; ড্রাইভার আর তার পাশে আরেকজন ছিল, তারা সাঙ্ঘাতিক ইঞ্জিওর্ড”

“কী বলছো কী! আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম যখন ট্রাকটা আমাদের গাড়ির গা ঘেঁষে ছেঁচড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, পেছনে আরেকজন ছিল… কালো রঙের জামা-প্যান্ট, সাথে একটা কুকুর, সেটাও কালো রঙ…লাল জিভ বের করে পা চাটছিল… লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে হাত নাড়ল…”

“স্টপ ইট, প্লীজ। তোমার এইসব গালগল্প শোনার মানসিকতা নেই আমার… ট্রমা আমারও আছে, রচনা, কিন্তু তাই বলে তোমার মতন মাথা খারাপ হয়ে যায়নি আমার…আই জাস্ট কান্ট টেক এনি মোর অভ দিস্‌ বুলশীট”

সেই শুরু।

*******

মাস সাতেক পর, রচনার ছোটকাকার পঁচাত্তর বছরের জন্মদিন খুব বড় করে পালন করা হবে বলে ওরা সব ভাইবোনেরা মিলে ডিসিশন নিল। এই কাকা অবিবাহিত, ভাইপো-ভাইঝিদের বড়ই প্রিয় এবং আদরের। ্সকাল থেকেই বাপের বাড়িতে রচনা। হই-হুল্লোড়, আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়ার দাপটে সাত মাস আগে ঘটে যাওয়া ভয়ানক স্মৃতিটা মন থেকে ব্লটিং পেপার দিয়ে কেউ শুষে নিয়েছে যেন। অভিও দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে খুড়শ্বশুরের সঙ্গে বিয়ার নিয়ে বসে হাল্কা রসিকতা করে চলেছে…অন্যান্য জামাই, শালারাও সঙ্গে যোগ দিয়েছে। মাঝে মাঝেই ছোটকাকার উদাত্ত হা-হা হাসির আওয়াজ ভেসে  আসছে দোতলার  হল থেকে। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে রচনা ছুটল সদর দরজা খুলতে।

বড়পিসি বাতের ব্যথায় কেঁপেঝেঁপেও এসে হাজির হয়েছে। কত্তদিন বাদে দেখা…জড়িয়ে ধরে রচনা পিসিকে।

ঠিক সেই সময়েই চোখে পড়ে সদর দরজার উল্টোদিকের পাঁচিলে বসা লোকটাকে।

কালো রঙের জামা-প্যান্ট, সাথে একটা কালো কুকুর… লাল জিভ বের করল না কুকুরটা?…পা-টা কি চাটছে? লোকটা হাসছে…হাতটা নাড়বে বলে ওঠাচ্ছে … পিসির গায়ের ওপরেই এলিয়ে পড়ে রচনা।

..আবার অন্ধকার… আবার নার্সিংহোম।

তবে এবার আর একা ফেরা নয়, সঙ্গে ছিল ছোটকাকার বডি। পিসির আর্তনাদ শুনে হুড়মুড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা স্লিপ করে যায় কাকার…ইন্ট্যারন্যাল হেমারেজ… কয়েক ঘন্টায় সব শেষ।

*******

অনেক চেষ্টা করেও অভিকে ঘটনাটা বলে উঠতে পারেনি রচনা। জানে যে, বিশ্বাস করবেনা, শুধু শুধু ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি…আজকাল একদম পারেনা এসব চাপ নিতে সে…

তিন দিন আগে, পাশের ফ্ল্যাটের মিসেস দেশাইয়ের ছেলের বাচ্চা হয়েছে শুনে দেখা করতে গেছিল। মিষ্টি, ফুট্‌ফুটে একটা পুতুল যেন মেয়েটা। খোলা জানালা দিয়ে সটান চোখ গেল সামনের ব্যালকনিতে।

আবার… মৃদু হাসল বোধহয়…কুকুরটা লোলুপ লোল জিহ্বা বের করে তাকিয়ে আছে।

ঝট্‌ করে চোখটা সরিয়ে নেয়… কিন্তু জানত কী হবে।

বাচ্চাটা দু-দিন পরে মারা গেল। টাইফয়েড হয়েছিল নাকি… বোঝা যায়নি।

********

অভি প্রথমে কোন কথাই বললনা কিছুক্ষণ। মাথা নীচু করে কিছু ভাবছিল। যখন মুখ তুলল, তখন দু-চোখে মায়া মাখানো।
“আমায় ভুল বুঝোনা প্লিজ, কিন্তু তুমি বুঝতে পারছনা কী সাঙ্ঘাতিক একটা মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে তুমি যাচ্ছ। আমি জানি রচনা, এই ধরণের অ্যাকসিডেন্টের পর অনেক সময়েই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে… আর তুমি তো কিছু বুঝতেই দাওনি কখনো…শুধু কয়েকবার ব্ল্যাক-আউট…যাইহোক, আমি কালই ডক্টর সোমের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করছি, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে…কিছু ভেবোনা,সোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে।” হালকা করে একটা চুমু খায় অভি রচনার ভেজা গালে।

“আমি পাগল নই, অভি! মানসিক রোগ হয়নি আমার। আমি যা তোমাকে বললাম সব বর্ণে বর্ণে সত্যি। কীকরে বোঝাবো তোমাকে…লোকটা আসে, প্রতিবার, আমি জানি কিছু একটা ভয়ানক অমঙ্গল নিয়ে আসে ও…”

দুজনেই দুজনকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে চলে… শব্দ-প্রতিশব্দরা দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরতে থাকে, ঘুরতেই থাকে। তারপর একসময় প্রবল বিস্ফোরণে আছড়ে পড়ে। মাথার ভেতর প্রতিটি শব্দ বিস্ফোরণে ছিটকে আসা লোহার টুকরো…গেঁথে যেতে থাকে রচনার মগজে… শিরায়-উপশিরায়।

“পাগল, তুমি পাগল…মানসিক রোগী তুমি”

*********

গতকাল রাত্রে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে কখন যেন। টের পায়নি রচনা। এত ঘুম ঘুমোয় ও আজকাল যে কিছু টের পায়না। স্বপ্নও দেখেনা। কোথাও বেরোতে ভয় পায়। অভির সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ বললেই চলে। ডাক্তার দেখায়নি ও। কেন দ্যাখাবে? সব সত্যি, ও জানে…

তবুও আজ সকালটা অন্যরকম লাগছিল। অসময়ের বৃষ্টির ঝাপ্‌টায় বারান্দার গাছগুলো ভিজে চুপ্পুস। ইস্‌, জেগে থাকলে ও-ও দেখতে পেত, জলের ঝরোখার ওপারে ভিজতে থাকা  গাছগুলোর আনন্দ।  বহুদিন পরে হঠাৎ যেন বড় বেশী করে বাইরে বেরোতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ। বলবে কি অভিকে তাড়াতাড়ি আসতে?

ঘোরটা কেটে যায় অভির গলার আওয়াজে। আজকাল আর বাড়িতে ব্রেকফাস্ট করেনা অভি, বাইরেই খেয়ে নেয়। শুধু বেরোনর আগে নিয়ম করে একটা কথা রোজ জিজ্ঞেস করে…আজও সেটাই বলছে।

“যাবে একবার ডক্টর সোমের কাছে? প্লীজ?”

দমকা হাওয়ায় টবের গোলাপ গাছটা দুলে ওঠে, দু-ফোঁটা জল ঢেলে দিয়ে যায় আদর করে হাতের ওপর। অভিকে চূড়ান্ত হতবাক করে মাথা নাড়ে রচনা, যাবে।

হতভম্ব হয়ে কোন কথা না বলে রচনাকে  শুধু জড়িয়ে ধরে অভি; “রেডি হয়ে থেকো, ঠিক ছ’টা।”

আজ অনেকদিন পরে অভির যাওয়ার সময় সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ঠিক হয়ে যাবে সব, মনে মনে বলে সে।
ওই তো অভি গাড়ি বের করছে। বসলো স্টিয়ারিঙে…  হাত নাড়ছে হাসিমুখে।

অপস্রিয়মাণ গাড়িটার দিকে তাকাতে ঠিক তখনই…

পেছনে কালো জামা, কালো প্যান্ট পরা কে ও!

পাগলের মতন বেড্রুমে গিয়ে মোবাইলে অভির নাম্বার ডায়াল করে সে…আটকাতেই হবে অভিকে…

সামনে টেবিলে পড়ে থাকা অভির মোবাইলের রিংটোন ছাপিয়েও কানে আসে অনেক লোকের গলার আওয়াজ…অ-নে-ক  লো-ক… আর বীভৎস স্ক্রী-ই-ই-ই-চ-চ…।

একজোড়া

Posted: মার্চ 2, 2017 in ছন্দের কারিকুরি
ট্যাগসমূহ:, ,

হৃদয়ের ওমে বোনা
পশমী মাফলার
উশ্‌কে তোলে উষ্ণতা,
রঙিন সুতোয় যত্নে তোলা
আবছা হওয়া নাম…

বারাণসীর ঘাটে
সে যে ভাসিয়ে দিল শব
স্মৃতির স্রোতে যতেক ডালা
তোমার-ই সে সব…

হোয়াট্‌স অ্যাপ যে ভাল জিনিস, সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ ছিলনা প্রথম থেকেই। বেশি ভাল আমার সয়না, তাই নিজের ফোনে ব্যাপারটা রাখিনি অনেকদিন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের অবহেলা, অনাদর উপেক্ষা করেও একা কুম্ভ’র মতন লড়ে যাচ্ছিলাম। পয়সা খরচা করে ফোন করতাম বা এস এম এস তবুও মাথা নোয়াইনি।

তা কয়েকমাস আগে একটি ঘটনা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

এবছর পয়লা বৈশাখের পরদিন জনৈক বয়স্কা প্রতিবেশীর সঙ্গে মুখোমুখি হওয়াতে বলেই ফেললাম, “শুভ নববর্ষ”।  এমনিতে ওনার সঙ্গে মাঝে মাঝে বাক্যালাপ হয় বটে তবে তেমন কিছুনা। ভদ্রমহিলা কেমন ভূত দ্যখার মতন কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলে্ন, তারপর আমতা আমতা করে “নববর্ষ” বা ওরকম কিছু একটা বলে ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে গেলেন। রকমসকম দেখে সুবিধের লাগলোনা। হঠাৎ দেখি উনি হাতে একটা কী নিয়ে আবার আসছেন। নিশ্চয়ই মিষ্টি-ফিষ্টি দেবে ভেবে খুশি হয়ে গেলাম O:) নাঃ, লোককে এত অল্পে ভুল বোঝা ঠিক না, ভাবতে ভাবতেই দেখি এগিয়ে এসে ভয়ানক রহস্যময়ভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই, তুমি আমাদের “কোন এক পাড়ার বধূ” গ্রুপে নেই? কাল যে অতগুলো  নববর্ষ ফরওয়ার্ড করলাম, উইশ করলাম, পাওনি?”
আমি, সত্যি বলতে কী, এক অজানা জগতের অপার সম্ভাবনাসমৃদ্ধ এই সাংকেতিক প্রশ্নের সামনে যাকে বলে হুব্বা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আরো কিছু তীব্র, তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণের পর আমি বাড়ি এসে, অতঃপর, নিজের উপর লজ্জায়, ঘেন্নায়, ফোনে  হোয়াট্‌স অ্যাপ ইন্সটল করলাম।

এর পরদিন থেকে সকালগুলি যারপনাই অজস্র বন্ধুদের ফরওয়ার্ড স্বরূপ আশীর্বাদে সততই গুডমর্ণিং হয়ে উঠতে শুরু করল। দুপুর, বিকেল এবং রাতেও ভাব-ভালবাসার অন্ত নেই। কিছু কিছু মানুষ আবার কমপক্ষে চার-পাঁচটা “গুড-নাইট” লেখা ছবি পোস্ট না করে ঘুমোতে পারেননা। কারো কারো দৃঢ় বিশ্বাস, ২০ জনকে “ভগবান তোমার ভাল করুন” মেসেজ ফরওয়ার্ড করলে ভগবান অবশ্যই যাবতীয় কাজ ফেলে ছুটে এসে তাদের মঙ্গল, বুধ বা বেস্পতি কিছু একটা করবেন। কারো আবার বদ্ধমূল ধারণা, ৫০ জনকে কোন বিশেষ লিঙ্ক পাঠালে সে ৫০০ টাকার টকটাইম ফ্রী পাবে! এছাড়া, গেঞ্জি-জামা-ব্রা-প্যান্টি এসব ফ্রী-তে পাওয়া যাবে
সুধ্‌ধু ফরওয়ার্ড করলেই, এরকম লোভনীয় হাতছানিও পাওয়া যায়।

ফরওয়ার্ড- এর উপরেই দুনিয়া কায়েম হ্যায়। ঘাসের ওপর প্রথম পড়া শিশির সামান্য নুন দিয়ে খেলে কোষ্ঠ সাফ হবে, টোম্যাটো বেশি খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়, ইউনেস্কো আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে বাকী সব দেশেরও জাতীয় সঙ্গীত করার পরামর্শ দিয়েছে, কীভাবে বসলে মাথায় কোনদিন টাক পড়বেনা, কার কার ব্যাঙ্কে ঠিক কত পরিমাণ কালো টাকা আছে, কালো টাকা গোলাপী করার ১০ টি সহজ পদ্ধতি, কীভাবে দু-কিলোমিটার দূর থেকে গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারবেন সবচেয়ে নিকটবর্তী এটিএম-এ টাকা আছে না নেই, বা, নিমপাতার টক-মিষ্টি ফিরনি- এ সবই আমি হোয়াট্‌স অ্যাপ ফরওয়ার্ড থেকেই জেনেছি। যে বই আমি কখনো পড়িনি, যে সিনেমা আমার কখনো দেখতে ইচ্ছে হয়নি, ফরওয়ার্ড আমাকে সেইসব বই/সিনেমা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করেছে, সমাজে আমি মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছি।

আজ তাই নতমস্তকে, ছলোছলো চোখে বলতে বাধ্য হচ্ছি… হে হোঅ্যা, আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব ,ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব……